সংস্কৃতিতে বরাদ্দ বাড়ান
jugantor
সংস্কৃতিতে বরাদ্দ বাড়ান

  মিলন কান্তি দে  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতিবিদরা ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন বিষয় এবং এর গুণগত মান নিয়ে নানামুখী পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে ব্যস্ত। তবে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এখনো যেটা লক্ষ করিনি, সেটি হলো আমাদের সংস্কৃতি। অর্থাৎ সংস্কৃতি খাতে কোন যুক্তিতে কম বরাদ্দ দেওয়া হলো, অন্তত ১ শতাংশও কেন রাখা হলো না- এ নিয়ে দেশের উচ্চপর্যায়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। ভাবখানা অনেকটা এমন-সংস্কৃতি! ওটা থাকলেই কী, আর না থাকলেই কী!

তবে ব্যাপারটা সংস্কৃতিকর্মীদের নাড়া দিয়েছে প্রচণ্ডভাবে। তাদের আত্মসম্মানে বেধেছে। সম্প্রতি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এক সংবাদ সম্মেলন করে এর একটা সুষ্ঠু প্রতিকার চেয়েছে। যুগান্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ১০১ জন সংস্কৃতিকর্মীর বিবৃতি ছাপা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পরিষ্কার-প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৮৭ কোটি টাকার যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ ১ শতাংশেরও কম-সেটা আরেকটু বাড়াতে হবে। অন্তত ১ শতাংশ পূর্ণ করতে হবে।

সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে অনুদার দৃষ্টিভঙ্গি, তা গত দুই বছরের বরাদ্দের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যাবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ৫৭৯ কোটি টাকা। সংস্কৃতিজনরা বলছেন, সংস্কৃতি খাতে যেখানে ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দ জরুরি, সেখানে কমপক্ষে ১ শতাংশও কেন নয়? বাধা কোথায়?

সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের বক্তব্য থেকে জানা যায়, কয়েক বছর আগে থেকে সংস্কৃতিতে বাজেট বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে সৃষ্ট দেশের বাজেটে সংস্কৃতি খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাতে প্রত্যাশার কোনো প্রতিফলন ঘটে না। ফলে সংস্কৃতি কর্মীদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেছেন ‘মানুষের চিন্তায় ও মননে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ, এ ক্ষেত্রে বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। নামমাত্র অনুদান দিয়ে সর্বগ্রাসী সংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না।’ খুবই মূল্যবান ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদ ও অপশক্তি প্রতিরোধে রাজপথে রক্ত দিয়েছিল সংস্কৃতির সূর্যসন্তানরা। বাংলার স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে জেল খেটেছেন চারণকবি মুকুন্দদাশ।

এই যে সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা বলা হচ্ছে, এ ঐতিহ্য তো দীর্ঘদিনের। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল রবীন্দ্রনাথের সেই কালজয়ী সংগীত-আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। এ ছাড়া অনেক দেশপ্রেমমূলক যাত্রা, নাটক ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের ওই কালাকানুন রদ করেছিল এ দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা। সংস্কৃতির যে প্রচণ্ড শক্তি, এ শিক্ষা তো আমরা ইতিহাস থেকে পেতে পারি। এ দেশের সংস্কৃতিকে বড় ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু।

রাজনৈতিক ঝড়ো হাওয়ার মধ্যেও বাঙালি সংস্কৃতিকে তিনি বিস্মৃত হননি। তার ছয় দফা তো বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক মুক্তিসনদ। সাংস্কৃতিক শক্তির জোরেই তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। আর কে না জানে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এ দেশের ভাওয়াইয়া গানের সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের একনিষ্ঠ ভক্ত। এতসব কথা বলার উদ্দেশ্য, আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক যারা, বাজেট প্রণয়নে যারা যুক্ত আছেন, তাদের কাছে সাংস্কৃতিক জাগরণের ইতিহাসটা তুলে ধরা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কূটকৌশলের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, সংস্কৃতির মানোন্নয়ন নয়। ফলে বাজেটে উপেক্ষিত ছিল সংস্কৃতি। ১৯৯১ সালে আমরা একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার পেলেও আশানুরূপ বাজেট পেলেন না সংস্কৃতিকর্মীরা। অন্যদিকে নানারকম কালাকানুন জারি করে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের কণ্ঠরোধ করা হলো। রাজনৈতিক উন্মত্ততায় বারবার বিপন্ন হয়েছে দেশের সংস্কৃতি।

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন সংস্কৃতি কর্মীরা। ক্ষমতায় আসীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার তো কথা নয়! এ সরকারের আমলে সংস্কৃতির নানাবিধ উন্নয়ন ঘটবে। বিশেষ করে জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতিতে বরাদ্দসহ গুণগত মান বাড়বে। এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় এগিয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হলো না, হচ্ছে না। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ঠেকাতে যে গণসচেতনতার প্রয়োজন এবং তাতে যে সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে, তা কেন যে কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে চাইছেন না, আমরা তা বুঝতে পারছি না।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটকে ধন্যবাদ যে, তারা বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নে ৯ দফা দাবি পেশ করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে : প্রত্যেক উপজেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতির পদে জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে স্থানীয় কোনো বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক কিংবা কোনো শিক্ষাবিদকে মনোনয়ন দেওয়া, রাজধানীসহ সব জেলায় সরকারি উদ্যোগে একটি করে যাত্রা প্যান্ডেল নির্মাণ করা, প্রত্যেক অসচ্ছল শিল্পীকে মাসে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান, ৫ হাজার সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিটিকে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান এবং প্রতিটি জেলায় চারুকলা প্রদর্শনী এবং আর্ট গ্যালারি ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর জন্য মিনি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা। গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশ প্রকৃত অর্থেই সংস্কৃতিসমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এ জন্য শুধু দরকার একটি সংস্কৃতি অনুরাগী সংবেদনশীল বাঙালি মন।

বাজেট নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক আলোচনায় ছোটবেলায় পড়া একটি কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/ খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি/ দু’টি যদি জোটে অর্ধেকে তার/ ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’ কবি এখানে ফুলকে সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন জীবন-জীবিকার সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চাটাও নিজেদের জন্য, দেশ ও জাতির জন্য খুবই কল্যাণকর হবে। ফুল যেমন সুগন্ধে চারদিক মাতিয়ে রাখে, সংস্কৃতির গন্ধও মানুষকে জাগিয়ে তোলে, অন্ধত্ব দূর করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন-এসব ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সংস্কৃতির যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। তাই তো জীবন ধারণের পর সামান্য যদি কিছু সংস্থান থাকে, সেটা দিয়ে ফুল কেনার জন্য অর্থাৎ সংস্কৃতি সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাগিদ দিয়েছেন কবি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর যে তাগিদ দিয়েছে, আমরা মনে করি সেটা খুবই বাস্তবানুগ ও ন্যায়সঙ্গত। ন্যূনতম মাত্র ১ শতাংশ-আশা করি এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বরং স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে দেশমাতৃকার সংস্কৃতিসেবীদের কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হবে- সংস্কৃতির জয় হোক।

মিলন কান্তি দে : যাত্রা ব্যক্তিত্ব

সংস্কৃতিতে বরাদ্দ বাড়ান

 মিলন কান্তি দে 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতিবিদরা ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন বিষয় এবং এর গুণগত মান নিয়ে নানামুখী পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে ব্যস্ত। তবে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এখনো যেটা লক্ষ করিনি, সেটি হলো আমাদের সংস্কৃতি। অর্থাৎ সংস্কৃতি খাতে কোন যুক্তিতে কম বরাদ্দ দেওয়া হলো, অন্তত ১ শতাংশও কেন রাখা হলো না- এ নিয়ে দেশের উচ্চপর্যায়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। ভাবখানা অনেকটা এমন-সংস্কৃতি! ওটা থাকলেই কী, আর না থাকলেই কী!

তবে ব্যাপারটা সংস্কৃতিকর্মীদের নাড়া দিয়েছে প্রচণ্ডভাবে। তাদের আত্মসম্মানে বেধেছে। সম্প্রতি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এক সংবাদ সম্মেলন করে এর একটা সুষ্ঠু প্রতিকার চেয়েছে। যুগান্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ১০১ জন সংস্কৃতিকর্মীর বিবৃতি ছাপা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পরিষ্কার-প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৮৭ কোটি টাকার যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ ১ শতাংশেরও কম-সেটা আরেকটু বাড়াতে হবে। অন্তত ১ শতাংশ পূর্ণ করতে হবে।

সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে অনুদার দৃষ্টিভঙ্গি, তা গত দুই বছরের বরাদ্দের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যাবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ৫৭৯ কোটি টাকা। সংস্কৃতিজনরা বলছেন, সংস্কৃতি খাতে যেখানে ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দ জরুরি, সেখানে কমপক্ষে ১ শতাংশও কেন নয়? বাধা কোথায়?

সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের বক্তব্য থেকে জানা যায়, কয়েক বছর আগে থেকে সংস্কৃতিতে বাজেট বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে সৃষ্ট দেশের বাজেটে সংস্কৃতি খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাতে প্রত্যাশার কোনো প্রতিফলন ঘটে না। ফলে সংস্কৃতি কর্মীদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেছেন ‘মানুষের চিন্তায় ও মননে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ, এ ক্ষেত্রে বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। নামমাত্র অনুদান দিয়ে সর্বগ্রাসী সংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না।’ খুবই মূল্যবান ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদ ও অপশক্তি প্রতিরোধে রাজপথে রক্ত দিয়েছিল সংস্কৃতির সূর্যসন্তানরা। বাংলার স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে জেল খেটেছেন চারণকবি মুকুন্দদাশ।

এই যে সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা বলা হচ্ছে, এ ঐতিহ্য তো দীর্ঘদিনের। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল রবীন্দ্রনাথের সেই কালজয়ী সংগীত-আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। এ ছাড়া অনেক দেশপ্রেমমূলক যাত্রা, নাটক ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের ওই কালাকানুন রদ করেছিল এ দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা। সংস্কৃতির যে প্রচণ্ড শক্তি, এ শিক্ষা তো আমরা ইতিহাস থেকে পেতে পারি। এ দেশের সংস্কৃতিকে বড় ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু।

রাজনৈতিক ঝড়ো হাওয়ার মধ্যেও বাঙালি সংস্কৃতিকে তিনি বিস্মৃত হননি। তার ছয় দফা তো বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক মুক্তিসনদ। সাংস্কৃতিক শক্তির জোরেই তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। আর কে না জানে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এ দেশের ভাওয়াইয়া গানের সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের একনিষ্ঠ ভক্ত। এতসব কথা বলার উদ্দেশ্য, আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক যারা, বাজেট প্রণয়নে যারা যুক্ত আছেন, তাদের কাছে সাংস্কৃতিক জাগরণের ইতিহাসটা তুলে ধরা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কূটকৌশলের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, সংস্কৃতির মানোন্নয়ন নয়। ফলে বাজেটে উপেক্ষিত ছিল সংস্কৃতি। ১৯৯১ সালে আমরা একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার পেলেও আশানুরূপ বাজেট পেলেন না সংস্কৃতিকর্মীরা। অন্যদিকে নানারকম কালাকানুন জারি করে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের কণ্ঠরোধ করা হলো। রাজনৈতিক উন্মত্ততায় বারবার বিপন্ন হয়েছে দেশের সংস্কৃতি।

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন সংস্কৃতি কর্মীরা। ক্ষমতায় আসীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার তো কথা নয়! এ সরকারের আমলে সংস্কৃতির নানাবিধ উন্নয়ন ঘটবে। বিশেষ করে জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতিতে বরাদ্দসহ গুণগত মান বাড়বে। এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় এগিয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হলো না, হচ্ছে না। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ঠেকাতে যে গণসচেতনতার প্রয়োজন এবং তাতে যে সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে, তা কেন যে কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে চাইছেন না, আমরা তা বুঝতে পারছি না।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটকে ধন্যবাদ যে, তারা বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নে ৯ দফা দাবি পেশ করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে : প্রত্যেক উপজেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতির পদে জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে স্থানীয় কোনো বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক কিংবা কোনো শিক্ষাবিদকে মনোনয়ন দেওয়া, রাজধানীসহ সব জেলায় সরকারি উদ্যোগে একটি করে যাত্রা প্যান্ডেল নির্মাণ করা, প্রত্যেক অসচ্ছল শিল্পীকে মাসে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান, ৫ হাজার সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিটিকে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান এবং প্রতিটি জেলায় চারুকলা প্রদর্শনী এবং আর্ট গ্যালারি ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর জন্য মিনি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা। গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশ প্রকৃত অর্থেই সংস্কৃতিসমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এ জন্য শুধু দরকার একটি সংস্কৃতি অনুরাগী সংবেদনশীল বাঙালি মন।

বাজেট নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক আলোচনায় ছোটবেলায় পড়া একটি কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/ খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি/ দু’টি যদি জোটে অর্ধেকে তার/ ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’ কবি এখানে ফুলকে সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন জীবন-জীবিকার সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চাটাও নিজেদের জন্য, দেশ ও জাতির জন্য খুবই কল্যাণকর হবে। ফুল যেমন সুগন্ধে চারদিক মাতিয়ে রাখে, সংস্কৃতির গন্ধও মানুষকে জাগিয়ে তোলে, অন্ধত্ব দূর করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন-এসব ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সংস্কৃতির যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। তাই তো জীবন ধারণের পর সামান্য যদি কিছু সংস্থান থাকে, সেটা দিয়ে ফুল কেনার জন্য অর্থাৎ সংস্কৃতি সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাগিদ দিয়েছেন কবি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর যে তাগিদ দিয়েছে, আমরা মনে করি সেটা খুবই বাস্তবানুগ ও ন্যায়সঙ্গত। ন্যূনতম মাত্র ১ শতাংশ-আশা করি এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বরং স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে দেশমাতৃকার সংস্কৃতিসেবীদের কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হবে- সংস্কৃতির জয় হোক।

মিলন কান্তি দে : যাত্রা ব্যক্তিত্ব

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন