গণমানুষের শিল্পী
jugantor
গণমানুষের শিল্পী

  ফরিদুর রেজা সাগর  

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবিশ্বাস্য সংবাদ। ফকির আলমগীরের মৃত্যু সংবাদে মন ভেঙে গেল। দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। চিকিৎসার জন্য আছি সুদূর নিউইয়র্কে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে ঢাকায়।

ফকির আলমগীরের হাজারও স্মৃতি মনে পড়ছে। এক বর্ণাঢ্য অসাধারণ শিল্পী হিসাবে অনেক বড় তিনি। দেশবরেণ্য শিল্পী। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। তার গান পৌঁছে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। খুব কম শিল্পীর জীবনেই এমন সৌভাগ্য ঘটে। ফকির আলমগীর গণমানুষের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। আমার অগ্রজ বন্ধু তিনি। কোনোদিন তার মন খারাপ দেখিনি। চ্যানেল আই, বাংলাদেশ টেলিভিশন, শহিদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমি, সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে যখনই তার সঙ্গে দেখা হতো, তিনি উদ্ভাসিত হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাছে এসে দাঁড়াতেন। নিত্যনতুন পরিকল্পনা। নতুন গান তৈরির গল্প। আগামীতে কী করতে চান কিংবা গণসঙ্গীত নিয়ে তার স্বপ্নের কথা তিনি বলতেন। কী যে কাজের উৎসাহ। ক্লান্তিহীন তার কাজের স্বপ্ন। আর সব স্বপ্নই তার ছিল বাংলা গানকে ঘিরে। ফকির আলমগীর ছিলেন অসম্ভব স্বাপ্নিক। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে কত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ঋষিজ পদক বিতরণ করতেন প্রতিবছর। আমাদের দেশে গণসঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূর্বসূরিদের সম্মান জানানোর ব্যাপারে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন।

দেশে-বিদেশে মঞ্চ কাঁপানো শিল্পী ছিলেন তিনি। বাবরি চুল ঝাঁকিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে গান পরিবেশন করতেন। তার পরিবেশনা দেখেনি এমন সংস্কৃতিবান ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ফকির আলমগীর আচারে-ব্যবহারে ছিলেন শিশুর মতো। গানকে ভালোবেসে একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন। গানই ছিল তার প্রাণ। গানের বাইরে তিনি কিছু ভাবতেন না।

ষাট দশকের শেষে আবির্ভাব। সত্তর দশকে পপ গান গেয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তারপর নিজেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে থাকেন। দেশের গান, মেহনতি মানুষের গান, সমাজ বদলের গান গেয়ে তিনি বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। মানুষের জন্য গান- এই বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অটল। যে কোনো সংকটে, যে কোনো রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তিনি চারণ কবির মতো গান বেঁধে ফেলতেন। এমন যোগ্যতা আর কারও মধ্যে দেখা যায় না।

এই তো গত মে দিবসে তিনি চ্যানেল আইতে গান দিয়ে শুরু অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। গত বিজয় দিবসে বিজয়মেলায় তিনি সারাদিন লাল-সবুজ পোশাক পরে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইতে।

বলতেন, করোনা থেকে সাবধান থাকতে হবে। ঘরেই বেশি সময় থাকা উচিত। সেই মরণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এই বেদনা ও ক্ষতি আমরা এখনই উপলব্ধি করতে পারব না। ফকির গানের বাদশা। তার অনন্ত যাত্রায় আমাদের সবার দোয়া।

২.

গণমানুষের শিল্পী, মেহনতি মানুষের শিল্পী... বাংলা গণসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ ফকির আলমগীর। তার কণ্ঠে আর কখনো রাজপথ প্রকম্পিত হবে না। মেহনতি মানুষের বজ্রমুষ্ঠি আর তার গান শুনে আকাশপানে উঠবে না। সংগীতের মাধ্যমে ফকির আলমগীর রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে গান গেয়ে। কোথায় নেই তিনি?

ফকির আলমগীর সঙ্গীতের মাধ্যমে রাজপথে রেখেছেন শিল্পের ছোঁয়া আর শিল্পে তুলে এনেছেন রাজপথের গান। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনে তার গান ছিল অনন্য হাতিয়ার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসাবে তার উপস্থিতি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের করেছে উজ্জীবিত।

সত্তরের দশকে বাংলা আধুনিক গানে পাশ্চাত্যের ধারাকে যোগ করা ফকির আলমগীর বাংলা পপ গানের ধারার অন্যতম প্রবর্তক। তার গাওয়া গণসঙ্গীত আমাদের বাংলা গানকে ঋদ্ধ করেছে। প্রতিবাদী গানের শিল্পীদের দল হিসাবে তিনি গড়েছিলেন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী।

৩.

আমার জানামতে ব্যক্তিজীবনে ১ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন গণমানুষের কিংবদন্তি গায়ক ফকির আলমগীর। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’, ‘মায়ের একধার দুধের দাম’ গানগুলো এতটাই জনপ্রিয় যে ফকির আলমগীরকে চেনেন না এমন মানুষও অন্তর থেকে এই গান গেয়ে ওঠেন। ১৯৮২ সালে বিটিভির আনন্দমেলায় প্রথম প্রচারিত হয় ‘ও সখিনা’ গানটি।

দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ফকির আলমগীর বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। নিজে গান রচনা করতেন এবং সময়কে ধারণ করে প্রতিবাদী গান গাইতেন, যা সাধারণ মানুষকে আন্দোলন-সংগ্রামে ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা জোগায়।

ফকির আলমগীর চ্যানেল আই পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। নতুন কোনো গান তৈরি হলেই চ্যানেল আইতে আসতেন। চ্যানেল আইয়ের সকালের গানের অনুষ্ঠান, দুপুরের তারকাকথন অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন নিয়মিত শিল্পী। মেহনতি মানুষের প্রিয় শিল্পী ফকির আলমগীরকে লাল সালাম।

ফরিদুর রেজা সাগর : লেখক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই

গণমানুষের শিল্পী

 ফরিদুর রেজা সাগর 
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবিশ্বাস্য সংবাদ। ফকির আলমগীরের মৃত্যু সংবাদে মন ভেঙে গেল। দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। চিকিৎসার জন্য আছি সুদূর নিউইয়র্কে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে ঢাকায়।

ফকির আলমগীরের হাজারও স্মৃতি মনে পড়ছে। এক বর্ণাঢ্য অসাধারণ শিল্পী হিসাবে অনেক বড় তিনি। দেশবরেণ্য শিল্পী। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। তার গান পৌঁছে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। খুব কম শিল্পীর জীবনেই এমন সৌভাগ্য ঘটে। ফকির আলমগীর গণমানুষের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। আমার অগ্রজ বন্ধু তিনি। কোনোদিন তার মন খারাপ দেখিনি। চ্যানেল আই, বাংলাদেশ টেলিভিশন, শহিদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমি, সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে যখনই তার সঙ্গে দেখা হতো, তিনি উদ্ভাসিত হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাছে এসে দাঁড়াতেন। নিত্যনতুন পরিকল্পনা। নতুন গান তৈরির গল্প। আগামীতে কী করতে চান কিংবা গণসঙ্গীত নিয়ে তার স্বপ্নের কথা তিনি বলতেন। কী যে কাজের উৎসাহ। ক্লান্তিহীন তার কাজের স্বপ্ন। আর সব স্বপ্নই তার ছিল বাংলা গানকে ঘিরে। ফকির আলমগীর ছিলেন অসম্ভব স্বাপ্নিক। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে কত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ঋষিজ পদক বিতরণ করতেন প্রতিবছর। আমাদের দেশে গণসঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূর্বসূরিদের সম্মান জানানোর ব্যাপারে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন।

দেশে-বিদেশে মঞ্চ কাঁপানো শিল্পী ছিলেন তিনি। বাবরি চুল ঝাঁকিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে গান পরিবেশন করতেন। তার পরিবেশনা দেখেনি এমন সংস্কৃতিবান ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ফকির আলমগীর আচারে-ব্যবহারে ছিলেন শিশুর মতো। গানকে ভালোবেসে একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন। গানই ছিল তার প্রাণ। গানের বাইরে তিনি কিছু ভাবতেন না।

ষাট দশকের শেষে আবির্ভাব। সত্তর দশকে পপ গান গেয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তারপর নিজেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে থাকেন। দেশের গান, মেহনতি মানুষের গান, সমাজ বদলের গান গেয়ে তিনি বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। মানুষের জন্য গান- এই বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অটল। যে কোনো সংকটে, যে কোনো রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তিনি চারণ কবির মতো গান বেঁধে ফেলতেন। এমন যোগ্যতা আর কারও মধ্যে দেখা যায় না।

এই তো গত মে দিবসে তিনি চ্যানেল আইতে গান দিয়ে শুরু অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। গত বিজয় দিবসে বিজয়মেলায় তিনি সারাদিন লাল-সবুজ পোশাক পরে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইতে।

বলতেন, করোনা থেকে সাবধান থাকতে হবে। ঘরেই বেশি সময় থাকা উচিত। সেই মরণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এই বেদনা ও ক্ষতি আমরা এখনই উপলব্ধি করতে পারব না। ফকির গানের বাদশা। তার অনন্ত যাত্রায় আমাদের সবার দোয়া।

২.

গণমানুষের শিল্পী, মেহনতি মানুষের শিল্পী... বাংলা গণসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ ফকির আলমগীর। তার কণ্ঠে আর কখনো রাজপথ প্রকম্পিত হবে না। মেহনতি মানুষের বজ্রমুষ্ঠি আর তার গান শুনে আকাশপানে উঠবে না। সংগীতের মাধ্যমে ফকির আলমগীর রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে গান গেয়ে। কোথায় নেই তিনি?

ফকির আলমগীর সঙ্গীতের মাধ্যমে রাজপথে রেখেছেন শিল্পের ছোঁয়া আর শিল্পে তুলে এনেছেন রাজপথের গান। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনে তার গান ছিল অনন্য হাতিয়ার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসাবে তার উপস্থিতি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের করেছে উজ্জীবিত।

সত্তরের দশকে বাংলা আধুনিক গানে পাশ্চাত্যের ধারাকে যোগ করা ফকির আলমগীর বাংলা পপ গানের ধারার অন্যতম প্রবর্তক। তার গাওয়া গণসঙ্গীত আমাদের বাংলা গানকে ঋদ্ধ করেছে। প্রতিবাদী গানের শিল্পীদের দল হিসাবে তিনি গড়েছিলেন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী।

৩.

আমার জানামতে ব্যক্তিজীবনে ১ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন গণমানুষের কিংবদন্তি গায়ক ফকির আলমগীর। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’, ‘মায়ের একধার দুধের দাম’ গানগুলো এতটাই জনপ্রিয় যে ফকির আলমগীরকে চেনেন না এমন মানুষও অন্তর থেকে এই গান গেয়ে ওঠেন। ১৯৮২ সালে বিটিভির আনন্দমেলায় প্রথম প্রচারিত হয় ‘ও সখিনা’ গানটি।

দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ফকির আলমগীর বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। নিজে গান রচনা করতেন এবং সময়কে ধারণ করে প্রতিবাদী গান গাইতেন, যা সাধারণ মানুষকে আন্দোলন-সংগ্রামে ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা জোগায়।

ফকির আলমগীর চ্যানেল আই পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। নতুন কোনো গান তৈরি হলেই চ্যানেল আইতে আসতেন। চ্যানেল আইয়ের সকালের গানের অনুষ্ঠান, দুপুরের তারকাকথন অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন নিয়মিত শিল্পী। মেহনতি মানুষের প্রিয় শিল্পী ফকির আলমগীরকে লাল সালাম।

ফরিদুর রেজা সাগর : লেখক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন