সশরীরে নেই, আছেন হৃদয়ের মণিকোঠায়
jugantor
সশরীরে নেই, আছেন হৃদয়ের মণিকোঠায়

  ড. এম এ মাননান  

১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে সংঘটিত বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র অধ্যায়। আর এ অধ্যায়ের রচয়িতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জগৎজুড়ে অভিষিক্ত হয়েছেন অনেক অনুপম অভিধায়। বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসের রচয়িতা হিসাবেও তিনি দেদীপ্যমান হয়ে থাকবেন চিরকাল ইতিহাসের পাতায়, সব সচেতন দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয়ে। জনমানুষের হৃদয় জয় করা ক্যারিশম্যাটিক স্বাপ্নিক নেতা বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই বটে, তবে বেঁচে আছেন সবার হৃদয়ের মণিকোঠায়। অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলতে থাকবেন তিনি চিরকাল উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে যুগ যুগ ধরে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন, আদর্শ আর ত্যাগের শিক্ষা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও অনেক প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধুকে চিনতে হলে নতুন প্রজন্মকে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বুলালেই তারা জানতে পারবেন কোন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর উত্থান হয়েছিল আর তিনি কেন এবং কীভাবে জীবনের স্বর্ণালি দিনগুলো বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে রাজপথে আর কারাগারে উৎসর্গ করেছিলেন।

প্রায় দু’শ বছর ধরে ভারত উপমহাদেশে বেনিয়ার বেশে এসে শাসক হিসাবে গেঁড়ে বসা ব্রিটিশ শাসকরা ছিল এক ধরনের শকুন। ১৯৪৭-এ শকুনদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) হয়ে গেল পাকিস্তানের অংশ। এক শকুনের থাবা থেকে বাঙালিরা পড়ল আরেক শকুনের থাবায়। ১৯৫০-৬০’র দশকগুলোতে অখণ্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে আমরা কী দেখি?

দেখছি শুধুই বঞ্চনা, রক্তচোষাদের বিচরণ, হাজার মাইল দূরে পশ্চিমের অংশে পূর্ব বাংলার সম্পদ পাচার, সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের নৈরাজ্য (উদাহরণ হিসাবে, রাজস্ব ও রপ্তানি আয়ের যথাক্রমে ৬০ ও ৫৯ ভাগ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সংগৃহীত হলেও খরচ করা হতো যথাক্রমে ২৫ ও ৩০ ভাগ; সশস্ত্র বাহিনী আর জনপ্রশাসনে পূর্ব পাকিস্তানি ছিল মাত্র যথাক্রমে ৫ ও ১৫ ভাগ; বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের মাত্র ৪ শতাংশ দেওয়া হতো পূর্ব পাকিস্তানকে), পূর্ববঙ্গে ধারাবাহিক শোষণ-অবহেলা আর নিষ্ঠুর শাসকদের নিষ্ঠুর আচরণের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগমন, ধাপ্পাবাজির বুনিয়াদি গণতন্ত্রের প্রহসন, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে পাঞ্জাবিকরণ, ক্ষমতার রাজপ্রাসাদে শকুনিদের লোলুপতা, উচ্চাভিলাষী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতার মসনদ আবার তাদেরই হাতে ক্ষমতার জুয়াখেলার তুরুপ তাস-শুধুই তাদের চেরাপথের খোঁজাখুঁজি, রাজনীতি আর শাসনব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতা, আইয়ুব খানের পায়ের তলায় নয় বছর পর প্রণীত প্রথম সংবিধান, সমরশাসনে পর্যুদস্ত সারা দেশ, ব্যবসা-বাণিজ্যে উর্দুওয়ালাদের মনোপলি, কলকারখানা-শিল্পে পিন্ডিওয়ালাদের আধিপত্য, কায়েমি স্বার্থচক্রের নানা রকম চক্রান্ত-জোগসাজশ-সিন্ডিকেট, উন্নয়নের দশকের নামে রেডিও-টিভিতে খ্যামটা-নাচের আসর, পত্রিপত্রিকায় মিথ্যা তথ্যের বেসাতি, প্রতিবাদমুখর রাজনীতির অঙ্গন, ছাত্রসমাজের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত হামলা-মামলা, চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের সরকারকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বরখাস্তকরণের কারণে বাঙালিদের ফুঁসে ওঠা, রক্তঝরানোর হোলিখেলা, বাংলা ভাষার ওপর নগ্ন আক্রমণ, এমনি আরও কত কী বিমাতাসুলভ আচরণ আর কর্মকাণ্ড!

ইতিহাসের পাতায় আরও আমরা দেখতে পাই সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুই যে সমগ্র দেশের অবিসংবাদিত স্বীকৃত নেতা তা প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকদের ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা, অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া বাঙালির চোখের মণি ভিশনারি নেতা শেখ মুজিবকে বারবার কারাগারে বন্দি করে রাখা, একাত্তরের মার্চে প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চে মুক্তির ডাক, ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন আর ২৫ মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেশব্যাপী গণহত্যা আর নারকীয় উল্লাস।

জনযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুই। তিনি সবাইকে একটিমাত্র গন্তব্যের ঠিকানা দিতে পেরেছিলেন বলেই সব বাঙালি (দেশপ্রেমবিবর্জিত মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ব্যতীত) তাদের গন্তব্য বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। তারই ফলে ২৬ মার্চের সকাল থেকেই পাকিস্তানিদের হঠাৎ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায়নি এ দেশের মানুষ।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার আলোকে দেশপ্রেমী বাঙালিদের প্রতিটি ঘর পরিণত হয়ে উঠেছিল একেকটি দুর্গে। সর্বস্তরের মানুষ জড়িয়ে পড়েছিল দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে, যার কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে জনযুদ্ধ, জনগণের যুদ্ধ, মানুষ বাঁচানোর যুদ্ধ, হঠকারি অবাঙালি শাসকদের বিতাড়িত করার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সামরিক বাহিনীর সাহায্যে কোনো সামরিক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যুদ্ধ। এমন যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছেন একজনই। তিনি বঙ্গবন্ধু।

এত কিছু করার পরও কি তিনি নিজের নেতৃত্বে স্বাধীন করা তার স্বপ্নের দেশে শান্তিতে থাকতে পেরেছিলেন এক দণ্ড? নাকি তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল? যিনি ৫৫ বছরের জীবনকালের একটা বড় অংশ শুধু নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, ঘর-সংসার, আপনজন থেকে দূরে থেকেছেন, সেই তিনিই স্বাধীনতা-পরবর্তী তিনটি বছরও শান্তিতে থাকতে পারেননি।

একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত সারা দেশের আনাচে-কানাচে, বিধ্বস্ত চেহারা সারা দেশের, আশ্রয় শিবির থেকে ফিরে আসা এক কোটি সহায়-সম্বলহীন শরণার্থীসহ দেশের ভেতরে মাটি কামড়ে থাকা প্রায়-সর্বস্বহারা মানুষদের খালি পেট, আর অন্যদিকে চক্রান্তের বেড়াজালে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলসহ খাদ্যদ্রব্যের আকাশচুম্বি মূল্য, আত্মস্বার্থসর্বস্ব সুযোগসন্ধানীদের বিভীষণের রূপ, নির্দয় প্রকৃতির কবলে পড়ে একাধারে দুই বছর খরাবন্যার ছোবল, গ্রামেগঞ্জে-শহরে তথাকথিত সর্বহারাদের অপতৎপরতাসহ চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনকে অনবরত ঠেলতে থাকে খাদের কিনারার দিকে। এ ছাড়াও আমরা দেখেছি আরও অনেক গোষ্ঠীর নানামুখী অপতৎপরতা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় অর্জিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের ২৫ শতাংশ ভোটার আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা অবশ্যম্ভাবীরূপে ছিল পাকিস্তানি মানসিকতার ধারক-বাহক। স্বাধীনতার পর তারা নিষ্ক্রিয় বসে থাকেনি। ঘাপটি মেরে বসে থাকতে থাকতে এক সময় ছদ্মাবরণে প্রশাসনে ঢুকে, আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে শুরু করে ষড়যন্ত্রমূলক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। তাদের চক্রান্ত এখন আর গোপন নেই। বেরিয়ে পড়েছে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে। আরও ক্ষতিকর ছিল অতি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বাইরের মদদপুষ্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী।

এরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত মুক্তাঞ্চল গড়ার মাধ্যমে অবস্থান নেয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে। অপশক্তিগুলো সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে বিপর্যস্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু যখন বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দৃঢ়চিত্তে পদক্ষেপ নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই হায়েনারা হামলে পড়ে ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর আবাসগৃহে। বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয় বহু যোজন দূরে।

জঘন্যতম হীন কাজটি যারা করেছে, তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ভূলুণ্ঠিত করার প্রয়াস পায়নি, তারা বাংলাদেশের জনগণকে কতটা অপমান আর লজ্জায় ফেলেছে তা কিছুটা বোঝা যায় যখন মনে পড়ে জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের আক্ষেপ : ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যারা মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

ড. এম এ মাননান : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক উপাচার্য, বাউবি

সশরীরে নেই, আছেন হৃদয়ের মণিকোঠায়

 ড. এম এ মাননান 
১৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে সংঘটিত বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র অধ্যায়। আর এ অধ্যায়ের রচয়িতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জগৎজুড়ে অভিষিক্ত হয়েছেন অনেক অনুপম অভিধায়। বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসের রচয়িতা হিসাবেও তিনি দেদীপ্যমান হয়ে থাকবেন চিরকাল ইতিহাসের পাতায়, সব সচেতন দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয়ে। জনমানুষের হৃদয় জয় করা ক্যারিশম্যাটিক স্বাপ্নিক নেতা বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই বটে, তবে বেঁচে আছেন সবার হৃদয়ের মণিকোঠায়। অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলতে থাকবেন তিনি চিরকাল উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে যুগ যুগ ধরে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন, আদর্শ আর ত্যাগের শিক্ষা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও অনেক প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধুকে চিনতে হলে নতুন প্রজন্মকে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বুলালেই তারা জানতে পারবেন কোন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর উত্থান হয়েছিল আর তিনি কেন এবং কীভাবে জীবনের স্বর্ণালি দিনগুলো বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে রাজপথে আর কারাগারে উৎসর্গ করেছিলেন।

প্রায় দু’শ বছর ধরে ভারত উপমহাদেশে বেনিয়ার বেশে এসে শাসক হিসাবে গেঁড়ে বসা ব্রিটিশ শাসকরা ছিল এক ধরনের শকুন। ১৯৪৭-এ শকুনদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) হয়ে গেল পাকিস্তানের অংশ। এক শকুনের থাবা থেকে বাঙালিরা পড়ল আরেক শকুনের থাবায়। ১৯৫০-৬০’র দশকগুলোতে অখণ্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে আমরা কী দেখি?

দেখছি শুধুই বঞ্চনা, রক্তচোষাদের বিচরণ, হাজার মাইল দূরে পশ্চিমের অংশে পূর্ব বাংলার সম্পদ পাচার, সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের নৈরাজ্য (উদাহরণ হিসাবে, রাজস্ব ও রপ্তানি আয়ের যথাক্রমে ৬০ ও ৫৯ ভাগ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সংগৃহীত হলেও খরচ করা হতো যথাক্রমে ২৫ ও ৩০ ভাগ; সশস্ত্র বাহিনী আর জনপ্রশাসনে পূর্ব পাকিস্তানি ছিল মাত্র যথাক্রমে ৫ ও ১৫ ভাগ; বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের মাত্র ৪ শতাংশ দেওয়া হতো পূর্ব পাকিস্তানকে), পূর্ববঙ্গে ধারাবাহিক শোষণ-অবহেলা আর নিষ্ঠুর শাসকদের নিষ্ঠুর আচরণের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগমন, ধাপ্পাবাজির বুনিয়াদি গণতন্ত্রের প্রহসন, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে পাঞ্জাবিকরণ, ক্ষমতার রাজপ্রাসাদে শকুনিদের লোলুপতা, উচ্চাভিলাষী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতার মসনদ আবার তাদেরই হাতে ক্ষমতার জুয়াখেলার তুরুপ তাস-শুধুই তাদের চেরাপথের খোঁজাখুঁজি, রাজনীতি আর শাসনব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতা, আইয়ুব খানের পায়ের তলায় নয় বছর পর প্রণীত প্রথম সংবিধান, সমরশাসনে পর্যুদস্ত সারা দেশ, ব্যবসা-বাণিজ্যে উর্দুওয়ালাদের মনোপলি, কলকারখানা-শিল্পে পিন্ডিওয়ালাদের আধিপত্য, কায়েমি স্বার্থচক্রের নানা রকম চক্রান্ত-জোগসাজশ-সিন্ডিকেট, উন্নয়নের দশকের নামে রেডিও-টিভিতে খ্যামটা-নাচের আসর, পত্রিপত্রিকায় মিথ্যা তথ্যের বেসাতি, প্রতিবাদমুখর রাজনীতির অঙ্গন, ছাত্রসমাজের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত হামলা-মামলা, চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের সরকারকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বরখাস্তকরণের কারণে বাঙালিদের ফুঁসে ওঠা, রক্তঝরানোর হোলিখেলা, বাংলা ভাষার ওপর নগ্ন আক্রমণ, এমনি আরও কত কী বিমাতাসুলভ আচরণ আর কর্মকাণ্ড!

ইতিহাসের পাতায় আরও আমরা দেখতে পাই সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুই যে সমগ্র দেশের অবিসংবাদিত স্বীকৃত নেতা তা প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকদের ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা, অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া বাঙালির চোখের মণি ভিশনারি নেতা শেখ মুজিবকে বারবার কারাগারে বন্দি করে রাখা, একাত্তরের মার্চে প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চে মুক্তির ডাক, ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন আর ২৫ মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেশব্যাপী গণহত্যা আর নারকীয় উল্লাস।

জনযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুই। তিনি সবাইকে একটিমাত্র গন্তব্যের ঠিকানা দিতে পেরেছিলেন বলেই সব বাঙালি (দেশপ্রেমবিবর্জিত মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ব্যতীত) তাদের গন্তব্য বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। তারই ফলে ২৬ মার্চের সকাল থেকেই পাকিস্তানিদের হঠাৎ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায়নি এ দেশের মানুষ।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার আলোকে দেশপ্রেমী বাঙালিদের প্রতিটি ঘর পরিণত হয়ে উঠেছিল একেকটি দুর্গে। সর্বস্তরের মানুষ জড়িয়ে পড়েছিল দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে, যার কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে জনযুদ্ধ, জনগণের যুদ্ধ, মানুষ বাঁচানোর যুদ্ধ, হঠকারি অবাঙালি শাসকদের বিতাড়িত করার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সামরিক বাহিনীর সাহায্যে কোনো সামরিক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যুদ্ধ। এমন যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছেন একজনই। তিনি বঙ্গবন্ধু।

এত কিছু করার পরও কি তিনি নিজের নেতৃত্বে স্বাধীন করা তার স্বপ্নের দেশে শান্তিতে থাকতে পেরেছিলেন এক দণ্ড? নাকি তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল? যিনি ৫৫ বছরের জীবনকালের একটা বড় অংশ শুধু নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, ঘর-সংসার, আপনজন থেকে দূরে থেকেছেন, সেই তিনিই স্বাধীনতা-পরবর্তী তিনটি বছরও শান্তিতে থাকতে পারেননি।

একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত সারা দেশের আনাচে-কানাচে, বিধ্বস্ত চেহারা সারা দেশের, আশ্রয় শিবির থেকে ফিরে আসা এক কোটি সহায়-সম্বলহীন শরণার্থীসহ দেশের ভেতরে মাটি কামড়ে থাকা প্রায়-সর্বস্বহারা মানুষদের খালি পেট, আর অন্যদিকে চক্রান্তের বেড়াজালে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলসহ খাদ্যদ্রব্যের আকাশচুম্বি মূল্য, আত্মস্বার্থসর্বস্ব সুযোগসন্ধানীদের বিভীষণের রূপ, নির্দয় প্রকৃতির কবলে পড়ে একাধারে দুই বছর খরাবন্যার ছোবল, গ্রামেগঞ্জে-শহরে তথাকথিত সর্বহারাদের অপতৎপরতাসহ চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনকে অনবরত ঠেলতে থাকে খাদের কিনারার দিকে। এ ছাড়াও আমরা দেখেছি আরও অনেক গোষ্ঠীর নানামুখী অপতৎপরতা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় অর্জিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের ২৫ শতাংশ ভোটার আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা অবশ্যম্ভাবীরূপে ছিল পাকিস্তানি মানসিকতার ধারক-বাহক। স্বাধীনতার পর তারা নিষ্ক্রিয় বসে থাকেনি। ঘাপটি মেরে বসে থাকতে থাকতে এক সময় ছদ্মাবরণে প্রশাসনে ঢুকে, আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে শুরু করে ষড়যন্ত্রমূলক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। তাদের চক্রান্ত এখন আর গোপন নেই। বেরিয়ে পড়েছে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে। আরও ক্ষতিকর ছিল অতি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বাইরের মদদপুষ্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী।

এরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত মুক্তাঞ্চল গড়ার মাধ্যমে অবস্থান নেয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে। অপশক্তিগুলো সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে বিপর্যস্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু যখন বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দৃঢ়চিত্তে পদক্ষেপ নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই হায়েনারা হামলে পড়ে ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর আবাসগৃহে। বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয় বহু যোজন দূরে।

জঘন্যতম হীন কাজটি যারা করেছে, তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ভূলুণ্ঠিত করার প্রয়াস পায়নি, তারা বাংলাদেশের জনগণকে কতটা অপমান আর লজ্জায় ফেলেছে তা কিছুটা বোঝা যায় যখন মনে পড়ে জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের আক্ষেপ : ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যারা মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

ড. এম এ মাননান : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক উপাচার্য, বাউবি

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট