বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মৃত্যু নেই
jugantor
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মৃত্যু নেই

  জুনাইদ আহমেদ পলক  

১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষকে হত্যা করা যায়। কিন্তু তার দর্শন, নীতি ও আদর্শকে হত্যা করা যায় না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। কিন্তু তারা হত্যা করতে পারেনি তার দর্শন, নীতি ও আদর্শকে। তার আদর্শই আজ আমাদের পথ চলার পাথেয়।

আসলে বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শন, নীতি, আদর্শ, কর্ম ও নেতৃত্বের বহুমাত্রিক গুণাবলির মধ্যে নিহিত রয়েছে আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হওয়ার সব উপাদান। বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি গ্রন্থ-‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পাঠ করলে এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। ছাত্রাবস্থায়ই তার মধ্যে মানবিক গুণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতি বোধের প্রকাশ দেখা যায়।

এ কারণেই গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দৃষ্টিতে আসেন তিনি। স্কুলের ছাত্র শেখ মুজিব তার গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ, এমএসসি পরিচালিত ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র সক্রিয় সদস্য হিসাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি চাল সংগ্রহ করে গরিব ছাত্রদের বই, পরীক্ষার ফি, জায়গিরের খরচ জোগান দিতেন। ১৯৪৩ সালে যখন কলেজছাত্র, তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। বঙ্গবন্ধু লঙ্গরখানা খুলে মানুষকে খাইয়েছেন। বেকার হোস্টেলে দুপুর ও রাতে যে খাবার বাঁচে, তা বুভুক্ষুদের বসিয়ে ভাগ করে দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু ২৩ বছর ধরে দেশের প্রতিটি মানুষকে জেনেছেন, চিনেছেন। তাদের নাগরিক ও নৈতিক অধিকার এবং সংশয়মুক্ত জীবন ধারণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সাহসী ও উপযুক্ত হয়ে উঠতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দেশের মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমি তাদের অত্যধিক ভালোবাসি।’

বঙ্গবন্ধুর জীবনে সততাই ছিল মূল চালিকাশক্তি। সততার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন পরিবার থেকে। তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান ১৯৪২ সালে তাকে বলেছিলেন, ‘‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এতো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না।’ আর একটা কথা মনে রেখ, ‘সিনসিয়ারিটি অব পারপোস অ্যান্ড অনেস্টি অব পারপোস’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২১)। সারা জীবনে তিনি সততার অনুশীলন করেছেন। রাজনীতিতে কখনো মিথ্যা, ভণ্ডামির আশ্রয় নেননি।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদর্শী নেতা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও তাতে বাঙালির কোনো লাভ হবে না। বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান নেতা বঙ্গবন্ধু এটি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। সেই সময় থেকেই তিনি বাঙালির স্বাধীনতার কথা ভাবেন। স্বাধীনতার পরে অন্নদাশঙ্করের ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা কবে আপনার মাথায় এলো’-এমন এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ২৩ বছর আন্দোলন করেছেন। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন ‘পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হলো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জিন্নাহ যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রকাশ্যে কেউ সাহস পায়নি। যেদিন মারা গেলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পুরোপুরি প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৭৮)।

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয় আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জনতার শক্তিতে। এ জন্য তিনি পাকিস্তানি শোষণ-বৈষম্যের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। তার বিশেষ গুণ ছিল তিনি একজন ভালো বাগ্মী।

বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসের অবিস্মরণীয় উপাদানে পরিণত হয়। ১৯ মিনিটের এ ভাষণ যুগ সৃষ্টিকারী ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, আদর্শ ও নীতির প্রতি জনগণের আস্থা ছিল শতভাগ। যে কারণে প্রত্যেক বাঙালি নিজেকে একজন বিপ্লবী হিসাবে তৈরি করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দিয়েই জনগণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ভিশনারি নেতা। শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামে নয়, মাত্র সাড়ে তিন বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি এমন কিছু পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছিলেন যা তার দূরদর্শী চিন্তা থেকে উৎসারিত। তার আজন্মলালিত স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা বিনির্মাণের। সেই লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বাস্তবায়নও করছিলেন। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন উদ্যোগের কথাই ধরা যাক। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এমনই একজন নেতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল না। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে সূদূরপ্রসারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। যে নেতা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে উঠলেন এবং যার সারা জীবনের রাজনীতি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বাংলার স্বাধীনতা, তাকে কেন হত্যা করা হলো?

স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পাকিস্তানি স্বৈরশাসক এবং তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের ষড়যন্ত্র সফল না হওয়ার কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর কৌশলী, দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বে জনতার সুদৃঢ় ঐক্য।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় হয়। কিন্তু এ পরাজয়কে তারা মেনে নিতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের ষড়যন্ত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এর কারণ বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ।

দক্ষিণ এশিয়ায় বঙ্গবন্ধুর মতো এমন একজন জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান, যাকে ১৯৭৩ সালে জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়, তাকে ৭১-এর দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তি মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন শাসক দীর্ঘ ২১ বছর বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তানে পরিণত করার অপচেষ্টা করে। প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় দেশ পরিচালনা করেছে।

আমরা সৌভাগ্যবান যে, দেশের জনগণ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন করে। ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ পরিচালিত হওয়ায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শন, নীতি ও আদর্শ জানতে পারছে।

ইতিহাসে তিনিই অমর, যিনি তার স্বপ্নের বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং জাতিকে স্বপ্ন দেখান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নও করেন। ইতিহাস তাকে সৃষ্টি করেনি। তিনিই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের সেই মহামানব।

তিনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কর্মের মধ্য দিয়ে যে দর্শন, নীতি ও আদর্শ আমাদের সামনে রেখে গেছেন তাকে অনুসরণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ করলেই একজন ব্যক্তি সুনাগরিক ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর উক্তি : নেতার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সংগঠন বেঁচে থাকলে আদর্শের মৃত্যু নেই।

জুনাইদ আহমেদ পলক : সংসদ সদস্য; প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মৃত্যু নেই

 জুনাইদ আহমেদ পলক 
১৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষকে হত্যা করা যায়। কিন্তু তার দর্শন, নীতি ও আদর্শকে হত্যা করা যায় না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। কিন্তু তারা হত্যা করতে পারেনি তার দর্শন, নীতি ও আদর্শকে। তার আদর্শই আজ আমাদের পথ চলার পাথেয়।

আসলে বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শন, নীতি, আদর্শ, কর্ম ও নেতৃত্বের বহুমাত্রিক গুণাবলির মধ্যে নিহিত রয়েছে আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হওয়ার সব উপাদান। বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি গ্রন্থ-‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পাঠ করলে এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। ছাত্রাবস্থায়ই তার মধ্যে মানবিক গুণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতি বোধের প্রকাশ দেখা যায়।

এ কারণেই গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দৃষ্টিতে আসেন তিনি। স্কুলের ছাত্র শেখ মুজিব তার গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ, এমএসসি পরিচালিত ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র সক্রিয় সদস্য হিসাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি চাল সংগ্রহ করে গরিব ছাত্রদের বই, পরীক্ষার ফি, জায়গিরের খরচ জোগান দিতেন। ১৯৪৩ সালে যখন কলেজছাত্র, তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। বঙ্গবন্ধু লঙ্গরখানা খুলে মানুষকে খাইয়েছেন। বেকার হোস্টেলে দুপুর ও রাতে যে খাবার বাঁচে, তা বুভুক্ষুদের বসিয়ে ভাগ করে দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু ২৩ বছর ধরে দেশের প্রতিটি মানুষকে জেনেছেন, চিনেছেন। তাদের নাগরিক ও নৈতিক অধিকার এবং সংশয়মুক্ত জীবন ধারণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সাহসী ও উপযুক্ত হয়ে উঠতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দেশের মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমি তাদের অত্যধিক ভালোবাসি।’

বঙ্গবন্ধুর জীবনে সততাই ছিল মূল চালিকাশক্তি। সততার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন পরিবার থেকে। তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান ১৯৪২ সালে তাকে বলেছিলেন, ‘‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এতো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না।’ আর একটা কথা মনে রেখ, ‘সিনসিয়ারিটি অব পারপোস অ্যান্ড অনেস্টি অব পারপোস’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২১)। সারা জীবনে তিনি সততার অনুশীলন করেছেন। রাজনীতিতে কখনো মিথ্যা, ভণ্ডামির আশ্রয় নেননি।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদর্শী নেতা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও তাতে বাঙালির কোনো লাভ হবে না। বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান নেতা বঙ্গবন্ধু এটি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। সেই সময় থেকেই তিনি বাঙালির স্বাধীনতার কথা ভাবেন। স্বাধীনতার পরে অন্নদাশঙ্করের ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা কবে আপনার মাথায় এলো’-এমন এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ২৩ বছর আন্দোলন করেছেন। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন ‘পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হলো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জিন্নাহ যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রকাশ্যে কেউ সাহস পায়নি। যেদিন মারা গেলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পুরোপুরি প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৭৮)।

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয় আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জনতার শক্তিতে। এ জন্য তিনি পাকিস্তানি শোষণ-বৈষম্যের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। তার বিশেষ গুণ ছিল তিনি একজন ভালো বাগ্মী।

বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসের অবিস্মরণীয় উপাদানে পরিণত হয়। ১৯ মিনিটের এ ভাষণ যুগ সৃষ্টিকারী ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, আদর্শ ও নীতির প্রতি জনগণের আস্থা ছিল শতভাগ। যে কারণে প্রত্যেক বাঙালি নিজেকে একজন বিপ্লবী হিসাবে তৈরি করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দিয়েই জনগণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ভিশনারি নেতা। শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামে নয়, মাত্র সাড়ে তিন বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি এমন কিছু পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছিলেন যা তার দূরদর্শী চিন্তা থেকে উৎসারিত। তার আজন্মলালিত স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা বিনির্মাণের। সেই লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বাস্তবায়নও করছিলেন। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন উদ্যোগের কথাই ধরা যাক। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এমনই একজন নেতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল না। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে সূদূরপ্রসারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। যে নেতা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে উঠলেন এবং যার সারা জীবনের রাজনীতি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বাংলার স্বাধীনতা, তাকে কেন হত্যা করা হলো?

স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পাকিস্তানি স্বৈরশাসক এবং তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের ষড়যন্ত্র সফল না হওয়ার কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর কৌশলী, দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বে জনতার সুদৃঢ় ঐক্য।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় হয়। কিন্তু এ পরাজয়কে তারা মেনে নিতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের ষড়যন্ত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এর কারণ বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ।

দক্ষিণ এশিয়ায় বঙ্গবন্ধুর মতো এমন একজন জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান, যাকে ১৯৭৩ সালে জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়, তাকে ৭১-এর দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তি মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন শাসক দীর্ঘ ২১ বছর বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তানে পরিণত করার অপচেষ্টা করে। প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় দেশ পরিচালনা করেছে।

আমরা সৌভাগ্যবান যে, দেশের জনগণ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন করে। ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ পরিচালিত হওয়ায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শন, নীতি ও আদর্শ জানতে পারছে।

ইতিহাসে তিনিই অমর, যিনি তার স্বপ্নের বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং জাতিকে স্বপ্ন দেখান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নও করেন। ইতিহাস তাকে সৃষ্টি করেনি। তিনিই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের সেই মহামানব।

তিনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কর্মের মধ্য দিয়ে যে দর্শন, নীতি ও আদর্শ আমাদের সামনে রেখে গেছেন তাকে অনুসরণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ করলেই একজন ব্যক্তি সুনাগরিক ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর উক্তি : নেতার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সংগঠন বেঁচে থাকলে আদর্শের মৃত্যু নেই।

জুনাইদ আহমেদ পলক : সংসদ সদস্য; প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট