রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আশা-নিরাশার দোলাচলে
jugantor
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আশা-নিরাশার দোলাচলে

  ড. দেলোয়ার হোসেন  

২৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একদিকে করোনা অতিমারি, অপরদিকে মিয়ানমারের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সামরিক জান্তার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টার ফলে বিশ্বে রোহিঙ্গা ইস্যুটির গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে।

কিন্তু একইসঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে। অবশ্য কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে তার চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর এবং ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ ভোটগ্রহণে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিংবা জাতিসংঘ থেকে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির বিষয় উঠে আসে। ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথমবার যখন ভোটটি হয়, তখন ১৩১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে অর্থাৎ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, ৯টি দেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং ৩১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম, ৩১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন ভোটগ্রহণ করা হয়, তখন যে দেশগুলো আগে ভোট দেয়নি, তারা বাংলাদেশের বা রোহিঙ্গাদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। গত ১২ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নিন্দা জ্ঞাপন করে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ওআইসি ও বাংলাদেশ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ প্রস্তাব পাশ হওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ এর ফলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটা চাপের মুখে রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জাতিসংঘে বাংলাদেশ আগে থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি শক্ত অবস্থানে যাওয়া উচিত এবং এ ব্যাপারে বিশ্ব সংস্থাটির একটি রোডম্যাপ থাকা উচিত।

এ ধরনের একটি বড় সংকটকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো যারা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়, তাদের আরও বেশি এগিয়ে আসা উচিত। অবশ্য পশ্চিমা দেশগুলোকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আরও বেশি জোরালো ভূমিকা রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশ চাপ দিয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই।

ঢাকায় মিসরের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হেথাম গোবাসি বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনে মিসরের পক্ষ থেকে সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাশিম রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, এ ব্যাপারে তারা সবসময় বাংলাদেশের পাশে রয়েছেন।

বাংলাদেশে নবনিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরান বলেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তুরস্ক সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করছে। এ ইস্যুটি জাতিসংঘে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আছে এবং যে ভাষায় মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে, তা অনেকটা নজিরবিহীন। শুধু তাই নয়, মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি, যিনি একজন মার্কিন নাগরিক, তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা যা করছে, সেটিকেও এক ধরনের গণহত্যা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। মিয়ানমারে শুধু যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন-নির্যাতন-গণহত্যা হয়েছে তা নয়, এ মুহূর্তে সামরিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক জান্তা যা করছে, সেটিকেও জাতিসংঘ গণহত্যা হিসাবে আখ্যায়িত করছে।

বিশেষ করে জাতিসংঘের ওই বিশেষ দূত এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছে।

তবে আমার মনে হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং এ মুহূর্তে মিয়ানমারের জান্তা যে ধরনের চাপে আছে, সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ সরাসরি তারা হয়তো নেবে না। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি সামরিক জান্তার ওপর নতুন করে এক ধরনের চাপ সৃষ্টির একটা সুযোগ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের ভেতরে ও বাইরে অন্য যেসব বাস্তবতা আছে-সবকিছু মিলিয়ে এই সামরিক সরকার যদি একটা দুর্বল অবস্থায় যায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের জন্য সেটি ইতিবাচক হবে।

বিরোধী রাজনৈতিক দল এনএলডি (ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি) পরিচালিত যে ছায়া সরকার, সেই সরকারের বক্তব্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ইতিবাচক।

এতে বোঝা যায়, এনএলডি রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অতীত অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এমনকি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বক্তব্য দিয়েছে। বলেছে, ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় গেলে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করবে।

আমরা রোহিঙ্গাদের ব্যাপরে দুধরনের সম্ভাবনা দেখি। একদিকে তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সামরিক জান্তা হয়তো এ চাপের মধ্যেই কোনো একসময় রাজি হতে পারে। কারণ তাদের ওপর ক্ষমতা ছাড়ার চাপ আছে, আবার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার চাপও আছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা একটা চিন্তা করতেও পারে। কারণ ক্ষমতা ছাড়াটা তাদের জন্য কঠিন হবে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপের ফলে তাদের ক্ষমতা ছাড়ার সম্ভাবনার বিভিন্ন লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

সেটি খুব দ্রুত না হলেও বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। এ সরকার যত দুর্বল হবে, যত বেশি তারা ক্ষমতা থেকে সরে যাবে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তত বেশি স্পষ্ট হবে। কারণ সামরিক সরকার ক্ষমতা থেকে সরে গেলে মিয়ানমারে এক ধরনের রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতীয় ঐক্য সরকার যে কমিটমেন্ট দিয়েছে, সেই কমিটমেন্টের জায়গা থেকেও একটা আশার আলো দেখা যেতে পারে।

সার্বিক দিক পর্যালোচনায় বলা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। কারণ মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। সামরিক সরকার ক্রমাগত চাপের মুখে আছে। তাদের যেহেতু দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা আছে, তাই তারা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের ভেতরের শক্তিগুলোর যে চাপ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটির একটা ভালো ফল হয়তো অচিরেই আমরা দেখতে পাব। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আমি মনে করি একটা দীর্ঘস্থায়ী সমীকরণ নিয়েই এগিয়ে যাবে।

ড. দেলোয়ার হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আশা-নিরাশার দোলাচলে

 ড. দেলোয়ার হোসেন 
২৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একদিকে করোনা অতিমারি, অপরদিকে মিয়ানমারের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সামরিক জান্তার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টার ফলে বিশ্বে রোহিঙ্গা ইস্যুটির গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে।

কিন্তু একইসঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে। অবশ্য কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে তার চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর এবং ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ ভোটগ্রহণে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিংবা জাতিসংঘ থেকে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির বিষয় উঠে আসে। ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথমবার যখন ভোটটি হয়, তখন ১৩১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে অর্থাৎ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, ৯টি দেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং ৩১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম, ৩১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন ভোটগ্রহণ করা হয়, তখন যে দেশগুলো আগে ভোট দেয়নি, তারা বাংলাদেশের বা রোহিঙ্গাদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। গত ১২ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নিন্দা জ্ঞাপন করে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ওআইসি ও বাংলাদেশ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ প্রস্তাব পাশ হওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ এর ফলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটা চাপের মুখে রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জাতিসংঘে বাংলাদেশ আগে থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি শক্ত অবস্থানে যাওয়া উচিত এবং এ ব্যাপারে বিশ্ব সংস্থাটির একটি রোডম্যাপ থাকা উচিত।

এ ধরনের একটি বড় সংকটকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো যারা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়, তাদের আরও বেশি এগিয়ে আসা উচিত। অবশ্য পশ্চিমা দেশগুলোকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আরও বেশি জোরালো ভূমিকা রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশ চাপ দিয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই।

ঢাকায় মিসরের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হেথাম গোবাসি বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনে মিসরের পক্ষ থেকে সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাশিম রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, এ ব্যাপারে তারা সবসময় বাংলাদেশের পাশে রয়েছেন।

বাংলাদেশে নবনিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরান বলেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তুরস্ক সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করছে। এ ইস্যুটি জাতিসংঘে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আছে এবং যে ভাষায় মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে, তা অনেকটা নজিরবিহীন। শুধু তাই নয়, মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি, যিনি একজন মার্কিন নাগরিক, তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা যা করছে, সেটিকেও এক ধরনের গণহত্যা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। মিয়ানমারে শুধু যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন-নির্যাতন-গণহত্যা হয়েছে তা নয়, এ মুহূর্তে সামরিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক জান্তা যা করছে, সেটিকেও জাতিসংঘ গণহত্যা হিসাবে আখ্যায়িত করছে।

বিশেষ করে জাতিসংঘের ওই বিশেষ দূত এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছে।

তবে আমার মনে হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং এ মুহূর্তে মিয়ানমারের জান্তা যে ধরনের চাপে আছে, সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ সরাসরি তারা হয়তো নেবে না। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি সামরিক জান্তার ওপর নতুন করে এক ধরনের চাপ সৃষ্টির একটা সুযোগ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের ভেতরে ও বাইরে অন্য যেসব বাস্তবতা আছে-সবকিছু মিলিয়ে এই সামরিক সরকার যদি একটা দুর্বল অবস্থায় যায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের জন্য সেটি ইতিবাচক হবে।

বিরোধী রাজনৈতিক দল এনএলডি (ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি) পরিচালিত যে ছায়া সরকার, সেই সরকারের বক্তব্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ইতিবাচক।

এতে বোঝা যায়, এনএলডি রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অতীত অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এমনকি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বক্তব্য দিয়েছে। বলেছে, ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় গেলে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করবে।

আমরা রোহিঙ্গাদের ব্যাপরে দুধরনের সম্ভাবনা দেখি। একদিকে তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সামরিক জান্তা হয়তো এ চাপের মধ্যেই কোনো একসময় রাজি হতে পারে। কারণ তাদের ওপর ক্ষমতা ছাড়ার চাপ আছে, আবার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার চাপও আছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা একটা চিন্তা করতেও পারে। কারণ ক্ষমতা ছাড়াটা তাদের জন্য কঠিন হবে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপের ফলে তাদের ক্ষমতা ছাড়ার সম্ভাবনার বিভিন্ন লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

সেটি খুব দ্রুত না হলেও বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। এ সরকার যত দুর্বল হবে, যত বেশি তারা ক্ষমতা থেকে সরে যাবে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তত বেশি স্পষ্ট হবে। কারণ সামরিক সরকার ক্ষমতা থেকে সরে গেলে মিয়ানমারে এক ধরনের রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতীয় ঐক্য সরকার যে কমিটমেন্ট দিয়েছে, সেই কমিটমেন্টের জায়গা থেকেও একটা আশার আলো দেখা যেতে পারে।

সার্বিক দিক পর্যালোচনায় বলা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। কারণ মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। সামরিক সরকার ক্রমাগত চাপের মুখে আছে। তাদের যেহেতু দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা আছে, তাই তারা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের ভেতরের শক্তিগুলোর যে চাপ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটির একটা ভালো ফল হয়তো অচিরেই আমরা দেখতে পাব। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আমি মনে করি একটা দীর্ঘস্থায়ী সমীকরণ নিয়েই এগিয়ে যাবে।

ড. দেলোয়ার হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা