করোনাকালীন এ বাজেট কতটা জনবান্ধব?
jugantor
করোনাকালীন এ বাজেট কতটা জনবান্ধব?

  মেহেদী হাসান বাবু  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো দেশের বাজেট ঘোষণা মানেই পরের অর্থবছরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া। কারণ রাষ্ট্রের সব ধরনের আয়-ব্যয়ের সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকে বাজেটে।

শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-শিক্ষা সব খাতে সরকারের বিনিয়োগ, খরচ, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। তাই বাজেট মানেই স্বপ্ন। আবার অন্যদিকে সেই বাজেটে প্রত্যাশা পূরণ করার একটা বড় চ্যালেঞ্জও কিন্তু থাকে। এরপরও মানুষ বাজেটে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দেখে আশান্বিত হয়।

নতুন করে স্বপ্ন সাজানোর কথা ভাবে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রবর্তিত হওয়ার পর বৈশ্বিকভাবেই বাজেটের আকার-আকৃতি ও প্রকৃতি জনকল্যাণমুখী হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখলে সেটাকে সুশাসনের সুফল বলেই মনে হবে। করোনার কারণে সরকারের অগ্রযাত্রা খানিকটা ব্যাহত হলেও বৈশ্বিক মহামারিকালীন মন্দার তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থানকে অনেকাংশেই ভালো বলা যায়। আর এ অগ্রগতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বিশ্ব দরবারে হয়েছেন প্রশংসিত।

উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে রোল মডেলে। সেই ধারবাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করোনাকালের এ বাজেটকে বলা হচ্ছে জীবন-জীবিকার বাজেট। বৈশ্বিক সংকট করোনা মহামারি মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ নানা বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে এবারের বাজেটে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাটে অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বেশকিছু পদক্ষেপ। এতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা একরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। সরকারের রূপকল্প এবং অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা পেয়ে অনেক মানুষই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপবে না, এমনটি আগাম প্রত্যাশা ছিল। মানুষের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এবারের বাজেটকে এক কথায় করোনাকালে নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে অগ্রসরতার বাজেট বলা চলে।

এ ছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে নারীদের জন্য সুখবরও। তবে এবারই প্রথম ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বাড়ছে। তবে ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আহরণ নিয়ে নানা শঙ্কা সব মহলের। মহামারির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে নতুন অর্থবছরের জন্য এ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বিগত ৫০ বছরে দেশের অর্থনীতির উন্নতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজেটের আকারও বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একটানা সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়ে যেভাবে ক্রমবর্ধমান হারে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছেন, তাতে তার এ উদ্যোগ সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই প্রতি বছর বিশাল আকৃতির বাজেট গ্রহণ করতে হয়। আর এ বৃহৎ বাজেটের কারণেই দেশের অর্থনীতির ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে এটি শিল্প ও কর্মসংস্থানবান্ধব। দেশীয় শিল্পের প্রাধান্য দেওয়ার জন্য নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে বেশকিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার দেশে বিষয়ভিত্তিক কর্মসংস্থানের নীতি গ্রহণ করেছে। এর আওতায় কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়বস্তু সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করে শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের যোগসূত্র স্থাপন করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে এরই মধ্যে ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে আরও ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দেশে-বিদেশে দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ উন্মোচন করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন কার্যক্রম দেশে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানে পারদর্শী জনবলের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের নীতি ও ফলদায়ী কর্মপরিকল্পনার ফলে দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুবিধা ভোগ করছে।

দেশি শিল্প বিকাশে বিভিন্ন ধরনের করে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে করপোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। কয়েকটি খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিছু খাতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির শুল্ক কমানো হয়েছে। কিছু খাতে আগাম করও তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশি শিল্প বাড়তি সুবিধা পাবে। শিল্পের খরচ কমায় বাড়বে বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগ বাড়লেই নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে দেশ।

ইলেকট্রনিকস শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় শিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। এখন দেশেই বিশ্বমানের এয়ারকন্ডিশন ও রেফ্রিজারেটর উৎপাদন হচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্র্যান্ডও দেশে কারখানা স্থাপন করেছে এবং অনেক ব্র্যান্ড পরিকল্পনা করছে। এ দুই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে।

তাই করোনা পরিস্থিতিতে দেশি শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, হোম অ্যাপ্লায়েন্সসামগ্রী উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে দুই বছরের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার ও প্রেশার কুকার দেশে উৎপাদন করলে উপকরণ-যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট দেওয়া লাগবে না। এ উদ্যোগগুলো এ ধরনের পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি করবে। মূলত এ বিষয়গুলোর কারণেই এ বাজেটকে গণমুখী কর্মসংস্থানবান্ধব বাজেট বলা চলে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের এ উন্নয়নযাত্রার প্রতিফলন দেখা যাবে বাজেটের আকারেই। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৭৬ কোটি টাকা। বিপরীতে মন্ত্রিসভার এবারে দেশের ৫০তম প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা; যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ বাজেট একইসঙ্গে চলমান বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারিকালে দেশের দ্বিতীয় বাজেট।

সংগত কারণেই এ বাজেটে মহামারি মোকাবিলা এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় টিকা আমদানির জন্য দশ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সবার জন্য বিনামূল্যে করোনার টিকার কথা বলা হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

যথারীতি আশা জাগানো, ভারসাম্যপূর্ণ এ বাজেটকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করলে সম্ভাবনাময় আগামীর স্বপ্নের বাজেট বলা চলে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেশকিছু ভালো পদক্ষেপের প্রস্তাবনাও লক্ষণীয়। দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে সচল রাখার তাগিদে এমন বাজেটই দরকার ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, করোনাকালীন এমন দুঃসময়ে আশাবাদী বাজেট প্রস্তাবনা সাহসিকতারই পরিচয়।

মেহেদী হাসান বাবু : সাংবাদিক

mhbabubd2021@gmail.com

করোনাকালীন এ বাজেট কতটা জনবান্ধব?

 মেহেদী হাসান বাবু 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো দেশের বাজেট ঘোষণা মানেই পরের অর্থবছরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া। কারণ রাষ্ট্রের সব ধরনের আয়-ব্যয়ের সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকে বাজেটে।

শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-শিক্ষা সব খাতে সরকারের বিনিয়োগ, খরচ, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। তাই বাজেট মানেই স্বপ্ন। আবার অন্যদিকে সেই বাজেটে প্রত্যাশা পূরণ করার একটা বড় চ্যালেঞ্জও কিন্তু থাকে। এরপরও মানুষ বাজেটে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দেখে আশান্বিত হয়।

নতুন করে স্বপ্ন সাজানোর কথা ভাবে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রবর্তিত হওয়ার পর বৈশ্বিকভাবেই বাজেটের আকার-আকৃতি ও প্রকৃতি জনকল্যাণমুখী হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখলে সেটাকে সুশাসনের সুফল বলেই মনে হবে। করোনার কারণে সরকারের অগ্রযাত্রা খানিকটা ব্যাহত হলেও বৈশ্বিক মহামারিকালীন মন্দার তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থানকে অনেকাংশেই ভালো বলা যায়। আর এ অগ্রগতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বিশ্ব দরবারে হয়েছেন প্রশংসিত।

উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে রোল মডেলে। সেই ধারবাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করোনাকালের এ বাজেটকে বলা হচ্ছে জীবন-জীবিকার বাজেট। বৈশ্বিক সংকট করোনা মহামারি মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ নানা বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে এবারের বাজেটে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাটে অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বেশকিছু পদক্ষেপ। এতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা একরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। সরকারের রূপকল্প এবং অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা পেয়ে অনেক মানুষই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপবে না, এমনটি আগাম প্রত্যাশা ছিল। মানুষের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এবারের বাজেটকে এক কথায় করোনাকালে নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে অগ্রসরতার বাজেট বলা চলে।

এ ছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে নারীদের জন্য সুখবরও। তবে এবারই প্রথম ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বাড়ছে। তবে ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আহরণ নিয়ে নানা শঙ্কা সব মহলের। মহামারির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে নতুন অর্থবছরের জন্য এ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বিগত ৫০ বছরে দেশের অর্থনীতির উন্নতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজেটের আকারও বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একটানা সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়ে যেভাবে ক্রমবর্ধমান হারে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছেন, তাতে তার এ উদ্যোগ সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই প্রতি বছর বিশাল আকৃতির বাজেট গ্রহণ করতে হয়। আর এ বৃহৎ বাজেটের কারণেই দেশের অর্থনীতির ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে এটি শিল্প ও কর্মসংস্থানবান্ধব। দেশীয় শিল্পের প্রাধান্য দেওয়ার জন্য নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে বেশকিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার দেশে বিষয়ভিত্তিক কর্মসংস্থানের নীতি গ্রহণ করেছে। এর আওতায় কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়বস্তু সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করে শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের যোগসূত্র স্থাপন করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে এরই মধ্যে ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে আরও ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দেশে-বিদেশে দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ উন্মোচন করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন কার্যক্রম দেশে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানে পারদর্শী জনবলের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের নীতি ও ফলদায়ী কর্মপরিকল্পনার ফলে দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুবিধা ভোগ করছে।

দেশি শিল্প বিকাশে বিভিন্ন ধরনের করে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে করপোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। কয়েকটি খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিছু খাতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির শুল্ক কমানো হয়েছে। কিছু খাতে আগাম করও তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশি শিল্প বাড়তি সুবিধা পাবে। শিল্পের খরচ কমায় বাড়বে বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগ বাড়লেই নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে দেশ।

ইলেকট্রনিকস শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় শিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। এখন দেশেই বিশ্বমানের এয়ারকন্ডিশন ও রেফ্রিজারেটর উৎপাদন হচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্র্যান্ডও দেশে কারখানা স্থাপন করেছে এবং অনেক ব্র্যান্ড পরিকল্পনা করছে। এ দুই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে।

তাই করোনা পরিস্থিতিতে দেশি শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, হোম অ্যাপ্লায়েন্সসামগ্রী উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে দুই বছরের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার ও প্রেশার কুকার দেশে উৎপাদন করলে উপকরণ-যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট দেওয়া লাগবে না। এ উদ্যোগগুলো এ ধরনের পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি করবে। মূলত এ বিষয়গুলোর কারণেই এ বাজেটকে গণমুখী কর্মসংস্থানবান্ধব বাজেট বলা চলে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের এ উন্নয়নযাত্রার প্রতিফলন দেখা যাবে বাজেটের আকারেই। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৭৬ কোটি টাকা। বিপরীতে মন্ত্রিসভার এবারে দেশের ৫০তম প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা; যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ বাজেট একইসঙ্গে চলমান বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারিকালে দেশের দ্বিতীয় বাজেট।

সংগত কারণেই এ বাজেটে মহামারি মোকাবিলা এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় টিকা আমদানির জন্য দশ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সবার জন্য বিনামূল্যে করোনার টিকার কথা বলা হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

যথারীতি আশা জাগানো, ভারসাম্যপূর্ণ এ বাজেটকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করলে সম্ভাবনাময় আগামীর স্বপ্নের বাজেট বলা চলে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেশকিছু ভালো পদক্ষেপের প্রস্তাবনাও লক্ষণীয়। দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে সচল রাখার তাগিদে এমন বাজেটই দরকার ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, করোনাকালীন এমন দুঃসময়ে আশাবাদী বাজেট প্রস্তাবনা সাহসিকতারই পরিচয়।

মেহেদী হাসান বাবু : সাংবাদিক

mhbabubd2021@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন