করোনা ও অবনতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি
jugantor
তৃতীয় মত
করোনা ও অবনতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালি মুসলমানদের জীবনে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে কুরবানির ঈদ একটি। সামনে সেই ঈদ। সেই সঙ্গে কোভিড-১৯-এর তৃতীয় ধাক্কাও ধেয়ে আসছে। ইউরোপের যে দেশগুলো প্রায় করোনামুক্ত হয়েছিল, সেসব দেশে আবার বিপদের ঘণ্টা বেজেছে। বাংলাদেশে এমনিতেই ঘরে ঘরে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় তৃতীয় ধাক্কা আর কী সর্বনাশ ঘটায় তা আমরা জানি না।

এই পরিস্থিতিতে কুরবানির ঈদ এসেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে বলা যাবে না আপনারা এবার কঠোর সংযমের সঙ্গে এই ঈদ পালন করুন। গরু কেনার হাটগুলোতে বেশি ভিড় না করাই ভালো। একটি সান্তনার কথা এবার অনলাইনেই অনেকে গরু কিনছেন। ফলে গরুর হাট থেকে আরও রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা একটু কমেছে। সরকার তবু বিপাকে। যদি ঈদে লকডাউন শিথিল না করে, তাহলে কেউ তা মানবে না।

ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখেই তা বোঝা যায়। আমাদের জনসমাজ শিক্ষিত নয়। তাই করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে তাদের মধ্যে আগ্রহ কম, কুসংস্কার বেশি। তবু হাসিনা সরকার যা করছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তা কম প্রশংসার নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন বিরোধী দল। তাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুল যেহেতু বিরোধী দলে আছেন, তখন দেশ ও দশের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন না করে জনগণকে হাওয়াই হালুয়া খাওয়াচ্ছেন।

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, জনগণকে গৃহে বন্দি করে রাখার চাইতে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। তিনি সরকারকে এই উপদেশ দিয়েছেন। বাংলায় একটা কথা আছে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে। সরকারকে অবশ্যই অভাবী মানুষের খাদ্যের সংস্থান করতে হবে। তাই বলে বিরোধী দলের কি কোনো কর্তব্য নেই? ’৫০-এর দুর্ভিক্ষের সময় বিদেশি সরকারই শুধু অনাহারী মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খোলেনি, ব্রিটিশবিরোধী সব দল- কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও নিজ নিজ লঙ্গরখানা খুলেছিল।

এবার বাংলাদেশে করোনার শুরুতেই শেখ হাসিনা অভাবী মানুষের ঘরে ঘরে ‘ফুড প্যাকেজ’ পাঠিয়েছিলেন। এখনো সরকার তাদের ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও জনসাধারণের জন্য যথেষ্ট করে যাচ্ছে। বিএনপি এসময় অভাবী মানুষের সাহায্যের জন্য ত্রাণ সংস্থা খুলতে পারে, অভাবী মানুষের ঘরে ‘ফুড প্যাকেজ’ পাঠাতে পারে। বিএনপিতে নব্য বড়লোকের অভাব নেই।

তারেক রহমানের যে সম্পদ তার চারআনা খরচ করলেও বাংলাদেশের বহু অভাবী মানুষ বেঁচে যাবে। মির্জা ফখরুল সেই উদ্যোগ না নিয়ে, তাদের হাজার দুয়ারি বড়লোকদের দুস্থদের ত্রাণে এগিয়ে আসার ডাক না দিয়ে, কেবল সরকারকে উপদেশ দিচ্ছেন। এটাকে বলে ‘বকধার্মিকতা’। এটাই বিএনপির রাজনীতি।

বিশ্ব পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। করোনার সঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপে বাড়ছে বর্ণবাদ, বাড়ছে নারী নির্যাতন, সবচাইতে বড় বিপদ লকডাউনে থাকার ফলে সব দেশেই মানুষের মধ্যে হতাশা ও মানসিক রোগের বিস্তার ঘটছে। কোনো কোনো দেশে, সম্ভবত বাংলাদেশেও টিকার অভাবে দুই ধরনের টিকা মানুষকে দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, মিশ্র টিকা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রকৃতির কাছে আমরা যে কত অসহায়, তার প্রমাণ বিশ্বের দুটি উন্নত দেশ জার্মানি এবং বেলজিয়ামে একদিনের বন্যায় দেড়শ নর-নারীর মৃত্যু হয়েছে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা? এই উন্নত দেশে আকস্মিক বন্যাদুর্গতদের ত্রাণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না!

এই ঘটনাটি বাংলাদেশে ঘটলে মির্জা ফখরুলরা এতদিনে ত্রাহি চিৎকার শুরু করতেন। আর ড. কামাল হোসেন তার ধ্যানের গুহা থেকে বেরিয়ে এসে বলতেন, সরকার বন্যা থেকে মানুষকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই করোনার বিভীষিকার মধ্যেও হাইতির প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে। মহাকাশ থেকে ঘুরে এলেন বিলিওনিয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন।

এত মৃত্যু চারদিকে, তবু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি শেষ হয়নি। আরেকটি বড় দুর্নীতির খবর সংবাদপত্রে বেরিয়েছে। রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ছোট্ট একটি টিউবের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দুই হাজার টাকা। এই হিসাবে পঞ্চাশটি টিউব কিনতে এক লাখ টাকা লাগে। কিন্তু সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তা কিনেছে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।

অর্থাৎ প্রতিটি টিউবের পেছনে প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বাজারে এই টিউব পাওয়া যায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। মেডিকেল সরঞ্জাম কেনার এই দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিট আপত্তিতে। শুধু তাই নয়, বাজারে যে ডিসেক্টিং টেবিল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ধরনের দুটি টেবিল কিনেছে ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায়।

এটা গেল দুর্নীতির ব্যাপ্তির কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশের তরুণদের সংগঠন আঁচলের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪,৪৩৬ জন নারী-পুরুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডক্টর মাহফুজা খানম বলেছেন, করোনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই আজ নিঃস্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্রসমাজের মনে হতাশা। তিনি আরও বলেছেন, মানুষকে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারকে আরও সাহায্য বাড়াতে হবে। প্রশ্নটা আসে এখানেই। করোনা যেভাবে বাড়ছে, তার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক ক্ষমতাও কমছে। বাজেটের অতিরিক্ত শুধু নয়, তারও বাইরে ব্যাপক ত্রাণ কর্মসূচি চালাতে গিয়ে সরকারের তহবিলেও চাপ বাড়ছে প্রচুর। এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, উন্নত-অনুন্নত সব দেশের জন্যই সত্য।

ইন্দোনেশিয়ায় এবার করোনার ভয়াবহ সংক্রমণে লাশ দাফন দেওয়ার লোক নেই। সরকার এবার ঈদ উদযাপন ও গরু কুরবানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এত যে ভয়াবহ মৃত্যুযজ্ঞ, তাতেও পৃথিবীতে অপরাধ কমছে না। ব্রিটেনে নাইফ ক্রাইম বেড়েছে। ভারতে অভিনব কায়দায় নারী ব্যবসা চলছে। তাতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মুসলিম নারীরা। কানাডায় বর্ণবিদ্বেষ বেড়েছে। আফগানিস্তানের তালেবানরা আবার ক্ষমতায় আসছে আমেরিকার মদদে। তারা চীনেরও মদদ চায়। এজন্য তারা চীনকে প্রলোভন দেখাচ্ছে যে, চীনের মুসলমানদের সরকারবিরোধী কাজে তারা সাহায্য জোগাবে না।

অর্থাৎ উইঘুরদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে এতদিন আফগান তালেবানরা সাহায্য জুগিয়ে আসছিল, এখন তা আর দেবে না। চীন এই প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। আফগানিস্তানে যদি তালেবানরা ঘাঁটি গাড়ে, তাহলে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে না। উগ্র-মৌলবাদীদের আস্ফালন বেড়ে যাবেই দুই দেশে।

কথায় বলে বিপদ একাকী আসে না। বর্তমান বিশ্বে তা প্রমাণিত হয়েছে। করোনা বাড়ছে সর্বত্র। প্রকৃতি সেখানেই ক্ষান্ত নেই। তার হামলা চলছে নানাভাবে। বাংলাদেশের রূপগঞ্জে হয়েছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আত্মীয়রা এখনো অপেক্ষা করছে লাশের জন্য। ভারতে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে ৬৮ জন। আমেরিকার অঞ্চল বিশেষে তাপমাত্রা রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবং বনাঞ্চলে তীব্র দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য আরও দুঃসংবাদ, দেশের সবাইকে টিকা দিতে ২০২৪ সাল পেরিয়ে যাবে।

এই ঘন জনবহুল দেশে টিকাদানের এই দীর্ঘ মেয়াদ আরও কত সর্বনাশ ঘটায় তা ভাবা যায় না। সারা বিশ্বের এই পরিস্থিতি বিজ্ঞানীদের এবং মানবতাবাদীদের ভাবিয়ে তুলছে। এটাকে তারা মানবতা ও প্রকৃতির মধ্যে যুদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন। অতীতে এরকম মহামারি এসেছে। তবে এত ব্যাপকভাবে নয়। প্রকৃতি এবার তার ধ্বংসের বাহু অনেক ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। যুদ্ধে যদি মানবতাবাদীরা জেতেন, তাহলেও মানবসভ্যতার চেহারা বদলে যাবে।

সামাজিক দূরত্বের ফলে হ্যান্ডশেক করা, কোলাকুলি করা অর্থাৎ মানুষের যে মানবিক আবেদন, তা যদি বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে আরেক ধরনের মানবসভ্যতা তৈরি হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর এবং যুদ্ধ মানুষের ভাষাতেও বিরাট রূপান্তর ঘটায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লঙ্গরখানা, জঙ্গিবিমান, আকাশযুদ্ধ, সাইরেন, ট্যাংক, ট্রেনস, রেশন, ব্ল্যাকআউট ইত্যাদি নানা শব্দ আমাদের ভাষায় পেয়েছি। ভাষার প্রকরণও বদলে গেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে আমরা হাইজ্যাকসহ বহু শব্দ ভাষায় পেয়েছি, যা গ্রামের লোকরাও বোঝে এবং ব্যবহার করে। এবার করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব, লকডাউনসহ অন্তত ১২/১৪টি শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে। ভাষার ব্যবহারবিধিও বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কত বদলাবে কে জানে। সম্প্রতি হেলসিঙ্কিতে বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা রাজনীতিকদের নিন্দা করেছেন, বলেছেন, পৃথিবী আজ এক ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন। এ সময় সব দেশের রাজনীতিকদের দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করে একটি মঞ্চে এসে সমবেত হওয়া উচিত। এবং মানবসভ্যতাকে কী করে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে আলোচনায় বসা উচিত।

এদিক থেকে বিজ্ঞানীরা অনেক ভালো মনের পরিচয় দিয়েছেন। আমেরিকার বিজ্ঞানী চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি এবং তা কী করে ঠেকানো যায় তা নিয়ে যুক্ত গবেষণা করছেন। এই গবেষণায় সোভিয়েত ইউনিয়নও পিছিয়ে নেই। ভারতের বিজ্ঞানীরা চীনের বিজ্ঞানীদের দিকে সহযোগিতায় হাত বাড়িয়েছেন। কিন্তু রাজনীতিকরা কোনো দেশেই পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারেননি। এক মঞ্চে বসে পৃথিবীর মানুষকে প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানাতে পারেননি।

রাজনীতিকরা এখনো দলাদলিতে ব্যস্ত। পল রবসনের মতো সেই সংগীতশিল্পী কোথায়? যিনি মানবতার এই বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। নেই হুইটম্যান অথবা নজরুলের মতো কবি। যারা মানবতার এই বিপদে এসে তাদের সাহস জোগাতে পারেন। আজ রাজনীতিকদের ভেতরেও দরকার ছিল আর একজন গান্ধী কিংবা আব্রাহাম লিংকন কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান। যারা হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত জনগণের মনে সাহস ও আশার বাণী জাগিয়ে তুলতে পারেন। ভারতে তবু অমর্ত্য সেন আছেন। আমরা নোবেল প্রাইজ পেয়েছি, কিন্তু সেই নোবলম্যান (মহৎ) পাইনি।

করোনা সম্পর্কে ১০০০ বিশেষজ্ঞ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ব্রিটেনে উনিশে জুলাই থেকে লকডাউন তুলে নেওয়ার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হলে ব্রিটেনের সর্বনাশ হবে। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্রিটেনে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিপুল হারে বাড়তে শুরু করেছে। আফ্রিকার খবর আমরা তো কেউ নেই না। সেখানে টিকাদান পরিস্থিতি খারাপ, বহির্বিশ্বে তাদের খবরা-খবর ভালোভাবে জানা যায় না।

আমার ধারণা, মানবতা শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, কিন্তু এবারের প্রকৃতির ধাক্কা পৃথিবীর এক বৃহদংশ অধিবাসীকে অপসারণ করবে। করোনা যাবে না। তবে প্রতিষেধক নিতে হবে। এক নতুন মানবসমাজ এবং মানবসভ্যতা তৈরি হবে। তার চেহারা কী হবে তা আমরা জানি না। ১০০ বছর আগেও কি আমরা জানতাম, পৃথিবীতে অ্যাটম বোমা তৈরি হবে, স্পুটনিক তৈরি হবে, ইন্টারনেট তৈরি হবে?

লন্ডন থেকে বাংলাদেশের গ্রামে মিনিটের মধ্যে কথা বলা যাবে! করোনা দেখা দিল দেড় বছর হয়। এত দ্রুত তার ভ্যাকসিন বেরোবে! এই মৃত্যুযজ্ঞের ভেতরেও মানুষের রসিকতা থামেনি। পশ্চিমা বিলিওনিয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন মহাকাশে ঘুরে এলেন। ১ ঘণ্টা তিনি মহাকাশে ছিলেন। তখন অন্য এক গ্রহের আরেক মহাকাশযাত্রীর সঙ্গে তার দেখা। দুজনই দুজনকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন। কিন্তু কী ভাষায় কথা বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হঠাৎ ব্র্যানসন বললেন করোনা। অমনি অন্য মহাকাশযাত্রী চিৎকার করে উঠলেন করোনা করোনা। ব্র্যানসনের মনে হলো, মহাকাশেও সম্ভবত করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। দুজনেই দুজনকে আবারও হাত তুলে অভিবাদন জানালেন এবং বললেন করোনা। তারপর মহাকাশের দুই দিকে সরে গেলেন।

পাঠক, এটা নেহাত পশ্চিমা কাগজের রসিকতা। আমার মনে হয়েছে এটা রসিকতা নয়, বাস্তব।

লন্ডন, ১৮ জুলাই, রোববার, ২০২১

তৃতীয় মত

করোনা ও অবনতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
১৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালি মুসলমানদের জীবনে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে কুরবানির ঈদ একটি। সামনে সেই ঈদ। সেই সঙ্গে কোভিড-১৯-এর তৃতীয় ধাক্কাও ধেয়ে আসছে। ইউরোপের যে দেশগুলো প্রায় করোনামুক্ত হয়েছিল, সেসব দেশে আবার বিপদের ঘণ্টা বেজেছে। বাংলাদেশে এমনিতেই ঘরে ঘরে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় তৃতীয় ধাক্কা আর কী সর্বনাশ ঘটায় তা আমরা জানি না।

এই পরিস্থিতিতে কুরবানির ঈদ এসেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে বলা যাবে না আপনারা এবার কঠোর সংযমের সঙ্গে এই ঈদ পালন করুন। গরু কেনার হাটগুলোতে বেশি ভিড় না করাই ভালো। একটি সান্তনার কথা এবার অনলাইনেই অনেকে গরু কিনছেন। ফলে গরুর হাট থেকে আরও রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা একটু কমেছে। সরকার তবু বিপাকে। যদি ঈদে লকডাউন শিথিল না করে, তাহলে কেউ তা মানবে না।

ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখেই তা বোঝা যায়। আমাদের জনসমাজ শিক্ষিত নয়। তাই করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে তাদের মধ্যে আগ্রহ কম, কুসংস্কার বেশি। তবু হাসিনা সরকার যা করছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তা কম প্রশংসার নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন বিরোধী দল। তাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুল যেহেতু বিরোধী দলে আছেন, তখন দেশ ও দশের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন না করে জনগণকে হাওয়াই হালুয়া খাওয়াচ্ছেন।

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, জনগণকে গৃহে বন্দি করে রাখার চাইতে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। তিনি সরকারকে এই উপদেশ দিয়েছেন। বাংলায় একটা কথা আছে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে। সরকারকে অবশ্যই অভাবী মানুষের খাদ্যের সংস্থান করতে হবে। তাই বলে বিরোধী দলের কি কোনো কর্তব্য নেই? ’৫০-এর দুর্ভিক্ষের সময় বিদেশি সরকারই শুধু অনাহারী মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খোলেনি, ব্রিটিশবিরোধী সব দল- কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও নিজ নিজ লঙ্গরখানা খুলেছিল।

এবার বাংলাদেশে করোনার শুরুতেই শেখ হাসিনা অভাবী মানুষের ঘরে ঘরে ‘ফুড প্যাকেজ’ পাঠিয়েছিলেন। এখনো সরকার তাদের ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও জনসাধারণের জন্য যথেষ্ট করে যাচ্ছে। বিএনপি এসময় অভাবী মানুষের সাহায্যের জন্য ত্রাণ সংস্থা খুলতে পারে, অভাবী মানুষের ঘরে ‘ফুড প্যাকেজ’ পাঠাতে পারে। বিএনপিতে নব্য বড়লোকের অভাব নেই।

তারেক রহমানের যে সম্পদ তার চারআনা খরচ করলেও বাংলাদেশের বহু অভাবী মানুষ বেঁচে যাবে। মির্জা ফখরুল সেই উদ্যোগ না নিয়ে, তাদের হাজার দুয়ারি বড়লোকদের দুস্থদের ত্রাণে এগিয়ে আসার ডাক না দিয়ে, কেবল সরকারকে উপদেশ দিচ্ছেন। এটাকে বলে ‘বকধার্মিকতা’। এটাই বিএনপির রাজনীতি।

বিশ্ব পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। করোনার সঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপে বাড়ছে বর্ণবাদ, বাড়ছে নারী নির্যাতন, সবচাইতে বড় বিপদ লকডাউনে থাকার ফলে সব দেশেই মানুষের মধ্যে হতাশা ও মানসিক রোগের বিস্তার ঘটছে। কোনো কোনো দেশে, সম্ভবত বাংলাদেশেও টিকার অভাবে দুই ধরনের টিকা মানুষকে দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, মিশ্র টিকা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রকৃতির কাছে আমরা যে কত অসহায়, তার প্রমাণ বিশ্বের দুটি উন্নত দেশ জার্মানি এবং বেলজিয়ামে একদিনের বন্যায় দেড়শ নর-নারীর মৃত্যু হয়েছে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা? এই উন্নত দেশে আকস্মিক বন্যাদুর্গতদের ত্রাণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না!

এই ঘটনাটি বাংলাদেশে ঘটলে মির্জা ফখরুলরা এতদিনে ত্রাহি চিৎকার শুরু করতেন। আর ড. কামাল হোসেন তার ধ্যানের গুহা থেকে বেরিয়ে এসে বলতেন, সরকার বন্যা থেকে মানুষকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই করোনার বিভীষিকার মধ্যেও হাইতির প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে। মহাকাশ থেকে ঘুরে এলেন বিলিওনিয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন।

এত মৃত্যু চারদিকে, তবু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি শেষ হয়নি। আরেকটি বড় দুর্নীতির খবর সংবাদপত্রে বেরিয়েছে। রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ছোট্ট একটি টিউবের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দুই হাজার টাকা। এই হিসাবে পঞ্চাশটি টিউব কিনতে এক লাখ টাকা লাগে। কিন্তু সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তা কিনেছে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।

অর্থাৎ প্রতিটি টিউবের পেছনে প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বাজারে এই টিউব পাওয়া যায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। মেডিকেল সরঞ্জাম কেনার এই দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিট আপত্তিতে। শুধু তাই নয়, বাজারে যে ডিসেক্টিং টেবিল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ধরনের দুটি টেবিল কিনেছে ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায়।

এটা গেল দুর্নীতির ব্যাপ্তির কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশের তরুণদের সংগঠন আঁচলের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪,৪৩৬ জন নারী-পুরুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডক্টর মাহফুজা খানম বলেছেন, করোনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই আজ নিঃস্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্রসমাজের মনে হতাশা। তিনি আরও বলেছেন, মানুষকে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারকে আরও সাহায্য বাড়াতে হবে। প্রশ্নটা আসে এখানেই। করোনা যেভাবে বাড়ছে, তার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক ক্ষমতাও কমছে। বাজেটের অতিরিক্ত শুধু নয়, তারও বাইরে ব্যাপক ত্রাণ কর্মসূচি চালাতে গিয়ে সরকারের তহবিলেও চাপ বাড়ছে প্রচুর। এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, উন্নত-অনুন্নত সব দেশের জন্যই সত্য।

ইন্দোনেশিয়ায় এবার করোনার ভয়াবহ সংক্রমণে লাশ দাফন দেওয়ার লোক নেই। সরকার এবার ঈদ উদযাপন ও গরু কুরবানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এত যে ভয়াবহ মৃত্যুযজ্ঞ, তাতেও পৃথিবীতে অপরাধ কমছে না। ব্রিটেনে নাইফ ক্রাইম বেড়েছে। ভারতে অভিনব কায়দায় নারী ব্যবসা চলছে। তাতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মুসলিম নারীরা। কানাডায় বর্ণবিদ্বেষ বেড়েছে। আফগানিস্তানের তালেবানরা আবার ক্ষমতায় আসছে আমেরিকার মদদে। তারা চীনেরও মদদ চায়। এজন্য তারা চীনকে প্রলোভন দেখাচ্ছে যে, চীনের মুসলমানদের সরকারবিরোধী কাজে তারা সাহায্য জোগাবে না।

অর্থাৎ উইঘুরদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে এতদিন আফগান তালেবানরা সাহায্য জুগিয়ে আসছিল, এখন তা আর দেবে না। চীন এই প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। আফগানিস্তানে যদি তালেবানরা ঘাঁটি গাড়ে, তাহলে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে না। উগ্র-মৌলবাদীদের আস্ফালন বেড়ে যাবেই দুই দেশে।

কথায় বলে বিপদ একাকী আসে না। বর্তমান বিশ্বে তা প্রমাণিত হয়েছে। করোনা বাড়ছে সর্বত্র। প্রকৃতি সেখানেই ক্ষান্ত নেই। তার হামলা চলছে নানাভাবে। বাংলাদেশের রূপগঞ্জে হয়েছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আত্মীয়রা এখনো অপেক্ষা করছে লাশের জন্য। ভারতে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে ৬৮ জন। আমেরিকার অঞ্চল বিশেষে তাপমাত্রা রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবং বনাঞ্চলে তীব্র দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য আরও দুঃসংবাদ, দেশের সবাইকে টিকা দিতে ২০২৪ সাল পেরিয়ে যাবে।

এই ঘন জনবহুল দেশে টিকাদানের এই দীর্ঘ মেয়াদ আরও কত সর্বনাশ ঘটায় তা ভাবা যায় না। সারা বিশ্বের এই পরিস্থিতি বিজ্ঞানীদের এবং মানবতাবাদীদের ভাবিয়ে তুলছে। এটাকে তারা মানবতা ও প্রকৃতির মধ্যে যুদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন। অতীতে এরকম মহামারি এসেছে। তবে এত ব্যাপকভাবে নয়। প্রকৃতি এবার তার ধ্বংসের বাহু অনেক ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। যুদ্ধে যদি মানবতাবাদীরা জেতেন, তাহলেও মানবসভ্যতার চেহারা বদলে যাবে।

সামাজিক দূরত্বের ফলে হ্যান্ডশেক করা, কোলাকুলি করা অর্থাৎ মানুষের যে মানবিক আবেদন, তা যদি বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে আরেক ধরনের মানবসভ্যতা তৈরি হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর এবং যুদ্ধ মানুষের ভাষাতেও বিরাট রূপান্তর ঘটায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লঙ্গরখানা, জঙ্গিবিমান, আকাশযুদ্ধ, সাইরেন, ট্যাংক, ট্রেনস, রেশন, ব্ল্যাকআউট ইত্যাদি নানা শব্দ আমাদের ভাষায় পেয়েছি। ভাষার প্রকরণও বদলে গেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে আমরা হাইজ্যাকসহ বহু শব্দ ভাষায় পেয়েছি, যা গ্রামের লোকরাও বোঝে এবং ব্যবহার করে। এবার করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব, লকডাউনসহ অন্তত ১২/১৪টি শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে। ভাষার ব্যবহারবিধিও বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কত বদলাবে কে জানে। সম্প্রতি হেলসিঙ্কিতে বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা রাজনীতিকদের নিন্দা করেছেন, বলেছেন, পৃথিবী আজ এক ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন। এ সময় সব দেশের রাজনীতিকদের দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করে একটি মঞ্চে এসে সমবেত হওয়া উচিত। এবং মানবসভ্যতাকে কী করে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে আলোচনায় বসা উচিত।

এদিক থেকে বিজ্ঞানীরা অনেক ভালো মনের পরিচয় দিয়েছেন। আমেরিকার বিজ্ঞানী চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি এবং তা কী করে ঠেকানো যায় তা নিয়ে যুক্ত গবেষণা করছেন। এই গবেষণায় সোভিয়েত ইউনিয়নও পিছিয়ে নেই। ভারতের বিজ্ঞানীরা চীনের বিজ্ঞানীদের দিকে সহযোগিতায় হাত বাড়িয়েছেন। কিন্তু রাজনীতিকরা কোনো দেশেই পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারেননি। এক মঞ্চে বসে পৃথিবীর মানুষকে প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানাতে পারেননি।

রাজনীতিকরা এখনো দলাদলিতে ব্যস্ত। পল রবসনের মতো সেই সংগীতশিল্পী কোথায়? যিনি মানবতার এই বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। নেই হুইটম্যান অথবা নজরুলের মতো কবি। যারা মানবতার এই বিপদে এসে তাদের সাহস জোগাতে পারেন। আজ রাজনীতিকদের ভেতরেও দরকার ছিল আর একজন গান্ধী কিংবা আব্রাহাম লিংকন কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান। যারা হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত জনগণের মনে সাহস ও আশার বাণী জাগিয়ে তুলতে পারেন। ভারতে তবু অমর্ত্য সেন আছেন। আমরা নোবেল প্রাইজ পেয়েছি, কিন্তু সেই নোবলম্যান (মহৎ) পাইনি।

করোনা সম্পর্কে ১০০০ বিশেষজ্ঞ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ব্রিটেনে উনিশে জুলাই থেকে লকডাউন তুলে নেওয়ার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হলে ব্রিটেনের সর্বনাশ হবে। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্রিটেনে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিপুল হারে বাড়তে শুরু করেছে। আফ্রিকার খবর আমরা তো কেউ নেই না। সেখানে টিকাদান পরিস্থিতি খারাপ, বহির্বিশ্বে তাদের খবরা-খবর ভালোভাবে জানা যায় না।

আমার ধারণা, মানবতা শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, কিন্তু এবারের প্রকৃতির ধাক্কা পৃথিবীর এক বৃহদংশ অধিবাসীকে অপসারণ করবে। করোনা যাবে না। তবে প্রতিষেধক নিতে হবে। এক নতুন মানবসমাজ এবং মানবসভ্যতা তৈরি হবে। তার চেহারা কী হবে তা আমরা জানি না। ১০০ বছর আগেও কি আমরা জানতাম, পৃথিবীতে অ্যাটম বোমা তৈরি হবে, স্পুটনিক তৈরি হবে, ইন্টারনেট তৈরি হবে?

লন্ডন থেকে বাংলাদেশের গ্রামে মিনিটের মধ্যে কথা বলা যাবে! করোনা দেখা দিল দেড় বছর হয়। এত দ্রুত তার ভ্যাকসিন বেরোবে! এই মৃত্যুযজ্ঞের ভেতরেও মানুষের রসিকতা থামেনি। পশ্চিমা বিলিওনিয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন মহাকাশে ঘুরে এলেন। ১ ঘণ্টা তিনি মহাকাশে ছিলেন। তখন অন্য এক গ্রহের আরেক মহাকাশযাত্রীর সঙ্গে তার দেখা। দুজনই দুজনকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন। কিন্তু কী ভাষায় কথা বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হঠাৎ ব্র্যানসন বললেন করোনা। অমনি অন্য মহাকাশযাত্রী চিৎকার করে উঠলেন করোনা করোনা। ব্র্যানসনের মনে হলো, মহাকাশেও সম্ভবত করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। দুজনেই দুজনকে আবারও হাত তুলে অভিবাদন জানালেন এবং বললেন করোনা। তারপর মহাকাশের দুই দিকে সরে গেলেন।

পাঠক, এটা নেহাত পশ্চিমা কাগজের রসিকতা। আমার মনে হয়েছে এটা রসিকতা নয়, বাস্তব।

লন্ডন, ১৮ জুলাই, রোববার, ২০২১

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন