জীবন বাঁচাতে পারে টিকা
jugantor
জীবন বাঁচাতে পারে টিকা

  ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ  

০৫ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউনেও করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে এ পরিসংখ্যান তাদের, যারা নমুনা পরীক্ষা করিয়েছে বা হাসপাতালে অন্যান্য চিকিৎসা করাতে গিয়ে নমুনা দিতে বাধ্য হয়েছে। এর বাইরে কতজন আক্রান্ত হয়েছে তা কেউ জানে না।

ধারণা করা হচ্ছে, ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামে যাওয়া-আসার কারণে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয়গুণ। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৭৫ শতাংশই গ্রাম থেকে আসা। যেভাবে রোগী বাড়ছে, তাতে হাসপাতালে বেড সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ বেড রোগীতে ভর্তি হয়ে গেছে।

করোনাকালের শুরুর দিকে অনেককে হাসপাতাল বা সিট ম্যানেজ করে দেওয়া, আইসিউ’র ব্যবস্থা করা চিকিৎসক বন্ধুদের সহায়তায় সম্ভব হলেও অবস্থা এখন কঠিন। পরিচিত অনেকেই একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিতে বলে, একটি আইসিউ চায়, এইচডিইউ চায়। ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীতে ভর্তি একেকটা হাসপাতাল। বড় দুঃসময়। তাই যাদেরই সুযোগ আছে, দ্রুত টিকা নিন। লকডাউন মেনে চলুন।

নোবেল পুরস্কারজয়ী সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ পিটার ডোহার্টি বলেছেন, ‘আগে শুধু বয়স্কদের জন্য করোনাভাইরাসকে মারাত্মক ধরা হতো। এখন কিন্তু তা নয়।’ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট তরুণ ও শিশুদের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে তরুণরা যথেষ্ট ঝুঁকিতে আছে এবং আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় এটি বেশি মারাত্মক।

তাই তরুণদের এমন ভাবলে চলবে না যে, করোনায় তাদের ঝুঁকি নেই বা তারা কম ঝুঁকিতে আছেন। কারণ এটি তরুণদেরও মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। এটি প্রসূতি মায়েদেরও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এ সময় কম থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাদেরও ভ্যাকসিনের আওতায় আনা জরুরি।

ভারত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে লকডাউন ও গণটিকাদান সফল হওয়ায়। তারা দিনে প্রায় ১ কোটি টিকা দিয়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, করোনা টেস্ট আরও সহজলভ্য করা ও দ্রুত রিপোর্ট প্রদান, সফল আইসোলেশনের পাশাপাশি আরও কিছুদিন কঠোর বিধিনিষেধ ও দ্রুতগতিতে টিকাদান করা দরকার।

বিভিন্ন তথ্যমতে আমরা জানি, ভারতের delta variant of SARSCoV2 (B1.167—) বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সারা বিশ্বে মানুষকে এ ভ্যারিয়েন্টটিই সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত করছে। আলফা ভ্যারিয়েন্ট মূল উহান ভ্যারিয়েন্ট থেকে ৫০ শতাংশ বেশি সংক্রামক এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আলফা ভ্যারিয়েন্ট থেকে আরও ৫০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। সেই হিসাবে এ ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত একজন ব্যক্তি অন্তত আটজন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।

এজন্যই এ ধরনটি গ্রামেও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেল্টা ও ডেল্টা প্লাস স্ট্রেইনের সংক্রমণ ঝুঁকি অন্যান্য SARSCoV2 স্ট্রেইনের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি। এর কারণ হচ্ছে ডবল ও ট্রিপল মিউটেশন। ডেল্টার বিশেষ একটি মিউটেশন, যাকে বিজ্ঞানীদের ভাষায় ‘টি৪৭৮কে’ বলা হয়, এটি থাকে স্পাইক প্রোটিনে; ফলে এটি নাক ও ফুসফুসের এসিই২ রিসিপ্টরে বেশি আটকাতে পারে, বেশি সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে এবং বেশি ইমিউনিটিকে ফাঁকি দিতে পারে। এ ভাইরাসটি তার ‘এল৪৫২আর’ ও ‘টি৪৭৮কে’ মিউটেশনের কারণে এতটাই শক্তিশালী যে, খুব সহজেই এবং অনেক শক্তভাবে নাকের বিশেষ কিছু কোষে সহজে আটকে থাকতে পারে।

আরেকটি গবেষণা করা হয়েছে যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডে। সেখানকার তথ্যমতে, এ ভ্যারিয়েন্ট ৮৩ শতাংশ বেশি রোগীকে হাসপাতালে পাঠায়। বিশেষ মিউটেশনের কারণে এটি ফুসফুসে দ্রুত সংক্রমণ করতে পারে, ফুসফুসের অনেক ক্ষতি হয় এবং শ্বাসকষ্ট বেশি হয়। এসব কারণে মৃত্যুহারও বেশি। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত ডেটা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে’।

দেখা গেছে, দুই ডোজ সম্পন্ন করার পর ফাইজার ভ্যাকসিন ৮৮ শতাংশ আর অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ৬৭ শতাংশ কার্যকর। যদিও আলফা ভ্যারিয়েন্ট বা ইউকে ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় এর কার্যকারিতা কিছুটা কম, তবে এর আগে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে বিটা ভ্যারিয়েন্ট বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন এক ডোজ যেখানে ৫০ শতাংশ কার্যকর আলফার ক্ষেত্রে, সেখানে ডেল্টার ক্ষেত্রে মাত্র ৩০ শতাংশ। ফাইজারের দুই ডোজ ৯৪ শতাংশ প্রতিরোধ করে আলফাকে, সেখানে ডেল্টাকে করে ৮৮ শতাংশ। মডার্না ভ্যাকসিনের ডেটা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার তথ্যের সঙ্গে তুলনা সাপেক্ষে আশা করা যাচ্ছে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে এ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আরও ভালো হবে। তবে কার্যকারিতার হিসাব যাই-ই হোক, এ মুহূর্তে ভ্যাকসিন প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। আশার কথা হচ্ছে, এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার এক মাস পর ৯২ শতাংশ গ্রহীতার দেহে এবং দুই মাস পর ৯৭ শতাংশের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া সব বয়সের ভ্যাকসিন গ্রহীতার দেহে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। অন্যান্য অসুস্থতা (কো-মরবিডিটি) থাকার বা না থাকার সঙ্গে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে চিকিৎসকরা এখনো জানেন না কতদিন পর্যন্ত এ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে থাকবে। এ বিষয়টি জানতে যারা ভ্যাকসিন নিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি (ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক পরা, ভিড় এড়িয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলা, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা ইত্যাদি) মেনে চলা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার পাশাপাশি টিকার রেজিস্ট্রেশেন পদ্ধতি সহজ করে গণটিকা প্রদানের গতি বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টিকার গতি বাড়িয়ে জরুরিভিত্তিতে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা মহামারি শেষ হবে না। এক গবেষণার তথ্য অনুসারে, টিকা নেওয়ার পরও কোভিডে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে যাওয়ার হার ২ থেকে ৫ শতাংশ। আর ৯৫ শতাংশই থাকছেন সুরক্ষিত। বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির গবেষণা বলছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮০ শতাংশ রোগীই টিকা না দেওয়া। আর ২০ শতাংশ টিকা নিয়েও আক্রান্ত হয়েছেন। যেসব রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই টিকা নেননি। গবেষণা বলছে, টিকা নেওয়া রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পরও মাস্ক পরাসহ মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে দৈনিক টিকা দেওয়ার সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাই সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া সরকার ২১ কোটি ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করছে।

এই ২১ কোটি ভ্যাকসিন দেওয়া ও রাখার ব্যবস্থা করা, করোনার টিকাপ্রাপ্তির বয়সসীমা ১৮ করা এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনসাপেক্ষে টিকা প্রদান- সরকারি এসব সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সিদ্ধান্তগুলো যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করা দরকার। টিকাপ্রাপ্তির জন্য পেশাগত কোনো পরিচয় রাখা ঠিক নয়। সবাই টিকা পাবে এমনটাই হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। টিকা নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে, সেগুলোও দূর করা প্রয়োজন।

ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ : গবেষক ও অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেষণে কোষাধ্যক্ষ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

khasru73@juniv.edu

জীবন বাঁচাতে পারে টিকা

 ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ 
০৫ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউনেও করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে এ পরিসংখ্যান তাদের, যারা নমুনা পরীক্ষা করিয়েছে বা হাসপাতালে অন্যান্য চিকিৎসা করাতে গিয়ে নমুনা দিতে বাধ্য হয়েছে। এর বাইরে কতজন আক্রান্ত হয়েছে তা কেউ জানে না।

ধারণা করা হচ্ছে, ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামে যাওয়া-আসার কারণে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয়গুণ। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৭৫ শতাংশই গ্রাম থেকে আসা। যেভাবে রোগী বাড়ছে, তাতে হাসপাতালে বেড সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ বেড রোগীতে ভর্তি হয়ে গেছে।

করোনাকালের শুরুর দিকে অনেককে হাসপাতাল বা সিট ম্যানেজ করে দেওয়া, আইসিউ’র ব্যবস্থা করা চিকিৎসক বন্ধুদের সহায়তায় সম্ভব হলেও অবস্থা এখন কঠিন। পরিচিত অনেকেই একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিতে বলে, একটি আইসিউ চায়, এইচডিইউ চায়। ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীতে ভর্তি একেকটা হাসপাতাল। বড় দুঃসময়। তাই যাদেরই সুযোগ আছে, দ্রুত টিকা নিন। লকডাউন মেনে চলুন।

নোবেল পুরস্কারজয়ী সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ পিটার ডোহার্টি বলেছেন, ‘আগে শুধু বয়স্কদের জন্য করোনাভাইরাসকে মারাত্মক ধরা হতো। এখন কিন্তু তা নয়।’ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট তরুণ ও শিশুদের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে তরুণরা যথেষ্ট ঝুঁকিতে আছে এবং আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় এটি বেশি মারাত্মক।

তাই তরুণদের এমন ভাবলে চলবে না যে, করোনায় তাদের ঝুঁকি নেই বা তারা কম ঝুঁকিতে আছেন। কারণ এটি তরুণদেরও মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। এটি প্রসূতি মায়েদেরও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এ সময় কম থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাদেরও ভ্যাকসিনের আওতায় আনা জরুরি।

ভারত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে লকডাউন ও গণটিকাদান সফল হওয়ায়। তারা দিনে প্রায় ১ কোটি টিকা দিয়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, করোনা টেস্ট আরও সহজলভ্য করা ও দ্রুত রিপোর্ট প্রদান, সফল আইসোলেশনের পাশাপাশি আরও কিছুদিন কঠোর বিধিনিষেধ ও দ্রুতগতিতে টিকাদান করা দরকার।

বিভিন্ন তথ্যমতে আমরা জানি, ভারতের delta variant of SARSCoV2 (B1.167—) বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সারা বিশ্বে মানুষকে এ ভ্যারিয়েন্টটিই সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত করছে। আলফা ভ্যারিয়েন্ট মূল উহান ভ্যারিয়েন্ট থেকে ৫০ শতাংশ বেশি সংক্রামক এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আলফা ভ্যারিয়েন্ট থেকে আরও ৫০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। সেই হিসাবে এ ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত একজন ব্যক্তি অন্তত আটজন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।

এজন্যই এ ধরনটি গ্রামেও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেল্টা ও ডেল্টা প্লাস স্ট্রেইনের সংক্রমণ ঝুঁকি অন্যান্য SARSCoV2 স্ট্রেইনের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি। এর কারণ হচ্ছে ডবল ও ট্রিপল মিউটেশন। ডেল্টার বিশেষ একটি মিউটেশন, যাকে বিজ্ঞানীদের ভাষায় ‘টি৪৭৮কে’ বলা হয়, এটি থাকে স্পাইক প্রোটিনে; ফলে এটি নাক ও ফুসফুসের এসিই২ রিসিপ্টরে বেশি আটকাতে পারে, বেশি সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে এবং বেশি ইমিউনিটিকে ফাঁকি দিতে পারে। এ ভাইরাসটি তার ‘এল৪৫২আর’ ও ‘টি৪৭৮কে’ মিউটেশনের কারণে এতটাই শক্তিশালী যে, খুব সহজেই এবং অনেক শক্তভাবে নাকের বিশেষ কিছু কোষে সহজে আটকে থাকতে পারে।

আরেকটি গবেষণা করা হয়েছে যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডে। সেখানকার তথ্যমতে, এ ভ্যারিয়েন্ট ৮৩ শতাংশ বেশি রোগীকে হাসপাতালে পাঠায়। বিশেষ মিউটেশনের কারণে এটি ফুসফুসে দ্রুত সংক্রমণ করতে পারে, ফুসফুসের অনেক ক্ষতি হয় এবং শ্বাসকষ্ট বেশি হয়। এসব কারণে মৃত্যুহারও বেশি। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত ডেটা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে’।

দেখা গেছে, দুই ডোজ সম্পন্ন করার পর ফাইজার ভ্যাকসিন ৮৮ শতাংশ আর অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ৬৭ শতাংশ কার্যকর। যদিও আলফা ভ্যারিয়েন্ট বা ইউকে ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় এর কার্যকারিতা কিছুটা কম, তবে এর আগে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে বিটা ভ্যারিয়েন্ট বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন এক ডোজ যেখানে ৫০ শতাংশ কার্যকর আলফার ক্ষেত্রে, সেখানে ডেল্টার ক্ষেত্রে মাত্র ৩০ শতাংশ। ফাইজারের দুই ডোজ ৯৪ শতাংশ প্রতিরোধ করে আলফাকে, সেখানে ডেল্টাকে করে ৮৮ শতাংশ। মডার্না ভ্যাকসিনের ডেটা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার তথ্যের সঙ্গে তুলনা সাপেক্ষে আশা করা যাচ্ছে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে এ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আরও ভালো হবে। তবে কার্যকারিতার হিসাব যাই-ই হোক, এ মুহূর্তে ভ্যাকসিন প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। আশার কথা হচ্ছে, এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার এক মাস পর ৯২ শতাংশ গ্রহীতার দেহে এবং দুই মাস পর ৯৭ শতাংশের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া সব বয়সের ভ্যাকসিন গ্রহীতার দেহে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। অন্যান্য অসুস্থতা (কো-মরবিডিটি) থাকার বা না থাকার সঙ্গে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে চিকিৎসকরা এখনো জানেন না কতদিন পর্যন্ত এ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে থাকবে। এ বিষয়টি জানতে যারা ভ্যাকসিন নিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি (ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক পরা, ভিড় এড়িয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলা, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা ইত্যাদি) মেনে চলা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার পাশাপাশি টিকার রেজিস্ট্রেশেন পদ্ধতি সহজ করে গণটিকা প্রদানের গতি বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টিকার গতি বাড়িয়ে জরুরিভিত্তিতে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা মহামারি শেষ হবে না। এক গবেষণার তথ্য অনুসারে, টিকা নেওয়ার পরও কোভিডে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে যাওয়ার হার ২ থেকে ৫ শতাংশ। আর ৯৫ শতাংশই থাকছেন সুরক্ষিত। বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির গবেষণা বলছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮০ শতাংশ রোগীই টিকা না দেওয়া। আর ২০ শতাংশ টিকা নিয়েও আক্রান্ত হয়েছেন। যেসব রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই টিকা নেননি। গবেষণা বলছে, টিকা নেওয়া রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পরও মাস্ক পরাসহ মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে দৈনিক টিকা দেওয়ার সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাই সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া সরকার ২১ কোটি ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করছে।

এই ২১ কোটি ভ্যাকসিন দেওয়া ও রাখার ব্যবস্থা করা, করোনার টিকাপ্রাপ্তির বয়সসীমা ১৮ করা এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনসাপেক্ষে টিকা প্রদান- সরকারি এসব সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সিদ্ধান্তগুলো যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করা দরকার। টিকাপ্রাপ্তির জন্য পেশাগত কোনো পরিচয় রাখা ঠিক নয়। সবাই টিকা পাবে এমনটাই হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। টিকা নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে, সেগুলোও দূর করা প্রয়োজন।

ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ : গবেষক ও অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেষণে কোষাধ্যক্ষ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

khasru73@juniv.edu

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস