ঈদ করলাম কোরবানি দিলাম গোশত খাইলাম না
jugantor
কিছুমিছু
ঈদ করলাম কোরবানি দিলাম গোশত খাইলাম না

  মোকাম্মেল হোসেন  

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ যেমন দুই জাতের- অরিজিনাল সৈয়দ এবং গামছাপোড়া সৈয়দ; তেমনি খানের মধ্যেও দুই জাত আছে। একটি শুধু খান; অন্যটি চাঁদযুক্ত ( ঁ) খাঁন। মাওয়া খাতুনের বেয়াই টেপু হচ্ছেন চাঁদযুক্ত ( ঁ) খান। মাওয়া খাতুনের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্লিনিকের বিছানায় মরা ব্যাঙের মতো চিৎ হয়ে পড়ে থাকা টেপু খাঁ চোখ খুললেন। বললেন-

: বেওয়াইন আইছুইন?

মাওয়া খাতুনের বাসা শহরেই। টেপু খাঁ ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর রোজ একবার করে বেয়াইকে দেখে যান তিনি। নিয়ম মেনে আজও এসেছেন মাওয়া খাতুন। বেয়াইয়ের জন্য আজ তিনি কাউনের পায়েস রান্না করে এনেছেন। টেপু খাঁর শিয়রের কাছে পায়েসের বাটি রাখার পর হাফ কিলোমিটার লম্বা দীর্ঘশ্বাস পয়দা করে মাওয়া খাতুন বললেন-

: হ বেওয়াই; আইছি।

: ভালো আছেন।

: ভালো কেমনে থাকবাম! এইরকম ছেড়াবেড়া ঘটনার পর আপনেই কইন- কেউ কি ভালো থাকবার পারে?

মাওয়া খাতুন যেটাকে ছেড়াবেড়া ঘটনা বলল, এর সূত্রপাত ঘটেছিল ঈদুল আজহার সপ্তাহ দুয়েক আগে। হাটবারে হাটে গিয়েছিল তালেব মুন্সি। ফেরার পথে সংবাদটা পাচার করল সে। সংবাদ শুনে সবাই হায় হায় করে উঠল। সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে টেপু খাঁ বললেন-

: আরে! আগেই তোমরা এতটা উতলা হইতেছ কীজন্য! আগে পাকা খবর পাইয়া লই।

সবাই এবার তালেব মুন্সির দিকে মুখ ফেরাল। তালেব মুন্সি নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও তার কথাগুলো বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করল।

মাগরিবের নামাজ শেষে পুকুরঘাটে গোল হয়ে যারা ‘মজমা’ জমিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়ষ্ক সদস্য হচ্ছেন নেকবর মণ্ডল। তিনি দন্তবিহীন মুখে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন-

: হাছা-মিছা না জাইন্যা তোমার কথা বিশ্বাস করি কেমনে! উড়া কথার ধরা কী?

অন্যরা নেকবর মণ্ডলের কথায় সমর্থন জানিয়ে বলল-

: ঠিক, ঠিক। মণ্ডলসাব হাজার কথার এক কথা কইছেন; উড়া কথার ধরা নাই।

কেতু বেপারি হাঁপানির রোগী। তিনি প্রাণপণ চেষ্টায় ফুসফুসে খানিকটা বাতাস জমা করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন-

: চিলে কান লইয়া গেছে- এই কথা শুইনাই দৌঁড় দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আগে দেখন লাগবে- কানের জায়গায় কান আছে কিনা?

সবাই হুররে দিল। বলল-

: বেপারিসাব জব্বর কথা কইছেন; লাখ কথার এক কথা।

টেপু খাঁ দু’চোখ বন্ধ করে সবার বাতচিৎ শুনছিলেন। হঠাৎ তিনি সবাইকে খামোশ হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। নিঃশ্বাস বন্ধ করে সবাই তার মুখের দিকে তাকাল। ডানহাতের তালু দিয়ে বারকয়েক মুখমণ্ডল মর্দন করে টেপু খাঁ বললেন-

: আমার পরদাদার আমলের ঘটনা। তাইনের একজোড়া হাতি ছিল। একটা মর্দা, আরেকটা মাদি। একদিন হাতির মাহুত আইসা খবর দিল-

: খাঁ সাব, আজব করবার! মাদি হাতি ডিমপাড়া শুরু করছে।

হাতি ডিম পাড়ছে শুইনা এলাকার লোকজন বেড়াগুড়া ভাইঙ্গা হাজির। শেষে রহস্য উদঘাটনের পর দেখা গেল- মাহুত বেটা যেইটারে হাতির ডিম মনে করছে, সেইটা আসলে একটা মুরগির ডিম। আশপাশের কোনো গেরস্তের মুরগি হয়তো মনের খেয়ালে হাতিশালায় ঢুইকা পুট্টুস কইরা একটা ডিম পাইড়া গেছে। তালেব মুন্সি, তোমার হাতির ডিমও শেষমেষ মুরগির ডিম অইব না তো!

টেপু খাঁর কথা শেষ হতেই উচ্ছ্বাসমাখা কণ্ঠে ফোরকান মোল্লা বললেন-

: মারহাবা, মারহাবা! হাজার কথার এক কথা; খাঁ সাব ছাড়া এমন খাপে-খাপ কথা বলার জ্ঞান-বুদ্ধি এই ইউনিয়নে আর কারো নাই।

তালেব মুন্সির ধারণা ছিল, এরকম গরম একটা খবর দিয়ে সে টেপু খাঁ সুদৃষ্টি লাভে সমর্থ হবে। সুদৃষ্টি তো দূরস্থান, এখন তার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। তবে বেশিক্ষণ তালেব মুন্সিকে এ অবস্থায় থাকতে হল না। ইসফ মেম্বার একেবারে পাকা খবর নিয়ে এলো। শুধু তাই নয়, তালেব মুন্সির দেওয়া সংবাদের পুনঃপরিবেশন শেষে লেজ হিসাবে এর সঙ্গে সে যা যোগ করল, তা শুনে সবার জবান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কয়েকবার মাথা দুলিয়ে ডানহাত দিয়ে বামহাতের তালুতে বিলি কাটতে কাটতে টেপু খাঁ বললেন-

: ঢাকায় কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য উট আমদানির খবর আমি পাইছি। কিন্তু সেই হাটে উটের দুধ বিক্রি হয়- এই খবর জানা নাই।

টেপু খাঁর কথা শুনে ইসফ মেম্বার জিহ্বায় কামড় দিল। মাথা নেড়ে বলল-

: হাটে দুধ বিক্রির কথা আমি বলি নাই!

ইসফ মেম্বারের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর টেপু খাঁ জানতে চাইলেন-

: তাইলে কোনখানে উটের দুধ বিক্রি হয়?

: ঢাকায় এক পীরসাহেব উটের খামার দিছেন। সেই খামারে উটের দুধ বিক্রি হওয়ার কথা শুনছি আমি।

সবার মুখের দিকে নজর বুলিয়ে ফ্যাসফ্যাসে কেতু বেপারি গলায় বললেন-

: অহন উপায়!

উপায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে আলোর কোনো দিশা পাওয়া যাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে আরামকেদারার হাতলে থাপ্পড় মেরে টেপু খাঁ বলে উঠলেন-

: মকবুইল্যা যদি উটের দুধ দিয়ে গ্রামের মানুষরে ক্ষীর খাওয়ানোর মতলব কইরা থাকে, তাইলে আমি বাঘের দুধ দিয়া পায়েস রান্না কইরা পুরা ইউনিয়নের লোকজনরে খাওয়াব- এই ব্যাপারে আপনেরা নিশ্চিত থাকেন। তবে কথা সেইটা না। কথা হইল, মকবুইল্যা কয়টা উট কেনার বন্দোবস্ত করছে- এই খবরটা জানা অতি জরুরি। ও একটা উট কিনলে আমি জোড়া উট কোরবানি দিব। ও দুইটা দিলে আমি চাইরটা দিব। কোনভাবেই ওর কাছে পল্টি খাওয়া চলবে না।

এসময় নেকবর মণ্ডল বলে উঠল-

: খাঁ সাব, আপনে বাঘের কথা কওয়ায় আমার মাথায় একটা চিন্তা হোঁচট খাইছে।

: কী চিন্তা?

: হরিণ কোরবানি দিলে কেমন হয়?

: হরিণ কোরবানি দেওয়া সম্ভবত দুরস্ত নয়। তাছাড়া প্রচলিত আইনে হরিণ জবাই নিষিদ্ধ।

: আইনে তো কতকিছুই নিষেধ করা আছে। এইসব বিধি-নিষেধ সাধারণ মানুষ মাইন্য কইরা চলবে। আপনের মতো মানুষ যদি আইন অমান্য কইরা বেডাগিরি না দেখায়, তাইলে খাঁ গোষ্ঠীর নামডাক সার্থক হইব কেমনে! মকবুল মাতবর এইবার ষাড় কোরবানি না দিয়া গোপনে উট কিইনা আপনেরে টেক্কা দেওয়ার পাঁয়তারা করতেছে। আপনেও গোপনে কমসে কম ছয় জোড়া হরিণ জোগাড়ের বন্দোবস্ত করেন। ঈদের দিন গ্রামবাসী যখন এক ডজন হরিণরে আল্লাহু-আকবর হইতে দেখবে, তখন মকবুল মাতবরের ইজ্জতের সিন্দুকে তেলাপোকা ঢুইকা এমন লেদানি লেদাবে, তা দেইখা মাতবর গোষ্ঠীর লোকজন মুখ দিয়া দম ছাড়বে, এইটা আমি কইয়া রাখলাম।

নেকবর মণ্ডলের কথা শুনে সবাই পুলকিত হলেও হরিণ কোরবানির বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে টেপু খাঁ বললেন-

: এইটা যদি কোনো শিকারের প্রতিযোগিতা হইত, তাইলে হরিণ নয়; সিংহ শিকারের বন্দোবস্ত কইরা মকবুইল্যার থোতামুখ আমি ভোতা কইরা দিতাম। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে উটের সঙ্গে হরিণের তুলনা চলে না। হরিণ হইল বনের জানোয়ার। আর উট? পবিত্র আরবভূমির পবিত্র জীব। কাজেই উটের মরতবাই আলাদা।

আলোচনা শেষে সাব্যস্ত হলো- অর্থকড়ি নিয়ে দু’জন লোক আজ রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। ঢাকায় পৌঁছে তারা একটা হোটেলে অবস্থান করে অপেক্ষায় থাকবে। মকবুল মাতবরের কোরবানি সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অবগত হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোনে তাদের সবকিছু জানিয়ে দেওয়ার পর তারা ‘অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে। ‘দরবার’ শেষ করে টেপু খাঁ প্রফুল্ল মনে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। কোরবানি বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত স্ত্র্রী পরিবানুর কাছে বয়ান করতেই তিনি বললেন-

: কোরবানি কি আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতি?

: না।

: তাইলে এইটা লইয়া পাল্টাপাল্টি হইতেছে কীজন্য?

: পাল্টাপাল্টি না কইরা উপায় কী? এইটা হইল ইজ্জতকা সওয়াল।

: তাই বইলা কোরবানি লইয়া? কোরবানির মানে হইল ত্যাগ, এই কথা ভুইলা গেছেন?

: ত্যাগের ব্যাপারে আমার কোনো কার্পণ্য নাই। কোরবানি বাবদ বিপুল অংকের অর্থের মায়া ত্যাগ করার নিয়ত করছি।

: এইরকম ত্যাগের ফায়দা কী? এর দৌড় হইল মকবুল মাতবরের দরজা পর্যন্ত। আল্লাহর আরশে এই ত্যাগের সুফল পৌঁছাইব না।

স্ত্রীর কথা শুনে টেপু খাঁ হাসলেন। পাল্টাপাল্টির কারবারে আসল উদ্দেশ্য একটু ব্যাহত হবেই। এটা নিয়ে বেচাইন হওয়ার কিছু নেই। পরদিন খবর পাওয়া গেল- উট নয়, এবার ঈদে কোরবানি দেওয়ার জন্য মকবুল মাতবর নকলা বাজার থেকে দুই লাখ ষাট হাজার টাকা দিয়ে ষাঁড় কিনেছে একটা। খবর পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হওয়ার পর ঢাকায় অবস্থানরতদের জানিয়ে দেওয়া হলো। এরপর থেকেই ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন টেপু খাঁ। অবশেষে ঈদের একদিন আগে পরম কাক্সিক্ষত সেই ফোন এলো। ফোনের অপর প্রাপ্ত থেকে ইসফ মেম্বার বললেন-

: খাঁ সাব! ষাড় একখান পাইছি হেভি আর দামেও সস্তা।

ষাড়ের দাম জানার উদ্দেশে টেপু খাঁ বললেন-

: কত চাইতেছে?

: পাইকারের কেনাদাম দুই লাখ সত্তর। বাজার ডাউন খাওয়ায় বর্তমানে সে এইটা আড়াই লাখে ছাইড়া দিবে বলতেছে।

টেপু খাঁ দেখলেন, আড়াই লাখে পাওয়া গেলেও এই দামে ষাড় কেনা ঠিক হবে না। তাইলে দামের দিক থেকে তিনি মকবুল মাতবরের কাছে ‘ডাউন’ খেয়ে যাবেন। ইসফ মেম্বারকে তিনি বললেন-

: পাইকার গরীব মানুষ। সে দুইটা পয়সার আশায় গরু কিনছে, এইটা তো মিথ্যা না।

: জি না।

: তাইলে তারে ঠকাবা কীজন্য? সে যে দামে গরু কিনছে, তার চাইতে দশ হাজার টাকা বেশি দিয়া আজ রাতের মধ্যেই গরু লইয়া রওনা দিবা।

: জি, আইচ্ছা।

ঈদের আগের দিন রাতে ট্রাকে চড়ে দুই লাখ আশি হাজার টাকা দামের ষাঁড় এলো টেপু খাঁর বাড়িতে। ভোররাতে ষাড়ের গোসল সম্পন্ন করে সেটিকে টেপু খাঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় বেঁধে রাখা হলো। মাতবর গোষ্ঠীর লোকজন এই রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাবে। যাওয়ার পথে ষাড়ের চেহারা ও দাম শুনে তাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাক- এটাই চান টেপু খাঁ। প্রদর্শন পর্ব শেষে নামাজ পড়তে মাঠে গেলেন টেপু খাঁ। ঈদগাহ থেকে ফেরার পর ষাঁড় কোরবানির আয়োজন করা হলো। মওলানা সাহেব ছুরি হাতের প্রস্তুত হওয়ার পর ইসব মেম্বার টেপু খাঁ উদ্দেশে বলল-

: এত সাধের কোরবানি; এর সঙ্গে একটা ছবি তুলেন খাঁ সাব।

টেপু খাঁ ভেবে দেখলেন, ইসফ মেম্বার মিথ্যা বলেনি। একটা প্রমাণ দরকার। তিনি ষাড়ের সঙ্গে একটা সেলফি তুলতে গেলেন। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। ষাঁড়ের গুতা খেয়ে জ্ঞান হারানোর আগে তিনি শুধু দেখলেন, রক্ত আর রক্ত! ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে আরো বড় দুঃসংবাদ পেলেন টেপু খাঁ। তাকে জানানো হলো, ষাঁড়জনিত দুর্ঘটনায় তার উপর-নিচ দুপাটি মিলে সামনে ছয়টি দাঁত নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো গোটা দশেক।

মাওয়া খাতুন চলে যাওয়ার পর মোবাইল ফোন নিয়ে নড়াচড়া করতে গিয়ে গ্যালারি ফোল্ডারে সংরক্ষিত ষাঁড়ের ছবিটা চোখে পড়ল টেপু খাঁর। ইয়া বড়, ইয়া মোটা, গাট্টুগুট্টু চেহারা। সে ওই সময় হঠাৎ ক্ষেপে গেল কেন, এ এক রহস্যই বটে। তবে শেষ পর্যন্ত দন্ত বিয়োগের বেদনা ভুলে টেপু খাঁ তার ফেসবুকে ষাঁড়ের সঙ্গে তোলা ছবিটা আপলোড করে দিলেন। আর এর নিচে ক্যাপশন দিলেন- ঈদ করলাম কোরবানি দিলাম গোশত খাইলাম না...

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

কিছুমিছু

ঈদ করলাম কোরবানি দিলাম গোশত খাইলাম না

 মোকাম্মেল হোসেন 
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ যেমন দুই জাতের- অরিজিনাল সৈয়দ এবং গামছাপোড়া সৈয়দ; তেমনি খানের মধ্যেও দুই জাত আছে। একটি শুধু খান; অন্যটি চাঁদযুক্ত ( ঁ) খাঁন। মাওয়া খাতুনের বেয়াই টেপু হচ্ছেন চাঁদযুক্ত ( ঁ) খান। মাওয়া খাতুনের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্লিনিকের বিছানায় মরা ব্যাঙের মতো চিৎ হয়ে পড়ে থাকা টেপু খাঁ চোখ খুললেন। বললেন-

: বেওয়াইন আইছুইন?

মাওয়া খাতুনের বাসা শহরেই। টেপু খাঁ ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর রোজ একবার করে বেয়াইকে দেখে যান তিনি। নিয়ম মেনে আজও এসেছেন মাওয়া খাতুন। বেয়াইয়ের জন্য আজ তিনি কাউনের পায়েস রান্না করে এনেছেন। টেপু খাঁর শিয়রের কাছে পায়েসের বাটি রাখার পর হাফ কিলোমিটার লম্বা দীর্ঘশ্বাস পয়দা করে মাওয়া খাতুন বললেন-

: হ বেওয়াই; আইছি।

: ভালো আছেন।

: ভালো কেমনে থাকবাম! এইরকম ছেড়াবেড়া ঘটনার পর আপনেই কইন- কেউ কি ভালো থাকবার পারে?

মাওয়া খাতুন যেটাকে ছেড়াবেড়া ঘটনা বলল, এর সূত্রপাত ঘটেছিল ঈদুল আজহার সপ্তাহ দুয়েক আগে। হাটবারে হাটে গিয়েছিল তালেব মুন্সি। ফেরার পথে সংবাদটা পাচার করল সে। সংবাদ শুনে সবাই হায় হায় করে উঠল। সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে টেপু খাঁ বললেন-

: আরে! আগেই তোমরা এতটা উতলা হইতেছ কীজন্য! আগে পাকা খবর পাইয়া লই।

সবাই এবার তালেব মুন্সির দিকে মুখ ফেরাল। তালেব মুন্সি নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও তার কথাগুলো বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করল।

মাগরিবের নামাজ শেষে পুকুরঘাটে গোল হয়ে যারা ‘মজমা’ জমিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়ষ্ক সদস্য হচ্ছেন নেকবর মণ্ডল। তিনি দন্তবিহীন মুখে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন-

: হাছা-মিছা না জাইন্যা তোমার কথা বিশ্বাস করি কেমনে! উড়া কথার ধরা কী?

অন্যরা নেকবর মণ্ডলের কথায় সমর্থন জানিয়ে বলল-

: ঠিক, ঠিক। মণ্ডলসাব হাজার কথার এক কথা কইছেন; উড়া কথার ধরা নাই।

কেতু বেপারি হাঁপানির রোগী। তিনি প্রাণপণ চেষ্টায় ফুসফুসে খানিকটা বাতাস জমা করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন-

: চিলে কান লইয়া গেছে- এই কথা শুইনাই দৌঁড় দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আগে দেখন লাগবে- কানের জায়গায় কান আছে কিনা?

সবাই হুররে দিল। বলল-

: বেপারিসাব জব্বর কথা কইছেন; লাখ কথার এক কথা।

টেপু খাঁ দু’চোখ বন্ধ করে সবার বাতচিৎ শুনছিলেন। হঠাৎ তিনি সবাইকে খামোশ হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। নিঃশ্বাস বন্ধ করে সবাই তার মুখের দিকে তাকাল। ডানহাতের তালু দিয়ে বারকয়েক মুখমণ্ডল মর্দন করে টেপু খাঁ বললেন-

: আমার পরদাদার আমলের ঘটনা। তাইনের একজোড়া হাতি ছিল। একটা মর্দা, আরেকটা মাদি। একদিন হাতির মাহুত আইসা খবর দিল-

: খাঁ সাব, আজব করবার! মাদি হাতি ডিমপাড়া শুরু করছে।

হাতি ডিম পাড়ছে শুইনা এলাকার লোকজন বেড়াগুড়া ভাইঙ্গা হাজির। শেষে রহস্য উদঘাটনের পর দেখা গেল- মাহুত বেটা যেইটারে হাতির ডিম মনে করছে, সেইটা আসলে একটা মুরগির ডিম। আশপাশের কোনো গেরস্তের মুরগি হয়তো মনের খেয়ালে হাতিশালায় ঢুইকা পুট্টুস কইরা একটা ডিম পাইড়া গেছে। তালেব মুন্সি, তোমার হাতির ডিমও শেষমেষ মুরগির ডিম অইব না তো!

টেপু খাঁর কথা শেষ হতেই উচ্ছ্বাসমাখা কণ্ঠে ফোরকান মোল্লা বললেন-

: মারহাবা, মারহাবা! হাজার কথার এক কথা; খাঁ সাব ছাড়া এমন খাপে-খাপ কথা বলার জ্ঞান-বুদ্ধি এই ইউনিয়নে আর কারো নাই।

তালেব মুন্সির ধারণা ছিল, এরকম গরম একটা খবর দিয়ে সে টেপু খাঁ সুদৃষ্টি লাভে সমর্থ হবে। সুদৃষ্টি তো দূরস্থান, এখন তার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। তবে বেশিক্ষণ তালেব মুন্সিকে এ অবস্থায় থাকতে হল না। ইসফ মেম্বার একেবারে পাকা খবর নিয়ে এলো। শুধু তাই নয়, তালেব মুন্সির দেওয়া সংবাদের পুনঃপরিবেশন শেষে লেজ হিসাবে এর সঙ্গে সে যা যোগ করল, তা শুনে সবার জবান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কয়েকবার মাথা দুলিয়ে ডানহাত দিয়ে বামহাতের তালুতে বিলি কাটতে কাটতে টেপু খাঁ বললেন-

: ঢাকায় কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য উট আমদানির খবর আমি পাইছি। কিন্তু সেই হাটে উটের দুধ বিক্রি হয়- এই খবর জানা নাই।

টেপু খাঁর কথা শুনে ইসফ মেম্বার জিহ্বায় কামড় দিল। মাথা নেড়ে বলল-

: হাটে দুধ বিক্রির কথা আমি বলি নাই!

ইসফ মেম্বারের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর টেপু খাঁ জানতে চাইলেন-

: তাইলে কোনখানে উটের দুধ বিক্রি হয়?

: ঢাকায় এক পীরসাহেব উটের খামার দিছেন। সেই খামারে উটের দুধ বিক্রি হওয়ার কথা শুনছি আমি।

সবার মুখের দিকে নজর বুলিয়ে ফ্যাসফ্যাসে কেতু বেপারি গলায় বললেন-

: অহন উপায়!

উপায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে আলোর কোনো দিশা পাওয়া যাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে আরামকেদারার হাতলে থাপ্পড় মেরে টেপু খাঁ বলে উঠলেন-

: মকবুইল্যা যদি উটের দুধ দিয়ে গ্রামের মানুষরে ক্ষীর খাওয়ানোর মতলব কইরা থাকে, তাইলে আমি বাঘের দুধ দিয়া পায়েস রান্না কইরা পুরা ইউনিয়নের লোকজনরে খাওয়াব- এই ব্যাপারে আপনেরা নিশ্চিত থাকেন। তবে কথা সেইটা না। কথা হইল, মকবুইল্যা কয়টা উট কেনার বন্দোবস্ত করছে- এই খবরটা জানা অতি জরুরি। ও একটা উট কিনলে আমি জোড়া উট কোরবানি দিব। ও দুইটা দিলে আমি চাইরটা দিব। কোনভাবেই ওর কাছে পল্টি খাওয়া চলবে না।

এসময় নেকবর মণ্ডল বলে উঠল-

: খাঁ সাব, আপনে বাঘের কথা কওয়ায় আমার মাথায় একটা চিন্তা হোঁচট খাইছে।

: কী চিন্তা?

: হরিণ কোরবানি দিলে কেমন হয়?

: হরিণ কোরবানি দেওয়া সম্ভবত দুরস্ত নয়। তাছাড়া প্রচলিত আইনে হরিণ জবাই নিষিদ্ধ।

: আইনে তো কতকিছুই নিষেধ করা আছে। এইসব বিধি-নিষেধ সাধারণ মানুষ মাইন্য কইরা চলবে। আপনের মতো মানুষ যদি আইন অমান্য কইরা বেডাগিরি না দেখায়, তাইলে খাঁ গোষ্ঠীর নামডাক সার্থক হইব কেমনে! মকবুল মাতবর এইবার ষাড় কোরবানি না দিয়া গোপনে উট কিইনা আপনেরে টেক্কা দেওয়ার পাঁয়তারা করতেছে। আপনেও গোপনে কমসে কম ছয় জোড়া হরিণ জোগাড়ের বন্দোবস্ত করেন। ঈদের দিন গ্রামবাসী যখন এক ডজন হরিণরে আল্লাহু-আকবর হইতে দেখবে, তখন মকবুল মাতবরের ইজ্জতের সিন্দুকে তেলাপোকা ঢুইকা এমন লেদানি লেদাবে, তা দেইখা মাতবর গোষ্ঠীর লোকজন মুখ দিয়া দম ছাড়বে, এইটা আমি কইয়া রাখলাম।

নেকবর মণ্ডলের কথা শুনে সবাই পুলকিত হলেও হরিণ কোরবানির বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে টেপু খাঁ বললেন-

: এইটা যদি কোনো শিকারের প্রতিযোগিতা হইত, তাইলে হরিণ নয়; সিংহ শিকারের বন্দোবস্ত কইরা মকবুইল্যার থোতামুখ আমি ভোতা কইরা দিতাম। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে উটের সঙ্গে হরিণের তুলনা চলে না। হরিণ হইল বনের জানোয়ার। আর উট? পবিত্র আরবভূমির পবিত্র জীব। কাজেই উটের মরতবাই আলাদা।

আলোচনা শেষে সাব্যস্ত হলো- অর্থকড়ি নিয়ে দু’জন লোক আজ রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। ঢাকায় পৌঁছে তারা একটা হোটেলে অবস্থান করে অপেক্ষায় থাকবে। মকবুল মাতবরের কোরবানি সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অবগত হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোনে তাদের সবকিছু জানিয়ে দেওয়ার পর তারা ‘অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে। ‘দরবার’ শেষ করে টেপু খাঁ প্রফুল্ল মনে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। কোরবানি বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত স্ত্র্রী পরিবানুর কাছে বয়ান করতেই তিনি বললেন-

: কোরবানি কি আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতি?

: না।

: তাইলে এইটা লইয়া পাল্টাপাল্টি হইতেছে কীজন্য?

: পাল্টাপাল্টি না কইরা উপায় কী? এইটা হইল ইজ্জতকা সওয়াল।

: তাই বইলা কোরবানি লইয়া? কোরবানির মানে হইল ত্যাগ, এই কথা ভুইলা গেছেন?

: ত্যাগের ব্যাপারে আমার কোনো কার্পণ্য নাই। কোরবানি বাবদ বিপুল অংকের অর্থের মায়া ত্যাগ করার নিয়ত করছি।

: এইরকম ত্যাগের ফায়দা কী? এর দৌড় হইল মকবুল মাতবরের দরজা পর্যন্ত। আল্লাহর আরশে এই ত্যাগের সুফল পৌঁছাইব না।

স্ত্রীর কথা শুনে টেপু খাঁ হাসলেন। পাল্টাপাল্টির কারবারে আসল উদ্দেশ্য একটু ব্যাহত হবেই। এটা নিয়ে বেচাইন হওয়ার কিছু নেই। পরদিন খবর পাওয়া গেল- উট নয়, এবার ঈদে কোরবানি দেওয়ার জন্য মকবুল মাতবর নকলা বাজার থেকে দুই লাখ ষাট হাজার টাকা দিয়ে ষাঁড় কিনেছে একটা। খবর পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হওয়ার পর ঢাকায় অবস্থানরতদের জানিয়ে দেওয়া হলো। এরপর থেকেই ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন টেপু খাঁ। অবশেষে ঈদের একদিন আগে পরম কাক্সিক্ষত সেই ফোন এলো। ফোনের অপর প্রাপ্ত থেকে ইসফ মেম্বার বললেন-

: খাঁ সাব! ষাড় একখান পাইছি হেভি আর দামেও সস্তা।

ষাড়ের দাম জানার উদ্দেশে টেপু খাঁ বললেন-

: কত চাইতেছে?

: পাইকারের কেনাদাম দুই লাখ সত্তর। বাজার ডাউন খাওয়ায় বর্তমানে সে এইটা আড়াই লাখে ছাইড়া দিবে বলতেছে।

টেপু খাঁ দেখলেন, আড়াই লাখে পাওয়া গেলেও এই দামে ষাড় কেনা ঠিক হবে না। তাইলে দামের দিক থেকে তিনি মকবুল মাতবরের কাছে ‘ডাউন’ খেয়ে যাবেন। ইসফ মেম্বারকে তিনি বললেন-

: পাইকার গরীব মানুষ। সে দুইটা পয়সার আশায় গরু কিনছে, এইটা তো মিথ্যা না।

: জি না।

: তাইলে তারে ঠকাবা কীজন্য? সে যে দামে গরু কিনছে, তার চাইতে দশ হাজার টাকা বেশি দিয়া আজ রাতের মধ্যেই গরু লইয়া রওনা দিবা।

: জি, আইচ্ছা।

ঈদের আগের দিন রাতে ট্রাকে চড়ে দুই লাখ আশি হাজার টাকা দামের ষাঁড় এলো টেপু খাঁর বাড়িতে। ভোররাতে ষাড়ের গোসল সম্পন্ন করে সেটিকে টেপু খাঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় বেঁধে রাখা হলো। মাতবর গোষ্ঠীর লোকজন এই রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাবে। যাওয়ার পথে ষাড়ের চেহারা ও দাম শুনে তাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাক- এটাই চান টেপু খাঁ। প্রদর্শন পর্ব শেষে নামাজ পড়তে মাঠে গেলেন টেপু খাঁ। ঈদগাহ থেকে ফেরার পর ষাঁড় কোরবানির আয়োজন করা হলো। মওলানা সাহেব ছুরি হাতের প্রস্তুত হওয়ার পর ইসব মেম্বার টেপু খাঁ উদ্দেশে বলল-

: এত সাধের কোরবানি; এর সঙ্গে একটা ছবি তুলেন খাঁ সাব।

টেপু খাঁ ভেবে দেখলেন, ইসফ মেম্বার মিথ্যা বলেনি। একটা প্রমাণ দরকার। তিনি ষাড়ের সঙ্গে একটা সেলফি তুলতে গেলেন। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। ষাঁড়ের গুতা খেয়ে জ্ঞান হারানোর আগে তিনি শুধু দেখলেন, রক্ত আর রক্ত! ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে আরো বড় দুঃসংবাদ পেলেন টেপু খাঁ। তাকে জানানো হলো, ষাঁড়জনিত দুর্ঘটনায় তার উপর-নিচ দুপাটি মিলে সামনে ছয়টি দাঁত নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো গোটা দশেক।

মাওয়া খাতুন চলে যাওয়ার পর মোবাইল ফোন নিয়ে নড়াচড়া করতে গিয়ে গ্যালারি ফোল্ডারে সংরক্ষিত ষাঁড়ের ছবিটা চোখে পড়ল টেপু খাঁর। ইয়া বড়, ইয়া মোটা, গাট্টুগুট্টু চেহারা। সে ওই সময় হঠাৎ ক্ষেপে গেল কেন, এ এক রহস্যই বটে। তবে শেষ পর্যন্ত দন্ত বিয়োগের বেদনা ভুলে টেপু খাঁ তার ফেসবুকে ষাঁড়ের সঙ্গে তোলা ছবিটা আপলোড করে দিলেন। আর এর নিচে ক্যাপশন দিলেন- ঈদ করলাম কোরবানি দিলাম গোশত খাইলাম না...

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন