এ দেশে জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ কী?
jugantor
এ দেশে জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ কী?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিডের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এর বিকল্প যে খুব আছে তেমনও বলা যাবে না। আবার আমরা কামনা করি, বিশ্বাসও করি এ দুর্ভোগ সাময়িক। আমাদের দেশ ও বিশ্ব নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে এই সংকট থেকে। তাই বলব এই সাময়িক স্থবিরতা দেখে হতাশ হয়ে বসে থাকলে চলবে না, দেশোন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে ভাবতেই হবে। তবে দেশোন্নয়ন বলতে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বুঝি তাহলে অন্ধকারই ক্রমে ঘনীভূত হবে।

২০১৬-এর একটি অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমি তখন প্যারিসে প্রথমবারের মতো গিয়েছি। এ ছাড়াও পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। একটি বিরক্তি সব সময়েই ছিল। ইংরেজি একেবারে অচল সেখানে। দোকানে কেনাকাটা করতে গেলেও ইংরেজি বলে সাহায্য করতে চায় না। জিনিসপত্রের প্যাকেটে বা দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজির বালাই নেই। শুধু ট্যাক্সিচালক আর হোটেল ম্যানেজার কেউ কেউ ইংরেজিতে সাহায্য করেন। স্পেনের গেস্ট হাউজের ম্যানেজার মেয়েটি তো ইংরেজি বোঝেই না। ওর সঙ্গে গুগল কনভার্টারের মাধ্যমে অনুবাদ করে কথা বলতে হয়েছে। খুব বিরক্ত হলাম পৃথিবীবিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে। সব প্রদর্শিত বস্তুর পরিচিতি দেওয়া হয়েছে ফরাসি ভাষায়। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসছে; কিন্তু ইংরেজির ছোঁয়াও নেই। ক্ষুব্ধ আমি রাতে ফরাসি হোটেল ম্যানেজারকে বললাম, এ তোমাদের ভারি অন্যায়, আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে কেন ইংরেজি ব্যবহার করবে না? উত্তরে তিনি যা বললেন তাতে আমার চিন্তার জগৎ বেশ নাড়া খেল। বললেন, দেখ আজ আমাদের তোমরা উন্নত দেশের মর্যাদায় রেখেছ, আমরা বিশ্বাস করি এই উন্নতির পেছনে প্রধান শক্তি ছিল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। আমরা বিশ্বাস করি নিজ ভাষায় জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকাশক্তি। আজ যদি আন্তর্জাতিক ভাষার দোহাই দিয়ে ইংরেজির অবাধ বিস্তারের সুযোগ করে দেই, তবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও আমরা দুর্বল হয়ে যাব।

আমার আশঙ্কা আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটানোর উচ্ছ্বাসে জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্বহীন করে দিচ্ছি কিনা। আজকের লেখাটির বিশ্লেষণ করতে গেলে উদাহরণ হিসাবে নিজেকেই উপস্থাপন করতে হবে যা আমার নিজের কাছে বিব্রতকর। কিন্তু উপায়ও দেখছি না। আশা করি পাঠক ক্ষমা করবেন। আসলে শিক্ষকতায় প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর যুক্ত থাকায় এবং পাঠক্রমভিত্তিক গ্রন্থ লেখায় কাছে থেকে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কোথায় পাব!

আমার বরাবর মনে হয়েছে, আমাদের দেশে যারা নীতি নির্ধারণ করেন, তারা অধিকাংশ সময়ে দূরদর্শিতা দিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেন না। বাইরের চাকচিক্যে সাধারণের চোখ ঝলসাতে চান। একবারও ভাবেন না দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়া ইমারত মুহূর্তেই ধসে যেতে পারে। সময়ের বাস্তবতায় সম্ভবত কলেজ ও বেসরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী জ্ঞানচর্চা ভুলতে বসেছে। অধিকাংশই সহজ পথ খুঁজেন সার্টিফিকেট অর্জনে। জ্ঞান অর্জন বোকার কাজ বলেই মনে করেন যেন! সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী যে সার্টিফিকেটের ঔজ্জ্বল্যে শিক্ষক বা আমলা হতে চান, সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে নিজ বিষয়ের বাইরে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বেশ চোখে লাগে। শিক্ষকদের কথাই বা বাদ দেই কেন! বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শিক্ষকতার বাইরেও জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় নিজেকে যুক্ত রাখবেন। কিন্তু সে সময় ও নিষ্ঠা ক’জনের আছে! একজন শিক্ষকের গবেষণার জন্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। আমাদের দেশের সরকার পরিচালকরা সেই সত্য কি কখনো অনুভব করেছেন? পুলিশ ক্যাডারে থাকা আমার এক মেধাবী ছাত্র যথার্থই বলেছিল, স্যার আপনারা তো রাজনীতিক ও সরকারের কাছে নিরামিষ। অপ্রয়োজনীয়ও বলতে পারেন। কারণ সরকার পরিবর্তনে আপনারা নন, আমরা ভূমিকা রাখতে পারি। আপনাদের চেয়ে আমাদের মূল্যই বেশি।

এই সত্যের সূত্রে আরেকটি জ্ঞানহীনতার কথা জানাল আমার ছাত্র ও সহকর্মী, বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক-মিজানুর রহমান। বলল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী সম্প্রতি অবসরে গিয়েছেন। তার জীবনবৃত্তান্ত ছাপা হয়েছে বিশ্বখ্যাত একাডেমিক জার্নালে। কিন্তু তাকে নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো সাড়া নেই। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র পুলিশের মাঝারি অফিসার সম্প্রতি প্রমোশন পেয়েছেন। তাকে ফেসবুকে ফুলেল শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। আমার ছাত্র-সহকর্মীর শেষ মন্তব্য-জ্ঞানের চেয়ে ক্ষমতাই এখন নজর কাড়ে।

ভবিষ্যতের একটি ঘোর অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। নানা সামাজিক মাধ্যম শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সময় কেড়ে নিচ্ছে। অবস্থা এমন, ইউটিউবে চটকদার গুরুত্বহীন নানা বিষয়ে যে সংখ্যক লাইক, ভিউ পড়ে, এর সিকিভাগেও আগ্রহ থাকে না শিক্ষাবিষয়ক ইউটিউব এপিসোড দেখার। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমার কজন দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্র ‘Bangladesh Archaeology’ নামে ইউটিউবে পেজ খুলেছে। সম্প্রতি ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চা জনপ্রিয় করার জন্য নতুন তথ্যসূত্রে সহজভাবে ছবিসমৃদ্ধ করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ধারাবাহিক উপস্থাপনা করবে। এ লক্ষ্যে ওরা আমাকে অনুরোধ করল নানা অজানা এবং কম জানা তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আমি যাতে ঢাকার ইতিহাস উপস্থাপন করি। এখন দর্শক খুব ব্যস্ত। তাই দশ মিনিট সময়ের পরিসরে এপিসোড সাজাতে হবে। সপ্তাহে দুটো করে এপিসোড প্রচার করছে ওরা। দশটি এপিসোড প্রচারের পর ওরা আমার কাছে এলো ওদের মূল্যায়ন নিয়ে। ওরা আশাহত। বলল, ‘স্যার জ্ঞানচর্চা থেকে বোধ হয় আমরা সরে যাচ্ছি। আমাদের ঢাকার ইতিহাসের ভিউ, লাইক আশাবাদী হওয়ার মতো নয়। এদেশের স্বল্প সংখ্যক মানুষ আর পশ্চিম বাংলার বড় সংখ্যক দর্শক তাদের ভালো লাগা নিয়ে কমেন্ট করছেন। সম্ভাব্য যাদের মনে করি তেমন বড় সংখ্যক দর্শক নীরব। আপনার অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর দুই শতাংশকেও যুক্ত থাকতে দেখছি না। শিক্ষকদের অবস্থা তো আরও খারাপ। যারা নিয়মিত দেখছেন তারা আকৃষ্ট হয়েছেন। তাদের মন্তব্য তারা অধীর আগ্রহে পরবর্তী এপিসোডের জন্য অপেক্ষা করছেন।’ সুখের কথা, আমার এই স্বাপ্নিক ছাত্ররা হতাশ নয়। ওরা নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানচর্চার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। এ খরার যুগে এটুকুই আশা করার মতো।

আমার যে বন্ধুরা আমাকে বিশেষ ভালোবাসেন তারা দুঃখ করে বলেন, গত বিশ বছরে বাংলাভাষায় অর্ধশতাধিক বই লিখে আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রভূত উপকার করেছেন। আপনার বইয়ের কারণে পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত ইতিহাস সম্পর্কিত অনেক বই আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পশ্চিম বাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আপনার বই পড়ে। কিন্তু কই এদেশে কোনো পক্ষ তো সেভাবে আপনার মূল্যায়ন করল না। আমি লজ্জিত হলাম। আমি বুঝলাম এটি ভালোবাসার আবেগী প্রকাশ। তবে একটি আনন্দ পেয়েছিলাম বছর পাঁচেক আগে। দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো পশ্চিম বাংলার বর্ধমান রাজ কলেজ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে বক্তৃতা করতে। বিশাল অডিটোরিয়ামে রমরমা আয়োজন ছিল। বক্তৃতা শেষে অধ্যক্ষা মহোদয় তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেলেন। অফিস কক্ষে রাখা একটি বুক সেলফের কাছে এলাম। আমি বিস্ময়ে-আনন্দে দেখলাম সেখানে সাজানো আমার লেখা পনেরো-ষোলটি বই। বললেন, স্যার আপনার সভ্যতার ইতিহাস ও ভারতীয় ইতিহাসের সিরিজভুক্ত বইগুলো প্রথম পাঠ বিবেচনা করতে বলি আমাদের শিক্ষার্থীদের।

জ্ঞানচর্চার এই অন্ধকার যুগে সৃজনশীল প্রকাশকরা দুঃখ করে বলেন, স্যার এটি হচ্ছে গাইডবইয়ের যুগ। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী এখন বই কিনে পড়ে না। গাইডবই, সিনিয়রদের নোট আর গুগল ওদের ভরসা। আইন লঙ্ঘন করে আগে কোনো জনপ্রিয় রেফারেন্স বই নীলক্ষেতে ফটোকপি করে বিক্রি করা হতো। এখন মূল বই বাজারে থাকলেও ফটোকপি করা বই বিক্রি হয়। ক্রেতার রুচিবৈকল্য এমন হয়েছে বিশ টাকা কমে পেলে মূল বইয়ের বদলে ফটোকপি করা বই কিনে নিচ্ছে। শুনেছি বই পাইরেসির বিরুদ্ধে নাকি আইন আছে। কিন্তু এর প্রয়োগ দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।

লেখক-প্রকাশকদের তাহলে কে রক্ষা করবে? তাদের রক্ষা করতে সরকার এগিয়ে এসেছিল। এখনো তা অব্যাহত আছে। কিন্তু ফলাফল কী? সরকার প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা বই কেনার জন্য বরাদ্দ করে। এসব বই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়ার জন্য, সরকারি লাইব্রেরিগুলোতে বিতরণের জন্য কেনা হয়। কিন্তু সেখানেও নাকি কিছু সংখ্যক প্রকাশকের সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রভাবশালী কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বই নাকি সবচেয়ে বেশি ঢুকে পড়ে সরকারি ক্রয়ে। পত্রিকায় দেখেছিলাম, গত বছর প্রথমবারের মতো বিশাল বাজেট এসেছিল বই কেনার জন্য। প্রকাশক-সিন্ডিকেট নাকি নিজেদের মধ্যে তা বণ্টনের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। পরে সংবাদ মাধ্যমে সব ফাঁস হয়ে গেলে সরকারি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা আগের প্রস্তাব বাতিল করে দেন। এখন উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতি প্রকাশককে তার প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পাঁচটি বই জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এবার প্রকাশকরা সুবিচার প্রত্যাশা করছেন। আরেকটি প্রসঙ্গ না বললেই নয়-সরকারি ক্রয়ের সুবিধা পেতে অনেক প্রকাশক রাতারাতি রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলাদের লেখক বানিয়ে ফেলেছেন। তাদের লেখা বই প্রকাশ করে সহজেই সরকারি ক্রয়ে ঢুকিয়ে দিতে পারছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত লেখক।

এমনি করে জ্ঞানচর্চার জগতে যেদিকেই তাকানো যায় সেদিকেই হতাশা। এ থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা বিকাশে প্রধানত সরকারি বিধায়কদের দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদেরও জ্ঞানচর্চার পক্ষে নীতিনির্ধারণ করতে হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকদের পক্ষে সহজ হবে না নিরপেক্ষ নীতিনির্ধারণ করা। কারণ দলীয় রাজনীতি অনেককেই বন্ধ্যা করে রেখেছে। এ বাস্তবতায় রাজনৈতিক সরকারের উপরেই আমরা ভরসা করতে চাই। সরকারি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে জাতিকে জ্ঞানচর্চাবিচ্ছিন্ন করে উন্নয়নের সিঁড়ি অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে স্মরণ করব। তিনি বলেছিলেন, ‘যে জাতি জ্ঞানে যত উন্নত তাদের সম্মান ও ঐশ্বর্যও তত উন্নত।’ এখন দেখতে হবে আমরা কীভাবে, কোন পথে ঐশ্বর্যশালী হতে চাই।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

এ দেশে জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ কী?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিডের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এর বিকল্প যে খুব আছে তেমনও বলা যাবে না। আবার আমরা কামনা করি, বিশ্বাসও করি এ দুর্ভোগ সাময়িক। আমাদের দেশ ও বিশ্ব নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে এই সংকট থেকে। তাই বলব এই সাময়িক স্থবিরতা দেখে হতাশ হয়ে বসে থাকলে চলবে না, দেশোন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে ভাবতেই হবে। তবে দেশোন্নয়ন বলতে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বুঝি তাহলে অন্ধকারই ক্রমে ঘনীভূত হবে।

২০১৬-এর একটি অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমি তখন প্যারিসে প্রথমবারের মতো গিয়েছি। এ ছাড়াও পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। একটি বিরক্তি সব সময়েই ছিল। ইংরেজি একেবারে অচল সেখানে। দোকানে কেনাকাটা করতে গেলেও ইংরেজি বলে সাহায্য করতে চায় না। জিনিসপত্রের প্যাকেটে বা দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজির বালাই নেই। শুধু ট্যাক্সিচালক আর হোটেল ম্যানেজার কেউ কেউ ইংরেজিতে সাহায্য করেন। স্পেনের গেস্ট হাউজের ম্যানেজার মেয়েটি তো ইংরেজি বোঝেই না। ওর সঙ্গে গুগল কনভার্টারের মাধ্যমে অনুবাদ করে কথা বলতে হয়েছে। খুব বিরক্ত হলাম পৃথিবীবিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে। সব প্রদর্শিত বস্তুর পরিচিতি দেওয়া হয়েছে ফরাসি ভাষায়। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসছে; কিন্তু ইংরেজির ছোঁয়াও নেই। ক্ষুব্ধ আমি রাতে ফরাসি হোটেল ম্যানেজারকে বললাম, এ তোমাদের ভারি অন্যায়, আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে কেন ইংরেজি ব্যবহার করবে না? উত্তরে তিনি যা বললেন তাতে আমার চিন্তার জগৎ বেশ নাড়া খেল। বললেন, দেখ আজ আমাদের তোমরা উন্নত দেশের মর্যাদায় রেখেছ, আমরা বিশ্বাস করি এই উন্নতির পেছনে প্রধান শক্তি ছিল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। আমরা বিশ্বাস করি নিজ ভাষায় জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকাশক্তি। আজ যদি আন্তর্জাতিক ভাষার দোহাই দিয়ে ইংরেজির অবাধ বিস্তারের সুযোগ করে দেই, তবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও আমরা দুর্বল হয়ে যাব।

আমার আশঙ্কা আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটানোর উচ্ছ্বাসে জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্বহীন করে দিচ্ছি কিনা। আজকের লেখাটির বিশ্লেষণ করতে গেলে উদাহরণ হিসাবে নিজেকেই উপস্থাপন করতে হবে যা আমার নিজের কাছে বিব্রতকর। কিন্তু উপায়ও দেখছি না। আশা করি পাঠক ক্ষমা করবেন। আসলে শিক্ষকতায় প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর যুক্ত থাকায় এবং পাঠক্রমভিত্তিক গ্রন্থ লেখায় কাছে থেকে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কোথায় পাব!

আমার বরাবর মনে হয়েছে, আমাদের দেশে যারা নীতি নির্ধারণ করেন, তারা অধিকাংশ সময়ে দূরদর্শিতা দিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেন না। বাইরের চাকচিক্যে সাধারণের চোখ ঝলসাতে চান। একবারও ভাবেন না দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়া ইমারত মুহূর্তেই ধসে যেতে পারে। সময়ের বাস্তবতায় সম্ভবত কলেজ ও বেসরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী জ্ঞানচর্চা ভুলতে বসেছে। অধিকাংশই সহজ পথ খুঁজেন সার্টিফিকেট অর্জনে। জ্ঞান অর্জন বোকার কাজ বলেই মনে করেন যেন! সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী যে সার্টিফিকেটের ঔজ্জ্বল্যে শিক্ষক বা আমলা হতে চান, সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে নিজ বিষয়ের বাইরে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বেশ চোখে লাগে। শিক্ষকদের কথাই বা বাদ দেই কেন! বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শিক্ষকতার বাইরেও জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় নিজেকে যুক্ত রাখবেন। কিন্তু সে সময় ও নিষ্ঠা ক’জনের আছে! একজন শিক্ষকের গবেষণার জন্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। আমাদের দেশের সরকার পরিচালকরা সেই সত্য কি কখনো অনুভব করেছেন? পুলিশ ক্যাডারে থাকা আমার এক মেধাবী ছাত্র যথার্থই বলেছিল, স্যার আপনারা তো রাজনীতিক ও সরকারের কাছে নিরামিষ। অপ্রয়োজনীয়ও বলতে পারেন। কারণ সরকার পরিবর্তনে আপনারা নন, আমরা ভূমিকা রাখতে পারি। আপনাদের চেয়ে আমাদের মূল্যই বেশি।

এই সত্যের সূত্রে আরেকটি জ্ঞানহীনতার কথা জানাল আমার ছাত্র ও সহকর্মী, বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক-মিজানুর রহমান। বলল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী সম্প্রতি অবসরে গিয়েছেন। তার জীবনবৃত্তান্ত ছাপা হয়েছে বিশ্বখ্যাত একাডেমিক জার্নালে। কিন্তু তাকে নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো সাড়া নেই। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র পুলিশের মাঝারি অফিসার সম্প্রতি প্রমোশন পেয়েছেন। তাকে ফেসবুকে ফুলেল শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। আমার ছাত্র-সহকর্মীর শেষ মন্তব্য-জ্ঞানের চেয়ে ক্ষমতাই এখন নজর কাড়ে।

ভবিষ্যতের একটি ঘোর অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। নানা সামাজিক মাধ্যম শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সময় কেড়ে নিচ্ছে। অবস্থা এমন, ইউটিউবে চটকদার গুরুত্বহীন নানা বিষয়ে যে সংখ্যক লাইক, ভিউ পড়ে, এর সিকিভাগেও আগ্রহ থাকে না শিক্ষাবিষয়ক ইউটিউব এপিসোড দেখার। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমার কজন দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্র ‘Bangladesh Archaeology’ নামে ইউটিউবে পেজ খুলেছে। সম্প্রতি ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চা জনপ্রিয় করার জন্য নতুন তথ্যসূত্রে সহজভাবে ছবিসমৃদ্ধ করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ধারাবাহিক উপস্থাপনা করবে। এ লক্ষ্যে ওরা আমাকে অনুরোধ করল নানা অজানা এবং কম জানা তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আমি যাতে ঢাকার ইতিহাস উপস্থাপন করি। এখন দর্শক খুব ব্যস্ত। তাই দশ মিনিট সময়ের পরিসরে এপিসোড সাজাতে হবে। সপ্তাহে দুটো করে এপিসোড প্রচার করছে ওরা। দশটি এপিসোড প্রচারের পর ওরা আমার কাছে এলো ওদের মূল্যায়ন নিয়ে। ওরা আশাহত। বলল, ‘স্যার জ্ঞানচর্চা থেকে বোধ হয় আমরা সরে যাচ্ছি। আমাদের ঢাকার ইতিহাসের ভিউ, লাইক আশাবাদী হওয়ার মতো নয়। এদেশের স্বল্প সংখ্যক মানুষ আর পশ্চিম বাংলার বড় সংখ্যক দর্শক তাদের ভালো লাগা নিয়ে কমেন্ট করছেন। সম্ভাব্য যাদের মনে করি তেমন বড় সংখ্যক দর্শক নীরব। আপনার অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর দুই শতাংশকেও যুক্ত থাকতে দেখছি না। শিক্ষকদের অবস্থা তো আরও খারাপ। যারা নিয়মিত দেখছেন তারা আকৃষ্ট হয়েছেন। তাদের মন্তব্য তারা অধীর আগ্রহে পরবর্তী এপিসোডের জন্য অপেক্ষা করছেন।’ সুখের কথা, আমার এই স্বাপ্নিক ছাত্ররা হতাশ নয়। ওরা নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানচর্চার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। এ খরার যুগে এটুকুই আশা করার মতো।

আমার যে বন্ধুরা আমাকে বিশেষ ভালোবাসেন তারা দুঃখ করে বলেন, গত বিশ বছরে বাংলাভাষায় অর্ধশতাধিক বই লিখে আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রভূত উপকার করেছেন। আপনার বইয়ের কারণে পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত ইতিহাস সম্পর্কিত অনেক বই আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পশ্চিম বাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আপনার বই পড়ে। কিন্তু কই এদেশে কোনো পক্ষ তো সেভাবে আপনার মূল্যায়ন করল না। আমি লজ্জিত হলাম। আমি বুঝলাম এটি ভালোবাসার আবেগী প্রকাশ। তবে একটি আনন্দ পেয়েছিলাম বছর পাঁচেক আগে। দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো পশ্চিম বাংলার বর্ধমান রাজ কলেজ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে বক্তৃতা করতে। বিশাল অডিটোরিয়ামে রমরমা আয়োজন ছিল। বক্তৃতা শেষে অধ্যক্ষা মহোদয় তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেলেন। অফিস কক্ষে রাখা একটি বুক সেলফের কাছে এলাম। আমি বিস্ময়ে-আনন্দে দেখলাম সেখানে সাজানো আমার লেখা পনেরো-ষোলটি বই। বললেন, স্যার আপনার সভ্যতার ইতিহাস ও ভারতীয় ইতিহাসের সিরিজভুক্ত বইগুলো প্রথম পাঠ বিবেচনা করতে বলি আমাদের শিক্ষার্থীদের।

জ্ঞানচর্চার এই অন্ধকার যুগে সৃজনশীল প্রকাশকরা দুঃখ করে বলেন, স্যার এটি হচ্ছে গাইডবইয়ের যুগ। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী এখন বই কিনে পড়ে না। গাইডবই, সিনিয়রদের নোট আর গুগল ওদের ভরসা। আইন লঙ্ঘন করে আগে কোনো জনপ্রিয় রেফারেন্স বই নীলক্ষেতে ফটোকপি করে বিক্রি করা হতো। এখন মূল বই বাজারে থাকলেও ফটোকপি করা বই বিক্রি হয়। ক্রেতার রুচিবৈকল্য এমন হয়েছে বিশ টাকা কমে পেলে মূল বইয়ের বদলে ফটোকপি করা বই কিনে নিচ্ছে। শুনেছি বই পাইরেসির বিরুদ্ধে নাকি আইন আছে। কিন্তু এর প্রয়োগ দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।

লেখক-প্রকাশকদের তাহলে কে রক্ষা করবে? তাদের রক্ষা করতে সরকার এগিয়ে এসেছিল। এখনো তা অব্যাহত আছে। কিন্তু ফলাফল কী? সরকার প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা বই কেনার জন্য বরাদ্দ করে। এসব বই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়ার জন্য, সরকারি লাইব্রেরিগুলোতে বিতরণের জন্য কেনা হয়। কিন্তু সেখানেও নাকি কিছু সংখ্যক প্রকাশকের সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রভাবশালী কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বই নাকি সবচেয়ে বেশি ঢুকে পড়ে সরকারি ক্রয়ে। পত্রিকায় দেখেছিলাম, গত বছর প্রথমবারের মতো বিশাল বাজেট এসেছিল বই কেনার জন্য। প্রকাশক-সিন্ডিকেট নাকি নিজেদের মধ্যে তা বণ্টনের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। পরে সংবাদ মাধ্যমে সব ফাঁস হয়ে গেলে সরকারি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা আগের প্রস্তাব বাতিল করে দেন। এখন উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতি প্রকাশককে তার প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পাঁচটি বই জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এবার প্রকাশকরা সুবিচার প্রত্যাশা করছেন। আরেকটি প্রসঙ্গ না বললেই নয়-সরকারি ক্রয়ের সুবিধা পেতে অনেক প্রকাশক রাতারাতি রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলাদের লেখক বানিয়ে ফেলেছেন। তাদের লেখা বই প্রকাশ করে সহজেই সরকারি ক্রয়ে ঢুকিয়ে দিতে পারছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত লেখক।

এমনি করে জ্ঞানচর্চার জগতে যেদিকেই তাকানো যায় সেদিকেই হতাশা। এ থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা বিকাশে প্রধানত সরকারি বিধায়কদের দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদেরও জ্ঞানচর্চার পক্ষে নীতিনির্ধারণ করতে হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকদের পক্ষে সহজ হবে না নিরপেক্ষ নীতিনির্ধারণ করা। কারণ দলীয় রাজনীতি অনেককেই বন্ধ্যা করে রেখেছে। এ বাস্তবতায় রাজনৈতিক সরকারের উপরেই আমরা ভরসা করতে চাই। সরকারি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে জাতিকে জ্ঞানচর্চাবিচ্ছিন্ন করে উন্নয়নের সিঁড়ি অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে স্মরণ করব। তিনি বলেছিলেন, ‘যে জাতি জ্ঞানে যত উন্নত তাদের সম্মান ও ঐশ্বর্যও তত উন্নত।’ এখন দেখতে হবে আমরা কীভাবে, কোন পথে ঐশ্বর্যশালী হতে চাই।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন