ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে কারণে অনন্য গৌরবের অধিকারী
jugantor
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে কারণে অনন্য গৌরবের অধিকারী

  পবিত্র সরকার  

০৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে উত্তীর্ণ হলো, বাঙালির কাছে এ এক পরম গৌরবের ঘটনা। আমি ঢাকার সন্তান, কিন্তু দেশভাগের ঠেলায় আপাতত বিদেশি বলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাইনি। আর ওখানে থাকলেও সে সুযোগ যে পেতামই, তা একেবারেই সুনিশ্চিত নয়। এ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলা একাডেমির হয়ে ব্যাকরণের কাজ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সেলেন্সের অতিথিশালায় থাকতে হয়েছিল পর পর তিন-চার বছর, নানা সময়ে। তখন একটা দৃশ্য দেখেছি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিতে আসা হাজার-হাজার ছেলেমেয়ের হাজিরা, তাদের আর তাদের অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন চোখমুখ। সেসব দেখে মনে যে ত্রাস জেগেছে, তাতে সুনিশ্চিত এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে, আমার মতো গ্রামের ছেলের ওই সুযোগ পাওয়া অসম্ভব ছিল।

ভারতের নাগরিক হিসাবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব- এক ধরনের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রভাবই বলব- তা থেকে মুক্ত ছিলাম না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা অন্যরা করবেন, কিন্তু আমার মতে তখনকার পূর্ববঙ্গে ওই সময়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদী শাসকের হাতে হলেও খুবই উচিত কাজ হয়েছিল। কারণ পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের প্রতিবেশে একটি উচ্চতম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান পেয়েছিলেন। তা শিক্ষার সর্বোচ্চ উৎকর্ষের একটি নিজের মানদণ্ড নির্মাণ করেছে এবং নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু উৎকৃষ্ট বিশেষজ্ঞ আর বিদ্বজ্জনের জন্ম দিয়েছে। এবং সেই আল্মা মাতের বা বিদ্যাজননীর জঠর থেকে নির্গত বহু সন্তান এই উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু ছিলেন, ছিলেন কবি অজিত দত্ত। অর্থনীতিবিদ ও পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অধ্যাপক অশোক মিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করে কলকাতায় ভর্তি হতে পারলেন না কমিউনিস্ট কলঙ্কের জন্য, তাই তাকে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এমএ করতে হলো। বুদ্ধদেব বসুদের কথায় মনে পড়ল, আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে (যাদবপুর, শুরু ১৯৫৬) সাতাশ-আঠাশ বছর পড়িয়েছি, তার সূত্রপাতই হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতে চলে আসা অধ্যাপকদের দিয়ে। ড. সুশীলকুমার দে, আমার সময়কার বাংলার প্রধান গণেশচরণ বসু, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, জানি না ইঞ্জিনিয়ারিং আর বিজ্ঞানে কতজন ছিলেন। আমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে অধ্যাপক ছিলেন ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, তিনি তো পশ্চিম বাংলায় লোকসংস্কৃতি চর্চায় একটা যুগান্তর ঘটিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক ভবতোষ দত্তও ছিলেন ঢাকার ছাত্র। আরও কত কত ঢাকার অধ্যাপক আর ছাত্রের বই আর লেখা পড়ে আমরা আমাদের জীবন আর জীবিকার ভিত শক্ত করেছি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তো মাথার ওপরে ছিলেনই। তাছাড়া অধ্যাপক এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- নামের তালিকা অন্তহীন।

২.

দূরের সম্পর্কের চরিত্র বদল হয়ে কাছের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় ১৯৭৮ সালে যখন যাদবপুরের বাংলা বিভাগে হ্যালেড সেমিনারের আয়োজন করি, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। সেই সেমিনারে পাঁচজন অধ্যাপক আসেন বাংলাদেশ থেকে, তাতে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আর অধ্যাপক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের। ঢাকার ছাত্ররাও তার আগে থেকেই যাদবপুরে পিএইচডি করতে আসতেন। এর ১০ বছর পর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে ‘কম্পিউটারে বাংলা ভাষা’ শীর্ষক একটি আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আমি প্রথম বাংলাদেশে যাই। আমন্ত্রণ করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আর বন্ধুবর জামিল চৌধুরী। জামিলও যতদূর জানি ঢাকার ছাত্র। সেখানে বাংলাদেশের আপ্যায়ন আর আতিথেয়তার প্রথম স্বাদ পাই, যার কথা মহাকাব্য রচনা করেও ফুরোনো যায় না। তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক স্নেহভাজন সৈয়দ আকরম হোসেনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং মনজুর মোরশেদ, অধ্যাপক মনসুর মুসা, প্রয়াত স্নেহভাজন হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের সঙ্গে প্রচুর আনন্দময় সময় কাটে। যখন রবীন্দ্র ভারতীতে ছিলাম তখন ঢাকার প্রচুর ছাত্র সেখানে বাংলা, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংগীত, নাটক ইত্যাদি বিভাগে পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা করে সফল হয়ে দেশে ফিরেছে, এবং ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের বিদ্যামর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন ঢাকার বাংলা বিভাগের সৌমিত্র শেখর তখনকার এক উজ্জ্বল পিএইচডি প্রাপক। নাটক আর সংগীত বিভাগেও এমন একাধিক ছিল এবং আছে। তারা ঢাকার গর্ব তো বটেই, রবীন্দ্র ভারতীরও গর্ব। বহু ছাত্রছাত্রী অইসিসিআরের বৃত্তি পেয়ে রবীন্দ্র ভারতীতে সংগীত, নাটক ইত্যাদিতে ডিগ্রি করে দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আবার আমারই সময়ে রবীন্দ্র ভারতী অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও কবি শামসুর রাহমানকে সাম্মানিক ডক্টরেট দিয়ে কৃতার্থ হয়েছিল। বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ডতাকে স্বীকৃতি জানানোর সেই ধারা রবীন্দ্র ভারতী এখনো অব্যাহত রেখেছে।

১৯৯৬ থেকে বাংলা একাডেমির সঙ্গে সম্পর্ক। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারি যে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতেই স্থাপিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহ এর চতুর্দিকে। ২০১০-এ বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রকল্পের কাজে চার বছর আমি ঢাকায় গিয়ে দু-তিন সপ্তাহ করে বছরে চার-পাঁচবার থাকব। দু-একবার টিএসসির অতিথি-কক্ষের একটায়, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সেন্টার অব এক্সেলেন্সের তিন তলায়। এর একটি ভূমিকা হয়েছিল ২০০৯-এ, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বলিষ্ঠ অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের আমন্ত্রণে আমি অধ্যাপক আহমদ শরিফ স্মারক বক্তৃতা দিতে যাই। এর পর থেকে ঢাকার ওই চত্বর, আর সেন্টার অব এক্সেলেন্সের অতিথিশালা হয়ে ওঠে আমার দ্বিতীয় ঘরবাড়ি। তখন আমাদের বাংলা ব্যাকরণের কর্মশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু অধ্যাপক, বিশেষত ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের, অংশগ্রহণ করেন এবং ব্যাকরণের বিভিন্ন অধ্যায় রচনা করেন। হাতের কাছে থাকার সূত্রে অন্যতম সম্পাদক রফিক ভাই আমাকে কখনো কখনো ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের দু-একটি অনুষ্ঠানেও টেনে নিয়ে গেছেন।

আমাদের কাজকর্ম কীভাবে চলত তার বিবরণ আমি আমার আত্মজীবনী ‘অল্প পুঁজির জীবন’-এ দিয়েছি, কিন্তু তা দেখার জন্য জামান ভাই, তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমিতে যারাই আসতেন তাদের আমাদের ঘরে, পুরোনো আর নতুন কমিটি রুমে ধরে নিয়ে আসতেন। নতুন কমিটি রুমের বিশাল কাচের দেওয়াল দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশরেখা দেখা যেত। আগেকার সভাপতি কবীর চৌধুরী, পরে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তো নিয়মিত আসতেন, কিন্তু সেই সঙ্গে আসতেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, প্রায়ই আনোয়ারা ভাবিসহ, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আগেকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, কবি আসাদ চৌধুরী- কে নয়? নানা সময়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ভাইয়ের সঙ্গেও সভা-সমিতিতে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছি। আবার এখনকার উপাচার্য আখতারুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গেও মাঝে মধ্যে ‘ওয়েবিনারে’ পর্দা ভাগ করে নিই। বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরীর নানা ক্ষেত্রে অভিজন বা এলিটদের সঙ্গে এ তুচ্ছ ব্যক্তির পরিচয় হয়েছিল ওই বাংলা একাডেমিতেই, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন সবচেয়ে মহিমময়ী ছাত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও।

৩.

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক হিসাবে একটা সমাজের জাগরণের উৎস হয়ে ওঠে, পৃথিবীর জ্ঞান ও চেতনার সঙ্গে যোগ ঘটিয়ে আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে, অগ্রগতির লক্ষ্য ও সীমানা নির্দেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে কাজ সার্থকভাবেই করেছে। পরে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও তার যোগ্য সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যা অনন্য গৌরব, যে কারণে পৃথিবীর আর যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিষ্ফল ঈর্ষা করতেই থাকবে, তা হলো তার একটি কীর্তি, যে কীর্তি আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কোনোদিন অর্জন করতে পারবে কিনা সন্দেহ। হাজার বিদ্যায়তনিক সাফল্য দিয়েও যার মূল্য লঘু করে দেখা যায় না, কারণ এ কীর্তি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও তার মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। এ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি দেশের, বর্তমান বাংলাদেশের, স্বাধীনতার অঙ্কুর প্রথম জেগে উঠেছিল। তার বীজ পুঁতেছিল এর ছাত্ররা, পাকিস্তানের কায়েদ-এ আজম জিন্নাহর মুখের ওপর ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিক্ষেপ করেছিল তারা, ২১ ফেব্রুয়ারির বিপ্লব ও রক্তদান তাদেরই আয়োজনে। তখন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ড উত্তরাধিকারের সন্ধান করেছেন। শেখ মুজিব ওই অঙ্কুরের গোড়ায় জলসিঞ্চন করেছেন, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তাকে বড় করেছে, তার পর নানা ক্ষোভ, বিক্ষোভ, প্রতিরোধ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই কিশলয় তরু দীর্ঘতা ও শক্তি পেয়েছে। সামরিক শাসনের স্বেচ্ছাচার ও নির্বুদ্ধিতার (রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদ্?যাপনে বিরূপতা, রবীন্দ্র সংগীতে নিষেধ, ধর্মের ভিত্তিতে সংস্কৃতি পুনর্গঠনের সুপারিশ) বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের চূড়ান্ত নেতৃত্বে সেই তরু মহিরুহ হয়ে ওঠে, এবং তা অখণ্ড পাকিস্তানের ভিত্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। রক্তাক্ত, মরণপণ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এ কথা নিশ্চয়ই অনেকে অনেকভাবে বলবেন, এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবদান, প্রথাগত ভাষায় বলি, স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ বিভাময় মর্যাদা দাবি করতে পারে বলে মনে হয় না।

বাঙালি হিসাবে আমি বাঙালির গৌরবের এই পীঠস্থানকে আনত অভিবাদন জানাই।

পবিত্র সরকার : খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে কারণে অনন্য গৌরবের অধিকারী

 পবিত্র সরকার 
০৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে উত্তীর্ণ হলো, বাঙালির কাছে এ এক পরম গৌরবের ঘটনা। আমি ঢাকার সন্তান, কিন্তু দেশভাগের ঠেলায় আপাতত বিদেশি বলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাইনি। আর ওখানে থাকলেও সে সুযোগ যে পেতামই, তা একেবারেই সুনিশ্চিত নয়। এ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলা একাডেমির হয়ে ব্যাকরণের কাজ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সেলেন্সের অতিথিশালায় থাকতে হয়েছিল পর পর তিন-চার বছর, নানা সময়ে। তখন একটা দৃশ্য দেখেছি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিতে আসা হাজার-হাজার ছেলেমেয়ের হাজিরা, তাদের আর তাদের অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন চোখমুখ। সেসব দেখে মনে যে ত্রাস জেগেছে, তাতে সুনিশ্চিত এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে, আমার মতো গ্রামের ছেলের ওই সুযোগ পাওয়া অসম্ভব ছিল।

ভারতের নাগরিক হিসাবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব- এক ধরনের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রভাবই বলব- তা থেকে মুক্ত ছিলাম না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা অন্যরা করবেন, কিন্তু আমার মতে তখনকার পূর্ববঙ্গে ওই সময়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদী শাসকের হাতে হলেও খুবই উচিত কাজ হয়েছিল। কারণ পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের প্রতিবেশে একটি উচ্চতম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান পেয়েছিলেন। তা শিক্ষার সর্বোচ্চ উৎকর্ষের একটি নিজের মানদণ্ড নির্মাণ করেছে এবং নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু উৎকৃষ্ট বিশেষজ্ঞ আর বিদ্বজ্জনের জন্ম দিয়েছে। এবং সেই আল্মা মাতের বা বিদ্যাজননীর জঠর থেকে নির্গত বহু সন্তান এই উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু ছিলেন, ছিলেন কবি অজিত দত্ত। অর্থনীতিবিদ ও পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অধ্যাপক অশোক মিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করে কলকাতায় ভর্তি হতে পারলেন না কমিউনিস্ট কলঙ্কের জন্য, তাই তাকে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এমএ করতে হলো। বুদ্ধদেব বসুদের কথায় মনে পড়ল, আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে (যাদবপুর, শুরু ১৯৫৬) সাতাশ-আঠাশ বছর পড়িয়েছি, তার সূত্রপাতই হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতে চলে আসা অধ্যাপকদের দিয়ে। ড. সুশীলকুমার দে, আমার সময়কার বাংলার প্রধান গণেশচরণ বসু, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, জানি না ইঞ্জিনিয়ারিং আর বিজ্ঞানে কতজন ছিলেন। আমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে অধ্যাপক ছিলেন ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, তিনি তো পশ্চিম বাংলায় লোকসংস্কৃতি চর্চায় একটা যুগান্তর ঘটিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক ভবতোষ দত্তও ছিলেন ঢাকার ছাত্র। আরও কত কত ঢাকার অধ্যাপক আর ছাত্রের বই আর লেখা পড়ে আমরা আমাদের জীবন আর জীবিকার ভিত শক্ত করেছি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তো মাথার ওপরে ছিলেনই। তাছাড়া অধ্যাপক এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- নামের তালিকা অন্তহীন।

২.

দূরের সম্পর্কের চরিত্র বদল হয়ে কাছের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় ১৯৭৮ সালে যখন যাদবপুরের বাংলা বিভাগে হ্যালেড সেমিনারের আয়োজন করি, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। সেই সেমিনারে পাঁচজন অধ্যাপক আসেন বাংলাদেশ থেকে, তাতে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আর অধ্যাপক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের। ঢাকার ছাত্ররাও তার আগে থেকেই যাদবপুরে পিএইচডি করতে আসতেন। এর ১০ বছর পর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে ‘কম্পিউটারে বাংলা ভাষা’ শীর্ষক একটি আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আমি প্রথম বাংলাদেশে যাই। আমন্ত্রণ করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আর বন্ধুবর জামিল চৌধুরী। জামিলও যতদূর জানি ঢাকার ছাত্র। সেখানে বাংলাদেশের আপ্যায়ন আর আতিথেয়তার প্রথম স্বাদ পাই, যার কথা মহাকাব্য রচনা করেও ফুরোনো যায় না। তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক স্নেহভাজন সৈয়দ আকরম হোসেনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং মনজুর মোরশেদ, অধ্যাপক মনসুর মুসা, প্রয়াত স্নেহভাজন হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের সঙ্গে প্রচুর আনন্দময় সময় কাটে। যখন রবীন্দ্র ভারতীতে ছিলাম তখন ঢাকার প্রচুর ছাত্র সেখানে বাংলা, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংগীত, নাটক ইত্যাদি বিভাগে পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা করে সফল হয়ে দেশে ফিরেছে, এবং ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের বিদ্যামর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন ঢাকার বাংলা বিভাগের সৌমিত্র শেখর তখনকার এক উজ্জ্বল পিএইচডি প্রাপক। নাটক আর সংগীত বিভাগেও এমন একাধিক ছিল এবং আছে। তারা ঢাকার গর্ব তো বটেই, রবীন্দ্র ভারতীরও গর্ব। বহু ছাত্রছাত্রী অইসিসিআরের বৃত্তি পেয়ে রবীন্দ্র ভারতীতে সংগীত, নাটক ইত্যাদিতে ডিগ্রি করে দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আবার আমারই সময়ে রবীন্দ্র ভারতী অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও কবি শামসুর রাহমানকে সাম্মানিক ডক্টরেট দিয়ে কৃতার্থ হয়েছিল। বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ডতাকে স্বীকৃতি জানানোর সেই ধারা রবীন্দ্র ভারতী এখনো অব্যাহত রেখেছে।

১৯৯৬ থেকে বাংলা একাডেমির সঙ্গে সম্পর্ক। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারি যে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতেই স্থাপিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহ এর চতুর্দিকে। ২০১০-এ বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রকল্পের কাজে চার বছর আমি ঢাকায় গিয়ে দু-তিন সপ্তাহ করে বছরে চার-পাঁচবার থাকব। দু-একবার টিএসসির অতিথি-কক্ষের একটায়, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সেন্টার অব এক্সেলেন্সের তিন তলায়। এর একটি ভূমিকা হয়েছিল ২০০৯-এ, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বলিষ্ঠ অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের আমন্ত্রণে আমি অধ্যাপক আহমদ শরিফ স্মারক বক্তৃতা দিতে যাই। এর পর থেকে ঢাকার ওই চত্বর, আর সেন্টার অব এক্সেলেন্সের অতিথিশালা হয়ে ওঠে আমার দ্বিতীয় ঘরবাড়ি। তখন আমাদের বাংলা ব্যাকরণের কর্মশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু অধ্যাপক, বিশেষত ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের, অংশগ্রহণ করেন এবং ব্যাকরণের বিভিন্ন অধ্যায় রচনা করেন। হাতের কাছে থাকার সূত্রে অন্যতম সম্পাদক রফিক ভাই আমাকে কখনো কখনো ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের দু-একটি অনুষ্ঠানেও টেনে নিয়ে গেছেন।

আমাদের কাজকর্ম কীভাবে চলত তার বিবরণ আমি আমার আত্মজীবনী ‘অল্প পুঁজির জীবন’-এ দিয়েছি, কিন্তু তা দেখার জন্য জামান ভাই, তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমিতে যারাই আসতেন তাদের আমাদের ঘরে, পুরোনো আর নতুন কমিটি রুমে ধরে নিয়ে আসতেন। নতুন কমিটি রুমের বিশাল কাচের দেওয়াল দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশরেখা দেখা যেত। আগেকার সভাপতি কবীর চৌধুরী, পরে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তো নিয়মিত আসতেন, কিন্তু সেই সঙ্গে আসতেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, প্রায়ই আনোয়ারা ভাবিসহ, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আগেকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, কবি আসাদ চৌধুরী- কে নয়? নানা সময়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ভাইয়ের সঙ্গেও সভা-সমিতিতে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছি। আবার এখনকার উপাচার্য আখতারুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গেও মাঝে মধ্যে ‘ওয়েবিনারে’ পর্দা ভাগ করে নিই। বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরীর নানা ক্ষেত্রে অভিজন বা এলিটদের সঙ্গে এ তুচ্ছ ব্যক্তির পরিচয় হয়েছিল ওই বাংলা একাডেমিতেই, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন সবচেয়ে মহিমময়ী ছাত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও।

৩.

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক হিসাবে একটা সমাজের জাগরণের উৎস হয়ে ওঠে, পৃথিবীর জ্ঞান ও চেতনার সঙ্গে যোগ ঘটিয়ে আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে, অগ্রগতির লক্ষ্য ও সীমানা নির্দেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে কাজ সার্থকভাবেই করেছে। পরে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও তার যোগ্য সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যা অনন্য গৌরব, যে কারণে পৃথিবীর আর যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিষ্ফল ঈর্ষা করতেই থাকবে, তা হলো তার একটি কীর্তি, যে কীর্তি আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কোনোদিন অর্জন করতে পারবে কিনা সন্দেহ। হাজার বিদ্যায়তনিক সাফল্য দিয়েও যার মূল্য লঘু করে দেখা যায় না, কারণ এ কীর্তি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও তার মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। এ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি দেশের, বর্তমান বাংলাদেশের, স্বাধীনতার অঙ্কুর প্রথম জেগে উঠেছিল। তার বীজ পুঁতেছিল এর ছাত্ররা, পাকিস্তানের কায়েদ-এ আজম জিন্নাহর মুখের ওপর ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিক্ষেপ করেছিল তারা, ২১ ফেব্রুয়ারির বিপ্লব ও রক্তদান তাদেরই আয়োজনে। তখন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ড উত্তরাধিকারের সন্ধান করেছেন। শেখ মুজিব ওই অঙ্কুরের গোড়ায় জলসিঞ্চন করেছেন, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তাকে বড় করেছে, তার পর নানা ক্ষোভ, বিক্ষোভ, প্রতিরোধ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই কিশলয় তরু দীর্ঘতা ও শক্তি পেয়েছে। সামরিক শাসনের স্বেচ্ছাচার ও নির্বুদ্ধিতার (রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদ্?যাপনে বিরূপতা, রবীন্দ্র সংগীতে নিষেধ, ধর্মের ভিত্তিতে সংস্কৃতি পুনর্গঠনের সুপারিশ) বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের চূড়ান্ত নেতৃত্বে সেই তরু মহিরুহ হয়ে ওঠে, এবং তা অখণ্ড পাকিস্তানের ভিত্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। রক্তাক্ত, মরণপণ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এ কথা নিশ্চয়ই অনেকে অনেকভাবে বলবেন, এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবদান, প্রথাগত ভাষায় বলি, স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ বিভাময় মর্যাদা দাবি করতে পারে বলে মনে হয় না।

বাঙালি হিসাবে আমি বাঙালির গৌরবের এই পীঠস্থানকে আনত অভিবাদন জানাই।

পবিত্র সরকার : খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন