শব্দে ও ছন্দে পিতার মুখ
jugantor
শব্দে ও ছন্দে পিতার মুখ

  ইকবাল খোরশেদ  

০৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কয়েক হাজার কবিতা লেখা হয়েছে বলে অনুমান করি। জানামতে, দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। দেশের বাইরে কলকাতার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও লিখেছেন। কবিদের পাশাপাশি মনীষ ঘটক, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, সেলিনা হোসেনের মতো খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকও বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে কবিতা রচনা করেছেন।

এটা জোর দিয়েই বলা যায়, বিশ্বে এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই, যাকে নিয়ে রচিত হয়েছে এত বিচিত্র কবিতা! কেন এত কবিতা রচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে? এ প্রশ্নের জবাব খুব সহজ। বঙ্গবন্ধু এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; যার দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা, নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রসবোধ ইত্যাদি তাকে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও সংবেদনশীল কবিদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফলে বেদনাহত কবিকুল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেছেন বহু মর্মস্পর্শী কবিতা।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতাবলিকে আমরা দুটি কালপর্বে ভাগ করতে পারি। একটি তার জীবনকালে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের আগে রচিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয়বাহী কবিতাবলি; অন্যটি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বেদনামথিত উচ্চারণগাথা। পঁচাত্তর পূর্বকালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যারা কবিতা লিখেছেন; তাদের মধ্যে জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, নির্মলেন্দু গুণ অন্যতম। বাদ যাননি পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকরাও। দক্ষিণারঞ্জন বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র চক্রবর্তী, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, বিনোদ বেরা, বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এবং পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেছেন কবিতা।

জানামতে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতা লেখার কৃতিত্ব কবি নির্মলেন্দু গুণের। ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর তিনি প্রথম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘প্রচ্ছদের জন্য’ শিরোনামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি তখন দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। কবিতাটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ হননি। পরে অবশ্য নির্মলেন্দু গুণ কবিতাটির নাম বদলে ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ রাখেন।

১৯৬৯ সালে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় জেলবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। ওই সভায় সে সময়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কবি জসীমউদ্দীন ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি রচনা করেন। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এটি দ্বিতীয় কবিতা। কবিতাটির সূচনা পঙ্ক্তিমালা উদ্ধৃত করছি-

মুজিবুর রহমান

ওই নাম যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নি উগারি বান।

বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,

জ্বালায় জ্বলিয়ে মহাকালের ঝঞ্ঝা অশনি বেয়ে;

বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা যার,

হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যের অংগার

দিনে দিনে হয় বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে

দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান দিল প্রকাশের মুখে

তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি

ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি,

নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশ হয় ১৯৭০ সালে। প্রকাশ হওয়ার পরপরই বইটি দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা ওই বইয়ের ‘হুলিয়া’ কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ আবার শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করেন। সেই সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা মাথায় নিয়ে ফেরার এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী হতাশ হয়ে উচ্চারণ করেন- ‘শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?’ এ কবিতা নিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় তার জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ একটি নিবন্ধ লিখেন। ওই লেখা পড়ে শেখ মুজিবুর রহমান নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিলেন।

সেই সত্তরের দশকের শুরুতে ত্রিপুরার কবি রামপ্রসাদ দত্ত ‘ইয়াহিয়া খান তাণ্ডবনৃত্য’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি দীর্ঘ পালাগান রচনা করেন, সেখানে বারবার এসেছে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ। সেই পালাগানের দুটি চরণ উদ্ধৃত করছি- আছেন শেখ মুজিবুর ভাই জয় বাংলাদেশে/শাসনতন্ত্র গঠন করে মনের উল্লাসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লিখে কারাবন্দি হন পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম। লাহোর ডিস্ট্রিক্ট জেলে বসে লেখা তার ‘সিরাজউদ্দৌলা ধোলা’ কবিতাটি তিনি উৎসর্গ করেন বঙ্গবন্ধুকে। তার দৃষ্টিতে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার মতো স্বাধীনতার রক্ষক। ভারতের প্রথিতযশা উর্দুভাষী কবি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কাইফি আজমি ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক যে কবিতাটি রচনা করেন, সেখানেও উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বীরগাথা। ভারতের আরেক কালজয়ী চিন্তানায়ক ও মানবতাবাদী সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে রচনা করেন অমর পঙ্ক্তিমালা-

যতকাল রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।

দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা

রক্তগঙ্গা বহমান

তবু নাই ভয় হবে হবে জয়।

জয় মুজিবুর রহমান॥

১৯৭৫ পূর্বকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশের লোককবিরা কোনো কবিতা লিখেছিলেন কিনা, তা আমাদের সামনে এখনো আসেনি। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গবেষকের গবেষণায় উঠে আসবে।

দুই.

কবি শামসুর রাহমান তার ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে লিখেছেন : ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার পর নিদারুণ বৈরী পরিবেশে প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের কণ্ঠে। কেননা, ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত’ বঙ্গবন্ধু এ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের চেতনালোকে সাংঘাতিক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলা ভাষার কবিদের কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অসামান্য সব কবিতা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতা রচনা করেন বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলবী শেখ আব্দুল হালিম। বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে সমাধিস্থ করার পর তিনি লেখেন তার মনোবেদনা। আরবি ভাষার এই শিক্ষক কবিতাটি লেখেন আরবি ভাষায়। পরে তিনি নিজেই আবার আরবি থেকে বাংলায় তরজমা করেন-

হে মহান, যার অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত

যাঁর আলোতে সারা হিন্দুস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছিল

আমি আমার নিজেকে তোমার কবরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিতেছি, যে তুমি কবরে শায়িত

আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি, ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা-

নিশ্চয়ই তুমি জগতে বিশ্বের উৎপীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে

সেহেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে-

আমরা মহান আল্লাহর নিকট তোমার আখিরাতের মঙ্গল কামনা করি।

বিদায়! বিদায়! বিদায়! হে মহান জাতির জনক।

বাংলাদেশের উর্দুভাষার শীর্ষস্থানীয় কবি নওশাদ নূরীও বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরে মর্মাহত হয়ে রচনা করেন ‘উত্থান-উৎস’ শীর্ষক কবিতা। তিনি লেখেন-

‘সে আছে, সে আছে-

সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে সে আছে,

সে আছে সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার।’

নওশাদ নূরীর উল্লিখিত চরণগুলোতে শামসুর রাহমানের সেই কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই-‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’ কবি নওশাদ নূরীর জন্ম ভারতের বিহারে। তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুকে দাফনের পর সতেরোই আগস্ট আরও একটি কবিতা লেখেন নওশাদ নূরী। কবিতার শিরোনাম ‘নজম টুঙ্গিপাড়া’। কবির উচ্চারণ-

‘তোমরা কি জান? তোমরা কী জান?

পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,

পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে।’

নওশাদ নূরীর উদ্ধৃত দুটো কবিতাই অনুবাদ করেন কবি আসাদ চৌধুরী। পঁচাত্তর সালে আরও একটি কবিতা রচিত হয় সাংবাদিক-সাহিত্যিক সন্তোষ গুপ্তের কলমে; শিরোনাম ‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী’। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সেনাশাসিত বাংলাদেশে নির্মলেন্দু গুণই সবার আগে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেন তার ‘আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতায়। কবিতার কয়েকটি চরণ-

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,

রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ

গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

আবার নির্মলেন্দু গুণের কবিতাতেই সবচেয়ে বেশিবার বঙ্গবন্ধু এসেছেন ঘুরেফিরে নানামাত্রিকতায়। কবির ‘মুজিবমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা ত্রিশটির মতো কবিতা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো- ‘প্রচ্ছদের জন্য : শেখ মুজিবুর রহমানকে’, ‘সুবর্ণ গোলাপের জন্য’, ‘শেখ মুজিব ১৯৭১’, ‘সেই খুনের গল্প ১৯৭৫’, ‘ভয় নেই’, ‘রাজদণ্ড’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’, ‘শেষ দেখা’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘শোকগাথা : ১৬ আগস্ট ১৯৭৫’, ‘পুনশ্চ মুজিবকথা’, ‘আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো’, ‘প্রত্যাবর্তনের আনন্দ’ ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজন প্রতিবাদী তরুণ প্রকাশ করেন একটি কবিতা-সংকলন। সংকলনটির শিরোনাম ছিল- ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’ এটি প্রকাশ হয় ১৯৭৮ সালে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এটিই ছিল প্রথম সংকলন। এ দুঃসাহসিক সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু। সংকলনে মোট ত্রিশটি কবিতা ছাপা হয়েছিল এবং সম্পাদক হিসাবে কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অজ্ঞাত সংগঠন ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী’র নামে সংকলনটি প্রকাশ হয়। ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলনটি যখন প্রকাশ হয়, তখন ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার মতো মানুষ ছিল হাতেগোনা। ওই সংকলনে তরুণ কবি কামাল চৌধুরী ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে অনন্যসাধারণ এক কবিতা রচনা করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতার একটি বই প্রকাশ করেন। ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ কবিতাটির প্রথমাংশ উপস্থাপন করছি-

কবরের নির্জন প্রবাসে

তোমার আত্মার মাগফেরাতের জন্য

যেসব বৃদ্ধেরা কাঁদে

আমাদের যে-সব বোনেরা

পিতা, ভাই, সন্তানের মতো

তোমার পবিত্র নাম

ভালোবেসে হৃদয়ে রেখেছে

যে-সব সাহসী লোক

বঙ্গোপসাগরের সব দুরন্ত মাঝির মতো

শোষিতের বৈঠা ধরে আছে

হে আমার স্বাধীনতার মহান স্থপতি

মহান প্রভুর নামে আমার শপথ

সেইসব বৃদ্ধদের প্রতি আমার শপথ

সেইসব ভাই-বোন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি আমার শপথ

আমি প্রতিশোধ নেব

আমার রক্ত ও শ্রম দিয়ে

এই বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জঘন্য হত্যার আমি প্রতিশোধ নেব।

দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বেশ কিছু কবিতা লেখেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেন বেদনামথিত শোকবিলাপ। গ্রিক রাজা অ্যাগামেননের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপন করে তিনি গভীর মমতায় কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেন। কবি উচ্চারণ করেন-

অ্যাগামেননের কবরে শায়িত আজ

আড়ালে বিলাপ করি একা

আমার সকল স্বপ্নেও তুমি

নিষিদ্ধ আজ

তোমার দুহিতা এ কী গুরুভার বয়।

জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল ছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষতবিক্ষত হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়েছিল সারাদেশের শোকগ্রস্ত মানুষের মনের কথা-

এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী

ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি

হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা

এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে, তার আঁকা ছবি, মুছে ফেল মিছে অশ্রু তোমার, আর কত রক্তের দরকার হবে, আমি সাক্ষী, আমার পরিচয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিতা রচনা করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তার ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি বর্তমানকালে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এ কবিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন যে, তিনি জাতির পিতার সন্তান, তাই তিনি পিতার ইতিহাস প্রেরণায় বাংলায় পথ চলেন। কবি বলেন-

এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?

যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;

তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথচলি-

চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।

হাসান হাফিজুর রহমান, সিকান্দার আবু জাফর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কায়সুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, মনজুরে মওলা, বেলাল চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, মহাদেব সাহা, অসীম সাহা, রবিউল হুসাইন, হেলাল হাফিজ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, হুমায়ুন আজাদসহ বাংলা ভাষার সব কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতাগুলো কবিদের নিজস্ব কবিতার বইয়ে অন্যান্য কবিতার সঙ্গে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতাবলি নানাজনের সম্পাদনায় সংকলন আকারে প্রকাশ পায়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা চেয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। সেই পিতাকেই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভোরে। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা চেয়েছিল বাংলার মাটি থেকে চিরতরে পিতার নাম মুছে ফেলতে। কিন্তু তাকে বাংলার মাটি থেকে, বাঙালির মনন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। দেশের কোনো-না-কোনো প্রান্তে প্রতিমুহূর্তে জাতির পিতার মুখ আঁকা হচ্ছে বাংলাভাষার কোনো-না-কোনো কবির কলমে শব্দে ও ছন্দে।

ইকবাল খোরশেদ : সাংবাদিক, গবেষক

শব্দে ও ছন্দে পিতার মুখ

 ইকবাল খোরশেদ 
০৩ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কয়েক হাজার কবিতা লেখা হয়েছে বলে অনুমান করি। জানামতে, দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। দেশের বাইরে কলকাতার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও লিখেছেন। কবিদের পাশাপাশি মনীষ ঘটক, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, সেলিনা হোসেনের মতো খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকও বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে কবিতা রচনা করেছেন।

এটা জোর দিয়েই বলা যায়, বিশ্বে এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই, যাকে নিয়ে রচিত হয়েছে এত বিচিত্র কবিতা! কেন এত কবিতা রচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে? এ প্রশ্নের জবাব খুব সহজ। বঙ্গবন্ধু এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; যার দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা, নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রসবোধ ইত্যাদি তাকে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও সংবেদনশীল কবিদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফলে বেদনাহত কবিকুল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেছেন বহু মর্মস্পর্শী কবিতা।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতাবলিকে আমরা দুটি কালপর্বে ভাগ করতে পারি। একটি তার জীবনকালে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের আগে রচিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয়বাহী কবিতাবলি; অন্যটি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বেদনামথিত উচ্চারণগাথা। পঁচাত্তর পূর্বকালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যারা কবিতা লিখেছেন; তাদের মধ্যে জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, নির্মলেন্দু গুণ অন্যতম। বাদ যাননি পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকরাও। দক্ষিণারঞ্জন বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র চক্রবর্তী, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, বিনোদ বেরা, বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এবং পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেছেন কবিতা।

জানামতে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতা লেখার কৃতিত্ব কবি নির্মলেন্দু গুণের। ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর তিনি প্রথম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘প্রচ্ছদের জন্য’ শিরোনামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি তখন দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। কবিতাটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ হননি। পরে অবশ্য নির্মলেন্দু গুণ কবিতাটির নাম বদলে ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ রাখেন।

১৯৬৯ সালে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় জেলবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। ওই সভায় সে সময়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কবি জসীমউদ্দীন ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি রচনা করেন। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এটি দ্বিতীয় কবিতা। কবিতাটির সূচনা পঙ্ক্তিমালা উদ্ধৃত করছি-

মুজিবুর রহমান

ওই নাম যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নি উগারি বান।

বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,

জ্বালায় জ্বলিয়ে মহাকালের ঝঞ্ঝা অশনি বেয়ে;

বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা যার,

হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যের অংগার

দিনে দিনে হয় বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে

দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান দিল প্রকাশের মুখে

তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি

ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি,

নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশ হয় ১৯৭০ সালে। প্রকাশ হওয়ার পরপরই বইটি দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা ওই বইয়ের ‘হুলিয়া’ কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ আবার শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করেন। সেই সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা মাথায় নিয়ে ফেরার এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী হতাশ হয়ে উচ্চারণ করেন- ‘শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?’ এ কবিতা নিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় তার জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ একটি নিবন্ধ লিখেন। ওই লেখা পড়ে শেখ মুজিবুর রহমান নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিলেন।

সেই সত্তরের দশকের শুরুতে ত্রিপুরার কবি রামপ্রসাদ দত্ত ‘ইয়াহিয়া খান তাণ্ডবনৃত্য’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি দীর্ঘ পালাগান রচনা করেন, সেখানে বারবার এসেছে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ। সেই পালাগানের দুটি চরণ উদ্ধৃত করছি- আছেন শেখ মুজিবুর ভাই জয় বাংলাদেশে/শাসনতন্ত্র গঠন করে মনের উল্লাসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লিখে কারাবন্দি হন পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম। লাহোর ডিস্ট্রিক্ট জেলে বসে লেখা তার ‘সিরাজউদ্দৌলা ধোলা’ কবিতাটি তিনি উৎসর্গ করেন বঙ্গবন্ধুকে। তার দৃষ্টিতে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার মতো স্বাধীনতার রক্ষক। ভারতের প্রথিতযশা উর্দুভাষী কবি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কাইফি আজমি ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক যে কবিতাটি রচনা করেন, সেখানেও উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বীরগাথা। ভারতের আরেক কালজয়ী চিন্তানায়ক ও মানবতাবাদী সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে রচনা করেন অমর পঙ্ক্তিমালা-

যতকাল রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।

দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা

রক্তগঙ্গা বহমান

তবু নাই ভয় হবে হবে জয়।

জয় মুজিবুর রহমান॥

১৯৭৫ পূর্বকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশের লোককবিরা কোনো কবিতা লিখেছিলেন কিনা, তা আমাদের সামনে এখনো আসেনি। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গবেষকের গবেষণায় উঠে আসবে।

দুই.

কবি শামসুর রাহমান তার ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে লিখেছেন : ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার পর নিদারুণ বৈরী পরিবেশে প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের কণ্ঠে। কেননা, ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত’ বঙ্গবন্ধু এ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের চেতনালোকে সাংঘাতিক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলা ভাষার কবিদের কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অসামান্য সব কবিতা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতা রচনা করেন বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলবী শেখ আব্দুল হালিম। বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে সমাধিস্থ করার পর তিনি লেখেন তার মনোবেদনা। আরবি ভাষার এই শিক্ষক কবিতাটি লেখেন আরবি ভাষায়। পরে তিনি নিজেই আবার আরবি থেকে বাংলায় তরজমা করেন-

হে মহান, যার অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত

যাঁর আলোতে সারা হিন্দুস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছিল

আমি আমার নিজেকে তোমার কবরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিতেছি, যে তুমি কবরে শায়িত

আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি, ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা-

নিশ্চয়ই তুমি জগতে বিশ্বের উৎপীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে

সেহেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে-

আমরা মহান আল্লাহর নিকট তোমার আখিরাতের মঙ্গল কামনা করি।

বিদায়! বিদায়! বিদায়! হে মহান জাতির জনক।

বাংলাদেশের উর্দুভাষার শীর্ষস্থানীয় কবি নওশাদ নূরীও বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরে মর্মাহত হয়ে রচনা করেন ‘উত্থান-উৎস’ শীর্ষক কবিতা। তিনি লেখেন-

‘সে আছে, সে আছে-

সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে সে আছে,

সে আছে সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার।’

নওশাদ নূরীর উল্লিখিত চরণগুলোতে শামসুর রাহমানের সেই কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই-‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’ কবি নওশাদ নূরীর জন্ম ভারতের বিহারে। তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুকে দাফনের পর সতেরোই আগস্ট আরও একটি কবিতা লেখেন নওশাদ নূরী। কবিতার শিরোনাম ‘নজম টুঙ্গিপাড়া’। কবির উচ্চারণ-

‘তোমরা কি জান? তোমরা কী জান?

পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,

পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে।’

নওশাদ নূরীর উদ্ধৃত দুটো কবিতাই অনুবাদ করেন কবি আসাদ চৌধুরী। পঁচাত্তর সালে আরও একটি কবিতা রচিত হয় সাংবাদিক-সাহিত্যিক সন্তোষ গুপ্তের কলমে; শিরোনাম ‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী’। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সেনাশাসিত বাংলাদেশে নির্মলেন্দু গুণই সবার আগে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেন তার ‘আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতায়। কবিতার কয়েকটি চরণ-

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,

রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ

গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

আবার নির্মলেন্দু গুণের কবিতাতেই সবচেয়ে বেশিবার বঙ্গবন্ধু এসেছেন ঘুরেফিরে নানামাত্রিকতায়। কবির ‘মুজিবমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা ত্রিশটির মতো কবিতা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো- ‘প্রচ্ছদের জন্য : শেখ মুজিবুর রহমানকে’, ‘সুবর্ণ গোলাপের জন্য’, ‘শেখ মুজিব ১৯৭১’, ‘সেই খুনের গল্প ১৯৭৫’, ‘ভয় নেই’, ‘রাজদণ্ড’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’, ‘শেষ দেখা’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘শোকগাথা : ১৬ আগস্ট ১৯৭৫’, ‘পুনশ্চ মুজিবকথা’, ‘আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো’, ‘প্রত্যাবর্তনের আনন্দ’ ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজন প্রতিবাদী তরুণ প্রকাশ করেন একটি কবিতা-সংকলন। সংকলনটির শিরোনাম ছিল- ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’ এটি প্রকাশ হয় ১৯৭৮ সালে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এটিই ছিল প্রথম সংকলন। এ দুঃসাহসিক সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু। সংকলনে মোট ত্রিশটি কবিতা ছাপা হয়েছিল এবং সম্পাদক হিসাবে কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অজ্ঞাত সংগঠন ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী’র নামে সংকলনটি প্রকাশ হয়। ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলনটি যখন প্রকাশ হয়, তখন ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার মতো মানুষ ছিল হাতেগোনা। ওই সংকলনে তরুণ কবি কামাল চৌধুরী ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে অনন্যসাধারণ এক কবিতা রচনা করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতার একটি বই প্রকাশ করেন। ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ কবিতাটির প্রথমাংশ উপস্থাপন করছি-

কবরের নির্জন প্রবাসে

তোমার আত্মার মাগফেরাতের জন্য

যেসব বৃদ্ধেরা কাঁদে

আমাদের যে-সব বোনেরা

পিতা, ভাই, সন্তানের মতো

তোমার পবিত্র নাম

ভালোবেসে হৃদয়ে রেখেছে

যে-সব সাহসী লোক

বঙ্গোপসাগরের সব দুরন্ত মাঝির মতো

শোষিতের বৈঠা ধরে আছে

হে আমার স্বাধীনতার মহান স্থপতি

মহান প্রভুর নামে আমার শপথ

সেইসব বৃদ্ধদের প্রতি আমার শপথ

সেইসব ভাই-বোন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি আমার শপথ

আমি প্রতিশোধ নেব

আমার রক্ত ও শ্রম দিয়ে

এই বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জঘন্য হত্যার আমি প্রতিশোধ নেব।

দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বেশ কিছু কবিতা লেখেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেন বেদনামথিত শোকবিলাপ। গ্রিক রাজা অ্যাগামেননের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপন করে তিনি গভীর মমতায় কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেন। কবি উচ্চারণ করেন-

অ্যাগামেননের কবরে শায়িত আজ

আড়ালে বিলাপ করি একা

আমার সকল স্বপ্নেও তুমি

নিষিদ্ধ আজ

তোমার দুহিতা এ কী গুরুভার বয়।

জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল ছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষতবিক্ষত হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়েছিল সারাদেশের শোকগ্রস্ত মানুষের মনের কথা-

এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী

ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি

হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা

এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে, তার আঁকা ছবি, মুছে ফেল মিছে অশ্রু তোমার, আর কত রক্তের দরকার হবে, আমি সাক্ষী, আমার পরিচয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিতা রচনা করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তার ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি বর্তমানকালে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এ কবিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন যে, তিনি জাতির পিতার সন্তান, তাই তিনি পিতার ইতিহাস প্রেরণায় বাংলায় পথ চলেন। কবি বলেন-

এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?

যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;

তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথচলি-

চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।

হাসান হাফিজুর রহমান, সিকান্দার আবু জাফর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কায়সুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, মনজুরে মওলা, বেলাল চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, মহাদেব সাহা, অসীম সাহা, রবিউল হুসাইন, হেলাল হাফিজ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, হুমায়ুন আজাদসহ বাংলা ভাষার সব কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতাগুলো কবিদের নিজস্ব কবিতার বইয়ে অন্যান্য কবিতার সঙ্গে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতাবলি নানাজনের সম্পাদনায় সংকলন আকারে প্রকাশ পায়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা চেয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। সেই পিতাকেই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভোরে। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা চেয়েছিল বাংলার মাটি থেকে চিরতরে পিতার নাম মুছে ফেলতে। কিন্তু তাকে বাংলার মাটি থেকে, বাঙালির মনন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। দেশের কোনো-না-কোনো প্রান্তে প্রতিমুহূর্তে জাতির পিতার মুখ আঁকা হচ্ছে বাংলাভাষার কোনো-না-কোনো কবির কলমে শব্দে ও ছন্দে।

ইকবাল খোরশেদ : সাংবাদিক, গবেষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট