করোনাকালের নয়া মহামারি ‘বাল্যবিবাহ’
jugantor
করোনাকালের নয়া মহামারি ‘বাল্যবিবাহ’

  ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত  

৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমার কাছে এ মুহূর্তে রত্নার চেয়ে ভালো উদাহরণ নেই। রত্না আমাদের প্রতিষ্ঠিত মল্লিকা ছানাউল্লা আনছারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এ স্কুলের ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তার বিয়ে নিয়ে পরিবারে তোড়জোড় বাধে।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি এবং আমার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সে যাত্রা বিয়ে আটকানো গেলেও মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই রত্নার বিয়ে হয়ে যায়। তার শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি সেখানেই। রত্না সত্যিকার অর্থেই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। স্বপ্ন দেখতো চিকিৎসক হওয়ার, মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করার। কিন্তু বাল্যবিবাহের করাল গ্রাস তার জীবনকে ওই মাধ্যমিকেই থমকে দিল।

দেশে প্রতিদিন এরকম শত শত রত্না বাল্যবিবাহের কারণে ঝরে পড়ছে। এ বিষয়ক সংশ্লিষ্ট পক্ষ যতই কঠোর হচ্ছে, অপরাধীরা ততই চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে বাল্যবিবাহ সমাজে এক নিরোধ-অনুপযোগী বিষফোঁড়া হয়ে টিকে যাচ্ছে। আর করোনা মহামারিতে এ বিষফোঁড়া আরও বেশি ফুলেফেঁপে উঠেছে। করোনাকালে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকায় অর্থনৈতিকভাবে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা বাল্যবিবাহের গতির পালে হাওয়া দিতে অন্যতম প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে এবং করছে।

আমরা খেয়াল করেছি, করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। বেড়েছে অবসাদ, অভাব ও অশিক্ষা। এগুলোও বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী। বলে রাখি, বাল্যবিবাহে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান চতুর্থ। সংখ্যার দিক থেকে আমরা ভারতের পরেই অবস্থান করছি। দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ কন্যাসন্তান বাল্যবিবাহের শিকার। গেল দুই বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে এবং ২২ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছরের আগে। কিন্তু করোনাকালে ১৩ শতাংশ বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এর মূল কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে তৈরি হওয়া অভাবের কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলো একরকম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও লকডাউন থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরছে, বিয়ে করছে। আর পরিবারগুলো মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছে।

লকডাউনে লোক সমাগম নিষিদ্ধ থাকায় বিয়ের খরচ কম হচ্ছে, এর সুযোগ নিচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। অন্যভাবে দেখলে, খরচের দিক থেকে লাভবান হচ্ছে দুই পরিবারই। শুধু তাই নয়, যেসব পরিবার করোনাকালে জীবিকার সংকটে নাজেহাল, তারাও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে সন্তানদের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইছে।

বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি করছে। অবকাঠামোগত, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, শিল্প, কর্মসংস্থান ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই। চলমান করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশ এগিয়ে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সফলতা গণটিকা কার্যক্রম। এ মুহূর্তে কয়েক ধরনের কোভিড-১৯ টিকা প্রদানের মাধ্যমে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানেও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মোদ্দা কথা, করোনা মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও নানা সংকট ডানা মেলেছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশই প্রান্তিক কৃষক, তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব রয়েছে, সচেতনতার অভাব রয়েছে। গ্রাম ও শহরে করোনা মহামারিতে জীবন ও জীবিকার সংকট রয়েছে।

কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ মহামারিতে জীবিকার সংস্থান করতে না পারায় পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরে আসছে। এসব মোকাবিলায় সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে, প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশের পরও দেশের কিছু কিছু স্থানে প্রণোদনার অর্থ সঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে না বলে আমরা সংবাদ পাচ্ছি। উপরের সবগুলো বিষয়ই কোনো না কোনোভাবে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে।

গবেষণা ও জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনা

আগেই বলেছি, করোনাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গবেষণার মাধ্যমে বাল্যবিবাহের প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করতে চাই। ব্র্যাক জানাচ্ছে, ৮৫ শতাংশ অভিভাবক উল্লেখ করেছেন, করোনাকালে জীবিকার সংকট থাকায় তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এ কারণে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই কন্যাসন্তানের বিয়ে দিতে আগ্রহী। ৭১ শতাংশ জানিয়েছে, স্কুল খোলায় অনিশ্চয়তা থাকার এবং করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় অনিরাপত্তাবোধে বাল্যবিবাহের প্রতি ঝুঁকছে।

৬২ শতাংশ জানিয়েছে, প্রবাসী ছেলে সহজেই পেয়ে যাওয়ায় তারা কন্যাসন্তানদের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ জানাচ্ছে, ৩ বছর ধরে দেশে বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে। তবে শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী এ মুহূর্তে ৫ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে, যার মধ্যে ২ লাখ দক্ষিণ এশিয়ায়। প্রায় ১০ লাখ বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সন্তানসম্ভবা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

করোনার কারণে ২০২৫ সাল নাগাদ বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়ে ২ কোটিতে পৌঁছতে পারে বলেও মনে করছে সংস্থাটি। সম্প্রতি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কোভিড-১৯ ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক নিয়ে। সেখানে দেখানো হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ কুড়িগ্রামে সংঘটিত হলেও করোনাকালে দেশের প্রতিটি জেলায় এর হার বেড়েছে। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, করোনাকালে নিবন্ধিত বিয়ে কমছে; বাড়ছে অনিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা, যার মূলত পুরোটাই বাল্যবিবাহ। সংস্থাটি এ জরিপ চালিয়েছে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

বাল্যবিবাহের প্রভাব

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়ার ন্যূনতম বয়সের ব্যাপারে অবগত। ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহকে সমর্থন করে না এবং ৯৬ শতাংশ বিশ্বাস করে, বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়া জরুরি। প্রশ্ন আসে, বাল্যবিবাহের কারণে আমরা কী ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি? আমরা যদি একটু তৃণমূল পর্যায় থেকে চিন্তা করি; বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।

অর্থনৈতিক অভাব, শিক্ষার অভাব, যৌতুক প্রথা, ইভটিজিং, অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা, যৌন নির্যাতন-এসব বিষয় বাল্যবিবাহে প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক হওয়ায় দেশে নারীশিক্ষার প্রসার বেড়েছে। কিন্তু শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি হলেও বাকি বিষয়গুলোর কারণে নারীদের ভবিষ্যৎ যাত্রা অনেকাংশেই মুখ থুবড়ে পড়ছে।

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় সমস্যা স্বাস্থ্যঝুঁকি। বাল্যবিবাহের সঙ্গে প্রজনন স্বাস্থ্য ও বয়ঃসন্ধির সম্পর্ক রয়েছে। ইউএনএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ৫৭টি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে না। অন্যভাবে বলা যায়, এ ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা কম।

দেশের নারীরা শুরু থেকেই অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে। করোনাকালে তা আরও বেড়েছে এবং কোভিড-১৯ মহামারিকালে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নারীর প্রতি সহিংসতা ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীদের অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ, গর্ভপাত ও অনিরাপদ সন্তান প্রসবের ঘটনা বাড়ছে, সন্তান ও মায়ের অপুষ্টিজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে

দেশের প্রথাগত আইনে বাল্যবিবাহকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে’ এর সাজা হিসাবে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান রয়েছে। যেহেতু বেশিরভাগ বাল্যবিবাহই সংঘটিত হয় গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে, তাই এ পরিমাণ দণ্ড তাদের জন্য বড় শাস্তি বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু তবুও এ আইন বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। আইনজীবীদের অভিযোগ, বাল্যবিবাহ নিয়ে থানায় অভিযোগ কম, যে কারণে শাস্তি পায় না অপরাধীরা। অন্যদিকে, দরিদ্র ও শিক্ষার অভাব থাকায় প্রচলিত আইনের চেয়ে গ্রামীণ সালিশকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়।

তবে অপরাধীরা যেমন নতুন নতুন পথের আশ্রয় নিচ্ছে, তেমনি সরকার ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার ঘটনাও বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। সরকারি হেল্পলাইন ৩৩৩ বাল্যবিবাহ রোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে এ হেল্পলাইনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। করোনা মহামারিতে এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি কম থাকার সুযোগ নিয়েই বাল্যবিবাহ বাড়ছে। তাই সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগই এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে।

শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, পরিবারগুলোক কাউন্সেলিং করাতে হবে। বাল্যবিবাহের ঝুঁকি আছে এমন দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সরকারি সামাজিক কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা যেতে পারে।

এনজিওগুলোর মাধ্যমেও আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বড় ফল পেতে পারি। আইনি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এসব সংস্থার ইতিবাচক অবদান রয়েছে। আমরা জানি, এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সেক্ষেত্রে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও এ ব্যাপারে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই তারা ৩৩৩-এ ফোন করে সরকারকে অবহিত করতে পারে।

সরকার নারীর সমতায় বিশ্বাস করে। নারীদের এগিয়ে নিতে নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। কিন্তু করোনাকালে বাল্যবিবাহের লাগাম ধরে না রাখতে পারলে আমরা সামনের দিনে যে প্রজন্ম পাব, তা সত্যিকার অর্থেই সংকটাপন্ন হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত, এমপি : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন

করোনাকালের নয়া মহামারি ‘বাল্যবিবাহ’

 ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত 
৩১ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমার কাছে এ মুহূর্তে রত্নার চেয়ে ভালো উদাহরণ নেই। রত্না আমাদের প্রতিষ্ঠিত মল্লিকা ছানাউল্লা আনছারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এ স্কুলের ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তার বিয়ে নিয়ে পরিবারে তোড়জোড় বাধে।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি এবং আমার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সে যাত্রা বিয়ে আটকানো গেলেও মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই রত্নার বিয়ে হয়ে যায়। তার শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি সেখানেই। রত্না সত্যিকার অর্থেই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। স্বপ্ন দেখতো চিকিৎসক হওয়ার, মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করার। কিন্তু বাল্যবিবাহের করাল গ্রাস তার জীবনকে ওই মাধ্যমিকেই থমকে দিল।

দেশে প্রতিদিন এরকম শত শত রত্না বাল্যবিবাহের কারণে ঝরে পড়ছে। এ বিষয়ক সংশ্লিষ্ট পক্ষ যতই কঠোর হচ্ছে, অপরাধীরা ততই চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে বাল্যবিবাহ সমাজে এক নিরোধ-অনুপযোগী বিষফোঁড়া হয়ে টিকে যাচ্ছে। আর করোনা মহামারিতে এ বিষফোঁড়া আরও বেশি ফুলেফেঁপে উঠেছে। করোনাকালে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকায় অর্থনৈতিকভাবে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা বাল্যবিবাহের গতির পালে হাওয়া দিতে অন্যতম প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে এবং করছে।

আমরা খেয়াল করেছি, করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। বেড়েছে অবসাদ, অভাব ও অশিক্ষা। এগুলোও বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী। বলে রাখি, বাল্যবিবাহে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান চতুর্থ। সংখ্যার দিক থেকে আমরা ভারতের পরেই অবস্থান করছি। দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ কন্যাসন্তান বাল্যবিবাহের শিকার। গেল দুই বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে এবং ২২ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছরের আগে। কিন্তু করোনাকালে ১৩ শতাংশ বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এর মূল কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে তৈরি হওয়া অভাবের কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলো একরকম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও লকডাউন থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরছে, বিয়ে করছে। আর পরিবারগুলো মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছে।

লকডাউনে লোক সমাগম নিষিদ্ধ থাকায় বিয়ের খরচ কম হচ্ছে, এর সুযোগ নিচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। অন্যভাবে দেখলে, খরচের দিক থেকে লাভবান হচ্ছে দুই পরিবারই। শুধু তাই নয়, যেসব পরিবার করোনাকালে জীবিকার সংকটে নাজেহাল, তারাও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে সন্তানদের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইছে।

বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি করছে। অবকাঠামোগত, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, শিল্প, কর্মসংস্থান ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই। চলমান করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশ এগিয়ে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সফলতা গণটিকা কার্যক্রম। এ মুহূর্তে কয়েক ধরনের কোভিড-১৯ টিকা প্রদানের মাধ্যমে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানেও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মোদ্দা কথা, করোনা মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও নানা সংকট ডানা মেলেছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশই প্রান্তিক কৃষক, তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব রয়েছে, সচেতনতার অভাব রয়েছে। গ্রাম ও শহরে করোনা মহামারিতে জীবন ও জীবিকার সংকট রয়েছে।

কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ মহামারিতে জীবিকার সংস্থান করতে না পারায় পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরে আসছে। এসব মোকাবিলায় সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে, প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশের পরও দেশের কিছু কিছু স্থানে প্রণোদনার অর্থ সঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে না বলে আমরা সংবাদ পাচ্ছি। উপরের সবগুলো বিষয়ই কোনো না কোনোভাবে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে।

গবেষণা ও জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনা

আগেই বলেছি, করোনাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গবেষণার মাধ্যমে বাল্যবিবাহের প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করতে চাই। ব্র্যাক জানাচ্ছে, ৮৫ শতাংশ অভিভাবক উল্লেখ করেছেন, করোনাকালে জীবিকার সংকট থাকায় তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এ কারণে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই কন্যাসন্তানের বিয়ে দিতে আগ্রহী। ৭১ শতাংশ জানিয়েছে, স্কুল খোলায় অনিশ্চয়তা থাকার এবং করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় অনিরাপত্তাবোধে বাল্যবিবাহের প্রতি ঝুঁকছে।

৬২ শতাংশ জানিয়েছে, প্রবাসী ছেলে সহজেই পেয়ে যাওয়ায় তারা কন্যাসন্তানদের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ জানাচ্ছে, ৩ বছর ধরে দেশে বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে। তবে শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী এ মুহূর্তে ৫ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে, যার মধ্যে ২ লাখ দক্ষিণ এশিয়ায়। প্রায় ১০ লাখ বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সন্তানসম্ভবা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

করোনার কারণে ২০২৫ সাল নাগাদ বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়ে ২ কোটিতে পৌঁছতে পারে বলেও মনে করছে সংস্থাটি। সম্প্রতি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কোভিড-১৯ ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক নিয়ে। সেখানে দেখানো হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ কুড়িগ্রামে সংঘটিত হলেও করোনাকালে দেশের প্রতিটি জেলায় এর হার বেড়েছে। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, করোনাকালে নিবন্ধিত বিয়ে কমছে; বাড়ছে অনিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা, যার মূলত পুরোটাই বাল্যবিবাহ। সংস্থাটি এ জরিপ চালিয়েছে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

বাল্যবিবাহের প্রভাব

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়ার ন্যূনতম বয়সের ব্যাপারে অবগত। ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহকে সমর্থন করে না এবং ৯৬ শতাংশ বিশ্বাস করে, বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়া জরুরি। প্রশ্ন আসে, বাল্যবিবাহের কারণে আমরা কী ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি? আমরা যদি একটু তৃণমূল পর্যায় থেকে চিন্তা করি; বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।

অর্থনৈতিক অভাব, শিক্ষার অভাব, যৌতুক প্রথা, ইভটিজিং, অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা, যৌন নির্যাতন-এসব বিষয় বাল্যবিবাহে প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক হওয়ায় দেশে নারীশিক্ষার প্রসার বেড়েছে। কিন্তু শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি হলেও বাকি বিষয়গুলোর কারণে নারীদের ভবিষ্যৎ যাত্রা অনেকাংশেই মুখ থুবড়ে পড়ছে।

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় সমস্যা স্বাস্থ্যঝুঁকি। বাল্যবিবাহের সঙ্গে প্রজনন স্বাস্থ্য ও বয়ঃসন্ধির সম্পর্ক রয়েছে। ইউএনএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ৫৭টি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে না। অন্যভাবে বলা যায়, এ ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা কম।

দেশের নারীরা শুরু থেকেই অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে। করোনাকালে তা আরও বেড়েছে এবং কোভিড-১৯ মহামারিকালে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নারীর প্রতি সহিংসতা ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীদের অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ, গর্ভপাত ও অনিরাপদ সন্তান প্রসবের ঘটনা বাড়ছে, সন্তান ও মায়ের অপুষ্টিজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে

দেশের প্রথাগত আইনে বাল্যবিবাহকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে’ এর সাজা হিসাবে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান রয়েছে। যেহেতু বেশিরভাগ বাল্যবিবাহই সংঘটিত হয় গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে, তাই এ পরিমাণ দণ্ড তাদের জন্য বড় শাস্তি বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু তবুও এ আইন বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। আইনজীবীদের অভিযোগ, বাল্যবিবাহ নিয়ে থানায় অভিযোগ কম, যে কারণে শাস্তি পায় না অপরাধীরা। অন্যদিকে, দরিদ্র ও শিক্ষার অভাব থাকায় প্রচলিত আইনের চেয়ে গ্রামীণ সালিশকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়।

তবে অপরাধীরা যেমন নতুন নতুন পথের আশ্রয় নিচ্ছে, তেমনি সরকার ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার ঘটনাও বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। সরকারি হেল্পলাইন ৩৩৩ বাল্যবিবাহ রোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে এ হেল্পলাইনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। করোনা মহামারিতে এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি কম থাকার সুযোগ নিয়েই বাল্যবিবাহ বাড়ছে। তাই সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগই এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে।

শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, পরিবারগুলোক কাউন্সেলিং করাতে হবে। বাল্যবিবাহের ঝুঁকি আছে এমন দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সরকারি সামাজিক কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা যেতে পারে।

এনজিওগুলোর মাধ্যমেও আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বড় ফল পেতে পারি। আইনি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এসব সংস্থার ইতিবাচক অবদান রয়েছে। আমরা জানি, এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সেক্ষেত্রে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও এ ব্যাপারে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই তারা ৩৩৩-এ ফোন করে সরকারকে অবহিত করতে পারে।

সরকার নারীর সমতায় বিশ্বাস করে। নারীদের এগিয়ে নিতে নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। কিন্তু করোনাকালে বাল্যবিবাহের লাগাম ধরে না রাখতে পারলে আমরা সামনের দিনে যে প্রজন্ম পাব, তা সত্যিকার অর্থেই সংকটাপন্ন হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত, এমপি : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

১৭ অক্টোবর, ২০২১