করোনাকালে চুল কাটতে মন্ত্রী গেলেন সেলুনে
jugantor
কিছুমিছু
করোনাকালে চুল কাটতে মন্ত্রী গেলেন সেলুনে

  মোকাম্মেল হোসেন  

১৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আশ্চর্যের পরেই অত্যাশ্চর্যের স্থান। মন্ত্রী বাহাদুরের মনে হলো, তিনি সেই অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। দুচোখ কপালে ওঠার আগেই রাইফেলের গুলির বেগে তার মুখ দিয়ে বের হলো-

: ওয়াও! অসাম্!

ফটিকলাল বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইল-

: স্যার! আয়োজন পছন্দ হইছে?

পছন্দ হয়েছে মানে? পছন্দ না হলে কারও মুখ দিয়ে ‘ওয়াও-অসাম্’ বের হয়? আয়োজন অবশ্যই পছন্দ হয়েছে। তবে এরা কিছু মিসটেক করে ফেলেছে। যেমন, বেলুন গেটের চান্দিতে লাগানো ব্যানারে লেখা হয়েছে- আজকের প্রধান আকর্ষণ...। এ জাতীয় কথাবার্তা অতীতে যাত্রাদলের নর্তকীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে দেখা যেত। যাত্রাদলের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ দর্শক টানতে ‘একঝাঁক ডানাকাটা পরীর’ ঝুমুর-ঝুমুর নাচ সম্পর্কিত প্রচারণায় মাইকে ঘোষণা দিত-আজকের প্রধান আকর্ষণ প্রিন্সেস জর্জিনা কিংবা রত্না অথবা কারিনা।

দ্বিতীয় ভুলটা এরা করেছে বানান নিয়ে। ফাইভ স্টার সেলুনের অসাধারণ একটি কর্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে ‘বঢি মেচাজ’। বানান ও ভাষারীতির ব্যাপারে মন্ত্রীর অবশ্য কোনো মাথাব্যথা নেই। এসব দেখার দায়িত্ব ভাষাতত্ত্ববিদ ও পণ্ডিত শ্রেণির লোকজনের। বিশ্বের একেক অঞ্চলের মানুষ একেকরকম উচ্চারণে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। বোবা শ্রেণির লোকেরা তো পেঁ-পোঁ ছাড়া আর কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারে না। আসল বিষয় হচ্ছে ভাব প্রকাশ। ভাবের ঘর পূর্ণ হলে বানান দেশের সড়ক-মহাসড়কের মতো এবড়ো-থেবড়ো হলেও কোনো সমস্যা নেই। অতএব, বানান বিষয়ক ভুলটাকে মধুর ভুল হিসাবে মার্জনা করা যায় এবং এর উসিলায় আগের ভুলটিকেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত। মন্ত্রী খোশমেজাজে গদিওয়ালা নরম চেয়ারে বসলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নরসুন্দরের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বললেন-

: কী মিয়া! করোনার মারাত্মক কঠিন পরিস্থিতিতে ঘোষণা দিয়া ক্ষুর-কেনচি হাতে লইলা! কাজটা কি সঠিক হইল?

মন্ত্রীর কথা শুনে তরুণ নরসুন্দর ফটিকলালের দিকে তাকাল। ফটিকলাল প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে করজোড়ে বলল-

: স্যার! আপনে দয়া করছেন, তাই...

ফটিকলালের হাবভাব ও মুখের ভাষায় প্রাচীন রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের প্রকাশ দেখে মন্ত্রী মুগ্ধ হলেন। ফটিকলাল কি তাকে রাজা-মহারাজাদের একজন ভাবতে শুরু করল! আগের দিনে রাজা-মহারাজরা চুল-দাড়ি কাটতে নাপিতের কাছে ধরনা দিতেন না; বরং নাপিতরাই তাদের ডেরায় নিয়মিত হাজিরা দিত। এ যুগেও অনেক মন্ত্রী-মিনিস্টার ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী প্রাচীন রীতিনীতির অনুসারী হয়ে বাড়িতে নাপিত তলব করেন। কিন্তু তিনি বরাবরই ব্যতিক্রম। মন্ত্রী হওয়ার আগে ফাইভ স্টার সেলুনে যেভাবে আসা-যাওয়া করতেন; মন্ত্রী হওয়ার পরেও সেভাবেই আসা-যাওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন। মাঝখানে করোনা এসে নিয়মে বিরিংতাল ঘটিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সেলুনে করোনার মরণকামড় বিষয়ে মহা সতর্কবাণী উচ্চারণের পর তিনি ফাইভ স্টারে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া করোনাকালে সরকারের বডির একজন সদস্য হয়ে তিনি যদি ‘নিষিদ্ধ জোন’ সেলুনে আসা-যাওয়া করেন, বিষয়টা বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে; এমন কী এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় গদিও হারাতে হতে পারে। গদি হারানোর ঘটনা অবশ্য খুবই বিরল। আগুনে-পানিতে সিদ্ধ হয় না-এমন ঘটনার জন্ম দিলেও এখানে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয় না। কাজেই, মন্ত্রিত্ব হারানো নিয়ে তার কোনো শঙ্কা ছিল না। তবে শঙ্কা ছিল বউ হারানো নিয়ে। সেলুনে যাওয়ার ক্ষেত্রে বউ কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছিল। বউয়ের কথা মান্য না করলে বিপদ। হাতে লোডা ধরিয়ে দেওয়ার পর সে বিচ্ছেদের দামামা বাজাতে শুরু করবে। মন্ত্রিত্ব খোয়া যাওয়া অবশ্যই সমস্যা; তবে বউহারা হলে আরও বেশি সমস্যা। যাকে বলে কূল-কিনারাহীন সমস্যা; তাই তিনি বাড়িতেই কোনোমতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেলুনে বসে শরীর-মাথা মালিশ করার যে সুখ, তা বাড়িতে পাওয়া সম্ভব নয়। আর তাই সুন্দর একটি পরিকল্পনা সাজালেন মন্ত্রী। এরপর বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বউকে বললেন-

: ঈদের আগে পয়-পরিষ্কার হওয়া দরকার। কী কও?

: তা তো দরকারই।

: এইজন্য আজ বিকালে সেলুনে যাওয়ার নিয়ত করছি।

মন্ত্রীর কথা শুনে বউ খাউমাউ করে উঠল। বলল-

: সেলুনে যাবা?

: হ।

: সেলুনে যাওয়া নিষেধ; ভুইলা গেছ?

: না, ভুলি নাই। আগে আমার কথা শোন।

: কী কথা?

: আমি যে সেলুনে যাব, সেইখানে মানুষের কোনো কারবার নাই। কাজকাম সব রোবটে করে। সেই রোবট শতভাগ জীবাণু ও করোনামুক্ত।

: তাই নাকি!

: আরে হ। নইলে কী আর করোনা জিন্দা থাকাকালে সেলুনের নাম মুখে উচ্চারণ করতাম?

বউ ম্যানেজ হওয়ার পর মন্ত্রী ফাইভ স্টার সেলুনে ফোন করলেন। প্রতিষ্ঠানটির একজন ম্যানেজার আছে। তার নাম ফটিকলাল। মন্ত্রীর কথা শুনে ফটিকলাল গদগদ হয়ে বলল-

: কতদিন আপনের পায়ের ধুলা পড়ে না স্যার! আপনের আগমনে আমরা ধন্য হইয়া যাব।

কিন্তু তার আগমন উপলক্ষে ফটিকলাল যে বেলুনে হাওয়া ভরে গেটমেট সাজিয়ে একাকার করবে, তা জানা ছিল না। আয়োজন দেখা শেষ করে অনুচ্চ স্বরে মন্ত্রী বললেন-

: ফটিক, দোকানের সাটার নামাইয়া দেও।

সাটার নামানোর কথা শুনে ফটিকলাল ইতস্তত গলায় বলল-

: স্যার! নিচে আপনের ফোর্স নাই?

: আরে! আমি তো প্রটোকল রক্ষা কইরা তোমার এখানে আসি নাই। ছদ্মবেশ ধারণ কইরা সঙ্গোপনে হাজির হইছি। কাজেই ফোর্স পাবা কই? তাছাড়া ফোর্স থাকলেই কী, আর না থাকলেই কী! আজকাল পুলিশ আর দারোগা নাই- ডিউটি ভুইলা সবাই ফেসবুক আর টিকটক লইয়া ব্যতিব্যস্ত থাকে। ফলে তাদেরকে ফাঁকি দিয়া যে কোনো ধরনের অঘটন ঘটানো কোনো ব্যাপার না।

সেলুনের সাটার বন্ধ করার পর ফটিকলাল বলল-

: স্যার! একটা কথা বলি?

: বল।

: এইখানে আপনের আসা বন্ধ হওয়ার পর কখন আপনারে দেখব-এই আশায় টেলিভিশনের পর্দা থেইকা চোখ সরাই না। সারাক্ষণ তাকাইয়া থাকি...

তরুণ নরসুন্দর কাজ শুরু করেছে। মন্ত্রী দুচোখ বন্ধ করে আরাম উপভোগ করছেন। ওই অবস্থায় ঠোঁট ফাঁক করে তিনি উচ্চারণ করলেন-

: বলতে থাক।

: যেদিন টেলিভিশনে আপনের টক শো থাকে, ওইদিন রাতে না ঘুমাইয়া আমরা সজাগ থাকি।

: তার মানে, তোমরা আমার অনুপস্থিতি ভালোই অনুভব করতেছিলা?

: হ স্যার।

: টেলিভিশনে মাঝেমধ্যে নিজের চেহারা দেখানো তাইলে খারাপ কিছু না? এতে তোমার মতো ভক্ত যারা আছে, তারা কিছুটা হালকা হওয়ার সুযোগ পায়। বুঝলা, আমার তো ইচ্ছা করে- পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়, বিলবোর্ড-ব্যানার-পোস্টার সবখানে সারা বছর ধইরা বিরাজ করি।

: স্যার! যাদের খুব নাম ফাটানির শখ, তারা সাধারণত এই ধরনের চিন্তা করে। আপনেও কি স্যার নামের কাঙাল?

ফটিকলালের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে মন্ত্রী বাহাদুর কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন। এরপর ভারি গলায় বললেন-

: কে নামের কাঙাল নয়, কও আমারে? এই যে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ কইরা গেছে, তুমি কি মনে কর-প্রেমের জন্য সে এইটা খাড়া করছে? প্রেমের জন্য শহিদ হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা থাকলে সে রাজসিংহাসনে বইসা না থাইকা মজনু হইয়া জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুইরা বেড়াইত। কিন্তু ওই মিয়া তো সেইটা করে নাই। সে জনগণের অর্থসম্পদের বারোটা বাজাইয়া তাজমহল নির্মাণ করেছে। এর কারণ কী? কারণ একটাই-তার নাম যাতে চারদিকে ছড়াইয়া পড়ে। মাঝেমধ্যে আমার কী ইচ্ছা হয়, জান?

: কী ইচ্ছা হয় স্যার!

: যদি প্রতিটা গাছের পাতায়-পাতায় নিজের নাম লেইখা দিতে পারতাম!

: কিন্তু এইটা তো সম্ভব না স্যার!

: হুঁ।

নরসুন্দর ক্ষৌরকর্ম শেষ করে শরীর দলাই-মলাইয়ের কাজ শুরু করল। মন্ত্রী তার ডান হাত নরসুন্দরের কাঁধে স্থাপন করতেই ফটিকলাল বলে উঠল-

: স্যার! আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসছে।

: কী আইডিয়া?

: এই করোনাকালে মানবিক সহায়তা প্রদানের নামে আপনে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেন।

: শুরু করলাম; তারপর?

: যারা ত্রাণ নিতে আসবে; তাদের মাথা বেল কইরা সেই বেলমাথায় আপনের ছবি ও নামযুক্ত ট্যাটু আঁইকা দিবেন। ব্যস, দেশের আনাচে-কানাচে শুধু আপনের নাম আর ছবি দেখা যাবে। পাশাপাশি আমাদেরও কিছুটা উপকার হবে।

: তোমাদের কী উপকার হবে?

: করোনার এই দুঃসময়ে অনেকেই সরকারি প্রণোদনা পাইছে; কিন্তু আমরা কিছুই পাই নাই। দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলা বিভিন্ন অফার ঘোষণার ক্ষেত্রে যে রকম স্টারচিহ্ন (*) দিয়া বইলা থাকে, শর্ত প্রযোজ্য; তেমনি আপনেও ত্রাণ পাওয়ার শর্ত হিসাবে ফাইভ স্টার সেলুনে মাথা ন্যাড়া করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করবেন। এতে আমরা কিছু টাকা-পয়সার মুখ দেখতে পারব।

: হুম। তুমি নিজের জন্য যে ধান্ধা ফিট করছ, সেইটা খারাপ না। তবে ত্রাণ পাওয়ার কথা শুইনা দলে দলে মানুষ আইসা যদি লাইনে দাঁড়ায়, তাইলে আমার অবস্থা ছেড়াবেড়া হইয়া যাবে।

: তাইলে স্যার, আপনে একটা জর্দার ফ্যাক্টরি দিয়া ফেলেন। ব্যবসার ব্যবসাও হবে; সেইসঙ্গে আপনের নাম ও ছবি সংবলিত জর্দার কৌটা সারা দেশের হাটে-বাজারে, দোকানে-দোকানে শোভা পাবে। আর পত্রিকায়-টেলিভিশনে সেই জর্দার বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করলে তো সেরের ওপরে সোয়াসের।

নরসুন্দর হাত মালিশ শেষ করে কাঁধে হাত রেখেছে। আরামে মন্ত্রীর দুচোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। তিনি অস্ফুট স্বরে ফটিকলালের উদ্দেশে বললেন-

: তোমার আইডিয়াটা খারাপ না ফটিক। দেখি, কী করা যায়...

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

কিছুমিছু

করোনাকালে চুল কাটতে মন্ত্রী গেলেন সেলুনে

 মোকাম্মেল হোসেন 
১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আশ্চর্যের পরেই অত্যাশ্চর্যের স্থান। মন্ত্রী বাহাদুরের মনে হলো, তিনি সেই অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। দুচোখ কপালে ওঠার আগেই রাইফেলের গুলির বেগে তার মুখ দিয়ে বের হলো-

: ওয়াও! অসাম্!

ফটিকলাল বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইল-

: স্যার! আয়োজন পছন্দ হইছে?

পছন্দ হয়েছে মানে? পছন্দ না হলে কারও মুখ দিয়ে ‘ওয়াও-অসাম্’ বের হয়? আয়োজন অবশ্যই পছন্দ হয়েছে। তবে এরা কিছু মিসটেক করে ফেলেছে। যেমন, বেলুন গেটের চান্দিতে লাগানো ব্যানারে লেখা হয়েছে- আজকের প্রধান আকর্ষণ...। এ জাতীয় কথাবার্তা অতীতে যাত্রাদলের নর্তকীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে দেখা যেত। যাত্রাদলের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ দর্শক টানতে ‘একঝাঁক ডানাকাটা পরীর’ ঝুমুর-ঝুমুর নাচ সম্পর্কিত প্রচারণায় মাইকে ঘোষণা দিত-আজকের প্রধান আকর্ষণ প্রিন্সেস জর্জিনা কিংবা রত্না অথবা কারিনা।

দ্বিতীয় ভুলটা এরা করেছে বানান নিয়ে। ফাইভ স্টার সেলুনের অসাধারণ একটি কর্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে ‘বঢি মেচাজ’। বানান ও ভাষারীতির ব্যাপারে মন্ত্রীর অবশ্য কোনো মাথাব্যথা নেই। এসব দেখার দায়িত্ব ভাষাতত্ত্ববিদ ও পণ্ডিত শ্রেণির লোকজনের। বিশ্বের একেক অঞ্চলের মানুষ একেকরকম উচ্চারণে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। বোবা শ্রেণির লোকেরা তো পেঁ-পোঁ ছাড়া আর কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারে না। আসল বিষয় হচ্ছে ভাব প্রকাশ। ভাবের ঘর পূর্ণ হলে বানান দেশের সড়ক-মহাসড়কের মতো এবড়ো-থেবড়ো হলেও কোনো সমস্যা নেই। অতএব, বানান বিষয়ক ভুলটাকে মধুর ভুল হিসাবে মার্জনা করা যায় এবং এর উসিলায় আগের ভুলটিকেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত। মন্ত্রী খোশমেজাজে গদিওয়ালা নরম চেয়ারে বসলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নরসুন্দরের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বললেন-

: কী মিয়া! করোনার মারাত্মক কঠিন পরিস্থিতিতে ঘোষণা দিয়া ক্ষুর-কেনচি হাতে লইলা! কাজটা কি সঠিক হইল?

মন্ত্রীর কথা শুনে তরুণ নরসুন্দর ফটিকলালের দিকে তাকাল। ফটিকলাল প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে করজোড়ে বলল-

: স্যার! আপনে দয়া করছেন, তাই...

ফটিকলালের হাবভাব ও মুখের ভাষায় প্রাচীন রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের প্রকাশ দেখে মন্ত্রী মুগ্ধ হলেন। ফটিকলাল কি তাকে রাজা-মহারাজাদের একজন ভাবতে শুরু করল! আগের দিনে রাজা-মহারাজরা চুল-দাড়ি কাটতে নাপিতের কাছে ধরনা দিতেন না; বরং নাপিতরাই তাদের ডেরায় নিয়মিত হাজিরা দিত। এ যুগেও অনেক মন্ত্রী-মিনিস্টার ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী প্রাচীন রীতিনীতির অনুসারী হয়ে বাড়িতে নাপিত তলব করেন। কিন্তু তিনি বরাবরই ব্যতিক্রম। মন্ত্রী হওয়ার আগে ফাইভ স্টার সেলুনে যেভাবে আসা-যাওয়া করতেন; মন্ত্রী হওয়ার পরেও সেভাবেই আসা-যাওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন। মাঝখানে করোনা এসে নিয়মে বিরিংতাল ঘটিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সেলুনে করোনার মরণকামড় বিষয়ে মহা সতর্কবাণী উচ্চারণের পর তিনি ফাইভ স্টারে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া করোনাকালে সরকারের বডির একজন সদস্য হয়ে তিনি যদি ‘নিষিদ্ধ জোন’ সেলুনে আসা-যাওয়া করেন, বিষয়টা বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে; এমন কী এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় গদিও হারাতে হতে পারে। গদি হারানোর ঘটনা অবশ্য খুবই বিরল। আগুনে-পানিতে সিদ্ধ হয় না-এমন ঘটনার জন্ম দিলেও এখানে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয় না। কাজেই, মন্ত্রিত্ব হারানো নিয়ে তার কোনো শঙ্কা ছিল না। তবে শঙ্কা ছিল বউ হারানো নিয়ে। সেলুনে যাওয়ার ক্ষেত্রে বউ কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছিল। বউয়ের কথা মান্য না করলে বিপদ। হাতে লোডা ধরিয়ে দেওয়ার পর সে বিচ্ছেদের দামামা বাজাতে শুরু করবে। মন্ত্রিত্ব খোয়া যাওয়া অবশ্যই সমস্যা; তবে বউহারা হলে আরও বেশি সমস্যা। যাকে বলে কূল-কিনারাহীন সমস্যা; তাই তিনি বাড়িতেই কোনোমতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেলুনে বসে শরীর-মাথা মালিশ করার যে সুখ, তা বাড়িতে পাওয়া সম্ভব নয়। আর তাই সুন্দর একটি পরিকল্পনা সাজালেন মন্ত্রী। এরপর বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বউকে বললেন-

: ঈদের আগে পয়-পরিষ্কার হওয়া দরকার। কী কও?

: তা তো দরকারই।

: এইজন্য আজ বিকালে সেলুনে যাওয়ার নিয়ত করছি।

মন্ত্রীর কথা শুনে বউ খাউমাউ করে উঠল। বলল-

: সেলুনে যাবা?

: হ।

: সেলুনে যাওয়া নিষেধ; ভুইলা গেছ?

: না, ভুলি নাই। আগে আমার কথা শোন।

: কী কথা?

: আমি যে সেলুনে যাব, সেইখানে মানুষের কোনো কারবার নাই। কাজকাম সব রোবটে করে। সেই রোবট শতভাগ জীবাণু ও করোনামুক্ত।

: তাই নাকি!

: আরে হ। নইলে কী আর করোনা জিন্দা থাকাকালে সেলুনের নাম মুখে উচ্চারণ করতাম?

বউ ম্যানেজ হওয়ার পর মন্ত্রী ফাইভ স্টার সেলুনে ফোন করলেন। প্রতিষ্ঠানটির একজন ম্যানেজার আছে। তার নাম ফটিকলাল। মন্ত্রীর কথা শুনে ফটিকলাল গদগদ হয়ে বলল-

: কতদিন আপনের পায়ের ধুলা পড়ে না স্যার! আপনের আগমনে আমরা ধন্য হইয়া যাব।

কিন্তু তার আগমন উপলক্ষে ফটিকলাল যে বেলুনে হাওয়া ভরে গেটমেট সাজিয়ে একাকার করবে, তা জানা ছিল না। আয়োজন দেখা শেষ করে অনুচ্চ স্বরে মন্ত্রী বললেন-

: ফটিক, দোকানের সাটার নামাইয়া দেও।

সাটার নামানোর কথা শুনে ফটিকলাল ইতস্তত গলায় বলল-

: স্যার! নিচে আপনের ফোর্স নাই?

: আরে! আমি তো প্রটোকল রক্ষা কইরা তোমার এখানে আসি নাই। ছদ্মবেশ ধারণ কইরা সঙ্গোপনে হাজির হইছি। কাজেই ফোর্স পাবা কই? তাছাড়া ফোর্স থাকলেই কী, আর না থাকলেই কী! আজকাল পুলিশ আর দারোগা নাই- ডিউটি ভুইলা সবাই ফেসবুক আর টিকটক লইয়া ব্যতিব্যস্ত থাকে। ফলে তাদেরকে ফাঁকি দিয়া যে কোনো ধরনের অঘটন ঘটানো কোনো ব্যাপার না।

সেলুনের সাটার বন্ধ করার পর ফটিকলাল বলল-

: স্যার! একটা কথা বলি?

: বল।

: এইখানে আপনের আসা বন্ধ হওয়ার পর কখন আপনারে দেখব-এই আশায় টেলিভিশনের পর্দা থেইকা চোখ সরাই না। সারাক্ষণ তাকাইয়া থাকি...

তরুণ নরসুন্দর কাজ শুরু করেছে। মন্ত্রী দুচোখ বন্ধ করে আরাম উপভোগ করছেন। ওই অবস্থায় ঠোঁট ফাঁক করে তিনি উচ্চারণ করলেন-

: বলতে থাক।

: যেদিন টেলিভিশনে আপনের টক শো থাকে, ওইদিন রাতে না ঘুমাইয়া আমরা সজাগ থাকি।

: তার মানে, তোমরা আমার অনুপস্থিতি ভালোই অনুভব করতেছিলা?

: হ স্যার।

: টেলিভিশনে মাঝেমধ্যে নিজের চেহারা দেখানো তাইলে খারাপ কিছু না? এতে তোমার মতো ভক্ত যারা আছে, তারা কিছুটা হালকা হওয়ার সুযোগ পায়। বুঝলা, আমার তো ইচ্ছা করে- পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়, বিলবোর্ড-ব্যানার-পোস্টার সবখানে সারা বছর ধইরা বিরাজ করি।

: স্যার! যাদের খুব নাম ফাটানির শখ, তারা সাধারণত এই ধরনের চিন্তা করে। আপনেও কি স্যার নামের কাঙাল?

ফটিকলালের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে মন্ত্রী বাহাদুর কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন। এরপর ভারি গলায় বললেন-

: কে নামের কাঙাল নয়, কও আমারে? এই যে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ কইরা গেছে, তুমি কি মনে কর-প্রেমের জন্য সে এইটা খাড়া করছে? প্রেমের জন্য শহিদ হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা থাকলে সে রাজসিংহাসনে বইসা না থাইকা মজনু হইয়া জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুইরা বেড়াইত। কিন্তু ওই মিয়া তো সেইটা করে নাই। সে জনগণের অর্থসম্পদের বারোটা বাজাইয়া তাজমহল নির্মাণ করেছে। এর কারণ কী? কারণ একটাই-তার নাম যাতে চারদিকে ছড়াইয়া পড়ে। মাঝেমধ্যে আমার কী ইচ্ছা হয়, জান?

: কী ইচ্ছা হয় স্যার!

: যদি প্রতিটা গাছের পাতায়-পাতায় নিজের নাম লেইখা দিতে পারতাম!

: কিন্তু এইটা তো সম্ভব না স্যার!

: হুঁ।

নরসুন্দর ক্ষৌরকর্ম শেষ করে শরীর দলাই-মলাইয়ের কাজ শুরু করল। মন্ত্রী তার ডান হাত নরসুন্দরের কাঁধে স্থাপন করতেই ফটিকলাল বলে উঠল-

: স্যার! আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসছে।

: কী আইডিয়া?

: এই করোনাকালে মানবিক সহায়তা প্রদানের নামে আপনে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেন।

: শুরু করলাম; তারপর?

: যারা ত্রাণ নিতে আসবে; তাদের মাথা বেল কইরা সেই বেলমাথায় আপনের ছবি ও নামযুক্ত ট্যাটু আঁইকা দিবেন। ব্যস, দেশের আনাচে-কানাচে শুধু আপনের নাম আর ছবি দেখা যাবে। পাশাপাশি আমাদেরও কিছুটা উপকার হবে।

: তোমাদের কী উপকার হবে?

: করোনার এই দুঃসময়ে অনেকেই সরকারি প্রণোদনা পাইছে; কিন্তু আমরা কিছুই পাই নাই। দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলা বিভিন্ন অফার ঘোষণার ক্ষেত্রে যে রকম স্টারচিহ্ন (*) দিয়া বইলা থাকে, শর্ত প্রযোজ্য; তেমনি আপনেও ত্রাণ পাওয়ার শর্ত হিসাবে ফাইভ স্টার সেলুনে মাথা ন্যাড়া করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করবেন। এতে আমরা কিছু টাকা-পয়সার মুখ দেখতে পারব।

: হুম। তুমি নিজের জন্য যে ধান্ধা ফিট করছ, সেইটা খারাপ না। তবে ত্রাণ পাওয়ার কথা শুইনা দলে দলে মানুষ আইসা যদি লাইনে দাঁড়ায়, তাইলে আমার অবস্থা ছেড়াবেড়া হইয়া যাবে।

: তাইলে স্যার, আপনে একটা জর্দার ফ্যাক্টরি দিয়া ফেলেন। ব্যবসার ব্যবসাও হবে; সেইসঙ্গে আপনের নাম ও ছবি সংবলিত জর্দার কৌটা সারা দেশের হাটে-বাজারে, দোকানে-দোকানে শোভা পাবে। আর পত্রিকায়-টেলিভিশনে সেই জর্দার বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করলে তো সেরের ওপরে সোয়াসের।

নরসুন্দর হাত মালিশ শেষ করে কাঁধে হাত রেখেছে। আরামে মন্ত্রীর দুচোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। তিনি অস্ফুট স্বরে ফটিকলালের উদ্দেশে বললেন-

: তোমার আইডিয়াটা খারাপ না ফটিক। দেখি, কী করা যায়...

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন