ডিম কিনতে টাকা লাগে
jugantor
কিছুমিছু
ডিম কিনতে টাকা লাগে

  মোকাম্মেল হোসেন  

২০ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মড়ার মতো বিছানায় পড়ে আছে লোকমান। গুটি বেগম কয়েকবার খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করলেও সাড়া দেয়নি সে। এ অবস্থায় হঠাৎ তার মধ্যে মৃত্যুভাব প্রবল হয়ে উঠল। লোকমান দেখল, নিজেকে মৃতমানব ভাবতে খারাপ লাগছে না। শরীরটা বেশ হালকা লাগছে। মনেও ফুরফুরে একটা ভাব চলে এসেছে।

সংসার যাতনাময়। এ যাতনার অবসান ঘটায় মৃত্যু। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটে জাগতিক দুঃখ-বেদনার। লোকমান ভেবে দেখল, জীবনখাতায় তিল তিল করে জমে ওঠা বেদনাগুলো ইতোমধ্যে পাহাড়ের আকার ধারণ করেছে। একজন মানুষ বড়জোর দেড়-দুই মণ ওজন বইতে পারে। পাহাড় কাঁধে নিয়ে চলাফেরা করা কি সম্ভব? সম্ভব যখন নয়, তখন নিজেকে মরহুম ঘোষণা করলে দোষ কী? নিজেকে মরহুম ভাবার একপর্যায়ে লোকমান অবাক হয়ে দেখল, এ কাজে সে সফল হয়েছে। এখন শরীরে কাফনের কাপড় পেঁচিয়ে কবরে শুয়ে পড়লেই ঝামেলা শেষ। সমাজ নেই, সংসার নেই, বাসনা নেই, যাতনা নেই; বেঁচে থাকার কোনো গ্লানিও নেই।

অনন্তলোকের যাত্রায় প্রিলিমিনারি ধাপে কবরে ফেরেশতাদ্বয়ের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তারপর হাশরের ময়দান-যেখানে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য ৭২ কাতারের এক কাতারে শামিল হয়ে বেহেশত-দোজখের ফয়সালার জন্য বান্দাদের অপেক্ষায় থাকার বিধান রয়েছে। লোকমান প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে, এমন সময় শোরগোল ভেসে এলো। লোকমান ভাবল, কবরে সওয়ালকারী দুই ফেরেশতা মনকির ও নকিরসাব বোধহয় কথা বলতে বলতে অগ্রসর হচ্ছেন। তবে শোরগোল আরও প্রকট আকার ধারণ করায় লোকমানের ভ্রম ঘুঁচল। বুঝতে পারল, কবর নয়; বিছানায় শুয়ে আছে সে। বাস্তব জগতে প্রবেশের পর গুটি বেগমের গলা শুনতে পেল সে-

: তুমি কি আসলেই ঘুমাইছ; নাকি ভং ধরছ?

: ঘুমাইছি।

লোকমানের কথা শুনে তরল গলায় গুটি বেগম বলল-

: বারে-বা! ঘুমের মধ্যে কথা বলার এলেম যখন আয়ত্ত কইরা ফেলছ, তখন আর চিন্তা কী! এখন নিজেরে পীর বইলা ঘোষণা দেও। দলে দলে মানুষ আইসা ভিড় করুক ঘুমন্ত পীরের পানিপড়া লইয়া যাওয়ার জন্য।

লোকমান আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। তারপর বলল-

: অতি চমৎকার একটা আইডিয়া উদ্ভাবন করার জন্য ধন্যবাদ। রাজকর্মচারী কিংবা জনপ্রতিনিধি হওয়ার কোনো সুযোগ যখন নাই, তখন বস্তাভর্তি টাকার মালিক হওয়ার এইটাই একমাত্র পথ। এক কাজ করো-আমি যে ঘুমন্ত পীররূপে আবির্ভূত হইছি-এইটা তুমি কৌশলে চারদিকে প্রচার কইরা দেও।

: ঠিক আছে প্রচার করব। তবে তার আগে দোকানে যাও।

: এখন আবার দোকানে যাওয়ার কী প্রয়োজন পড়ল?

: তোমার নন্দন ভাতের থালা সামনে লইয়া বইসা রইছে।

: কেন! সমস্যা কী?

: অর্ধেক ডিম দিয়া সে ভাত খাবে না।

লোকমানের শরীর ক্লান্ত। মন অবসন্ন। যানজটের ধকল সয়ে অফিস থেকে ফেরার পর একবার বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালে আর নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করে না। এর চেয়েও বড় কথা-এই মুহূর্তে তার পকেট ফক্কা কোম্পানি। অফিস থেকে বের হওয়ার আগে এক সহকর্মীর কাছ থেকে একশ টাকা ধার করে বাসায় এসেছে। বাসভাড়া দেওয়ার পর যে টাকা পকেটে রয়েছে, তা দিয়ে ডিম কিনে ফেললে আগামীকাল অফিসে যাওয়া দুষ্কর হবে। মনে মনে তিনবার দোয়া ইউনুস পাঠ করে খাবার টেবিলের সামনে দাঁড়াল লোকমান। ছেলের উদ্দেশে বলল-

: আব্বা! খাবার সামনে লইয়া এতক্ষণ কেউ মোনাজাত ধইরা বইসা থাকে না। বিসমিল্লাহ বইলা লোকমা মুখে দেন।

লোকমানের ছেলের নাম আদমান ইবনে লোকমান। বাপের কথায় তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো না। সে গাল ফুলিয়ে বসে রইল। একটা বুদ্ধি বের করে লোকমান বলল-

: আব্বা! আপনে আমাকে বলেন-ট্রেনে ভ্রমণ করার সময় আপনের হাফ টিকিট লাগে; না ফুল টিকিট লাগে?

আদমান সরলভাবে উত্তর দিল-

: হাফ টিকিট লাগে।

বল নিজের কোর্টে আসার আনন্দ নিয়ে লোকমান ছেলের চোখে চোখ রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল-

: যারা হাফ টিকিট লইয়া ট্রেনে ভ্রমণ করে, তাদের হাফ ডিম দিয়াই ভাত খাওয়া উচিত। তা না হইলে পরবর্তী সময়ে হাফ টিকিট পাইতে সমস্যা হইতে পারে।

লোকমানের কথা শুনে আদমান চোখ বড় করে তাকাল। পরে বলল-

: যাওয়ার সঙ্গে খাওয়ার কী সম্পর্ক?

এবার ঠেলা সামলাও। আদমানের কথার জুৎসই উত্তর কী হতে পারে-ভাবছে লোকমান; এ সময় কপট রাগের ভঙ্গিতে লোকমানের উদ্দেশে গুটি বেগম বলল-

: কাহিনি আর লম্বা না কইরা দোকানে যাও তো।

লোকমান দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। গুটি বেগম তো বলেই খালাস। ডিম কিনতে টাকা লাগে। এ টাকার উৎস অতি সীমিত। অথচ ডিমের দাম কেবল বেড়েই চলেছে। এক হালি ডিমের দাম দিয়ে যদি একটা ডিম কিনতে হয়, তবে ফর্মুলা অনুযায়ী অর্ধেক নয়; আদমানের ভাগে পড়বে চার ভাগের এক ভাগ ডিম। অথচ সে অর্ধেক ডিমই মুখে নিতে চাচ্ছে না। বাজারের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় লোকমান যদি ডিম ফর্মুলা কার্যকর করতে চায়, তাহলে গুটি বেগম যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সংসারে যুদ্ধের বাতাস লাগুক, লোকমান তা চায় না।

বইয়ের শেলফের পেছন থেকে একটা টিনের কৌটা বের করল লোকমান। মাঝেমধ্যে এ কৌটায় এক-দুই টাকার কয়েন জমা করে সে। কৌটা ঝেড়েপুঁছে ১৮ টাকা পাওয়া গেল। বর্তমানে এক হালি ডিমের দাম ৩৫ টাকা। তার মানে ১৮ টাকায় পাওয়া যাবে ২ ডিম। যথেষ্ট। ছেলেকে অপেক্ষা করতে বলে দোকানে গেল লোকমান। দোকানদার ডিম দুটো ছোট একটা পলিথিনের ব্যাগে ভরার উদ্যোগ নিতেই লোকমানের মধ্যে মর্যাদাবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দুই ডিম হাতে নিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রতিবেশী কারও চোখে পড়লে সাড়ে-সর্বনাশ। দোকানদারকে লোকমান বলল-

: ভাই, ডিম দুইটা কাগজের ঠোঙ্গায় ভইরা দেন।

লোকমানের কথা শুনে দোকানদার বলল-

: পলিথিন ছাড়া আর কিছু নাই।

: এইসব না উঠাইয়া দেওয়া হইল!

: উঠাইয়া দিলেই কী আর উইঠা যায়! পলিথিন আমাদের রক্তের মধ্যে ঢুইকা গেছে।

লোকমান একটা ছেঁড়া কাগজে ডিম দুটো মুড়ে হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই আজমত সাহেবের সঙ্গে দেখা। আজমত সাহেব হাসিমুখে বললেন-

: ভাই! আপনে তো আমার চাইতেও বড়লোক।

: মানে?

: মানে হইল, মূল্যবৃদ্ধি ঘটার পর আমি ডিম কেনা বন্ধ কইরা দিছি। অথচ আপনে এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখছেন। এর মানে কী? এর মানে হইল আপনে বড়লোক।

আজমত সাহেবের কথা শুনে লোকমান হা-হা করে হাসল কিছুক্ষণ। এরপর ডিম কেনার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করল। সবকিছু শোনার পর আজমত সাহেব বললেন-

: এইটা একটা পয়েন্ট। নেতা-নেত্রীরা মিটিং-বক্তৃতায় বলে থাকেন-শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। এক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হইল-জাতির আগামী দিনের কারিগর প্রত্যেক শিশুর মুখে যদি আমরা রোজ অন্তত একটা ডিম আর এক গ্লাস দুধ তুইলা দিতে না পারি, তাইলে তারা মেধা-বুদ্ধি ও শক্ত-সমর্থরূপে বাইড়া উঠবে কীভাবে?

আজমত সাহেবের কথায় একমত পোষণ করে লোকমান বলল-

: আচ্ছা, ডিমের দাম এইভাবে বাড়তেছে কীজন্য?

লোকমানের কথা শুনে আজমত গম্ভীর হলেন। কিছুক্ষণ পর জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন-

: শুধু ডিম কেন রে ভাই! আপনেরে দশ মিনিট টাইম দিলাম। এই সময়ের মধ্যে আপনে এমন একটা পণ্যের নাম খুঁইজ্যা বাইর করেন, যার দাম বাড়ে নাই।

লোকমানের হাতে অত সময় নেই। তাকে দ্রুত বাসায় ফিরতে হবে। সময় স্বল্পতার অজুহাত দিয়ে পা বাড়াতেই পেছন থেকে আজমত সাহেব বললেন-

: সমস্যা নাই। আপনে বাসায় যাইতে ভাবেন। যাওয়ার পর ভাবেন। খাইতে খাইতে ভাবেন। ঘুমাইতে ঘুমাইতে ভাবেন। এরপর এর রেজাল্টটা আমারে ফোনে জানাইয়া দিলেই চলবে।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

কিছুমিছু

ডিম কিনতে টাকা লাগে

 মোকাম্মেল হোসেন 
২০ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মড়ার মতো বিছানায় পড়ে আছে লোকমান। গুটি বেগম কয়েকবার খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করলেও সাড়া দেয়নি সে। এ অবস্থায় হঠাৎ তার মধ্যে মৃত্যুভাব প্রবল হয়ে উঠল। লোকমান দেখল, নিজেকে মৃতমানব ভাবতে খারাপ লাগছে না। শরীরটা বেশ হালকা লাগছে। মনেও ফুরফুরে একটা ভাব চলে এসেছে।

সংসার যাতনাময়। এ যাতনার অবসান ঘটায় মৃত্যু। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটে জাগতিক দুঃখ-বেদনার। লোকমান ভেবে দেখল, জীবনখাতায় তিল তিল করে জমে ওঠা বেদনাগুলো ইতোমধ্যে পাহাড়ের আকার ধারণ করেছে। একজন মানুষ বড়জোর দেড়-দুই মণ ওজন বইতে পারে। পাহাড় কাঁধে নিয়ে চলাফেরা করা কি সম্ভব? সম্ভব যখন নয়, তখন নিজেকে মরহুম ঘোষণা করলে দোষ কী? নিজেকে মরহুম ভাবার একপর্যায়ে লোকমান অবাক হয়ে দেখল, এ কাজে সে সফল হয়েছে। এখন শরীরে কাফনের কাপড় পেঁচিয়ে কবরে শুয়ে পড়লেই ঝামেলা শেষ। সমাজ নেই, সংসার নেই, বাসনা নেই, যাতনা নেই; বেঁচে থাকার কোনো গ্লানিও নেই।

অনন্তলোকের যাত্রায় প্রিলিমিনারি ধাপে কবরে ফেরেশতাদ্বয়ের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তারপর হাশরের ময়দান-যেখানে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য ৭২ কাতারের এক কাতারে শামিল হয়ে বেহেশত-দোজখের ফয়সালার জন্য বান্দাদের অপেক্ষায় থাকার বিধান রয়েছে। লোকমান প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে, এমন সময় শোরগোল ভেসে এলো। লোকমান ভাবল, কবরে সওয়ালকারী দুই ফেরেশতা মনকির ও নকিরসাব বোধহয় কথা বলতে বলতে অগ্রসর হচ্ছেন। তবে শোরগোল আরও প্রকট আকার ধারণ করায় লোকমানের ভ্রম ঘুঁচল। বুঝতে পারল, কবর নয়; বিছানায় শুয়ে আছে সে। বাস্তব জগতে প্রবেশের পর গুটি বেগমের গলা শুনতে পেল সে-

: তুমি কি আসলেই ঘুমাইছ; নাকি ভং ধরছ?

: ঘুমাইছি।

লোকমানের কথা শুনে তরল গলায় গুটি বেগম বলল-

: বারে-বা! ঘুমের মধ্যে কথা বলার এলেম যখন আয়ত্ত কইরা ফেলছ, তখন আর চিন্তা কী! এখন নিজেরে পীর বইলা ঘোষণা দেও। দলে দলে মানুষ আইসা ভিড় করুক ঘুমন্ত পীরের পানিপড়া লইয়া যাওয়ার জন্য।

লোকমান আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। তারপর বলল-

: অতি চমৎকার একটা আইডিয়া উদ্ভাবন করার জন্য ধন্যবাদ। রাজকর্মচারী কিংবা জনপ্রতিনিধি হওয়ার কোনো সুযোগ যখন নাই, তখন বস্তাভর্তি টাকার মালিক হওয়ার এইটাই একমাত্র পথ। এক কাজ করো-আমি যে ঘুমন্ত পীররূপে আবির্ভূত হইছি-এইটা তুমি কৌশলে চারদিকে প্রচার কইরা দেও।

: ঠিক আছে প্রচার করব। তবে তার আগে দোকানে যাও।

: এখন আবার দোকানে যাওয়ার কী প্রয়োজন পড়ল?

: তোমার নন্দন ভাতের থালা সামনে লইয়া বইসা রইছে।

: কেন! সমস্যা কী?

: অর্ধেক ডিম দিয়া সে ভাত খাবে না।

লোকমানের শরীর ক্লান্ত। মন অবসন্ন। যানজটের ধকল সয়ে অফিস থেকে ফেরার পর একবার বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালে আর নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করে না। এর চেয়েও বড় কথা-এই মুহূর্তে তার পকেট ফক্কা কোম্পানি। অফিস থেকে বের হওয়ার আগে এক সহকর্মীর কাছ থেকে একশ টাকা ধার করে বাসায় এসেছে। বাসভাড়া দেওয়ার পর যে টাকা পকেটে রয়েছে, তা দিয়ে ডিম কিনে ফেললে আগামীকাল অফিসে যাওয়া দুষ্কর হবে। মনে মনে তিনবার দোয়া ইউনুস পাঠ করে খাবার টেবিলের সামনে দাঁড়াল লোকমান। ছেলের উদ্দেশে বলল-

: আব্বা! খাবার সামনে লইয়া এতক্ষণ কেউ মোনাজাত ধইরা বইসা থাকে না। বিসমিল্লাহ বইলা লোকমা মুখে দেন।

লোকমানের ছেলের নাম আদমান ইবনে লোকমান। বাপের কথায় তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো না। সে গাল ফুলিয়ে বসে রইল। একটা বুদ্ধি বের করে লোকমান বলল-

: আব্বা! আপনে আমাকে বলেন-ট্রেনে ভ্রমণ করার সময় আপনের হাফ টিকিট লাগে; না ফুল টিকিট লাগে?

আদমান সরলভাবে উত্তর দিল-

: হাফ টিকিট লাগে।

বল নিজের কোর্টে আসার আনন্দ নিয়ে লোকমান ছেলের চোখে চোখ রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল-

: যারা হাফ টিকিট লইয়া ট্রেনে ভ্রমণ করে, তাদের হাফ ডিম দিয়াই ভাত খাওয়া উচিত। তা না হইলে পরবর্তী সময়ে হাফ টিকিট পাইতে সমস্যা হইতে পারে।

লোকমানের কথা শুনে আদমান চোখ বড় করে তাকাল। পরে বলল-

: যাওয়ার সঙ্গে খাওয়ার কী সম্পর্ক?

এবার ঠেলা সামলাও। আদমানের কথার জুৎসই উত্তর কী হতে পারে-ভাবছে লোকমান; এ সময় কপট রাগের ভঙ্গিতে লোকমানের উদ্দেশে গুটি বেগম বলল-

: কাহিনি আর লম্বা না কইরা দোকানে যাও তো।

লোকমান দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। গুটি বেগম তো বলেই খালাস। ডিম কিনতে টাকা লাগে। এ টাকার উৎস অতি সীমিত। অথচ ডিমের দাম কেবল বেড়েই চলেছে। এক হালি ডিমের দাম দিয়ে যদি একটা ডিম কিনতে হয়, তবে ফর্মুলা অনুযায়ী অর্ধেক নয়; আদমানের ভাগে পড়বে চার ভাগের এক ভাগ ডিম। অথচ সে অর্ধেক ডিমই মুখে নিতে চাচ্ছে না। বাজারের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় লোকমান যদি ডিম ফর্মুলা কার্যকর করতে চায়, তাহলে গুটি বেগম যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সংসারে যুদ্ধের বাতাস লাগুক, লোকমান তা চায় না।

বইয়ের শেলফের পেছন থেকে একটা টিনের কৌটা বের করল লোকমান। মাঝেমধ্যে এ কৌটায় এক-দুই টাকার কয়েন জমা করে সে। কৌটা ঝেড়েপুঁছে ১৮ টাকা পাওয়া গেল। বর্তমানে এক হালি ডিমের দাম ৩৫ টাকা। তার মানে ১৮ টাকায় পাওয়া যাবে ২ ডিম। যথেষ্ট। ছেলেকে অপেক্ষা করতে বলে দোকানে গেল লোকমান। দোকানদার ডিম দুটো ছোট একটা পলিথিনের ব্যাগে ভরার উদ্যোগ নিতেই লোকমানের মধ্যে মর্যাদাবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দুই ডিম হাতে নিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রতিবেশী কারও চোখে পড়লে সাড়ে-সর্বনাশ। দোকানদারকে লোকমান বলল-

: ভাই, ডিম দুইটা কাগজের ঠোঙ্গায় ভইরা দেন।

লোকমানের কথা শুনে দোকানদার বলল-

: পলিথিন ছাড়া আর কিছু নাই।

: এইসব না উঠাইয়া দেওয়া হইল!

: উঠাইয়া দিলেই কী আর উইঠা যায়! পলিথিন আমাদের রক্তের মধ্যে ঢুইকা গেছে।

লোকমান একটা ছেঁড়া কাগজে ডিম দুটো মুড়ে হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই আজমত সাহেবের সঙ্গে দেখা। আজমত সাহেব হাসিমুখে বললেন-

: ভাই! আপনে তো আমার চাইতেও বড়লোক।

: মানে?

: মানে হইল, মূল্যবৃদ্ধি ঘটার পর আমি ডিম কেনা বন্ধ কইরা দিছি। অথচ আপনে এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখছেন। এর মানে কী? এর মানে হইল আপনে বড়লোক।

আজমত সাহেবের কথা শুনে লোকমান হা-হা করে হাসল কিছুক্ষণ। এরপর ডিম কেনার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করল। সবকিছু শোনার পর আজমত সাহেব বললেন-

: এইটা একটা পয়েন্ট। নেতা-নেত্রীরা মিটিং-বক্তৃতায় বলে থাকেন-শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। এক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হইল-জাতির আগামী দিনের কারিগর প্রত্যেক শিশুর মুখে যদি আমরা রোজ অন্তত একটা ডিম আর এক গ্লাস দুধ তুইলা দিতে না পারি, তাইলে তারা মেধা-বুদ্ধি ও শক্ত-সমর্থরূপে বাইড়া উঠবে কীভাবে?

আজমত সাহেবের কথায় একমত পোষণ করে লোকমান বলল-

: আচ্ছা, ডিমের দাম এইভাবে বাড়তেছে কীজন্য?

লোকমানের কথা শুনে আজমত গম্ভীর হলেন। কিছুক্ষণ পর জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন-

: শুধু ডিম কেন রে ভাই! আপনেরে দশ মিনিট টাইম দিলাম। এই সময়ের মধ্যে আপনে এমন একটা পণ্যের নাম খুঁইজ্যা বাইর করেন, যার দাম বাড়ে নাই।

লোকমানের হাতে অত সময় নেই। তাকে দ্রুত বাসায় ফিরতে হবে। সময় স্বল্পতার অজুহাত দিয়ে পা বাড়াতেই পেছন থেকে আজমত সাহেব বললেন-

: সমস্যা নাই। আপনে বাসায় যাইতে ভাবেন। যাওয়ার পর ভাবেন। খাইতে খাইতে ভাবেন। ঘুমাইতে ঘুমাইতে ভাবেন। এরপর এর রেজাল্টটা আমারে ফোনে জানাইয়া দিলেই চলবে।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন