ওআইসি নিয়ে কিছু স্মৃতিকথা
jugantor
ওআইসি নিয়ে কিছু স্মৃতিকথা

  মহিউদ্দিন আহমদ  

০৭ মে ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২২-২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত কতগুলো মুসলমানপ্রধান দেশের একটি শীর্ষ সম্মেলনে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) মরক্কোর রাবাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ২১ আগস্ট আল-আকসা মসজিদে এক অগ্নিকাণ্ডে মসজিদটির গুরুতর ক্ষতি হয়। এ অগ্নিকাণ্ডটিকে ইসরাইলের একটি চরম অপরাধ এবং ধৃষ্টতা হিসেবে দেখে সারা দুনিয়ার মুসলমান জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থানে এই হামলা-আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় রাবাতে শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠান করে।

এই সম্মেলনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, এখানে ভারতকে সদস্য হতে দেয়া হয়নি। ভারতের পক্ষে তখন ভারতের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট, ফকরুদ্দিন আলী আহমদ প্রথম দিকে শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও পরে আর তাকে থাকতে দেয়া হয়নি। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তীব্র প্রতিবাদে ফকরুদ্দিন আলী আহমদ শীর্ষ সম্মেলনে আর উপস্থিত থাকতে পারেননি। তখন হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও মুসলমান জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দেশ ছিল ভারত।

রাবাতের সেই শীর্ষ সম্মেলনের পর গত ৪৯ বছরে ১৩টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষটি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ২০১৬ সালের ১৪-১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া আরও অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬টি এক্সট্রা-অর্ডিনারি শীর্ষ সম্মেলন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করবেন, এ ঘোষণার প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরে শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এই শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

প্রতি তিন বছরে একটি শীর্ষ সম্মেলন এবং প্রতি বছর একটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে এই সংস্থাটির চার্টারে। বাংলাদেশে গত ৫ ও ৬ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, সেটি ক্রমিক নম্বরে ৪৫তম বার্ষিক সম্মেলন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরও কতগুলো এক্সট্রা-অর্ডিনারি সম্মেলন এই ৫০ বছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৭৪-এর ২২-২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওআইসির দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। আমাদের বাংলাদেশের জন্য লাহোর শীর্ষ সম্মেলনটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তিনি লাহোর যেতে পারেন না, যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকেও প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের প্লেনে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়। উল্লেখ্য, জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যখন ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ফাঁসি দেয়া হয়, তখন কিন্তু তিনি ওআইসির সভাপতি। ১৯৭৪-এ ওআইসি সামিটে ভুট্টো সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ পর্যন্ত আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ৭ বছর পর ১৯৮১-তে নতুন হিজরি শতাব্দীর শুরুতে মক্কা ও তায়েফে তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি সম্মেলন হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন এআরএস দোহা এ সম্মেলনটির উদ্বোধন করেছিলেন। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১৩ বছরে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছিল। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনটির আরও গুরুত্ব ছিল ওআইসির তখনকার সেক্রেটারি জেনারেল তিউনিসিয়ার হাবিব শাত্তির মেয়াদ শেষে এআরএস দোহা প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দোহাকে এরশাদ বরখাস্ত করলে আমাদের আর কোনো প্রার্থী থাকল না। তখন পাকিস্তানের এক সাবেক আইনমন্ত্রী শরফুদ্দিন পীরজাদা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইয়েমেনের সানাতে ১৯৮৪-তে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়ে যান।

১৯৮৩ সালের সেই সম্মেলনের কথা ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ ৪৫তম সম্মেলনের কোথাও একটি হরফেও উল্লেখ দেখলাম না। এরশাদ তো এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, তার স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেত্রী। কিন্তু ৪ মে সন্ধ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া নৈশভোজে বা ৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ দু’জনের কাউকে দেখা গেল না। তবে আমার বিবেচনায় তাদের অন্তত এ দুই অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া সমীচীন ছিল।

মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব

শিউলীতলা, উত্তরা

ওআইসি নিয়ে কিছু স্মৃতিকথা

 মহিউদ্দিন আহমদ 
০৭ মে ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২২-২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত কতগুলো মুসলমানপ্রধান দেশের একটি শীর্ষ সম্মেলনে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) মরক্কোর রাবাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ২১ আগস্ট আল-আকসা মসজিদে এক অগ্নিকাণ্ডে মসজিদটির গুরুতর ক্ষতি হয়। এ অগ্নিকাণ্ডটিকে ইসরাইলের একটি চরম অপরাধ এবং ধৃষ্টতা হিসেবে দেখে সারা দুনিয়ার মুসলমান জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থানে এই হামলা-আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় রাবাতে শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠান করে।

এই সম্মেলনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, এখানে ভারতকে সদস্য হতে দেয়া হয়নি। ভারতের পক্ষে তখন ভারতের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট, ফকরুদ্দিন আলী আহমদ প্রথম দিকে শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও পরে আর তাকে থাকতে দেয়া হয়নি। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তীব্র প্রতিবাদে ফকরুদ্দিন আলী আহমদ শীর্ষ সম্মেলনে আর উপস্থিত থাকতে পারেননি। তখন হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও মুসলমান জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দেশ ছিল ভারত।

রাবাতের সেই শীর্ষ সম্মেলনের পর গত ৪৯ বছরে ১৩টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষটি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ২০১৬ সালের ১৪-১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া আরও অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬টি এক্সট্রা-অর্ডিনারি শীর্ষ সম্মেলন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করবেন, এ ঘোষণার প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরে শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এই শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

প্রতি তিন বছরে একটি শীর্ষ সম্মেলন এবং প্রতি বছর একটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে এই সংস্থাটির চার্টারে। বাংলাদেশে গত ৫ ও ৬ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, সেটি ক্রমিক নম্বরে ৪৫তম বার্ষিক সম্মেলন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরও কতগুলো এক্সট্রা-অর্ডিনারি সম্মেলন এই ৫০ বছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৭৪-এর ২২-২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওআইসির দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। আমাদের বাংলাদেশের জন্য লাহোর শীর্ষ সম্মেলনটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তিনি লাহোর যেতে পারেন না, যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকেও প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের প্লেনে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়। উল্লেখ্য, জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যখন ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ফাঁসি দেয়া হয়, তখন কিন্তু তিনি ওআইসির সভাপতি। ১৯৭৪-এ ওআইসি সামিটে ভুট্টো সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ পর্যন্ত আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ৭ বছর পর ১৯৮১-তে নতুন হিজরি শতাব্দীর শুরুতে মক্কা ও তায়েফে তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি সম্মেলন হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন এআরএস দোহা এ সম্মেলনটির উদ্বোধন করেছিলেন। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১৩ বছরে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছিল। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনটির আরও গুরুত্ব ছিল ওআইসির তখনকার সেক্রেটারি জেনারেল তিউনিসিয়ার হাবিব শাত্তির মেয়াদ শেষে এআরএস দোহা প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দোহাকে এরশাদ বরখাস্ত করলে আমাদের আর কোনো প্রার্থী থাকল না। তখন পাকিস্তানের এক সাবেক আইনমন্ত্রী শরফুদ্দিন পীরজাদা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইয়েমেনের সানাতে ১৯৮৪-তে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়ে যান।

১৯৮৩ সালের সেই সম্মেলনের কথা ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ ৪৫তম সম্মেলনের কোথাও একটি হরফেও উল্লেখ দেখলাম না। এরশাদ তো এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, তার স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেত্রী। কিন্তু ৪ মে সন্ধ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া নৈশভোজে বা ৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ দু’জনের কাউকে দেখা গেল না। তবে আমার বিবেচনায় তাদের অন্তত এ দুই অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া সমীচীন ছিল।

মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব

শিউলীতলা, উত্তরা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন