এক মানবিক তত্ত্বের প্রবর্তক কাল মার্কস

  সাজ্জাদ আলম খান ০৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুঁজির প্রভাব কখনও অস্বীকার করা যায় না। আর সবাই তো আর পুঁজির জোগানদাতা হতে পারে না। ধরুন ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের বিনিয়োগ ছাড়া কার্ল মার্কস তার ‘পুঁজি’ প্রকাশ করতে পারতেন না। আর এখানেই উঠে আসে পণ্যমূল্য রহস্য। কালজয়ী হয়ে ওঠেন দার্শনিক কার্ল মার্কস। উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বই তার অনন্য অর্জন। মার্কস পণ্যমূল্য প্রকাশের তিনটি রূপ নির্দিষ্ট করছেন। প্রথমটি হল অন্য আরেকটি পণ্যের সঙ্গে তুলনা করে মূল্য প্রকাশ, যাকে বলা হয় বিনিময় মূল্য। দ্বিতীয়টি হল তা ব্যবহারিক মূল্য আকারে প্রকাশ। আর তৃতীয়টি আরও বিকশিত রূপ। তাতে একটি পণ্যের সাপেক্ষেই দুনিয়ার অন্য আর সব পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন ধরনের মানবিক শ্রমশক্তির যে ব্যয় তার সংক্ষিপ্ত রূপ সাধারণ মূল্য। এতে যে শ্রম যুক্ত থাকে তার সুনির্দিষ্ট সামাজিক চরিত্র প্রকাশ পায়। মার্কসের মতে, পণ্যমূল্যের আপেক্ষিক রূপের বিকাশ তুল্যমূল্যের ওপর নির্ভরশীল।

সাধারণত আমরা পণ্যকে সাধারণ বিষয় মনে করি। বিশ্লেষণ বলছে, পণ্যমূল্য রহস্যজনক বিষয়, নানা উপাদানে আচ্ছন্ন। মার্কস পণ্য বিষয়ে আরও গভীরে প্রবেশ করছেন। ব্যবহারিক মূল্য দিয়ে মানুষ প্রয়োজন মেটাতে পারে। টেবিল বানানোর প্রসঙ্গ টেনে মার্কস উদাহরণ টেনেছেন; গাছ থেকে কাঠ ও পরে তা দিয়ে টেবিল বানানো। এটি পণ্যে পরিণত হলে অজ্ঞেয় একটা কিছুতে পরিবর্তিত হয়। পণ্যের রহস্যজনক চরিত্র ব্যবহারিক মূল্য থেকে জন্ম নেয় না। উৎপাদনশীল তৎপরতার ধরন যাই হোক না কেন, এগুলো মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহারের ফসল। শ্রম ব্যয়ের সময়কাল বিচেনায় নিলে জানা যাবে, পরিমাণ ও গুণগত দিকের পার্থক্য স্পষ্ট। মানুষ যখন আরেকজনের জন্য কাজ করে, তখন তা সামাজিক রূপ নেয়। পণ্যের চরিত্র সম্পর্কে মার্কস বলছেন, তা রহস্যময়। কারণ উৎপাদকদের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ক নিজেদের মধ্যে থাকে না। শ্রমের ফসলের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ব্যবহারযোগ্য নানা জিনিস পণ্য হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এগুলো উৎপাদন করে। আর এর মধ্যে সামষ্টিক শ্রম গঠন করে। মার্কসীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, ব্যক্তি-শ্রম সামাজিক শ্রমের অংশ হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে পণ্য বিনিময় সম্পর্কের মধ্যে। আর এর সূত্র ধরে পরোক্ষভাবে উৎপাদনকারীদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বস্তু ও মূল্য, একটি দ্রব্যের এ বিভাজন সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে। যখন প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদিত হয় বিনিময়ের জন্য। এসময় থেকে ব্যক্তি-উৎপাদকের শ্রমও সামাজিকভাবে দুই চরিত্র লাভ করে। তবে মানুষের বিশ্লেষণ শুরু হয় তার সামনে উপস্থিত বিকাশ প্রক্রিয়ার ফলাফল দেখে। এর কারণে পণ্যের দাম দিয়েই তার মূল্য পরিমাপ শুরু হয় মুদ্রার মাধ্যমে। পণ্যজগতে মুদ্রার এ রূপ ব্যক্তি-শ্রমের সামাজিক চরিত্র প্রকৃতপক্ষে গোপন করে। মার্কসের সময়কালে অনেক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তারা ধ্র“পদী অর্থনীতিবিদ বলে পরিচিত। মূল্য সম্পর্কে ধ্র“পদী ধারার অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ডেভিড রিকার্ডোর মতে, শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য মৌলিক সম্পদ। এগুলোর ব্যবহার, কোনো না কোনো ধরনের শ্রম ব্যবহার আমাদের একমাত্র মৌলিক অবলম্বন। রিকার্ডোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে মার্কস বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বলছেন, রিকার্ডো নিজেও মূল্যের দ্বৈত রূপ সম্পর্কে খুব কম মনোযোগ দিয়েছেন। রাজনৈতিক অর্থনীতি অসম্পূর্ণভাবে হলেও মূল্য এবং তার পরিমাণ নিয়ে অনেকে বিশ্লেষণ করেছে এবং এসব রূপের পেছনে কী আছে তা-ও আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তা কখনও এ প্রশ্নটা করেনি, কেন দ্রব্যের মূল্য শ্রমকে প্রতিনিধিত্ব করে, মূল্যের পরিমাণ কেন প্রতিনিধিত্ব করে শ্রম সময়কে?

উৎপাদনের উপকরণের ওপর কর্তৃত্ব না থাকায় একজন শ্রমিক উৎপাদিত দ্রব্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তা প্রথমবারের মতো তুলে ধরেন কার্ল মার্কস। এর ফলে একজন শ্রমিক তার মানবীয় সত্তা হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তিন ধরনের বিচ্ছিন্নতার কারণে একজন শ্রমিক ক্রমশ বিযুক্ত হয়ে পড়ে অন্যান্য মানুষ থেকে। মার্কস লিখছেন, মানুষ তার শ্রমের উৎপাদন হতে বিচ্ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন তার জীবন ক্রিয়া হতে; বিচ্ছিন্ন প্রজাতি সত্তা হতে। এর প্রভাবে মানুষ তার সম্পূর্ণতাকে হারিয়ে ফেলে, একটা নির্দিষ্ট বৃত্তির চক্রাবর্তে ঘুরতে থাকে এবং খণ্ডিত মানুষে পরিণত হয়। শ্রেণীহীন সমাজ ছাড়া তা দূর হওয়া সম্ভব নয়।

কার্ল মার্কস যে শুধু পণ্যমূল্য রহস্য উন্মোচন করেছেন, তা নয়। তার সামাজিক দর্শনে আন্দোলিত হয়েছেন অনেকে। গেল শতাব্দীর প্রায় অর্ধেক সময় এ জনপদের মেধাবীদের একটা অংশ মানব ও প্রকৃতির মুক্তির লড়াইয়ে শরিক হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ধসে পড়ার সময় থেকেই দমকা বাতাসে চুপসে যায় অনেকে। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় কেউ কেউ। বিপ্লবীদের কেউ কেউ রাজনৈতিক বিশ্বাসে আস্থা হারিয়ে যোগ দিয়েছেন প্রচলিত ধারার বিভিন্ন দলে। তবে অর্থনৈতিক স্কুল অফ থটে, অমলিন মার্কসীয় দর্শন। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট, বিশ্বমন্দা বা বৈষম্যজনিত নানা সংকটে বারবার আলোচনায় চলে আসে মার্কসীয় দর্শন।

কার্ল মার্কস একজন প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানী। জীবিত অবস্থায় পরিচিত না হলেও মৃত্যুর পর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের কাছে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এ তত্ত্বের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসবাদ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ ও এর প্রকৃতি সম্বন্ধে যত তত্ত্বের আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, তার মধ্যে নিঃসন্দেহে মার্কসীয় তত্ত্বই সর্বব্যাপক। মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাগুলোই হচ্ছে মার্কসবাদ। এঙ্গেলস মার্কসবাদ শব্দটির ব্যবহার শুরু করেছিলেন। মার্কসবাদ একটি সামগ্রিক তত্ত্বচিন্তা। যে কোনো জ্ঞান শৃঙ্খলাতেই এর প্রয়োগ সম্ভব। উনবিংশ শতাব্দীতে মার্কসবাদের উদ্ভব হয়। ওই সময়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে শিল্প বিপ্লব হয়। অথচ তাদের দেশের শিল্প শ্রমিকরাই অনেক কষ্টে দিনযাপন করছিল। সে সময়ে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ দরিদ্র ও দুর্দশার জন্য তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক অক্ষমতাকে দায়ী করে ন্যাচারাল সিলেকশন তত্ত্ব প্রদান করেন। ফলে মালিক শ্রেণীর পক্ষে কম মজুরি প্রদান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়ে ওঠে। এ সময় মার্কস উল্লেখ করেন, দরিদ্রদের দুর্দশা তাদের হাতে তৈরি হয়নি। সমাজ জীবনে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণীর মধ্যে অবিরাম সংগ্রাম চলে। এসব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সবসময়ই উৎপাদনকেন্দ্রিক।

মার্কস সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচার করেছেন; তবে তা রাষ্ট্রদর্শনের আদর্শ হিসেবে পুরনো। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখনীতে এর রূপ পরিচিতি লাভ করে। তবে সমাজতন্ত্রকে কল্পনার রাজ্য থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কস ও এঙ্গেলস। সমাজতন্ত্রকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। ইতিহাসের বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ইতিহাস বা মানবজীবনের ঘটনাপ্রবাহ অর্থনৈতিক বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসের ধারণা নতুন। তার মতে, রাষ্ট্র অভিন্ন কল্যাণে নিবেদিত সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক উৎপাদনের মাধ্যম যখন যে শ্রেণীর হাতে সংরক্ষিত থাকে তখন সেই শ্রেণী সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রাধান্য লাভ করে। সমাজতন্ত্র বিকাশের পথে সর্বহারার একনায়কত্ব অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা মাত্র। সমাজতন্ত্রের মূল্য লক্ষ্য হল শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সমাজব্যবস্থা থেকে সব শ্রেণী-বৈষম্য দূর হবে তখন, সর্বহারা শ্রেণী তার চরিত্র হারিয়ে ফেলবে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন এক পর্যায়ে বিলুপ্ত হবে।

১৮১৮ সালের ৫ মে তৎকালীন প্রাশিয়ার ত্রিভস শহরে কার্ল মার্কস জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তার কোনো জাতীয়তা অর্থাৎ দেশ ছিল না। তাকে তিনদিন পর লন্ডনের হাইগেট সেমিট্রিতে সমাহিত করা হয়। তার সমাধি ফলকে দুটি বাক্য লেখা আছে। প্রথমে লেখা, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন : দুনিয়ার মজদুর এক হওয়। এর পরে লেখা : এতদিন দার্শনিকরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেছেন; কিন্তু আসল কাজ হল তা পরিবর্তন করা।

সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter