বাস্তব নির্দেশনার প্রতীক্ষায়
jugantor
বাস্তব নির্দেশনার প্রতীক্ষায়

  কাজী ফারুক আহমেদ  

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পাঁচ দিন পর দেশে আজ পালিত হচ্ছে মহান শিক্ষা দিবস।

উল্লেখ্য, ৫৯ বছর আগে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে ব্যতিক্রমী আন্দোলন গড়ে তোলে, ওই বছর অর্থাৎ ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তা পরিণতি লাভ করে।

দুঃখ হয়, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দিনটি আজও জাতীয় শিক্ষা দিবসের স্বীকৃতি পায়নি। এ কথা সত্য, শিক্ষা মানবাধিকারের অপরিহার্য অংশ এবং এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা দুটোই গুরুত্ববহ হলেও জাতীয় প্রেক্ষিতে সময়োচিত কাম্য পদক্ষেপ গ্রহণে অসামর্থ্য অনেক ক্ষেত্রে বেশি করে আশাভঙ্গের ও বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্মর্তব্য যে, চারটি মোটা দাগের ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, যা হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এর প্রতিটির যথাযথ মূল্যায়ন যে জাতীয় মর্যাদার জন্য অপরিহার্য, তা মানতে আমরা আর কত সময় নেব?

অন্যদিকে পাহাড়সম ভুলের কথাও বলতে হয়। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তি রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য জিয়াউর রহমানের জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সরকারিভাবে তা পালন শুরুও হয়।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট এভাবে দিবসটি পালনের অসারতা উল্লেখ করে বলে, কুদরাত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে একটি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের কথা বলা হয়েছে ঠিকই; সেই অনুযায়ী সরকার যদি শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-ই খুদা, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বিজ্ঞানী সত্যেন বসু অথবা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর মতো কোনো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের নামে এ দিবসটি উদযাপন করত, তাহলে সেটাই হতো যৌক্তিক।

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কারণে আজকের দিনটি আমাকে সে সময়ের ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন পরাধীন আমরা একটি গণমুখী শিক্ষানীতির দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। আজ ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। দিনটি কয়েকটি কারণে আমার মনঃকষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত, এ দিনটি এখনো জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার কারণে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যেভাবে এ দিনটিতে কর্মসূচি পালন করা হতো-যার মধ্যে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল সবকিছু ছিল-তার বেশির ভাগই করা যাচ্ছে না। এ দুঃখ আমার কাছে অনেক বড়। শিশুরা যেমন ঘরে আবদ্ধ থেকে অস্থিরতায় ভুগেছে, তেমনই আমিও বয়স সত্তরের কোঠা অতিক্রমের অপেক্ষায়, দেড় হাজার বর্গফুটের মধ্যে আবদ্ধ।

শুধু বিকালে ছাদে আধা ঘণ্টা হাঁটাচলা করতে পারি। এই যে স্বাভাবিক চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ-এটি সহ্য করা সত্যি খুব কঠিন। তবে আশার কথা, স্কুল খোলার পর শিক্ষার্থীরা এখন মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে। তবে শিক্ষকদের দুর্দশা ভিন্ন ধরনের। এ করোনার মধ্যে শিক্ষার যে বিশ্বব্যাপী রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, তার সঙ্গে তারা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবেন সেটা একটা দিক।

আরেক দিকে লক্ষাধিক শিক্ষক বিনা বেতনে বছরের পর বছর পাঠদান করে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় তাদের একটা অংশকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ মানবিক দৃষ্টান্ত প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বছরের পর বছর বিনা বেতনে স্কুল-কলেজ-কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, অনার্স-মাস্টার্স কলেজে যেসব শিক্ষক এমপিও না পেয়ে দিন যাপন করছেন, তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশের ভাষা আমার নেই। আশা করি, তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন।

এটা সত্য, সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষাক্রমের অনুমোদন মিলেছে। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ২০১৭ সালে গঠিত কমিটিতে আমিও যুক্ত ছিলাম। তবে ওই প্রতিবেদন ছিল করোনার আগে বিদ্যমান অবস্থায়। তথ্যপ্রযুক্তি ও দূরশিক্ষণের অপরিহার্য ব্যবহার ও বর্তমান অতিমারির মতো জরুরি অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সেভাবে বিবেচনায় আসেনি। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে গঠিত শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটিও এ নিয়ে কাজ করে।

২০১৭ ও ২০১৯ সালে দুটি কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ এবং বিশিষ্টজনদের মতামত, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্দেশনা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণীত হয়। কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী এতে অনুমোদন দিয়েছেন। অপেক্ষায় আছি, যে কোনো পরিস্থিতি বা দুর্বিপাকের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তব নির্দেশনা সেখানে কীভাবে দেওয়া হয়েছে তা দেখার জন্য। এ বিষয় ও প্রত্যাশা এবারের শিক্ষা দিবসকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম প্রণেতা। শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক

principalqfahmed@yahoo.com

বাস্তব নির্দেশনার প্রতীক্ষায়

 কাজী ফারুক আহমেদ 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পাঁচ দিন পর দেশে আজ পালিত হচ্ছে মহান শিক্ষা দিবস।

উল্লেখ্য, ৫৯ বছর আগে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে ব্যতিক্রমী আন্দোলন গড়ে তোলে, ওই বছর অর্থাৎ ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তা পরিণতি লাভ করে।

দুঃখ হয়, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দিনটি আজও জাতীয় শিক্ষা দিবসের স্বীকৃতি পায়নি। এ কথা সত্য, শিক্ষা মানবাধিকারের অপরিহার্য অংশ এবং এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা দুটোই গুরুত্ববহ হলেও জাতীয় প্রেক্ষিতে সময়োচিত কাম্য পদক্ষেপ গ্রহণে অসামর্থ্য অনেক ক্ষেত্রে বেশি করে আশাভঙ্গের ও বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্মর্তব্য যে, চারটি মোটা দাগের ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, যা হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এর প্রতিটির যথাযথ মূল্যায়ন যে জাতীয় মর্যাদার জন্য অপরিহার্য, তা মানতে আমরা আর কত সময় নেব?

অন্যদিকে পাহাড়সম ভুলের কথাও বলতে হয়। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তি রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য জিয়াউর রহমানের জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সরকারিভাবে তা পালন শুরুও হয়।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট এভাবে দিবসটি পালনের অসারতা উল্লেখ করে বলে, কুদরাত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে একটি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের কথা বলা হয়েছে ঠিকই; সেই অনুযায়ী সরকার যদি শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-ই খুদা, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বিজ্ঞানী সত্যেন বসু অথবা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর মতো কোনো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের নামে এ দিবসটি উদযাপন করত, তাহলে সেটাই হতো যৌক্তিক।

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কারণে আজকের দিনটি আমাকে সে সময়ের ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন পরাধীন আমরা একটি গণমুখী শিক্ষানীতির দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। আজ ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। দিনটি কয়েকটি কারণে আমার মনঃকষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত, এ দিনটি এখনো জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার কারণে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যেভাবে এ দিনটিতে কর্মসূচি পালন করা হতো-যার মধ্যে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল সবকিছু ছিল-তার বেশির ভাগই করা যাচ্ছে না। এ দুঃখ আমার কাছে অনেক বড়। শিশুরা যেমন ঘরে আবদ্ধ থেকে অস্থিরতায় ভুগেছে, তেমনই আমিও বয়স সত্তরের কোঠা অতিক্রমের অপেক্ষায়, দেড় হাজার বর্গফুটের মধ্যে আবদ্ধ।

শুধু বিকালে ছাদে আধা ঘণ্টা হাঁটাচলা করতে পারি। এই যে স্বাভাবিক চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ-এটি সহ্য করা সত্যি খুব কঠিন। তবে আশার কথা, স্কুল খোলার পর শিক্ষার্থীরা এখন মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে। তবে শিক্ষকদের দুর্দশা ভিন্ন ধরনের। এ করোনার মধ্যে শিক্ষার যে বিশ্বব্যাপী রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, তার সঙ্গে তারা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবেন সেটা একটা দিক।

আরেক দিকে লক্ষাধিক শিক্ষক বিনা বেতনে বছরের পর বছর পাঠদান করে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় তাদের একটা অংশকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ মানবিক দৃষ্টান্ত প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বছরের পর বছর বিনা বেতনে স্কুল-কলেজ-কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, অনার্স-মাস্টার্স কলেজে যেসব শিক্ষক এমপিও না পেয়ে দিন যাপন করছেন, তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশের ভাষা আমার নেই। আশা করি, তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন।

এটা সত্য, সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষাক্রমের অনুমোদন মিলেছে। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ২০১৭ সালে গঠিত কমিটিতে আমিও যুক্ত ছিলাম। তবে ওই প্রতিবেদন ছিল করোনার আগে বিদ্যমান অবস্থায়। তথ্যপ্রযুক্তি ও দূরশিক্ষণের অপরিহার্য ব্যবহার ও বর্তমান অতিমারির মতো জরুরি অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সেভাবে বিবেচনায় আসেনি। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে গঠিত শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটিও এ নিয়ে কাজ করে।

২০১৭ ও ২০১৯ সালে দুটি কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ এবং বিশিষ্টজনদের মতামত, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্দেশনা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণীত হয়। কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী এতে অনুমোদন দিয়েছেন। অপেক্ষায় আছি, যে কোনো পরিস্থিতি বা দুর্বিপাকের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তব নির্দেশনা সেখানে কীভাবে দেওয়া হয়েছে তা দেখার জন্য। এ বিষয় ও প্রত্যাশা এবারের শিক্ষা দিবসকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম প্রণেতা। শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক

principalqfahmed@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন