বড় গাছ থেকে এখনই আগাছা দূর করা দরকার
jugantor
তৃতীয় মত
বড় গাছ থেকে এখনই আগাছা দূর করা দরকার

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

২৬ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অসতর্কতা একজন বড় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেও ক্ষমতাচ্যুত করে

গাছ যখন বুড়ো হয়, তাতে আগাছা জন্মে। এই আগাছা সময়মতো পরিষ্কার করা না হলে তাতে নানা ধরনের কীট বাসা বাঁধে। তারা গাছটাকে খেতে শুরু করে। গাছটি মাথা উঁচু করে তারপরও দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সামান্য ঝড়ে পড়ে যায়। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন পুরোনো আর্টস বিল্ডিংয়ের সামনে একটি প্রায় শতবর্ষের গাছ হঠাৎ ভেঙে পড়ে যায়। অত বড় গাছ, রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় পতিত এই গাছ সরাতে পাঁচ দিন লেগেছিল। আমার ভয় হয়, আওয়ামী লীগ নামক প্রাচীন সংগঠনটিরও আজ এই অবস্থা। এত আগাছা জন্মেছে এবং এত কীট গাছটির শেকড় খেতে শুরু করেছে যে, ভয় হয় এই গাছটি না হঠাৎ পড়ে যায়। তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য এক চরম দুর্ভাগ্য।

ঢাকার কাগজে ফেনীর নিজাম হাজারীর শিষ্য আবুল কালামের কীর্তিকাণ্ডের খবর পড়লাম। এক গরু ব্যবসায়ীকে এই আবুল কালাম গুলি করে হত্যা করেছে। তার অভিপ্রায় ছিল, নিহত মোহাম্মদ শাহজালালের গরুগুলো চুরি করা। শাহজালালের বয়স ৩৫। সদ্যবিবাহিত। তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। এখন এই হতভাগ্য পরিবারটির ভবিষ্যৎ কী? পুলিশ আবুল কালামের দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের একজন তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, আবুল কালাম নিজেই গরু ব্যবসায়ীকে গুলি করে। তারপর তিনজনে মিলে লাশটি পুকুরে ফেলে দেয়। ফেনী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘাতক পৌর কাউন্সিলরকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। আমার এই লেখাটি পাঠকদের চোখে পৌঁছার আগেই আবুল কালাম হয়তো গ্রেফতার হবে, এই আশা করছি।

আওয়ামী লীগ এখন আবুল কালামে ভর্তি। একজনকে শাস্তি দিলে কী হবে, ১০ জন আবুল কালাম বেরিয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী যে এত বড় শুদ্ধি অভিযান চালালেন, তার পরিণতি কী হলো? ছাত্রলীগ ও যুবলীগ, এমনকি আওয়ামী লীগ কি শুদ্ধ হয়েছে? তাহলে ফেনীর এই আবুল কালামের আবির্ভাব হয় কীভাবে? ফেনীতে যখন জয়নাল হাজারীর আবির্ভাব হয় এবং তার কর্মকাণ্ডে সারা এলাকা কাঁপছে, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি প্রত্যেক জেলায় একজন করে জয়নাল হাজারী চান। তার এই কথাটার ভেতর যুক্তি ছিল। তখন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সর্বত্রই উগ্র মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবাধে হত্যা ও জখম করা হচ্ছিল। তখন আওয়ামী লীগকেও গণতন্ত্রের ভাষা একটু পাল্টে মারের বদলা মার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগের যারা সারথি ছিলেন, তাদের মধ্যে ফেনীর জয়নাল হাজারীও একজন। তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। বিএনপির শাসনামলে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য তিনি যখন কলকাতায়, আমিও তখন সেই শহরে। জয়নাল হাজারীর সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। পরে তাকে যখন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করেন, তখনই আমার মনে হয়েছিল ফেনীর রাজনীতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পূর্ণ করার জন্য ভালো মানুষ পাওয়া যাবে না। এটি আমি আমার এক কলামে লিখেছিলামও। আওয়ামী লীগ নেতারা কর্ণপাত করেননি। জয়নাল হাজারীর বদলে নিজাম হাজারীকে ফেনীর রাজনীতিতে নেতৃত্বে আনা হয়। নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পাওয়া গেছে অসংখ্য সন্ত্রাসী পোষণের অভিযোগ। আবুল কালামও তার রিক্রুট। নিজাম হাজারীর সুনজরে পড়ার আগে আবুল কালাম যুবদলে ছিল। নিজাম হাজারী তাকে প্রথমে যুবলীগে আনেন। যুবলীগে আসার কিছুদিনের মধ্যে আবুল কালাম আওয়ামী লীগেরও নেতা হয়ে বসেন। তার অত্যাচারে সারা এলাকা জর্জরিত। তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা রতন হত্যারও অভিযোগ ছিল।

ছাত্রলীগ নেতা রতনকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানেই গরু ব্যবসায়ী শাহজালালকে হত্যা করা হয়। রতনের বড় ভাই এখন আমেরিকায় আছেন। তিনি ঢাকার একটি কাগজকে বলেছেন, রতন হত্যা মামলার আসামি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, আবার নেতা হয়েছে। এখন চাঁদাবাজি করছে এবং মানুষ খুন করছে, এটি খুবই লজ্জাজনক। এ রকম খুনি চরিত্রের কত যুবক আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাস করছে এবং কেউ কেউ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে চারদিকে খুনখারাবি করার অবাধ লাইসেন্স পেয়েছে, তা আমি জানি না।

আবুল কালাম ১৯৯৬ সালে ছিল ভিপি জয়নালের শিষ্য। তার হাত ধরে বিএনপির ক্যাডার হিসাবে কালামের রাজনীতির মাঠে নামা। তখন থেকেই তার খুনখারাবি শুরু। এটি জেনেও তাকে আওয়ামী লীগে নেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারী তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর বানান। ফেনী পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তিনি সাধারণ সম্পাদকও। তার এই দ্রুত উন্নতির মূলে রয়েছে আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার পৃষ্ঠপোষকতা। আবুল কালামের দুষ্কৃতির বিস্তারিত বিবরণ এখানে পুনরুল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কারণ ঢাকার কাগজগুলোতে তার সবিস্তার বিবরণ বেরিয়েছে। আমার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের সঠিক নেতাকর্মীদের এত দীর্ঘ কয়েক বছরের ত্যাগ, আত্মদান এবং জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগা সবই কি ব্যর্থ হবে এ অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে?

ভারতের এবং বাংলাদেশেরও কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্য সংগ্রহের একটা কড়া নিয়ম আছে। বাংলাদেশের জামায়াতও এই নিয়মটি অনুসরণ করে। যে কেউ দু’আনা চাঁদা দিয়ে এই দুটি দলের সদস্য হতে পারেন না। যারা সদস্য হতে চান, তাদের প্রথমে দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন, তার পরীক্ষা দিতে হয়, দলও তাদের চরিত্র ও জীবনযাপন সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। যখন দল নিশ্চিত হয়, যে ব্যক্তি সদস্য হতে চায়, তার চরিত্র ভালো এবং দলের আদর্শের প্রতি আনুগত্যও সঠিক, তখনই তাকে দলে গ্রহণ করা হয়।

অবশ্য একটি গণতান্ত্রিক দলে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়। সেখানে সবারই অবাধ অধিকার। ভারতের কংগ্রেসে যা ঘটেছে, বাংলাদেশের আওয়ামী লীগেও তাই ঘটছে। দুটি দলই এখন বৃদ্ধ বনস্পতি। কংগ্রেসের নেতৃত্ব নেহেরু পরিবারের হাতে। তারা অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও অসংখ্য সাম্প্রদায়িক নেতা ও কর্মী কংগ্রেসে অনুপ্রবেশ করেছে। আজ আর কংগ্রেস আগের সেই দল নেই। আজ আওয়ামী লীগেরও শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক; কিন্তু দলে বানের জলের মতো সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ এবং নীতিহীন ও চরিত্রহীন মানুষের ঢল ঢুকে পড়েছে।

এই আওয়ামী লীগে যদি কঠোর হাতে পরগাছা বর্জন শুরু না হয়, তাহলে আমার সন্দেহ হয়, কেবল টাকাওয়ালা মানুষকে নির্বাচনে নমিনেশন দিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হবে কিনা। একবার-দুবার প্রশাসনিক সাহায্যে নির্বাচনে জেতা যায়। বারবার জেতা যায় না। আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করছে, তাদের আর কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অবশিষ্ট নেই। বিএনপি এখন নেতৃত্বহীন, সংগঠনহীন। জামায়াত কার্যত অবলুপ্ত। হেফাজত মার খেয়ে ঘরে উঠেছে। সুতরাং আওয়ামী লীগের আর বিপদ কী? তাদের যে একমাত্র সমালোচক ছিল সুশীলসমাজ, তাদের আজ কোনো গোলটেবিল করতেও দেখা যায় না। সুতরাং আওয়ামী লীগকে আর পায় কে? তারা গোঁফে তা দিয়ে ভাবছেন আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা মূলধন করে তারা আবার নির্বাচিত হবেন এবং লুটপাট অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু কোনো শাসকেরই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা তার জন্য বিপজ্জনক। শূন্যতার মধ্য থেকে কখন কীভাবে প্রচণ্ড ঝড় উঠবে এবং সেই ঝড় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে তার কোনো ঠিক নেই।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নার মৃত্যুর পর ভেবেছিলেন, তার সামনে ফাঁকা ময়দান। তিনি যদি এখন পাকিস্তানের স্থায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে যান, তাহলেও তাকে কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু আকস্মিকভাবে তারই পোষা জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে মাথা তুললেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে মাথা তুললেন আইয়ুব শাসনের ঘোরবিরোধী শেখ মুজিবুর রহমান। তাসের ঘরের মতো আইয়ুবের সাধের মৌলিক গণতন্ত্র, তার নিজের বাদশাহী কোথায় ভেসে গেল! আজ আইয়ুবের রাজনৈতিক দল কনভেনশন মুসলিম লীগের খোঁজ ইতিহাসের ছেঁড়া পাতাতেও পাওয়া যাবে না। আমি বেঁচে থাকতে আওয়ামী লীগের এই পতন দশা দেখে যাব, তা যেন না হয়। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, আওয়ামী লীগ নেতাদের হুঁশ হোক। তারা দলে বানের জলে ভেসে আসা আবুল কালামদের বিতাড়ন করুন!

এটি আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জা ফেনীতে বসে রাজনীতির জল ঘোলা করছেন! তিনি ওবায়দুল কাদের এবং দলের বিরুদ্ধে যেসব কথা বলছেন, সেজন্য বহুদিন আগে তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাদের মির্জা কাদের ভরসায়, কাদের সাহসে ফেনীতে কালাপাহাড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তা আমি জানি না। কাদের মির্জা যা বলছেন, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই তা বলার অধিকার কাউকে দেওয়া হয় না। অথচ কাদের মির্জা মনে হয় বিদ্রোহ করে ফেনীতে তার একটি সরকার গঠন করেছেন এবং শাসন চালাচ্ছেন। তাকে দমন করা না হলে আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে আরও এ রকম ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমেরিকায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চেয়েছিলেন তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে বর্ণ-সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। বুশের সব অনাচারের ক্লেদ ঝেঁটিয়ে দূর করবেন। তার এক বন্ধু তাকে বলেছিলেন- ওবামা, প্রেসিডেন্ট হিসাবে তুমি যতই শক্তিশালী হও, আমেরিকার একটি ক্ষুধার্ত রাষ্ট্রযন্ত্র আছে। সে প্রত্যেক প্রেসিডেন্টকে কিছুদিনের মধ্যে হজম করে ফেলে। যাদের পারে না, উগরে ফেলে দেয়, যেমন জন এফ কেনেডি। ওবামা ক্ষমতায় বসে তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাকে তার বিরোধী নেত্রী হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দিতে হয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানি আর্মিকে যুদ্ধে পরাজিত করে। কিন্তু তারা যে রাষ্ট্রযন্ত্রটি গড়ে দিয়ে গেছে, তাকে পরাজিত করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে এ রাষ্ট্রযন্ত্র হত্যা করেছে। শেখ হাসিনাকে তারা গ্রাস করেছে। দেশ এখন আমলাতন্ত্রের দ্বারা চালিত। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী কীভাবে পালিত হবে তা-ও নির্ধারণ করে এ রাষ্ট্রযন্ত্র। জনগণ নয়। আজ যদি আওয়ামী লীগ তার আগের রাজনৈতিক চরিত্র ফিরে না পায়, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে এ দলটির পতন অনিবার্য। আমি এই দলের শুভাকাক্ষী এবং সমর্থক বলেই এ কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করছি। শেখ হাসিনা অত্যন্ত শক্তিশালী দেশনেত্রী। কিন্তু মার্গারেট থ্যাচারের মতো শক্তিশালী নেত্রী কীভাবে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়েছিলেন, সে ইতিহাস তাকে স্মরণ করতে বলি। আওয়ামী লীগের প্রকৃত মিত্রদের তিনি ডেকে আনুন।

দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করুন। যে বানের জল দলে ঢুকেছে তাদের কীভাবে সরাবেন, কীভাবে দলকে আগাছামুক্ত বটবৃক্ষে পরিণত করবেন, তার উপায় উদ্ভাবন করুন। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, অসতর্কতা একজন বড় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেও ক্ষমতাচ্যুত করে। এ অসতর্কতা থেকে আওয়ামী লীগ মুক্ত হোক।

লন্ডন, ২৪ জুলাই, শনিবার, ২০২১

তৃতীয় মত

বড় গাছ থেকে এখনই আগাছা দূর করা দরকার

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
২৬ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অসতর্কতা একজন বড় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেও ক্ষমতাচ্যুত করে
গাছ যখন বুড়ো হয়, তাতে আগাছা জন্মে। এই আগাছা সময়মতো পরিষ্কার করা না হলে তাতে নানা ধরনের কীট বাসা বাঁধে

গাছ যখন বুড়ো হয়, তাতে আগাছা জন্মে। এই আগাছা সময়মতো পরিষ্কার করা না হলে তাতে নানা ধরনের কীট বাসা বাঁধে। তারা গাছটাকে খেতে শুরু করে। গাছটি মাথা উঁচু করে তারপরও দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সামান্য ঝড়ে পড়ে যায়। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন পুরোনো আর্টস বিল্ডিংয়ের সামনে একটি প্রায় শতবর্ষের গাছ হঠাৎ ভেঙে পড়ে যায়। অত বড় গাছ, রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় পতিত এই গাছ সরাতে পাঁচ দিন লেগেছিল। আমার ভয় হয়, আওয়ামী লীগ নামক প্রাচীন সংগঠনটিরও আজ এই অবস্থা। এত আগাছা জন্মেছে এবং এত কীট গাছটির শেকড় খেতে শুরু করেছে যে, ভয় হয় এই গাছটি না হঠাৎ পড়ে যায়। তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য এক চরম দুর্ভাগ্য।

ঢাকার কাগজে ফেনীর নিজাম হাজারীর শিষ্য আবুল কালামের কীর্তিকাণ্ডের খবর পড়লাম। এক গরু ব্যবসায়ীকে এই আবুল কালাম গুলি করে হত্যা করেছে। তার অভিপ্রায় ছিল, নিহত মোহাম্মদ শাহজালালের গরুগুলো চুরি করা। শাহজালালের বয়স ৩৫। সদ্যবিবাহিত। তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। এখন এই হতভাগ্য পরিবারটির ভবিষ্যৎ কী? পুলিশ আবুল কালামের দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের একজন তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, আবুল কালাম নিজেই গরু ব্যবসায়ীকে গুলি করে। তারপর তিনজনে মিলে লাশটি পুকুরে ফেলে দেয়। ফেনী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘাতক পৌর কাউন্সিলরকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। আমার এই লেখাটি পাঠকদের চোখে পৌঁছার আগেই আবুল কালাম হয়তো গ্রেফতার হবে, এই আশা করছি।

আওয়ামী লীগ এখন আবুল কালামে ভর্তি। একজনকে শাস্তি দিলে কী হবে, ১০ জন আবুল কালাম বেরিয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী যে এত বড় শুদ্ধি অভিযান চালালেন, তার পরিণতি কী হলো? ছাত্রলীগ ও যুবলীগ, এমনকি আওয়ামী লীগ কি শুদ্ধ হয়েছে? তাহলে ফেনীর এই আবুল কালামের আবির্ভাব হয় কীভাবে? ফেনীতে যখন জয়নাল হাজারীর আবির্ভাব হয় এবং তার কর্মকাণ্ডে সারা এলাকা কাঁপছে, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি প্রত্যেক জেলায় একজন করে জয়নাল হাজারী চান। তার এই কথাটার ভেতর যুক্তি ছিল। তখন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সর্বত্রই উগ্র মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবাধে হত্যা ও জখম করা হচ্ছিল। তখন আওয়ামী লীগকেও গণতন্ত্রের ভাষা একটু পাল্টে মারের বদলা মার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগের যারা সারথি ছিলেন, তাদের মধ্যে ফেনীর জয়নাল হাজারীও একজন। তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। বিএনপির শাসনামলে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য তিনি যখন কলকাতায়, আমিও তখন সেই শহরে। জয়নাল হাজারীর সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। পরে তাকে যখন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করেন, তখনই আমার মনে হয়েছিল ফেনীর রাজনীতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পূর্ণ করার জন্য ভালো মানুষ পাওয়া যাবে না। এটি আমি আমার এক কলামে লিখেছিলামও। আওয়ামী লীগ নেতারা কর্ণপাত করেননি। জয়নাল হাজারীর বদলে নিজাম হাজারীকে ফেনীর রাজনীতিতে নেতৃত্বে আনা হয়। নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পাওয়া গেছে অসংখ্য সন্ত্রাসী পোষণের অভিযোগ। আবুল কালামও তার রিক্রুট। নিজাম হাজারীর সুনজরে পড়ার আগে আবুল কালাম যুবদলে ছিল। নিজাম হাজারী তাকে প্রথমে যুবলীগে আনেন। যুবলীগে আসার কিছুদিনের মধ্যে আবুল কালাম আওয়ামী লীগেরও নেতা হয়ে বসেন। তার অত্যাচারে সারা এলাকা জর্জরিত। তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা রতন হত্যারও অভিযোগ ছিল।

ছাত্রলীগ নেতা রতনকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানেই গরু ব্যবসায়ী শাহজালালকে হত্যা করা হয়। রতনের বড় ভাই এখন আমেরিকায় আছেন। তিনি ঢাকার একটি কাগজকে বলেছেন, রতন হত্যা মামলার আসামি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, আবার নেতা হয়েছে। এখন চাঁদাবাজি করছে এবং মানুষ খুন করছে, এটি খুবই লজ্জাজনক। এ রকম খুনি চরিত্রের কত যুবক আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাস করছে এবং কেউ কেউ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে চারদিকে খুনখারাবি করার অবাধ লাইসেন্স পেয়েছে, তা আমি জানি না।

আবুল কালাম ১৯৯৬ সালে ছিল ভিপি জয়নালের শিষ্য। তার হাত ধরে বিএনপির ক্যাডার হিসাবে কালামের রাজনীতির মাঠে নামা। তখন থেকেই তার খুনখারাবি শুরু। এটি জেনেও তাকে আওয়ামী লীগে নেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারী তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর বানান। ফেনী পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তিনি সাধারণ সম্পাদকও। তার এই দ্রুত উন্নতির মূলে রয়েছে আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার পৃষ্ঠপোষকতা। আবুল কালামের দুষ্কৃতির বিস্তারিত বিবরণ এখানে পুনরুল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কারণ ঢাকার কাগজগুলোতে তার সবিস্তার বিবরণ বেরিয়েছে। আমার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের সঠিক নেতাকর্মীদের এত দীর্ঘ কয়েক বছরের ত্যাগ, আত্মদান এবং জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগা সবই কি ব্যর্থ হবে এ অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে?

ভারতের এবং বাংলাদেশেরও কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্য সংগ্রহের একটা কড়া নিয়ম আছে। বাংলাদেশের জামায়াতও এই নিয়মটি অনুসরণ করে। যে কেউ দু’আনা চাঁদা দিয়ে এই দুটি দলের সদস্য হতে পারেন না। যারা সদস্য হতে চান, তাদের প্রথমে দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন, তার পরীক্ষা দিতে হয়, দলও তাদের চরিত্র ও জীবনযাপন সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। যখন দল নিশ্চিত হয়, যে ব্যক্তি সদস্য হতে চায়, তার চরিত্র ভালো এবং দলের আদর্শের প্রতি আনুগত্যও সঠিক, তখনই তাকে দলে গ্রহণ করা হয়।

অবশ্য একটি গণতান্ত্রিক দলে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়। সেখানে সবারই অবাধ অধিকার। ভারতের কংগ্রেসে যা ঘটেছে, বাংলাদেশের আওয়ামী লীগেও তাই ঘটছে। দুটি দলই এখন বৃদ্ধ বনস্পতি। কংগ্রেসের নেতৃত্ব নেহেরু পরিবারের হাতে। তারা অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও অসংখ্য সাম্প্রদায়িক নেতা ও কর্মী কংগ্রেসে অনুপ্রবেশ করেছে। আজ আর কংগ্রেস আগের সেই দল নেই। আজ আওয়ামী লীগেরও শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক; কিন্তু দলে বানের জলের মতো সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ এবং নীতিহীন ও চরিত্রহীন মানুষের ঢল ঢুকে পড়েছে।

এই আওয়ামী লীগে যদি কঠোর হাতে পরগাছা বর্জন শুরু না হয়, তাহলে আমার সন্দেহ হয়, কেবল টাকাওয়ালা মানুষকে নির্বাচনে নমিনেশন দিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হবে কিনা। একবার-দুবার প্রশাসনিক সাহায্যে নির্বাচনে জেতা যায়। বারবার জেতা যায় না। আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করছে, তাদের আর কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অবশিষ্ট নেই। বিএনপি এখন নেতৃত্বহীন, সংগঠনহীন। জামায়াত কার্যত অবলুপ্ত। হেফাজত মার খেয়ে ঘরে উঠেছে। সুতরাং আওয়ামী লীগের আর বিপদ কী? তাদের যে একমাত্র সমালোচক ছিল সুশীলসমাজ, তাদের আজ কোনো গোলটেবিল করতেও দেখা যায় না। সুতরাং আওয়ামী লীগকে আর পায় কে? তারা গোঁফে তা দিয়ে ভাবছেন আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা মূলধন করে তারা আবার নির্বাচিত হবেন এবং লুটপাট অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু কোনো শাসকেরই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা তার জন্য বিপজ্জনক। শূন্যতার মধ্য থেকে কখন কীভাবে প্রচণ্ড ঝড় উঠবে এবং সেই ঝড় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে তার কোনো ঠিক নেই।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নার মৃত্যুর পর ভেবেছিলেন, তার সামনে ফাঁকা ময়দান। তিনি যদি এখন পাকিস্তানের স্থায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে যান, তাহলেও তাকে কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু আকস্মিকভাবে তারই পোষা জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে মাথা তুললেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে মাথা তুললেন আইয়ুব শাসনের ঘোরবিরোধী শেখ মুজিবুর রহমান। তাসের ঘরের মতো আইয়ুবের সাধের মৌলিক গণতন্ত্র, তার নিজের বাদশাহী কোথায় ভেসে গেল! আজ আইয়ুবের রাজনৈতিক দল কনভেনশন মুসলিম লীগের খোঁজ ইতিহাসের ছেঁড়া পাতাতেও পাওয়া যাবে না। আমি বেঁচে থাকতে আওয়ামী লীগের এই পতন দশা দেখে যাব, তা যেন না হয়। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, আওয়ামী লীগ নেতাদের হুঁশ হোক। তারা দলে বানের জলে ভেসে আসা আবুল কালামদের বিতাড়ন করুন!

এটি আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জা ফেনীতে বসে রাজনীতির জল ঘোলা করছেন! তিনি ওবায়দুল কাদের এবং দলের বিরুদ্ধে যেসব কথা বলছেন, সেজন্য বহুদিন আগে তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাদের মির্জা কাদের ভরসায়, কাদের সাহসে ফেনীতে কালাপাহাড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তা আমি জানি না। কাদের মির্জা যা বলছেন, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই তা বলার অধিকার কাউকে দেওয়া হয় না। অথচ কাদের মির্জা মনে হয় বিদ্রোহ করে ফেনীতে তার একটি সরকার গঠন করেছেন এবং শাসন চালাচ্ছেন। তাকে দমন করা না হলে আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে আরও এ রকম ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমেরিকায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চেয়েছিলেন তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে বর্ণ-সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। বুশের সব অনাচারের ক্লেদ ঝেঁটিয়ে দূর করবেন। তার এক বন্ধু তাকে বলেছিলেন- ওবামা, প্রেসিডেন্ট হিসাবে তুমি যতই শক্তিশালী হও, আমেরিকার একটি ক্ষুধার্ত রাষ্ট্রযন্ত্র আছে। সে প্রত্যেক প্রেসিডেন্টকে কিছুদিনের মধ্যে হজম করে ফেলে। যাদের পারে না, উগরে ফেলে দেয়, যেমন জন এফ কেনেডি। ওবামা ক্ষমতায় বসে তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাকে তার বিরোধী নেত্রী হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দিতে হয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানি আর্মিকে যুদ্ধে পরাজিত করে। কিন্তু তারা যে রাষ্ট্রযন্ত্রটি গড়ে দিয়ে গেছে, তাকে পরাজিত করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে এ রাষ্ট্রযন্ত্র হত্যা করেছে। শেখ হাসিনাকে তারা গ্রাস করেছে। দেশ এখন আমলাতন্ত্রের দ্বারা চালিত। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী কীভাবে পালিত হবে তা-ও নির্ধারণ করে এ রাষ্ট্রযন্ত্র। জনগণ নয়। আজ যদি আওয়ামী লীগ তার আগের রাজনৈতিক চরিত্র ফিরে না পায়, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে এ দলটির পতন অনিবার্য। আমি এই দলের শুভাকাক্ষী এবং সমর্থক বলেই এ কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করছি। শেখ হাসিনা অত্যন্ত শক্তিশালী দেশনেত্রী। কিন্তু মার্গারেট থ্যাচারের মতো শক্তিশালী নেত্রী কীভাবে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়েছিলেন, সে ইতিহাস তাকে স্মরণ করতে বলি। আওয়ামী লীগের প্রকৃত মিত্রদের তিনি ডেকে আনুন।

দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করুন। যে বানের জল দলে ঢুকেছে তাদের কীভাবে সরাবেন, কীভাবে দলকে আগাছামুক্ত বটবৃক্ষে পরিণত করবেন, তার উপায় উদ্ভাবন করুন। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, অসতর্কতা একজন বড় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেও ক্ষমতাচ্যুত করে। এ অসতর্কতা থেকে আওয়ামী লীগ মুক্ত হোক।

লন্ডন, ২৪ জুলাই, শনিবার, ২০২১

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন