ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা : অরাজনৈতিক দাবিও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা : অরাজনৈতিক দাবিও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

০৫ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র যেসব দার্শনিক উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ভলতেয়ার অগ্রগণ্য। তিনি বলেছেন, ‘Every man is guilty of all the good he didn't do’. প্রত্যেক মানুষ যেসব ভালো কাজ করতে পারে, তা না করার জন্য তারা অপরাধী হয়। ভলতেয়ার চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার সাধ্যমতো ভালো কাজ করবে।

যদি সে তা না করে বা এ ব্যাপারে কোনো রকম গাফিলতি করে, তার জন্য সে অপরাধী বলে বিবেচিত হবে। ফরাসি বিপ্লব পৃথিবীতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এ বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। এ তিনটির কোনোটি বাংলাদেশের বর্তমান সমাজে খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না।

ফরাসি বিপ্লব পূর্বতন সমাজকে (Ancient regime) আমূল পরিবর্তিত করে দিয়েছিল। পূর্বতন সমাজে তিনটি গোষ্ঠী ছিল। এগুলো হলো যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং জনসাধারণ। অভিজাত প্রভাবিত পূর্বতন সমাজের প্রতি শহরের জনতা ও বিপ্লবী বুর্জোয়া শ্রেণি অসন্তুষ্ট ছিল। শহরের জনতা ও বিপ্লবী বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শহরের জনতা পূর্বতন ব্যবস্থার ভারবাহী শ্রেণি। কিন্তু এ শ্রেণির মধ্যেও নানা বিভাজন ছিল।

এ কারণে এই শ্রেণিভুক্ত মানুষও বিপ্লবের প্রতি বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত। যে বিপুল জনতা প্রধানত কায়িক শ্রমের দ্বারা উৎপাদনে নিযুক্ত, অভিজাত ও বৃহৎ বুর্জোয়ারা অনেকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের নাম দিয়েছিল ‘জনতা’। ইংরেজিতে জনতাকে বলা হয় Public. সমস্যা হলো এই শ্রেণির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ সহজ ছিল না।

কারণ মধ্য অথবা নিম্ন বুর্জোয়া এবং শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা চিহ্নিত করা সম্ভব হতো না। যেসব কারিগর দাদন নিয়ে কাজ করত তারা ছিল নিম্ন বুর্জোয়া। কিন্তু নিম্ন বুর্জোয়া যেখানে অবসিত হতো সেখান থেকেই জনতার সূচনা। দাদনি কারিগরদের নিজস্ব উৎপাদন যন্ত্র ছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা পুঁজিবাদী বণিকদের বেতনভুক্ত কর্মচারীতে পরিণত হয়েছিল।

দাদনি কারিগর ছাড়াও ছিল মধ্যযুগীয় উৎপাদন ব্যবস্থার কর্মী এবং সম্প্রতি গড়ে ওঠা বৃহদায়তন শিল্পের শ্রমিক। বৃহদায়তন শিল্পের কর্মীরা ছিল যথার্থ শ্রমিক বা প্রলেতারিয়েত। এদের সঙ্গে শ্রমিক সংঘের শিক্ষানবিশদের কোনো মিল ছিল না। শিক্ষানবিশদের নানা রকম শর্ত মেনে চলতে হতো, কিন্তু কারখানার নিয়মশৃঙ্খলা ছিল লৌহ কঠিন। শহরের জনতার প্রধান অংশ ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যেমন- দিনমজুর, পত্রবাহক, মুটে, বাগানের মালি, ভিস্তিওয়ালা, কাঠুরে, গৃহভৃত্য, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি। আকালের সময়ে গ্রামের গরিব মানুষ শহরে চলে আসত।

অষ্টাদশ শতাব্দীকে ইউরোপের নাগরিক অভ্যুদয়ের শতাব্দী বলা যায়। এর ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামের তুলনায় শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বেশি। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা শহর ও গ্রামের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করি। ফরাসি দেশের রাজকীয় প্রশাসন সমাজের এ পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত ছিল। এটা বোঝা যায় ১৭৪৫ ও ১৭৬৫ সালের রাজ প্রজ্ঞাপন থেকে। এসব প্রজ্ঞাপনে জনসংখ্যার ভিত্তিতে শহরের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

শহরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকার ফলে উৎপাদনের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যেরও বৃদ্ধি ঘটে। সুতি বস্ত্রশিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গ্রামের ভূমিহীন চাষিরা শহরে চলে আসতে থাকে। এ সময় প্যারিসের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিয়ঁর জনসংখ্যা ছিল ১ লাখের কাছাকাছি। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিটি শহরের চেহারা ছিল মধ্যযুগীয়।

সব শহরই ছিল দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। ফ্রান্সের রাজতন্ত্রের শেষ শতাব্দীতে শহরের রাজপথগুলো হয়ে উঠেছিল প্রশস্ত। পৌর উদ্যান, জেটি ইত্যাদি নির্মাণের ফলে শহরগুলো আধুনিক রূপলাভ করে। অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদে শহরে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়ে যায় এবং এর সঙ্গে বাড়ে সামাজিক উত্তেজনা। ১৭৪০ থেকে ১৭৫০-এ শহরে আগত গ্রামের মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। কিন্তু এ ছিন্নমূল মানুষরা শহরের জনতার সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি। শহরের সম্ভ্রান্ত মানুষরা এসব দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষদের বিপজ্জনক সামাজিক গোষ্ঠী হিসাবে সন্দেহ করত।

এই যে দিন-আনা দিন-খাওয়া জনসাধারণ, তাদের আর্থিক সমস্যার মূলে ছিল মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। মূল্যবৃদ্ধির অসম প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে একরকম ছিল না। কারণ এসব শ্রেণির বাজেট কাঠামো ছিল ভিন্নতর। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিশাল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের তুলনায় খাদ্যসামগ্রীর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্গতি বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ রুটি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করত।

কিন্তু রুটি হয়ে উঠেছিল মহার্ঘ্য ও দুষ্প্রাপ্য। সাধারণ মানুষ তাদের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ রুটির জন্য ব্যয় করত। সবজি, চর্বি ও মদের জন্য ব্যয় করত ১৬ শতাংশ, পোশাকের জন্য ১৫ শতাংশ, জ্বালানির জন্য ৫ শতাংশ এবং মোমবাতির জন্য ১০ শতাংশ। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ১৭২৬-৪১ সময়কালের তুলনায় ১৭৭১-৮৯ সময়কালে বেড়েছিল ৪৫ শতাংশ।

আর ১৭৮৫-৮৯ সময়কালে বৃদ্ধি পায় ৬২ শতাংশ। ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল ১৭৮৯ সালে। ১৭৮৯ সালের অব্যবহিত পূর্বে মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের বাজেটে রুটির জন্য ব্যয় হতো ৫৮ শতাংশ। যারা বিত্তশালী ছিল তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি অসহনীয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু দরিদ্র জনসাধারণ দুর্গতিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার সবসময় মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পেছনে অতি মন্থর গতিতে এগোচ্ছিল।

মজুরির ঊর্ধ্বগতির সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। লাব্রুসের বেতন বৃদ্ধির হিসাব মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। লাব্রুসের হিসাব অনুযায়ী ১৭২৬-৪১ সময়কালের তুলনায় ১৭৭১-৮৯ সময়কালে মজুরি বেড়েছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। কিন্তু রুটির দাম বেড়েছিল ৮৮ শতাংশ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির ফলে অনেক সময় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেত এবং কৃষিতে ফলন ভালো না হওয়ায় কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেত। কৃষির সংকট শিল্পের সংকটকে ঘনিভূত করে তুলেছিল।

আঠারো শতকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস ছাড়া সাধারণ মানুষের টিকে থাকার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তা হয়নি। সাধারণ মানুষের দুর্দশা বেড়েই চলছিল এবং ক্ষুধা মানুষকে আন্দোলনমুখী করে তুলেছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটেছিল। বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কারণ কর্মপ্রার্থী মানুষের তুলনায় কর্মের জোগান ছিল অপ্রতুল।

এ কারণে ১৭৭৯ থেকে একটি সাধারণ বেতনহার প্রবর্তনের দাবিতে সচেতন শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৭৮৭-৮৯- এ ক’বছর শ্রমিকদের জন্য ভয়াবহ দুঃসময় হয়ে উঠেছিল। অকথ্য আর্থিক দুর্গতির জন্য ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক পরিবারের কর্তাকে কাপিতাসিও থেকে রেহাই দেওয়া হয় এবং রুটির মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়।

কিন্তু তাতেও ১০ হাজার পরিবারের অন্তত ৩০ হাজার লোকের ক্ষুধার অন্ন জোটেনি। ৩০ হাজার কংকালসার রক্তশূন্য প্রেতরূপী অসহায় মানুষ রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়। এরা ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া রেশম কারখানার শ্রমিক। কারণ রেশম তৈরির উপকরণ পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্ষুধার জ্বালায় এরা ধুঁকে ধুঁকে মরছিল। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের শ্রমিকদের অবস্থা প্রায় একই ধরনের দুর্দশাপূর্ণ ছিল।

১৭৮৯-এ নাগরিকদের নির্বাচনী সভায় শ্রমিকরা উপস্থিত হয়নি। অভিযোগের তালিকায় তাদের সমস্যার কোনো উল্লেখ ছিল না। সর্বোপরি তাদের প্রতি ব্যবসায়ীদের ছিল নিদারুণ অবজ্ঞা। তারা দাবি জানিয়েছিল, শ্রমিকদের সুশৃঙ্খল রাখার জন্য পুলিশ প্রয়োজন। মানুষে মানুষে বৈষম্য যে কী প্রকট ছিল, তা বোঝা যায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের খাবার-দাবার এবং পোশাক-আশাকের পার্থক্য থেকে।

অর্লেয়ার সাধারণ মানুষের খাদ্য : গম, যব ও পনির মেশানো রুটি; কারিগর ও শ্রমিকদের পোশাক প্যান্টালুন ও ব্লাউজ; বুর্জোয়াদের ব্রিচেস লিনেন অথবা বিদেশি মিহি কাপড়ে তৈরি কোট, টুপি, সুতো অথবা সিল্কের মোজা। জে. স্যাঁতুর বর্ণনা থেকে দেখা যায় দুরূজের কারিগরদের সীমাহীন দারিদ্র্য। বিবাহ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এরা সম্পূর্ণ বিত্তহীন। এদের প্রায় কারোরই ঘরবাড়ি নেই। এরা ভাড়াটে বাড়িতে বাস করত।

অথচ নিম্ন বুর্জোয়াদের অধিকাংশেরই নিজস্ব বাড়ি ছিল। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছিল ফ্রান্সের অধিকাংশ শহরে। ১৭৭৬ সালে ষোড়শ লুই তার মন্ত্রী আমেলকে নির্দেশ দেন ভিক্ষুকদের চার্চের অভ্যন্তরে অথবা বাড়ির দরজায় ভিক্ষা করতে দেওয়া চলবে না। বহু ভিক্ষুককে আটক করে রাখা হয়েছিল। তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি।

গ্রাম থেকে আরও বিরাট সংখ্যায় দরিদ্র মানুষ শহরগুলোতে ভিড় জমাচ্ছিল। এখানে লক্ষণীয় হলো, আজকের যুগে এসেও শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত দেখানোর জন্য পুলিশ কখনো কখনো ভিক্ষুকদের আটক করে দূরে কোথাও রেখে আসে। অর্থাৎ আমরা এখনো মধ্যযুগের প্রশাসনিক পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছি।

দুর্ভিক্ষ পীড়িত বুভুক্ষু জনতার আন্দোলনের ভয়ে অনেক সময় বিভিন্ন শহরের পৌর প্রশাসন পূর্বাহ্নেই ব্যবস্থা অবলম্বন করত। ১৭০৯-এ লাঁগদকের বিভিন্ন শহর একত্রিত হয়ে খাদ্যশস্য আনার জন্য ২০টি জাহাজ কার্বারিতে পাঠিয়েছিল। ১৭৫০-এ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় লিয়ঁ ৩ মিলিয়ন লিভ্র মূল্যের শস্য ক্রয় করে ভাণ্ডার পূর্ণ করে রাখে। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষও অনেক সময় শস্য ক্রয় করত অথবা শস্য ক্রয়ের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে অগ্রিম অর্থ প্রদান করত।

জনসাধারণ এটাকে শাসকদের Panic byuing মনে করত। মজুদদার ও রাজার বিরুদ্ধে আতঙ্কজনিত শস্য ক্রয়ের জন্য জনতার অভিযোগ ছিল। মানুষ শস্য ঘাটতির জন্য বিরূপ প্রকৃতিকে দায়ী করত না। বরং জনসাধারণ মনে করত কৃত্রিম উপায়ে খাদ্যশস্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করত খাদ্যশস্যের রিকুইজিশন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এর চড়া দামের কোনো সমাধান নেই।

জনতার মধ্যে যে বিপ্লবী স্পৃহা জেগে উঠেছিল, তার সঙ্গে রুটির দাবি ছিল অবিচ্ছেদ্দভাবে জড়িত। ফরাসি বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় রুটির দাবি থেকে। ১৭৮৮-৮৯-এ সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা এবং আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল আর্থিক দুরবস্থা থেকে। ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য দাঙ্গার সূচনা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেহনতি মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়।

এর ফলে বিক্ষোভ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, একজন শ্রমিকের জন্য দৈনিক ১৫ সু (প্রাচীন ফরাসি মুদ্রা) যথেষ্ট। এ বক্তব্যের সমর্থনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কেউ কেউ মন্তব্য প্রকাশ করে। এসব উক্তির বিরুদ্ধে ১৭৮৯-এর ২৭ এপ্রিল শ্রমিক বিক্ষোভ ঘটে। ২৮ এপ্রিল জনতা আপত্তিকর মন্তব্যকারীর বাড়িতে লুটতরাজ চালায় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

এ সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহত হয়। আর্থ-সামাজিক ইস্যুকে ভিত্তি করেই এ আন্দোলনের সূচনা। আন্দোলনে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত কোনো রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। এতদসত্ত্বেও রাজনৈতিক দিক থেকে আন্দোলন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনতা এ ধারণা পোষণ করত যে, খাদ্যাভাব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানের উপায় হলো ভোগ্যপণ্যের অধিগ্রহণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এ দাবি ছিল অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের দাবি।

অন্যদিকে বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল মুক্ত অর্থনীতির পূজারি। এ দুই বিপরীতমুখী অর্থনীতির ধারণা ফ্রান্সে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৭৮৯-এর জুলাই মাসে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা ছিল খাদ্যশস্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য জনতার দাবির ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজা ষোড়শ লুইর রানী মারি আঁত্তিওনেত বলেছিলেন, ‘প্রজারা খাবার জন্য আলু পাচ্ছে না তো কী হয়েছে? ওরা তো কেক খেলেই পারে।’

আমাদের দেশে একসময় মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভুখা মিছিল বের করা হয়েছিল। তখনকার মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর সম্পর্কেও এ ধরনের বালখিল্য মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী নাকি বলেছিলেন, এরা ভাত খেতে পায় না তো কী হয়েছে? পোলাও খেলেই তো পারে! এর কতটুকু সত্যতা আছে তা বলা মুশকিল। কিন্তু মানুষ যখন এ ধরনের গল্প করতে শুরু করে তখন বুঝতে হবে ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। ঝড় অত্যাসন্ন।

সুতরাং যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের একটু কান খাড়া করে শুনতে হবে জনতা কী বলাবলি করছে। এসব বলাবলির সত্যতা মুখ্য বিচার্য বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে জনতার ক্ষোভ ও আক্রোশের যে অনুভূতি প্রকাশ পায়, তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এটাকেই বোধহয় দেওয়ালের লিখন বলা হয়। এক সময় ছিল যখন দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হতো।

এটা রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে ‘চিকা মারা’ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় একটি দেওয়ালে বেশ খানিকটা উপরে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছিল, ‘আইয়ুব শাহী ধ্বংস হোক’। এর উপর চুন দিয়ে ব্রাশ করার পরও লেখাটি ভেসে উঠে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজ কার সাধ্য আছে এমনভাবে চিকা মারার। দেশে ‘গণতন্ত্র’ আছে!

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা : অরাজনৈতিক দাবিও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
০৫ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র যেসব দার্শনিক উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ভলতেয়ার অগ্রগণ্য। তিনি বলেছেন, ‘Every man is guilty of all the good he didn't do’. প্রত্যেক মানুষ যেসব ভালো কাজ করতে পারে, তা না করার জন্য তারা অপরাধী হয়। ভলতেয়ার চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার সাধ্যমতো ভালো কাজ করবে।

যদি সে তা না করে বা এ ব্যাপারে কোনো রকম গাফিলতি করে, তার জন্য সে অপরাধী বলে বিবেচিত হবে। ফরাসি বিপ্লব পৃথিবীতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এ বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। এ তিনটির কোনোটি বাংলাদেশের বর্তমান সমাজে খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না।

ফরাসি বিপ্লব পূর্বতন সমাজকে (Ancient regime) আমূল পরিবর্তিত করে দিয়েছিল। পূর্বতন সমাজে তিনটি গোষ্ঠী ছিল। এগুলো হলো যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং জনসাধারণ। অভিজাত প্রভাবিত পূর্বতন সমাজের প্রতি শহরের জনতা ও বিপ্লবী বুর্জোয়া শ্রেণি অসন্তুষ্ট ছিল। শহরের জনতা ও বিপ্লবী বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শহরের জনতা পূর্বতন ব্যবস্থার ভারবাহী শ্রেণি। কিন্তু এ শ্রেণির মধ্যেও নানা বিভাজন ছিল।

এ কারণে এই শ্রেণিভুক্ত মানুষও বিপ্লবের প্রতি বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত। যে বিপুল জনতা প্রধানত কায়িক শ্রমের দ্বারা উৎপাদনে নিযুক্ত, অভিজাত ও বৃহৎ বুর্জোয়ারা অনেকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের নাম দিয়েছিল ‘জনতা’। ইংরেজিতে জনতাকে বলা হয় Public. সমস্যা হলো এই শ্রেণির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ সহজ ছিল না।

কারণ মধ্য অথবা নিম্ন বুর্জোয়া এবং শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা চিহ্নিত করা সম্ভব হতো না। যেসব কারিগর দাদন নিয়ে কাজ করত তারা ছিল নিম্ন বুর্জোয়া। কিন্তু নিম্ন বুর্জোয়া যেখানে অবসিত হতো সেখান থেকেই জনতার সূচনা। দাদনি কারিগরদের নিজস্ব উৎপাদন যন্ত্র ছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা পুঁজিবাদী বণিকদের বেতনভুক্ত কর্মচারীতে পরিণত হয়েছিল।

দাদনি কারিগর ছাড়াও ছিল মধ্যযুগীয় উৎপাদন ব্যবস্থার কর্মী এবং সম্প্রতি গড়ে ওঠা বৃহদায়তন শিল্পের শ্রমিক। বৃহদায়তন শিল্পের কর্মীরা ছিল যথার্থ শ্রমিক বা প্রলেতারিয়েত। এদের সঙ্গে শ্রমিক সংঘের শিক্ষানবিশদের কোনো মিল ছিল না। শিক্ষানবিশদের নানা রকম শর্ত মেনে চলতে হতো, কিন্তু কারখানার নিয়মশৃঙ্খলা ছিল লৌহ কঠিন। শহরের জনতার প্রধান অংশ ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যেমন- দিনমজুর, পত্রবাহক, মুটে, বাগানের মালি, ভিস্তিওয়ালা, কাঠুরে, গৃহভৃত্য, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি। আকালের সময়ে গ্রামের গরিব মানুষ শহরে চলে আসত।

অষ্টাদশ শতাব্দীকে ইউরোপের নাগরিক অভ্যুদয়ের শতাব্দী বলা যায়। এর ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামের তুলনায় শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বেশি। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা শহর ও গ্রামের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করি। ফরাসি দেশের রাজকীয় প্রশাসন সমাজের এ পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত ছিল। এটা বোঝা যায় ১৭৪৫ ও ১৭৬৫ সালের রাজ প্রজ্ঞাপন থেকে। এসব প্রজ্ঞাপনে জনসংখ্যার ভিত্তিতে শহরের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

শহরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকার ফলে উৎপাদনের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যেরও বৃদ্ধি ঘটে। সুতি বস্ত্রশিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গ্রামের ভূমিহীন চাষিরা শহরে চলে আসতে থাকে। এ সময় প্যারিসের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিয়ঁর জনসংখ্যা ছিল ১ লাখের কাছাকাছি। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিটি শহরের চেহারা ছিল মধ্যযুগীয়।

সব শহরই ছিল দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। ফ্রান্সের রাজতন্ত্রের শেষ শতাব্দীতে শহরের রাজপথগুলো হয়ে উঠেছিল প্রশস্ত। পৌর উদ্যান, জেটি ইত্যাদি নির্মাণের ফলে শহরগুলো আধুনিক রূপলাভ করে। অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদে শহরে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়ে যায় এবং এর সঙ্গে বাড়ে সামাজিক উত্তেজনা। ১৭৪০ থেকে ১৭৫০-এ শহরে আগত গ্রামের মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। কিন্তু এ ছিন্নমূল মানুষরা শহরের জনতার সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি। শহরের সম্ভ্রান্ত মানুষরা এসব দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষদের বিপজ্জনক সামাজিক গোষ্ঠী হিসাবে সন্দেহ করত।

এই যে দিন-আনা দিন-খাওয়া জনসাধারণ, তাদের আর্থিক সমস্যার মূলে ছিল মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। মূল্যবৃদ্ধির অসম প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে একরকম ছিল না। কারণ এসব শ্রেণির বাজেট কাঠামো ছিল ভিন্নতর। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিশাল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের তুলনায় খাদ্যসামগ্রীর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্গতি বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ রুটি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করত।

কিন্তু রুটি হয়ে উঠেছিল মহার্ঘ্য ও দুষ্প্রাপ্য। সাধারণ মানুষ তাদের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ রুটির জন্য ব্যয় করত। সবজি, চর্বি ও মদের জন্য ব্যয় করত ১৬ শতাংশ, পোশাকের জন্য ১৫ শতাংশ, জ্বালানির জন্য ৫ শতাংশ এবং মোমবাতির জন্য ১০ শতাংশ। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ১৭২৬-৪১ সময়কালের তুলনায় ১৭৭১-৮৯ সময়কালে বেড়েছিল ৪৫ শতাংশ।

আর ১৭৮৫-৮৯ সময়কালে বৃদ্ধি পায় ৬২ শতাংশ। ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল ১৭৮৯ সালে। ১৭৮৯ সালের অব্যবহিত পূর্বে মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের বাজেটে রুটির জন্য ব্যয় হতো ৫৮ শতাংশ। যারা বিত্তশালী ছিল তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি অসহনীয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু দরিদ্র জনসাধারণ দুর্গতিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার সবসময় মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পেছনে অতি মন্থর গতিতে এগোচ্ছিল।

মজুরির ঊর্ধ্বগতির সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। লাব্রুসের বেতন বৃদ্ধির হিসাব মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। লাব্রুসের হিসাব অনুযায়ী ১৭২৬-৪১ সময়কালের তুলনায় ১৭৭১-৮৯ সময়কালে মজুরি বেড়েছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। কিন্তু রুটির দাম বেড়েছিল ৮৮ শতাংশ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির ফলে অনেক সময় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেত এবং কৃষিতে ফলন ভালো না হওয়ায় কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেত। কৃষির সংকট শিল্পের সংকটকে ঘনিভূত করে তুলেছিল।

আঠারো শতকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস ছাড়া সাধারণ মানুষের টিকে থাকার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তা হয়নি। সাধারণ মানুষের দুর্দশা বেড়েই চলছিল এবং ক্ষুধা মানুষকে আন্দোলনমুখী করে তুলেছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটেছিল। বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কারণ কর্মপ্রার্থী মানুষের তুলনায় কর্মের জোগান ছিল অপ্রতুল।

এ কারণে ১৭৭৯ থেকে একটি সাধারণ বেতনহার প্রবর্তনের দাবিতে সচেতন শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৭৮৭-৮৯- এ ক’বছর শ্রমিকদের জন্য ভয়াবহ দুঃসময় হয়ে উঠেছিল। অকথ্য আর্থিক দুর্গতির জন্য ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক পরিবারের কর্তাকে কাপিতাসিও থেকে রেহাই দেওয়া হয় এবং রুটির মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়।

কিন্তু তাতেও ১০ হাজার পরিবারের অন্তত ৩০ হাজার লোকের ক্ষুধার অন্ন জোটেনি। ৩০ হাজার কংকালসার রক্তশূন্য প্রেতরূপী অসহায় মানুষ রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়। এরা ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া রেশম কারখানার শ্রমিক। কারণ রেশম তৈরির উপকরণ পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্ষুধার জ্বালায় এরা ধুঁকে ধুঁকে মরছিল। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের শ্রমিকদের অবস্থা প্রায় একই ধরনের দুর্দশাপূর্ণ ছিল।

১৭৮৯-এ নাগরিকদের নির্বাচনী সভায় শ্রমিকরা উপস্থিত হয়নি। অভিযোগের তালিকায় তাদের সমস্যার কোনো উল্লেখ ছিল না। সর্বোপরি তাদের প্রতি ব্যবসায়ীদের ছিল নিদারুণ অবজ্ঞা। তারা দাবি জানিয়েছিল, শ্রমিকদের সুশৃঙ্খল রাখার জন্য পুলিশ প্রয়োজন। মানুষে মানুষে বৈষম্য যে কী প্রকট ছিল, তা বোঝা যায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের খাবার-দাবার এবং পোশাক-আশাকের পার্থক্য থেকে।

অর্লেয়ার সাধারণ মানুষের খাদ্য : গম, যব ও পনির মেশানো রুটি; কারিগর ও শ্রমিকদের পোশাক প্যান্টালুন ও ব্লাউজ; বুর্জোয়াদের ব্রিচেস লিনেন অথবা বিদেশি মিহি কাপড়ে তৈরি কোট, টুপি, সুতো অথবা সিল্কের মোজা। জে. স্যাঁতুর বর্ণনা থেকে দেখা যায় দুরূজের কারিগরদের সীমাহীন দারিদ্র্য। বিবাহ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এরা সম্পূর্ণ বিত্তহীন। এদের প্রায় কারোরই ঘরবাড়ি নেই। এরা ভাড়াটে বাড়িতে বাস করত।

অথচ নিম্ন বুর্জোয়াদের অধিকাংশেরই নিজস্ব বাড়ি ছিল। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছিল ফ্রান্সের অধিকাংশ শহরে। ১৭৭৬ সালে ষোড়শ লুই তার মন্ত্রী আমেলকে নির্দেশ দেন ভিক্ষুকদের চার্চের অভ্যন্তরে অথবা বাড়ির দরজায় ভিক্ষা করতে দেওয়া চলবে না। বহু ভিক্ষুককে আটক করে রাখা হয়েছিল। তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি।

গ্রাম থেকে আরও বিরাট সংখ্যায় দরিদ্র মানুষ শহরগুলোতে ভিড় জমাচ্ছিল। এখানে লক্ষণীয় হলো, আজকের যুগে এসেও শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত দেখানোর জন্য পুলিশ কখনো কখনো ভিক্ষুকদের আটক করে দূরে কোথাও রেখে আসে। অর্থাৎ আমরা এখনো মধ্যযুগের প্রশাসনিক পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছি।

দুর্ভিক্ষ পীড়িত বুভুক্ষু জনতার আন্দোলনের ভয়ে অনেক সময় বিভিন্ন শহরের পৌর প্রশাসন পূর্বাহ্নেই ব্যবস্থা অবলম্বন করত। ১৭০৯-এ লাঁগদকের বিভিন্ন শহর একত্রিত হয়ে খাদ্যশস্য আনার জন্য ২০টি জাহাজ কার্বারিতে পাঠিয়েছিল। ১৭৫০-এ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় লিয়ঁ ৩ মিলিয়ন লিভ্র মূল্যের শস্য ক্রয় করে ভাণ্ডার পূর্ণ করে রাখে। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষও অনেক সময় শস্য ক্রয় করত অথবা শস্য ক্রয়ের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে অগ্রিম অর্থ প্রদান করত।

জনসাধারণ এটাকে শাসকদের Panic byuing মনে করত। মজুদদার ও রাজার বিরুদ্ধে আতঙ্কজনিত শস্য ক্রয়ের জন্য জনতার অভিযোগ ছিল। মানুষ শস্য ঘাটতির জন্য বিরূপ প্রকৃতিকে দায়ী করত না। বরং জনসাধারণ মনে করত কৃত্রিম উপায়ে খাদ্যশস্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করত খাদ্যশস্যের রিকুইজিশন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এর চড়া দামের কোনো সমাধান নেই।

জনতার মধ্যে যে বিপ্লবী স্পৃহা জেগে উঠেছিল, তার সঙ্গে রুটির দাবি ছিল অবিচ্ছেদ্দভাবে জড়িত। ফরাসি বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় রুটির দাবি থেকে। ১৭৮৮-৮৯-এ সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা এবং আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল আর্থিক দুরবস্থা থেকে। ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য দাঙ্গার সূচনা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেহনতি মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়।

এর ফলে বিক্ষোভ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, একজন শ্রমিকের জন্য দৈনিক ১৫ সু (প্রাচীন ফরাসি মুদ্রা) যথেষ্ট। এ বক্তব্যের সমর্থনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কেউ কেউ মন্তব্য প্রকাশ করে। এসব উক্তির বিরুদ্ধে ১৭৮৯-এর ২৭ এপ্রিল শ্রমিক বিক্ষোভ ঘটে। ২৮ এপ্রিল জনতা আপত্তিকর মন্তব্যকারীর বাড়িতে লুটতরাজ চালায় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

এ সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহত হয়। আর্থ-সামাজিক ইস্যুকে ভিত্তি করেই এ আন্দোলনের সূচনা। আন্দোলনে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত কোনো রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। এতদসত্ত্বেও রাজনৈতিক দিক থেকে আন্দোলন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনতা এ ধারণা পোষণ করত যে, খাদ্যাভাব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানের উপায় হলো ভোগ্যপণ্যের অধিগ্রহণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এ দাবি ছিল অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের দাবি।

অন্যদিকে বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল মুক্ত অর্থনীতির পূজারি। এ দুই বিপরীতমুখী অর্থনীতির ধারণা ফ্রান্সে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৭৮৯-এর জুলাই মাসে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা ছিল খাদ্যশস্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য জনতার দাবির ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজা ষোড়শ লুইর রানী মারি আঁত্তিওনেত বলেছিলেন, ‘প্রজারা খাবার জন্য আলু পাচ্ছে না তো কী হয়েছে? ওরা তো কেক খেলেই পারে।’

আমাদের দেশে একসময় মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভুখা মিছিল বের করা হয়েছিল। তখনকার মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর সম্পর্কেও এ ধরনের বালখিল্য মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী নাকি বলেছিলেন, এরা ভাত খেতে পায় না তো কী হয়েছে? পোলাও খেলেই তো পারে! এর কতটুকু সত্যতা আছে তা বলা মুশকিল। কিন্তু মানুষ যখন এ ধরনের গল্প করতে শুরু করে তখন বুঝতে হবে ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। ঝড় অত্যাসন্ন।

সুতরাং যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের একটু কান খাড়া করে শুনতে হবে জনতা কী বলাবলি করছে। এসব বলাবলির সত্যতা মুখ্য বিচার্য বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে জনতার ক্ষোভ ও আক্রোশের যে অনুভূতি প্রকাশ পায়, তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এটাকেই বোধহয় দেওয়ালের লিখন বলা হয়। এক সময় ছিল যখন দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হতো।

এটা রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে ‘চিকা মারা’ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় একটি দেওয়ালে বেশ খানিকটা উপরে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছিল, ‘আইয়ুব শাহী ধ্বংস হোক’। এর উপর চুন দিয়ে ব্রাশ করার পরও লেখাটি ভেসে উঠে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজ কার সাধ্য আছে এমনভাবে চিকা মারার। দেশে ‘গণতন্ত্র’ আছে!

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন