এ অভিজ্ঞতা সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে
jugantor
এ অভিজ্ঞতা সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে

  ড. আহমেদ সুমন  

১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি আমাদের সবকিছুকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ মহামারিতে পৃথিবীর প্রায় সব ক্ষেত্রই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্র অন্যতম। আবার এটাও সত্য যে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হয়। সারা জীবন যে শিক্ষকরা প্রচলিত টিচিং-লার্নিংয়ে অভ্যস্ত, তারা সবাই অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়া, ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন করার পদ্ধতি রপ্ত করেছেন।

এটি শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন না হলেও সব শিক্ষকের জন্য অনলাইন ডিভাইসের ব্যবহার সহজ ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে কোনো চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত বা পর্যাপ্ত মাত্রায় অর্জন নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং আন্তরিক চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি। লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজের শুরুতে একটি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। এ পরিকল্পনাটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পথিকৃৎ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। করোনায় শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে সমাদৃত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন শিক্ষা এবং পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করছে।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মতো এত দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল বাংলাদেশ। এসব দেশে এত দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছে তিন কোটি ৭০ লাখ।.

আরও জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডাসহ অনেক দেশ করোনার ক্ষতি কাটাতে অনলাইন শিক্ষাকে জোরদার করেছে। কোনো কোনো দেশ অনলাইনে পরীক্ষাও নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার করোনার শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে খুলে দিয়েও আবার বন্ধ করেছে। উন্নত দেশগুলো অনলাইন শিক্ষা জোরদার করলেও আমাদের দেশে তা বড় চ্যালেঞ্জ।

শহরের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করলেও গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ কম। অনেকের ডিভাইস নেই, অনেকের ইন্টারনেট নেই। মফস্বলের যেসব এলাকায় ইন্টারনেটের ধীরগতি, সেখানে অনলাইন ক্লাস ঠিকমতো করা সম্ভব হয় না। এসব কিছু মোকাবিলা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় করোনাকালে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। করোনা সংক্রমণের কারণে এক বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অবশ্য এ সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে অনলাইনে পরীক্ষা নেবে, তা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলোচনা করে ঠিক করতে বলা হয়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় স্থগিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের আর শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে হতাশায় না রেখে ২০২০ সালের ১২ জুলাই থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন অনলাইন ক্লাসে সব শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে প্রাপ্ত অর্থে ২৫৭ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে স্মার্টফোন ক্রয়ের জন্য সুদবিহীন আট হাজার টাকা করে ঋণ প্রদান, ল্যাপটপ ক্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের স্বল্পসুদে ৬০ হাজার টাকা ঋণের ব্যবস্থা এবং করোনার শুরুর দিকে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তিন হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করে।

এ ছাড়া প্রশাসন বিভিন্ন বর্ষের এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের চলমান সব পরীক্ষার ফি মওকুফ করার ঘোষণা দেয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয় বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের উদ্যোগে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় ‘মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনার’। এ কেন্দ্রের দুজন মনোবিজ্ঞানী নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করেন।

করোনা মহামারি দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্কালে চলতি বছরে অনুষ্ঠিত বিবিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম ব্যাচের (সেশন ২০১৫-২০১৬) শিক্ষার্থীদের চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার মাধ্যমে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরীক্ষা গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফলও ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছরে দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সশরীরে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সেদিকে যাওয়ার কথা চিন্তাভাবনা করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে সিদ্ধান্ত হতে সরে আসে। এ অবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করে। এবং সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এর আগে গত ২৭ মে দুর্যোগকালীন পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত গঠিত একটি টেকনিক্যাল কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল সভায় ‘দুর্যোগকালীন পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’ প্রস্তাবনা তুলে ধরে। একাডেমিক কাউন্সিলের ওই সভায় প্রস্তাবনার ওপর ব্যাপক আলোচনার পর এতে নতুন করে কিছু সুপারিশ সংযোজিত হয়। ২ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় প্রস্তাবিত ‘দুর্যোগকালীন পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’ অনুমোদন লাভ করে। এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ ও ৩টি ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়েছে।

২৭ জুন ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক সভায় অনলাইনে বিভিন্ন বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির পরীক্ষা কার্যক্রম ও স্নাতকোত্তর (নিয়মিত) শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের চলতি পরীক্ষাগুলোর ফি মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকে ১ জুলাই ২০২১ তারিখ থেকে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষাও গ্রহণ করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা গ্রহণকে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী কেয়া বোস জানান, করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য সশরীরে পরীক্ষা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সশরীরে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

এমতাবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা মনে করি প্রশংসার দাবি রাখে। এতে আমাদের শিক্ষার ক্ষতি কমে আসছে। এবং আমরা তীব্র সেশনজটের কবলে পড়ার যে আশঙ্কা করেছিলাম, তা দূরীভূত হয়েছে। করোনার এ মহামারিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু একাডেমিক কার্যক্রম নয়, প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও সমানতালে এগিয়ে চলছে। অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি, নিয়োগও চালু রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছিল। এ ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে সে সময় অনেকের মনে দ্বিধা সংকোচ ছিল। সেই দ্বিধা সংকোচ কেটে গেছে। মহামারি করোনাকালে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।

স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার পুত্র প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের সব ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তাই অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বিভাগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে। উপাচার্য আরও বলেন, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করলেও করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে তারা সেসব পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। তাই আমরা শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা ভেবে কোনোরকম ঝুঁকি ছাড়াই অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা মনে করি অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তটি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা যায় না।

শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা এতে হতাশ হয়ে পড়তে পারেন। তাই করোনাকালে অনলাইনভিত্তিক নতুন জীবনকে স্বাভাবিক মনে করতে হবে। শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারেও প্রবেশ করতে হবে। আমরা লক্ষ করছি যে, আমাদের এ অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা নেওয়া সবাই গ্রহণ করেছে। উপাচার্য বলেন আমরা আশা করি, এক সময় মানুষ করোনার বিরুদ্ধে জয়ী হবে। সে সময়েও আজকে অনলাইনের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তার ব্যবহার অব্যাহত থাকবে।

ড. আহমেদ সুমন : গবেষক ও লেখক

asumanarticle@gmail.com

এ অভিজ্ঞতা সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে

 ড. আহমেদ সুমন 
১৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি আমাদের সবকিছুকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ মহামারিতে পৃথিবীর প্রায় সব ক্ষেত্রই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্র অন্যতম। আবার এটাও সত্য যে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হয়। সারা জীবন যে শিক্ষকরা প্রচলিত টিচিং-লার্নিংয়ে অভ্যস্ত, তারা সবাই অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়া, ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন করার পদ্ধতি রপ্ত করেছেন।

এটি শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন না হলেও সব শিক্ষকের জন্য অনলাইন ডিভাইসের ব্যবহার সহজ ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে কোনো চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত বা পর্যাপ্ত মাত্রায় অর্জন নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং আন্তরিক চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি। লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজের শুরুতে একটি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। এ পরিকল্পনাটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পথিকৃৎ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। করোনায় শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে সমাদৃত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন শিক্ষা এবং পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করছে।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মতো এত দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল বাংলাদেশ। এসব দেশে এত দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছে তিন কোটি ৭০ লাখ।.

আরও জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডাসহ অনেক দেশ করোনার ক্ষতি কাটাতে অনলাইন শিক্ষাকে জোরদার করেছে। কোনো কোনো দেশ অনলাইনে পরীক্ষাও নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার করোনার শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে খুলে দিয়েও আবার বন্ধ করেছে। উন্নত দেশগুলো অনলাইন শিক্ষা জোরদার করলেও আমাদের দেশে তা বড় চ্যালেঞ্জ।

শহরের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করলেও গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ কম। অনেকের ডিভাইস নেই, অনেকের ইন্টারনেট নেই। মফস্বলের যেসব এলাকায় ইন্টারনেটের ধীরগতি, সেখানে অনলাইন ক্লাস ঠিকমতো করা সম্ভব হয় না। এসব কিছু মোকাবিলা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় করোনাকালে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। করোনা সংক্রমণের কারণে এক বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অবশ্য এ সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে অনলাইনে পরীক্ষা নেবে, তা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলোচনা করে ঠিক করতে বলা হয়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় স্থগিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের আর শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে হতাশায় না রেখে ২০২০ সালের ১২ জুলাই থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন অনলাইন ক্লাসে সব শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে প্রাপ্ত অর্থে ২৫৭ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে স্মার্টফোন ক্রয়ের জন্য সুদবিহীন আট হাজার টাকা করে ঋণ প্রদান, ল্যাপটপ ক্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের স্বল্পসুদে ৬০ হাজার টাকা ঋণের ব্যবস্থা এবং করোনার শুরুর দিকে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তিন হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করে।

এ ছাড়া প্রশাসন বিভিন্ন বর্ষের এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের চলমান সব পরীক্ষার ফি মওকুফ করার ঘোষণা দেয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয় বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের উদ্যোগে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় ‘মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনার’। এ কেন্দ্রের দুজন মনোবিজ্ঞানী নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করেন।

করোনা মহামারি দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্কালে চলতি বছরে অনুষ্ঠিত বিবিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম ব্যাচের (সেশন ২০১৫-২০১৬) শিক্ষার্থীদের চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার মাধ্যমে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরীক্ষা গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফলও ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছরে দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সশরীরে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সেদিকে যাওয়ার কথা চিন্তাভাবনা করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে সিদ্ধান্ত হতে সরে আসে। এ অবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করে। এবং সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এর আগে গত ২৭ মে দুর্যোগকালীন পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত গঠিত একটি টেকনিক্যাল কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল সভায় ‘দুর্যোগকালীন পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’ প্রস্তাবনা তুলে ধরে। একাডেমিক কাউন্সিলের ওই সভায় প্রস্তাবনার ওপর ব্যাপক আলোচনার পর এতে নতুন করে কিছু সুপারিশ সংযোজিত হয়। ২ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় প্রস্তাবিত ‘দুর্যোগকালীন পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’ অনুমোদন লাভ করে। এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ ও ৩টি ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়েছে।

২৭ জুন ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক সভায় অনলাইনে বিভিন্ন বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির পরীক্ষা কার্যক্রম ও স্নাতকোত্তর (নিয়মিত) শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের চলতি পরীক্ষাগুলোর ফি মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকে ১ জুলাই ২০২১ তারিখ থেকে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষাও গ্রহণ করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা গ্রহণকে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী কেয়া বোস জানান, করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য সশরীরে পরীক্ষা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সশরীরে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

এমতাবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা মনে করি প্রশংসার দাবি রাখে। এতে আমাদের শিক্ষার ক্ষতি কমে আসছে। এবং আমরা তীব্র সেশনজটের কবলে পড়ার যে আশঙ্কা করেছিলাম, তা দূরীভূত হয়েছে। করোনার এ মহামারিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু একাডেমিক কার্যক্রম নয়, প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও সমানতালে এগিয়ে চলছে। অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি, নিয়োগও চালু রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছিল। এ ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে সে সময় অনেকের মনে দ্বিধা সংকোচ ছিল। সেই দ্বিধা সংকোচ কেটে গেছে। মহামারি করোনাকালে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।

স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার পুত্র প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের সব ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তাই অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বিভাগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে। উপাচার্য আরও বলেন, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করলেও করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে তারা সেসব পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। তাই আমরা শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা ভেবে কোনোরকম ঝুঁকি ছাড়াই অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা মনে করি অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তটি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা যায় না।

শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা এতে হতাশ হয়ে পড়তে পারেন। তাই করোনাকালে অনলাইনভিত্তিক নতুন জীবনকে স্বাভাবিক মনে করতে হবে। শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারেও প্রবেশ করতে হবে। আমরা লক্ষ করছি যে, আমাদের এ অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা নেওয়া সবাই গ্রহণ করেছে। উপাচার্য বলেন আমরা আশা করি, এক সময় মানুষ করোনার বিরুদ্ধে জয়ী হবে। সে সময়েও আজকে অনলাইনের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তার ব্যবহার অব্যাহত থাকবে।

ড. আহমেদ সুমন : গবেষক ও লেখক

asumanarticle@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস