আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়া করেছেন তাদের অনেকেই দার্শনিক সক্রেটিসের নামের সঙ্গে পরিচিত। সক্রেটিসের জন্ম হয়েছিল এথেন্সে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯ সালে। তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি এবং দাইমার ছেলে। সম্ভবত তিনি পিতার পেশাই গ্রহণ করেছিলেন এবং দর্শন পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তাকে পরবর্তীকালে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে।

তিনি পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে খুব নামও করেছিলেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি এথেন্সে কিছুদিনের জন্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার পিতার মৃত্যুর পর তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক অর্থের মালিক হন। প্রচুর টাকা পয়সা থাকায় তাকে কোনো ধরনের কাজ করতে হতো না। তিনি স্ত্রী য্যানথিপিকে নিয়ে জীবনযাপন করতেন।

সেই থেকে সক্রেটিস এথেন্সে একজন পরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। কারণ তিনি অন্য নাগরিকদের সঙ্গে দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন এবং তিনি তরুণ ছাত্রদের মধ্যে অনেক অনুসারী সৃষ্টি করতে সমর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল যে তিনি তরুণদের মনে কু-প্রভাব সৃষ্টি করছেন। এ অপরাধের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়েছিল তিনি চাইলে দেশত্যাগ করতে পারেন।

কিন্তু তিনি দোষী হিসাবে তার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছিল তা মেনে নিলেন এবং হ্যামলক বিষপানে আত্মাহুতি দিলেন। শর্ত ছিল এ বিষ তিনি নিজেই পান করবেন। সক্রেটিস তাই করেছিলেন। সময়টি ছিল ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব সাল। সক্রেটিসের ধ্যান-ধারণা এবং নীতিবোধ আজকের দিনের জন্যও প্রযোজ্য।

সক্রেটিসের বিচার হয়েছিল তৎকালীন এথেন্সে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিকভাবে। এথেন্সের গণতন্ত্র ছিল পাবলিক গণতন্ত্র। নাগরিক হিসাবে স্বীকৃত ব্যক্তিরা ওই বিচার সভায় অংশ নিতে পারতেন। সক্রেটিসের বিচার সভায় ৫০০ জন নাগরিক অংশগ্রহণ করেছিল। বিচারের রায় এ ৫০০ জনের মধ্যে ভোটাভুটিতে নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছিল। কয়েক বছর আগে গ্রিক সরকার সক্রেটিসকে প্রদত্ত দণ্ড প্রত্যাহার করে নেয় এবং ওই সময়ের বিচার সঠিক হয়নি বলে ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং আদালতের রায়কে সব সময় সঠিক ও ন্যায্য বলে গ্রহণ করা যায় না।

সক্রেটিসকে পাশ্চাত্য দর্শনের জনক বলা হয়। অথচ তিনি কিছুই লিখে যাননি। কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি এবং তার নিজস্ব সুনির্দিষ্ট কোনো তত্ত্বও ছিল না। তাহলে তিনি কী করেছেন? তিনি প্রশ্ন তুলতে খুব পছন্দ করতেন। এর মধ্য দিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ ঘটত এবং আমরা যে চিন্তা করি তা তলিয়ে দেখার তাগিদ অনুভব করি। এটাকেই বলা হয় সক্রেটিক ম্যাথড। বাংলাদেশে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে অনেকেই একই কথা বলেছেন।

তিনি লিখতেন না। কিন্তু চমৎকার আলোচনা করতেন। কী ধরনের গবেষণা করা যায় সে ব্যাপারেও তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। সক্রেটিসের পদ্ধতিকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বলা হয়। কারণ আলোচনার মধ্য দিয়ে বিপরীতমুখী চিন্তাভাবনা বের হয়ে আসে। ফলে এথেন্সে তার অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়। তাকে Sophist বলে নিন্দা করা হতো। Sophist-দের কথাবার্তায় মানুষ বিভ্রান্ত হতো।

এ জন্যই সক্রেটিসের বিরুদ্ধে তরুণদের ভ্রষ্টাচারে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। সক্রেটিসের শিষ্য ছিলেন প্লেটো। প্লেটো সক্রেটিসের চিন্তা-ভাবনাগুলো সিরিজ আকারে লিখে রেখেছিলেন। এটি ডায়লগ নামে পরিচিতি অর্জন করে। এভাবেই সক্রেটিসের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। অন্যথায় সক্রেটিসের চিন্তাভাবনা হারিয়ে যেত।

সক্রেটিস খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এথেন্সে বসবাস করতেন। তরুণ বয়সে তিনি ‘প্রকৃতি-দর্শন’ অধ্যয়ন করেছিলেন। এ বিশ্ব চরাচরের বিভিন্ন জিনিস দেখে তিনি তার রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি নগর রাষ্ট্রের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশ্ব চরাচরের রহস্য ভেদ করার মতো বিশাল চিন্তা ত্যাগ করে তিনি দৈনন্দিন জীবনের নৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ন্যায়বিচারের বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত? কিন্তু তিনি তর্ক করে জয়লাভ করায় উৎসাহী ছিলেন না। অথবা যুক্তি দিয়ে টাকাকড়ি রোজগারেরও চেষ্টা করেননি। তার সমসাময়িকদের অনেকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ছিল। তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর কিংবা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও খুঁজে বেড়াননি। তিনি আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়, যেমন-কাকে বা কোনটিকে ভালো বলব, কোনটিকে মন্দ বলব এবং কোনটিকে ন্যায্য বলব, এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন নিজেকে জানাই দর্শনের প্রথম কাজ।

ভারতীয় দর্শনেও একটি কথা আছে। কথাটি হলো ‘আত্মানং বিদ্ধি’। অর্থাৎ, নিজেকে জানো। সক্রেটিসের চিন্তার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল জীবন সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং তিনি অত্যন্ত নির্দয়ভাবে মানুষের লালিত বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন, বিশেষ করে তাদের নিজেদের সম্পর্কে। এর ফলে তার অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়। কিন্তু তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিবেদিত ছিলেন। তার বিচারের সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি যা বলেছিলেন প্লেটো তা লিখে রেখেছিলেন। সক্রেটিস অজ্ঞানতার জীবনযাপনের চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘The life which is unexamined is not worth living’. প্রশ্ন হলো, সক্রেটিস জীবন সম্পর্কে যে প্রশ্ন তুলেছেন তার অর্থ কী হতে পারে? সক্রেটিসের মতে এটি হলো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা। এসব ধারণা আমরা প্রতিদিনই ব্যবহার করি। আমরা আমাদের জ্ঞান ও অজ্ঞানতা সম্পর্কেও প্রশ্ন করি কি?

সক্রেটিস ছিলেন দার্শনিকদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি ভালো জীবন বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। তার দৃষ্টিতে ভালো জীবনের মানে হলো মনের শান্তি অর্জন করা। এ শান্তির উৎস হলো সঠিক কাজ করা। সমাজে বিদ্যমান নৈতিকতাকেই প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাটাই ভালো জীবন নয়। সঠিক কাজ তখনই নিরূপণ করা যায়, যখন কঠোরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

সক্রেটিস ন্যায়সঙ্গত কাজকে আপেক্ষিক বলে মনে করতেন না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন, ভালো কাজ একরকমই হয়, অন্যরকম নয়। যেটি ন্যায়সঙ্গত সেটি গ্রিসের নাগরিকদের জন্যই শুধু প্রযোজ্য হবে না, প্রযোজ্য হবে বিশ্বের সব মানুষের জন্য। তিনি মনে করতেন, ন্যায় পথে চলা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং কোনো মানুষই আসলে খারাপ কাজ করতে চায় না।

যদি কেউ খারাপ কাজ করে, তাহলে তা তার বিবেকবিরুদ্ধ হবে। ফলে সে অস্বস্তি বোধ করবে। আমরা সবাই মনের শান্তি চাই। কিন্তু এটি এমন কিছু নয় যে, আমরা ইচ্ছুক হয়ে করি। মানুষ খারাপ কাজ করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাবে। এ থেকে সক্রেটিস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, একটি ভালো কাজ হতে পারে, যা জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল এবং একটিমাত্র খারাপ কাজ হতে পারে যা অজ্ঞানতার ওপর নির্ভরশীল। জ্ঞান নৈতিকতার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী রূপে বাঁধা। কিন্তু যেহেতু ভালো মাত্র একটিই আছে, সেহেতু জীবন সম্পর্কে আমাদের অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেতে হবে।

সক্রেটিস মনে করতেন মৃত্যুর পর যে জীবন আছে সেই জীবনেও জ্ঞানের একটি ভূমিকা থাকতে পারে। অপরীক্ষিত জীবনটি কী? এ সম্পর্কে সক্রেটিসের ধারণা নিয়ে প্লেটোর ব্যাখ্যা হলো, জীবনে একটি দিন যেন অতিবাহিত না হয় ভালোত্ব বলতে কী বোঝায় সে ব্যাপারে আলোচনা না করে। এ ছাড়া আরও অনেক জিনিস আছে যেগুলো সম্পর্কে মানুষের আলোচনা করা উচিত। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই সবচেয়ে ভালো কাজ যা একজন মানুষ করতে পারে। জীবনের পরম লক্ষ্য হলো, ধনসম্পদ বা উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেয়ে জ্ঞান অর্জন করা।

এ জ্ঞান অর্জন নিছক বিনোদন অথবা কৌতূহল মেটানো নয়। আমাদের অস্তিত্ব জ্ঞানের কারণেই। সর্বোপরি সব ধরনের জ্ঞান শেষ বিচারে আত্ম-জ্ঞান। জ্ঞান এ পৃথিবীতে মানুষের ভেতরকার মানুষটিকে সৃষ্টি করে। অবিনশ্বর আত্মাকে যত্ন করে জ্ঞান। সক্রেটিস বলেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষাহীন জীবন আত্মাকে বিভ্রান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত করে। মনে হয় আত্মা মদ্যপান করেছে। অন্যদিকে জ্ঞানই আত্মার স্থৈর্য নিশ্চিত করে। আত্মাকে বিপথগামী হতে বাধা প্রদান করে।

সক্রেটিসের এ দর্শন বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বেশি করে প্রযোজ্য সেসব মানুষের ক্ষেত্রে, যারা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে আছেন, আর যারা রাজনীতি করেন। এ দেশে আত্মানুসন্ধান হয় না বলে অনেক ধরনের বিপত্তি সৃষ্টি হয়। যদি দায়িত্বশীল নাগরিকরা সঠিক ও বেঠিক কাজের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করতেন তাহলে দেশ ও দেশের মানুষ অনেক অ-কল্যাণ থেকে রক্ষা পেত।

এ দেশের মানুষের দুর্ভোগের মূলে রয়েছে আত্ম-জিজ্ঞাসাহীন নেতৃত্ব। এ নেতৃত্ব বলতে শুধু রাষ্ট্রের কর্ণধারদের বোঝায় না, এর মধ্যে রয়েছেন সব পেশা ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। এ দেশে কবে সেই নেতৃত্ব আসবে, যে নেতৃত্ব প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মসমীক্ষণ করবে এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপ সম্পর্কে মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

এতে তাদের শুধু এ পৃথিবীর জীবন নয়, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনেও শান্তি নিশ্চিত হবে। যে কাজ মনকে কণ্টকবিদ্ধ করে সে কাজ অবশ্যই বর্জনীয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এ দেশে অধিকাংশ দায়িত্বশীল মানুষ পদ-পদবি এবং অর্থ সম্পদের কারবারি। এরা শয়তানের কাছে আত্ম-বিক্রয় করেছে। একভাবে বিচার করলে দেখা যাবে এরা শয়তানের চেয়েও খারাপ। কারণ শয়তান খারাপ কাজের জন্য কু-মন্ত্রণা দেয়, কিন্তু এসব বিবেকশূন্য মানুষ নিজেরাই খারাপ কাজ করে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়া করেছেন তাদের অনেকেই দার্শনিক সক্রেটিসের নামের সঙ্গে পরিচিত। সক্রেটিসের জন্ম হয়েছিল এথেন্সে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯ সালে। তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি এবং দাইমার ছেলে। সম্ভবত তিনি পিতার পেশাই গ্রহণ করেছিলেন এবং দর্শন পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তাকে পরবর্তীকালে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে।

তিনি পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে খুব নামও করেছিলেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি এথেন্সে কিছুদিনের জন্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার পিতার মৃত্যুর পর তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক অর্থের মালিক হন। প্রচুর টাকা পয়সা থাকায় তাকে কোনো ধরনের কাজ করতে হতো না। তিনি স্ত্রী য্যানথিপিকে নিয়ে জীবনযাপন করতেন।

সেই থেকে সক্রেটিস এথেন্সে একজন পরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। কারণ তিনি অন্য নাগরিকদের সঙ্গে দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন এবং তিনি তরুণ ছাত্রদের মধ্যে অনেক অনুসারী সৃষ্টি করতে সমর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল যে তিনি তরুণদের মনে কু-প্রভাব সৃষ্টি করছেন। এ অপরাধের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়েছিল তিনি চাইলে দেশত্যাগ করতে পারেন।

কিন্তু তিনি দোষী হিসাবে তার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছিল তা মেনে নিলেন এবং হ্যামলক বিষপানে আত্মাহুতি দিলেন। শর্ত ছিল এ বিষ তিনি নিজেই পান করবেন। সক্রেটিস তাই করেছিলেন। সময়টি ছিল ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব সাল। সক্রেটিসের ধ্যান-ধারণা এবং নীতিবোধ আজকের দিনের জন্যও প্রযোজ্য।

সক্রেটিসের বিচার হয়েছিল তৎকালীন এথেন্সে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিকভাবে। এথেন্সের গণতন্ত্র ছিল পাবলিক গণতন্ত্র। নাগরিক হিসাবে স্বীকৃত ব্যক্তিরা ওই বিচার সভায় অংশ নিতে পারতেন। সক্রেটিসের বিচার সভায় ৫০০ জন নাগরিক অংশগ্রহণ করেছিল। বিচারের রায় এ ৫০০ জনের মধ্যে ভোটাভুটিতে নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছিল। কয়েক বছর আগে গ্রিক সরকার সক্রেটিসকে প্রদত্ত দণ্ড প্রত্যাহার করে নেয় এবং ওই সময়ের বিচার সঠিক হয়নি বলে ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং আদালতের রায়কে সব সময় সঠিক ও ন্যায্য বলে গ্রহণ করা যায় না।

সক্রেটিসকে পাশ্চাত্য দর্শনের জনক বলা হয়। অথচ তিনি কিছুই লিখে যাননি। কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি এবং তার নিজস্ব সুনির্দিষ্ট কোনো তত্ত্বও ছিল না। তাহলে তিনি কী করেছেন? তিনি প্রশ্ন তুলতে খুব পছন্দ করতেন। এর মধ্য দিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ ঘটত এবং আমরা যে চিন্তা করি তা তলিয়ে দেখার তাগিদ অনুভব করি। এটাকেই বলা হয় সক্রেটিক ম্যাথড। বাংলাদেশে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে অনেকেই একই কথা বলেছেন।

তিনি লিখতেন না। কিন্তু চমৎকার আলোচনা করতেন। কী ধরনের গবেষণা করা যায় সে ব্যাপারেও তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। সক্রেটিসের পদ্ধতিকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বলা হয়। কারণ আলোচনার মধ্য দিয়ে বিপরীতমুখী চিন্তাভাবনা বের হয়ে আসে। ফলে এথেন্সে তার অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়। তাকে Sophist বলে নিন্দা করা হতো। Sophist-দের কথাবার্তায় মানুষ বিভ্রান্ত হতো।

এ জন্যই সক্রেটিসের বিরুদ্ধে তরুণদের ভ্রষ্টাচারে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। সক্রেটিসের শিষ্য ছিলেন প্লেটো। প্লেটো সক্রেটিসের চিন্তা-ভাবনাগুলো সিরিজ আকারে লিখে রেখেছিলেন। এটি ডায়লগ নামে পরিচিতি অর্জন করে। এভাবেই সক্রেটিসের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। অন্যথায় সক্রেটিসের চিন্তাভাবনা হারিয়ে যেত।

সক্রেটিস খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এথেন্সে বসবাস করতেন। তরুণ বয়সে তিনি ‘প্রকৃতি-দর্শন’ অধ্যয়ন করেছিলেন। এ বিশ্ব চরাচরের বিভিন্ন জিনিস দেখে তিনি তার রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি নগর রাষ্ট্রের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশ্ব চরাচরের রহস্য ভেদ করার মতো বিশাল চিন্তা ত্যাগ করে তিনি দৈনন্দিন জীবনের নৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ন্যায়বিচারের বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত? কিন্তু তিনি তর্ক করে জয়লাভ করায় উৎসাহী ছিলেন না। অথবা যুক্তি দিয়ে টাকাকড়ি রোজগারেরও চেষ্টা করেননি। তার সমসাময়িকদের অনেকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ছিল। তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর কিংবা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও খুঁজে বেড়াননি। তিনি আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়, যেমন-কাকে বা কোনটিকে ভালো বলব, কোনটিকে মন্দ বলব এবং কোনটিকে ন্যায্য বলব, এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন নিজেকে জানাই দর্শনের প্রথম কাজ।

ভারতীয় দর্শনেও একটি কথা আছে। কথাটি হলো ‘আত্মানং বিদ্ধি’। অর্থাৎ, নিজেকে জানো। সক্রেটিসের চিন্তার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল জীবন সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং তিনি অত্যন্ত নির্দয়ভাবে মানুষের লালিত বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন, বিশেষ করে তাদের নিজেদের সম্পর্কে। এর ফলে তার অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়। কিন্তু তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিবেদিত ছিলেন। তার বিচারের সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি যা বলেছিলেন প্লেটো তা লিখে রেখেছিলেন। সক্রেটিস অজ্ঞানতার জীবনযাপনের চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘The life which is unexamined is not worth living’. প্রশ্ন হলো, সক্রেটিস জীবন সম্পর্কে যে প্রশ্ন তুলেছেন তার অর্থ কী হতে পারে? সক্রেটিসের মতে এটি হলো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা। এসব ধারণা আমরা প্রতিদিনই ব্যবহার করি। আমরা আমাদের জ্ঞান ও অজ্ঞানতা সম্পর্কেও প্রশ্ন করি কি?

সক্রেটিস ছিলেন দার্শনিকদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি ভালো জীবন বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। তার দৃষ্টিতে ভালো জীবনের মানে হলো মনের শান্তি অর্জন করা। এ শান্তির উৎস হলো সঠিক কাজ করা। সমাজে বিদ্যমান নৈতিকতাকেই প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাটাই ভালো জীবন নয়। সঠিক কাজ তখনই নিরূপণ করা যায়, যখন কঠোরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

সক্রেটিস ন্যায়সঙ্গত কাজকে আপেক্ষিক বলে মনে করতেন না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন, ভালো কাজ একরকমই হয়, অন্যরকম নয়। যেটি ন্যায়সঙ্গত সেটি গ্রিসের নাগরিকদের জন্যই শুধু প্রযোজ্য হবে না, প্রযোজ্য হবে বিশ্বের সব মানুষের জন্য। তিনি মনে করতেন, ন্যায় পথে চলা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং কোনো মানুষই আসলে খারাপ কাজ করতে চায় না।

যদি কেউ খারাপ কাজ করে, তাহলে তা তার বিবেকবিরুদ্ধ হবে। ফলে সে অস্বস্তি বোধ করবে। আমরা সবাই মনের শান্তি চাই। কিন্তু এটি এমন কিছু নয় যে, আমরা ইচ্ছুক হয়ে করি। মানুষ খারাপ কাজ করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাবে। এ থেকে সক্রেটিস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, একটি ভালো কাজ হতে পারে, যা জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল এবং একটিমাত্র খারাপ কাজ হতে পারে যা অজ্ঞানতার ওপর নির্ভরশীল। জ্ঞান নৈতিকতার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী রূপে বাঁধা। কিন্তু যেহেতু ভালো মাত্র একটিই আছে, সেহেতু জীবন সম্পর্কে আমাদের অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেতে হবে।

সক্রেটিস মনে করতেন মৃত্যুর পর যে জীবন আছে সেই জীবনেও জ্ঞানের একটি ভূমিকা থাকতে পারে। অপরীক্ষিত জীবনটি কী? এ সম্পর্কে সক্রেটিসের ধারণা নিয়ে প্লেটোর ব্যাখ্যা হলো, জীবনে একটি দিন যেন অতিবাহিত না হয় ভালোত্ব বলতে কী বোঝায় সে ব্যাপারে আলোচনা না করে। এ ছাড়া আরও অনেক জিনিস আছে যেগুলো সম্পর্কে মানুষের আলোচনা করা উচিত। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই সবচেয়ে ভালো কাজ যা একজন মানুষ করতে পারে। জীবনের পরম লক্ষ্য হলো, ধনসম্পদ বা উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেয়ে জ্ঞান অর্জন করা।

এ জ্ঞান অর্জন নিছক বিনোদন অথবা কৌতূহল মেটানো নয়। আমাদের অস্তিত্ব জ্ঞানের কারণেই। সর্বোপরি সব ধরনের জ্ঞান শেষ বিচারে আত্ম-জ্ঞান। জ্ঞান এ পৃথিবীতে মানুষের ভেতরকার মানুষটিকে সৃষ্টি করে। অবিনশ্বর আত্মাকে যত্ন করে জ্ঞান। সক্রেটিস বলেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষাহীন জীবন আত্মাকে বিভ্রান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত করে। মনে হয় আত্মা মদ্যপান করেছে। অন্যদিকে জ্ঞানই আত্মার স্থৈর্য নিশ্চিত করে। আত্মাকে বিপথগামী হতে বাধা প্রদান করে।

সক্রেটিসের এ দর্শন বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বেশি করে প্রযোজ্য সেসব মানুষের ক্ষেত্রে, যারা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে আছেন, আর যারা রাজনীতি করেন। এ দেশে আত্মানুসন্ধান হয় না বলে অনেক ধরনের বিপত্তি সৃষ্টি হয়। যদি দায়িত্বশীল নাগরিকরা সঠিক ও বেঠিক কাজের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করতেন তাহলে দেশ ও দেশের মানুষ অনেক অ-কল্যাণ থেকে রক্ষা পেত।

এ দেশের মানুষের দুর্ভোগের মূলে রয়েছে আত্ম-জিজ্ঞাসাহীন নেতৃত্ব। এ নেতৃত্ব বলতে শুধু রাষ্ট্রের কর্ণধারদের বোঝায় না, এর মধ্যে রয়েছেন সব পেশা ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। এ দেশে কবে সেই নেতৃত্ব আসবে, যে নেতৃত্ব প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মসমীক্ষণ করবে এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপ সম্পর্কে মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

এতে তাদের শুধু এ পৃথিবীর জীবন নয়, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনেও শান্তি নিশ্চিত হবে। যে কাজ মনকে কণ্টকবিদ্ধ করে সে কাজ অবশ্যই বর্জনীয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এ দেশে অধিকাংশ দায়িত্বশীল মানুষ পদ-পদবি এবং অর্থ সম্পদের কারবারি। এরা শয়তানের কাছে আত্ম-বিক্রয় করেছে। একভাবে বিচার করলে দেখা যাবে এরা শয়তানের চেয়েও খারাপ। কারণ শয়তান খারাপ কাজের জন্য কু-মন্ত্রণা দেয়, কিন্তু এসব বিবেকশূন্য মানুষ নিজেরাই খারাপ কাজ করে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন