রেহমান সোবহানের ‘উতল রোমন্থন’
jugantor
রেহমান সোবহানের ‘উতল রোমন্থন’

  মুঈদ রহমান  

২০ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরেণ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের পাণ্ডিত্য নিয়ে দেশে কিংবা দেশের বাইরে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস করেছেন কিংবা আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে তার একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘উতল রোমন্থন’ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমি বিমোহিত, এক কথায় বলতে পারেন আত্মহারা। আত্মজীবনী মানে কেবল জীবনের সাধারণ গল্প নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ জীবনবোধ, রাজনীতি ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি রয়েছে বইটিতে। কেবল স্মৃতির ওপর ভর করেও যে মানুষ এমন জনম-লিখন লিখতে পারেন, তা ‘উতল রোমন্থন’ না পড়লে বোঝা যেত না। বইটিতে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিকতার যে নিখুঁত বর্ণনা করা হয়েছে, তা বোধকরি অধ্যাপক রেহমান সোবহানের দ্বারাই সম্ভব।

‘উতল রোমন্থন’ রেহমান সোবহানের মূল গ্রন্থ ‘UNTRANQUIL RECOLLECTIONS: The Years of Fulfilment’-এর বাংলা অনুবাদ। অনুবাদের কাজটি করেছেন অমিতাভ সেনগুপ্ত। ১৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বইটি পাঠকের যে কোনো মূল্যবান সময়কে অনায়াসে টেনে নেবে। বইটি অধ্যাপক সোবহানের জন্মকাল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাপ্তিকাল পর্যন্ত অপূর্ব বর্ণনায় গাঁথা। অবশ্য অধ্যাপক রেহমান সোবহানের আগের বইটির দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে লেখা ‘UNTRANQUIL RECOLLECTIONS: Nation Building in Post-Liberation Bangladesh’ এরই মধ্যে পাঠকের হাতে পৌঁছে গেছে। তবে আজকের আলোচনা আমি ‘উতল রোমন্থনেই’ সীমাবদ্ধ রাখব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে তিনি কতটা লালন করেছিলেন, তা শুরুতেই অনুমান করা যায়। গ্রন্থের শুরুটা হয়েছে এভাবে-‘আমার ঘটনাবহুল জীবনের ফেলে আসা সময়ের দিকে ফিরে তাকালে আমি দেখতে পাই, বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী আমি। নিজের সামান্য যোগ্যতার সম্বলে খুব কাছ থেকে এমন বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেখার ও অনুধাবনের সুযোগ পেয়েছি। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখনীয় হলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম।’

জন্ম পরিচয় দিতে গিয়ে পরিবারকে মার্গে তুলে ধরার জন্য ‘সম্ভ্রান্ত’, ‘অভিজাত’ ইত্যাদি যত রকমের সামন্তীয় শব্দ আছে, তার সবগুলোই রেহমান সোবহানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু লক্ষণীয়, পরিবারের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি শুধু লিখেছেন, ‘সমাজের সুবিধাভোগী অংশে আমার জন্ম।’ ব্রিটিশশাসিত ভারতের কলকাতায় ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ রেহমান সোবহানের জন্ম। সে সময়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে হাতেগোনা কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল কিছু ভারতীয়কে ব্রিটিশ শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গড়ে তোলা। সেসব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম হলো দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল্স স্কুল। ১৯৪২ সালে এই স্কুলে ভর্তির ভেতর দিয়েই রেহমান সোবহানের শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৫০ সালে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা পর্যন্ত তিনি এখানেই পড়াশোনা করেন। ঢাকার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ১৯৪৮ সালের ফেব্রয়ারিতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন রেহমান সোবহানের নানা (মায়ের মামা)। সেই সূত্রে এক মাসের জন্য নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেন্ট পল্সের পাঠ শেষ করে ১৯৫১ সালের মার্চের শেষে চলে যান পাকিস্তানের অভিজাত মহলের শহর লাহোরে। সেখানে ভর্তি হন আরেক বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এইচেসন কলেজে। সেখানে দুবছরের পড়া শেষ করে ১৯৫৩ সালে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখেন। ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে অর্থনীতি বিষয়ে পড়ার জন্য ক্যামব্রিজে ভর্তি হন। ক্যামব্রিজে পড়াকালীন রেহমান সোবহানের ভাবনা জগতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল্স স্কুল কিংবা লাহোরের এইচেসন কলেজ লেখাপড়া ও খেলাধুলার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত হলেও রাজনৈতিক ভাবনার অনুকূল ছিল না, তাছাড়া বয়স একটি নির্ণায়ক ছিল। কিন্তু ক্যামব্রিজে ভর্তি হওয়ার পর রাজনৈতিক দিকটি আলোকিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। রেহমান সোবহানের ভাষায়-‘ক্যামব্রিজ মজলিশ থেকে আমার নিজের সরাসরি ক্যামব্রিজের জনজীবন ও রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে যাওয়া শুরু। ভারত ও সিংহল নিয়ে গঠিত তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের ছাত্রদের ফোরাম হিসাবে উনবিংশ শতকের শেষভাগে এই পুরোনো সংস্থাটির জন্ম। এখানে উপমহাদেশীয় ছাত্ররা সামাজিকতা বিনিময়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে পারত।’

ক্যামব্রিজের পড়াশোনা শেষে দুমাস করাচিতে থেকে ১৯৫৭ সালের ৩ জানুয়ারি সকালে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে ঢাকায় আসেন। ওই বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং তার স্থায়িত্ব ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত হলেও কার্যত তিনি অধ্যাপকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান ১৯৭৭ সালে। অধ্যাপক সোবহান পৃথিবীর যে কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশ ছিল তার অন্তঃস্থলে। তাছাড়া পেশা নির্বাচনের বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। তার ভাষায়-‘যদি পেশাদার হিসাবে স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাই এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে চাই, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ বিভিন্ন পছন্দের সন্ধান দেবে।’

রেহমান সোবহানের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তাকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি পরিষ্কারভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান ও অন্যতম সমস্যা হলো পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার অসম ও অন্যায্য সম্পর্ক। ১৯৬১ সালের জুন মাসে রেহমান সোবহানের লেখা থেকেই আমরা ধারণা পাই, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত ‘দুই অর্থনীতি’ চালু রেখেছে, যা বৈষম্য দ্বারা আবর্তিত। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা প্রশাসনিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ২৫৫ কোটি টাকা, যা পশ্চিম পাকিস্তানের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। এই চরম বৈষম্যের অন্যায্যতার কথা মাত্র ২৫ বছর বয়সি রেহমান সোবহান তুলে ধরেন।

শুধু লেখালেখির মধ্যেই রেহমান সোবহান নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়েছিলেন। বইটির ১৩ অধ্যায়ের শিরোনাম হলো-‘জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্তি’। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়, তার মূলে ছিল দলটির নির্বাচনী ইশতেহার। রেহমান সোবহান এই ইশতেহার তৈরিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তার ভাষায়-‘১৯৭০ সালের আসন্ন নির্বাচনের জন্য তৈরি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের উদ্দেশ্য ছিল এটা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এজেন্ডার অনুমোদনের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি হিসেবে কাজ করবে। ... বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত দলিলে সই করেন, যা ৬ জুন ১৯৭০ ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পর্ষদের ঐতিহাসিক বৈঠকে পেশ করা হয় এবং গৃহীত হয়।’

‘উতল রোমন্থন’ বইটির প্রতিটি অধ্যায়ই সমভাবে উজ্জ্বল। তবে ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ অধ্যায়গুলো গৌরবের বিবেচনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে। এ অধ্যায়গুলোতে রেহমান সোবহান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১ জানুয়ারি ১৯৭০ ইয়াহিয়া প্রকাশ্য রাজনীতিচর্চা অনুমোদন করামাত্র পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা-পরবর্তী পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মর্যাদা ইতিমধ্যেই উচ্চাসীন হয়েছিল। এবার পাকিস্তানের ২২ বছরের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ আসায় স্বমূর্তিতে প্রকাশিত হলেন বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগ বিপ্লবী দল ছিল না, কিন্তু তার শেকড় ছিল জনমানসের গভীরে, যা নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পদ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। জনগণের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি এবং তাদের সমর্থন জোগাড়ের সুযোগটুকু শুধু প্রয়োজন ছিল।’ কিন্তু সে নির্বাচনে সমগ্র জাতির ম্যান্ডেট পাওয়ার পরও পশ্চিমারা ২৫ মার্চ রাতে বাঙালি নিধনের পথ বেছে নেয়। শুরু হয়ে যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

রেহমান সোবহান সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ কয়েকজন সাথীসহ তিনি আগরতলা সীমান্তের দিকে রওনা হন। পাকিস্তানি গুপ্তচরদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য ছদ্মনাম ধারণ করেন দীন মোহাম্মদ। কিন্তু চেহারার কারণে কেউ কেউ তাকে পাকিস্তানের চর ভেবেছিল। ১ এপ্রিল রেহমান সোবহান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা পৌঁছান। সেখানেও প্রাথমিকভাবে ছদ্মনাম নিতে হয়-মদন মোহন। আগরতলা থেকে কলকাতা হয়ে বিমানযোগে দিল্লি পৌঁছে ৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে বসেই স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র তৈরির বিরল অংশীদার হন রেহমান সোবহান। তার ভাষায়-‘‘আমি মনে করতে পারি, ‘বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র’ এই ঘোষণায় ‘গণ’ শব্দটা জুড়েছিলাম।’’ শুধু তাই নয়, এই ঘোষণাপত্রের প্রেক্ষিত হিসাবে যে মূল্যবান বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল, তার স্রষ্টাও রেহমান সোবহান। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত বিবৃতির একটি উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতিবাক্য ছিল, ‘পাকিস্তান মৃত এবং মৃতের পাহাড়ের নিচে সমাধিত।’ তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করা এবং সেই মতে মুজিবনগর সরকার গঠন করা, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া-সবকিছুতে আওয়ামী নেতৃত্বের যে বিরোধ ছিল, তার একটি পরিষ্কার বর্ণনা এ অধ্যায়টিতে আছে।

মুজিবনগর সরকার ঘোষিত হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ দূতের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় রেহমান সোবহানকে। পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখার হাজারো চেষ্টায় ইয়াহিয়া গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং বিশ্বের সারা প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে তা প্রতিরোধে রেহমান সোবহানের মতো একজন বিচক্ষণ মানুষের প্রয়োজনবোধ করেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং এ কারণেই তাকে দূত হিসাবে নিয়োজিত করেন। রেহমান সোবহানও দমবার পাত্র নন। বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালাতে এবং বহির্র্বিশ্বের বাঙালিদের সমর্থন আদায়ে ছুটে বেড়িয়েছেন প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্কে। মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডিসহ ডেমোক্র্যাটদের তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও সাফল্যজনক আলোচনা করেন। বিশ্ব যোগাযোগের প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করতে রেহমান সোবহান কলকাতায় ফিরে আসেন জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। তার সেই রিপোর্টটি প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। পরবর্তী সময়ে রেহমান সোবহানের প্রস্তাব করা প্ল্যানিং বোর্ড মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের এফ কেনেডি বিমানবন্দর হয়ে রেহমান সোবহান যখন হিথরো বিমানবন্দর এবং সেখান থেকে অক্সফোর্ডে পৌঁছান, ততক্ষণে পাকিস্তানিরা ঢাকায় আত্মসমপর্ণের কাজ সমাধা করে ফেলে।

একজন রেহমান সোবহানের জীবনের যে বিশাল ক্যানভাস, তা এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা এক ধরনের ধৃষ্টতা বলে বিবেচিত হতে পারে। সেজন্য আমি সেদিকে পা বাড়াইনি। আমি শুধু একটি বইয়ের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলাম, যে বইটি পড়লে ‘বাংলার মানুষ রেহমান সোবহান’কে চেনা যাবে, জানা যাবে। বইটির নাম ‘উতল রোমন্থন’।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

রেহমান সোবহানের ‘উতল রোমন্থন’

 মুঈদ রহমান 
২০ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরেণ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের পাণ্ডিত্য নিয়ে দেশে কিংবা দেশের বাইরে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস করেছেন কিংবা আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে তার একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘উতল রোমন্থন’ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমি বিমোহিত, এক কথায় বলতে পারেন আত্মহারা। আত্মজীবনী মানে কেবল জীবনের সাধারণ গল্প নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ জীবনবোধ, রাজনীতি ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি রয়েছে বইটিতে। কেবল স্মৃতির ওপর ভর করেও যে মানুষ এমন জনম-লিখন লিখতে পারেন, তা ‘উতল রোমন্থন’ না পড়লে বোঝা যেত না। বইটিতে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিকতার যে নিখুঁত বর্ণনা করা হয়েছে, তা বোধকরি অধ্যাপক রেহমান সোবহানের দ্বারাই সম্ভব।

‘উতল রোমন্থন’ রেহমান সোবহানের মূল গ্রন্থ ‘UNTRANQUIL RECOLLECTIONS: The Years of Fulfilment’-এর বাংলা অনুবাদ। অনুবাদের কাজটি করেছেন অমিতাভ সেনগুপ্ত। ১৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বইটি পাঠকের যে কোনো মূল্যবান সময়কে অনায়াসে টেনে নেবে। বইটি অধ্যাপক সোবহানের জন্মকাল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাপ্তিকাল পর্যন্ত অপূর্ব বর্ণনায় গাঁথা। অবশ্য অধ্যাপক রেহমান সোবহানের আগের বইটির দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে লেখা ‘UNTRANQUIL RECOLLECTIONS: Nation Building in Post-Liberation Bangladesh’ এরই মধ্যে পাঠকের হাতে পৌঁছে গেছে। তবে আজকের আলোচনা আমি ‘উতল রোমন্থনেই’ সীমাবদ্ধ রাখব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে তিনি কতটা লালন করেছিলেন, তা শুরুতেই অনুমান করা যায়। গ্রন্থের শুরুটা হয়েছে এভাবে-‘আমার ঘটনাবহুল জীবনের ফেলে আসা সময়ের দিকে ফিরে তাকালে আমি দেখতে পাই, বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী আমি। নিজের সামান্য যোগ্যতার সম্বলে খুব কাছ থেকে এমন বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেখার ও অনুধাবনের সুযোগ পেয়েছি। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখনীয় হলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম।’

জন্ম পরিচয় দিতে গিয়ে পরিবারকে মার্গে তুলে ধরার জন্য ‘সম্ভ্রান্ত’, ‘অভিজাত’ ইত্যাদি যত রকমের সামন্তীয় শব্দ আছে, তার সবগুলোই রেহমান সোবহানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু লক্ষণীয়, পরিবারের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি শুধু লিখেছেন, ‘সমাজের সুবিধাভোগী অংশে আমার জন্ম।’ ব্রিটিশশাসিত ভারতের কলকাতায় ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ রেহমান সোবহানের জন্ম। সে সময়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে হাতেগোনা কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল কিছু ভারতীয়কে ব্রিটিশ শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গড়ে তোলা। সেসব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম হলো দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল্স স্কুল। ১৯৪২ সালে এই স্কুলে ভর্তির ভেতর দিয়েই রেহমান সোবহানের শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৫০ সালে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা পর্যন্ত তিনি এখানেই পড়াশোনা করেন। ঢাকার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ১৯৪৮ সালের ফেব্রয়ারিতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন রেহমান সোবহানের নানা (মায়ের মামা)। সেই সূত্রে এক মাসের জন্য নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেন্ট পল্সের পাঠ শেষ করে ১৯৫১ সালের মার্চের শেষে চলে যান পাকিস্তানের অভিজাত মহলের শহর লাহোরে। সেখানে ভর্তি হন আরেক বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এইচেসন কলেজে। সেখানে দুবছরের পড়া শেষ করে ১৯৫৩ সালে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখেন। ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে অর্থনীতি বিষয়ে পড়ার জন্য ক্যামব্রিজে ভর্তি হন। ক্যামব্রিজে পড়াকালীন রেহমান সোবহানের ভাবনা জগতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল্স স্কুল কিংবা লাহোরের এইচেসন কলেজ লেখাপড়া ও খেলাধুলার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত হলেও রাজনৈতিক ভাবনার অনুকূল ছিল না, তাছাড়া বয়স একটি নির্ণায়ক ছিল। কিন্তু ক্যামব্রিজে ভর্তি হওয়ার পর রাজনৈতিক দিকটি আলোকিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। রেহমান সোবহানের ভাষায়-‘ক্যামব্রিজ মজলিশ থেকে আমার নিজের সরাসরি ক্যামব্রিজের জনজীবন ও রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে যাওয়া শুরু। ভারত ও সিংহল নিয়ে গঠিত তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের ছাত্রদের ফোরাম হিসাবে উনবিংশ শতকের শেষভাগে এই পুরোনো সংস্থাটির জন্ম। এখানে উপমহাদেশীয় ছাত্ররা সামাজিকতা বিনিময়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে পারত।’

ক্যামব্রিজের পড়াশোনা শেষে দুমাস করাচিতে থেকে ১৯৫৭ সালের ৩ জানুয়ারি সকালে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে ঢাকায় আসেন। ওই বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং তার স্থায়িত্ব ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত হলেও কার্যত তিনি অধ্যাপকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান ১৯৭৭ সালে। অধ্যাপক সোবহান পৃথিবীর যে কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশ ছিল তার অন্তঃস্থলে। তাছাড়া পেশা নির্বাচনের বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। তার ভাষায়-‘যদি পেশাদার হিসাবে স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাই এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে চাই, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ বিভিন্ন পছন্দের সন্ধান দেবে।’

রেহমান সোবহানের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তাকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি পরিষ্কারভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান ও অন্যতম সমস্যা হলো পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার অসম ও অন্যায্য সম্পর্ক। ১৯৬১ সালের জুন মাসে রেহমান সোবহানের লেখা থেকেই আমরা ধারণা পাই, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত ‘দুই অর্থনীতি’ চালু রেখেছে, যা বৈষম্য দ্বারা আবর্তিত। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা প্রশাসনিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ২৫৫ কোটি টাকা, যা পশ্চিম পাকিস্তানের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। এই চরম বৈষম্যের অন্যায্যতার কথা মাত্র ২৫ বছর বয়সি রেহমান সোবহান তুলে ধরেন।

শুধু লেখালেখির মধ্যেই রেহমান সোবহান নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়েছিলেন। বইটির ১৩ অধ্যায়ের শিরোনাম হলো-‘জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্তি’। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়, তার মূলে ছিল দলটির নির্বাচনী ইশতেহার। রেহমান সোবহান এই ইশতেহার তৈরিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তার ভাষায়-‘১৯৭০ সালের আসন্ন নির্বাচনের জন্য তৈরি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের উদ্দেশ্য ছিল এটা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এজেন্ডার অনুমোদনের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি হিসেবে কাজ করবে। ... বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত দলিলে সই করেন, যা ৬ জুন ১৯৭০ ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পর্ষদের ঐতিহাসিক বৈঠকে পেশ করা হয় এবং গৃহীত হয়।’

‘উতল রোমন্থন’ বইটির প্রতিটি অধ্যায়ই সমভাবে উজ্জ্বল। তবে ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ অধ্যায়গুলো গৌরবের বিবেচনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে। এ অধ্যায়গুলোতে রেহমান সোবহান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১ জানুয়ারি ১৯৭০ ইয়াহিয়া প্রকাশ্য রাজনীতিচর্চা অনুমোদন করামাত্র পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা-পরবর্তী পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মর্যাদা ইতিমধ্যেই উচ্চাসীন হয়েছিল। এবার পাকিস্তানের ২২ বছরের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ আসায় স্বমূর্তিতে প্রকাশিত হলেন বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগ বিপ্লবী দল ছিল না, কিন্তু তার শেকড় ছিল জনমানসের গভীরে, যা নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পদ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। জনগণের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি এবং তাদের সমর্থন জোগাড়ের সুযোগটুকু শুধু প্রয়োজন ছিল।’ কিন্তু সে নির্বাচনে সমগ্র জাতির ম্যান্ডেট পাওয়ার পরও পশ্চিমারা ২৫ মার্চ রাতে বাঙালি নিধনের পথ বেছে নেয়। শুরু হয়ে যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

রেহমান সোবহান সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ কয়েকজন সাথীসহ তিনি আগরতলা সীমান্তের দিকে রওনা হন। পাকিস্তানি গুপ্তচরদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য ছদ্মনাম ধারণ করেন দীন মোহাম্মদ। কিন্তু চেহারার কারণে কেউ কেউ তাকে পাকিস্তানের চর ভেবেছিল। ১ এপ্রিল রেহমান সোবহান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা পৌঁছান। সেখানেও প্রাথমিকভাবে ছদ্মনাম নিতে হয়-মদন মোহন। আগরতলা থেকে কলকাতা হয়ে বিমানযোগে দিল্লি পৌঁছে ৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে বসেই স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র তৈরির বিরল অংশীদার হন রেহমান সোবহান। তার ভাষায়-‘‘আমি মনে করতে পারি, ‘বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র’ এই ঘোষণায় ‘গণ’ শব্দটা জুড়েছিলাম।’’ শুধু তাই নয়, এই ঘোষণাপত্রের প্রেক্ষিত হিসাবে যে মূল্যবান বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল, তার স্রষ্টাও রেহমান সোবহান। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত বিবৃতির একটি উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতিবাক্য ছিল, ‘পাকিস্তান মৃত এবং মৃতের পাহাড়ের নিচে সমাধিত।’ তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করা এবং সেই মতে মুজিবনগর সরকার গঠন করা, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া-সবকিছুতে আওয়ামী নেতৃত্বের যে বিরোধ ছিল, তার একটি পরিষ্কার বর্ণনা এ অধ্যায়টিতে আছে।

মুজিবনগর সরকার ঘোষিত হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ দূতের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় রেহমান সোবহানকে। পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখার হাজারো চেষ্টায় ইয়াহিয়া গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং বিশ্বের সারা প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে তা প্রতিরোধে রেহমান সোবহানের মতো একজন বিচক্ষণ মানুষের প্রয়োজনবোধ করেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং এ কারণেই তাকে দূত হিসাবে নিয়োজিত করেন। রেহমান সোবহানও দমবার পাত্র নন। বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালাতে এবং বহির্র্বিশ্বের বাঙালিদের সমর্থন আদায়ে ছুটে বেড়িয়েছেন প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্কে। মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডিসহ ডেমোক্র্যাটদের তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও সাফল্যজনক আলোচনা করেন। বিশ্ব যোগাযোগের প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করতে রেহমান সোবহান কলকাতায় ফিরে আসেন জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। তার সেই রিপোর্টটি প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। পরবর্তী সময়ে রেহমান সোবহানের প্রস্তাব করা প্ল্যানিং বোর্ড মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের এফ কেনেডি বিমানবন্দর হয়ে রেহমান সোবহান যখন হিথরো বিমানবন্দর এবং সেখান থেকে অক্সফোর্ডে পৌঁছান, ততক্ষণে পাকিস্তানিরা ঢাকায় আত্মসমপর্ণের কাজ সমাধা করে ফেলে।

একজন রেহমান সোবহানের জীবনের যে বিশাল ক্যানভাস, তা এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা এক ধরনের ধৃষ্টতা বলে বিবেচিত হতে পারে। সেজন্য আমি সেদিকে পা বাড়াইনি। আমি শুধু একটি বইয়ের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলাম, যে বইটি পড়লে ‘বাংলার মানুষ রেহমান সোবহান’কে চেনা যাবে, জানা যাবে। বইটির নাম ‘উতল রোমন্থন’।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন