বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, ব্যয়েও স্বচ্ছতা আসুক
jugantor
বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, ব্যয়েও স্বচ্ছতা আসুক

  মুঈদ রহমান  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১২ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ হবে আরও ৭৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে শুধু নবীগঞ্জের বিবিয়ানা কেন্দ্র থেকেই পাওয়া যাবে ৪০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে গ্যাস। সিলেটের কুমারগাঁওয়ে নতুন করে উৎপাদিত হবে ৭৫ মেগাওয়াট। গ্যাস ব্যবহৃত এ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ২২৫ মেগাওয়াট। বাগেরহাটের মোল্লাহাটের কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১০০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামের জুলদা প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। এ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা কেন্দ্রেও জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। সেখান থেকে পাওয়া যাবে ১০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। নতুন পাঁচটিসহ দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়াল ১৪৬-এ। এর মধ্যে ১১৯টি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে। এই তিন মেয়াদে সংযুক্ত ৩ কোটি ১ লাখ গ্রাহকসহ দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৯ লাখ। পাশাপাশি বিদ্যুতের সেচ সংযোগ ২০০৮ সালে ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার। সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজারে।

অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর চালিকাশক্তি হিসাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সেই হিসাবে সরকার ২০২১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ২৪ হাজার মেগাওয়াট। যদি আমরা ক্যাপটিভ (শিল্পে নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুৎ) এবং ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমকে বিবেচনায় নেই, তাহলে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াটে। তা সত্ত্বেও ‘নিরবচ্ছিন্ন’ বিদ্যুৎ সরবরাহ যাকে বলে তা করা যায়নি। সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নাও থাকতে পারে। কারণ সরবরাহের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের সম্পর্ক আছে। জ্বালানি হিসাবে গ্যাস ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি খরচ হয় ৩ টাকা আর জ্বালানি তেল ব্যবহার করলে খরচ হয় ২০ টাকা; যে কারণে সরকারকে ভর্তুকি হিসাবে খরচ করতে হয় বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমান সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডেরই সমালোচনা করার সুযোগ আছে। তবে তারা বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে অনকটাই সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। আগেই বলেছি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার আগে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার যদি ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশে রাখতে চাই, তাহলে ২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ৩৬ হাজার মেগাওয়াটে। সরকারকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে। তা না হলে বিদ্যুতের অভাবে অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে নির্মিত হয়েছে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট। এর জন্য ব্যয় করা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। নির্মাণ শেষে কেন্দ্রটি সঞ্চালনের অপেক্ষায় রয়েছে। উৎপাদনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হবে। বরগুনার তালতলী উপজেলায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে উৎপাদন করা হবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি নির্মাণ করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০২৪ সালে পাওয়া যাবে ১ হাজার ২০০ এবং ২০২৫ সালে পাওয়া যাবে ১ হাজার ২০০, মোট ২ হাজর ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ব্যয়বহুল এ প্রকল্পে খরচ হবে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অনেকেই মনে করেন, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য লাখকোটি টাকা খরচ অনেক বেশি। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের হিসাবে তা বেশি নয়। প্রকল্পটির মেয়াদ প্রাথমিকভাবে ৬০ বছর, এর সঙ্গে ২০ বছর সম্প্রসারণযোগ্য, মোট ৮০ বছরের উৎপাদন প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিলে ব্যয় খুব বেশি নয়।

চাাহিদার অনুপাতে শতভাগ জোগানের ব্যবস্থা করা না গেলেও দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতি খুব একটা অসন্তোষজনক নয়। এটাকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছি। পৃথিবীতে কোনো কোনো কাজে ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও থাকে। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন-বিতরণ-বিপণনও তেমন একটি। এর উজ্জ্বল দিকের পাশাপাশি অন্ধকার দিকও আছে। আমাদের উন্নয়নটি হতে হবে টেকসই। এমন কোনো উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত নয়, যা বিপর্যয় ডেকে আনবে। খুলনার রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করেছেন। তাদের দাবি হলো, এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হলে এবং তা উৎপাদনে গেলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ প্রকল্প থেকে পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু পরিবেশবাদীরা তাদের মতের পক্ষে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন, তা তাদের দাবির কিছুটা হলেও যৌক্তিকতার প্রমাণ দেয়। তা না হলে বিষয়টি ইউনেস্কো পর্যন্ত গড়াত না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও কথা উঠেছে। তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকার কারণে বিশ্বে এখন আর এ ধরনের প্রকল্প প্রচলিত নেই। সেখানে আমরা কেন ঝুঁকির মধ্যে গেলাম-এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

বিতরণ ও বিপণন নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ‘সিস্টেম লস’ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। উৎপাদন থেকে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যে সঞ্চালন পথ, সে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বিদ্যুতের একটা অংশ ক্ষয় হয়, একেই আমরা সিস্টেম লস বলি। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ৫ শতাংশেরও নিচে; আর আমাদের দেশে তা ১০ শতাংশের উপরে। কেন? কারণ হলো বিদ্যুৎ চুরি রোধ করতে না পারা। এই সিস্টেম লসের পুরো টাকাটাই যোগ হয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে। ফলে খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের তরফ থেকে দামবৃদ্ধির নির্দেশনা আসতে থাকে। এই অজুহাতে গত ১১ বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১০ বার, যার মধ্যে পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৯০ শতাংশ। তারপরও হাজার হাজার কোটি টাকা এ খাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যে টাকা আবার আসে জনগণেরই দেওয়া কর থেকে। অঙ্কটা যা দাঁড়াল তা হলো, বিশাল জনগোষ্ঠীর কষ্টার্জিত করের টাকা ঢুকছে গুটিকয় মানুষের পকেটে। ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।’ এই ভর্তুকির টাকা কোথায় গেল তার খোঁজ পাওয়া যাবে মন্ত্রীর বক্তব্যের তিন মাস আগের ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে উঠিয়ে নিয়েছে ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে ৬ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায়। চাহিদার কথা বিবেচনায় না নিয়ে তড়িঘড়ি করে, কোনো প্রকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে, অনেক রকমের সুবিধা দিয়ে বেসরকারি খাতে বেশকিছু তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয় সরকার। এই অলস কেন্দ্রগুলোর জন্য সরকারকে দিতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ। এভাবে স্থাপিত প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু হলে তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আইপিপি নামের এসব কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ টানতে হবে ১৫ থেকে ২২ বছর।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালন ও বিতরণে বার্ষিক অযৌক্তিক ব্যয় যথাক্রমে ৮ হাজার ৫৯১ এবং ২ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এই অযৌক্তিক ব্যয় কাম্য নয়। আমাদের অর্থনীতিতে দিনকে দিন প্রকল্প চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সেই গতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। ফলে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত ৬ বছরের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালে আমাদের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৩৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এসে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ১৬ বিলিয়িন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি)। স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পগুলোতে ব্যয়ের স্বচ্ছতা আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, ব্যয়েও স্বচ্ছতা আসুক

 মুঈদ রহমান 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১২ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ হবে আরও ৭৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে শুধু নবীগঞ্জের বিবিয়ানা কেন্দ্র থেকেই পাওয়া যাবে ৪০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে গ্যাস। সিলেটের কুমারগাঁওয়ে নতুন করে উৎপাদিত হবে ৭৫ মেগাওয়াট। গ্যাস ব্যবহৃত এ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ২২৫ মেগাওয়াট। বাগেরহাটের মোল্লাহাটের কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১০০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামের জুলদা প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। এ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা কেন্দ্রেও জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস অয়েল। সেখান থেকে পাওয়া যাবে ১০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। নতুন পাঁচটিসহ দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়াল ১৪৬-এ। এর মধ্যে ১১৯টি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে। এই তিন মেয়াদে সংযুক্ত ৩ কোটি ১ লাখ গ্রাহকসহ দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৯ লাখ। পাশাপাশি বিদ্যুতের সেচ সংযোগ ২০০৮ সালে ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার। সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজারে।

অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর চালিকাশক্তি হিসাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সেই হিসাবে সরকার ২০২১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ২৪ হাজার মেগাওয়াট। যদি আমরা ক্যাপটিভ (শিল্পে নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুৎ) এবং ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমকে বিবেচনায় নেই, তাহলে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াটে। তা সত্ত্বেও ‘নিরবচ্ছিন্ন’ বিদ্যুৎ সরবরাহ যাকে বলে তা করা যায়নি। সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নাও থাকতে পারে। কারণ সরবরাহের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের সম্পর্ক আছে। জ্বালানি হিসাবে গ্যাস ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি খরচ হয় ৩ টাকা আর জ্বালানি তেল ব্যবহার করলে খরচ হয় ২০ টাকা; যে কারণে সরকারকে ভর্তুকি হিসাবে খরচ করতে হয় বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমান সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডেরই সমালোচনা করার সুযোগ আছে। তবে তারা বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে অনকটাই সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। আগেই বলেছি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার আগে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার যদি ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশে রাখতে চাই, তাহলে ২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ৩৬ হাজার মেগাওয়াটে। সরকারকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে। তা না হলে বিদ্যুতের অভাবে অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে নির্মিত হয়েছে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট। এর জন্য ব্যয় করা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। নির্মাণ শেষে কেন্দ্রটি সঞ্চালনের অপেক্ষায় রয়েছে। উৎপাদনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হবে। বরগুনার তালতলী উপজেলায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে উৎপাদন করা হবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি নির্মাণ করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০২৪ সালে পাওয়া যাবে ১ হাজার ২০০ এবং ২০২৫ সালে পাওয়া যাবে ১ হাজার ২০০, মোট ২ হাজর ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ব্যয়বহুল এ প্রকল্পে খরচ হবে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অনেকেই মনে করেন, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য লাখকোটি টাকা খরচ অনেক বেশি। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের হিসাবে তা বেশি নয়। প্রকল্পটির মেয়াদ প্রাথমিকভাবে ৬০ বছর, এর সঙ্গে ২০ বছর সম্প্রসারণযোগ্য, মোট ৮০ বছরের উৎপাদন প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিলে ব্যয় খুব বেশি নয়।

চাাহিদার অনুপাতে শতভাগ জোগানের ব্যবস্থা করা না গেলেও দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতি খুব একটা অসন্তোষজনক নয়। এটাকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছি। পৃথিবীতে কোনো কোনো কাজে ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও থাকে। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন-বিতরণ-বিপণনও তেমন একটি। এর উজ্জ্বল দিকের পাশাপাশি অন্ধকার দিকও আছে। আমাদের উন্নয়নটি হতে হবে টেকসই। এমন কোনো উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত নয়, যা বিপর্যয় ডেকে আনবে। খুলনার রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করেছেন। তাদের দাবি হলো, এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হলে এবং তা উৎপাদনে গেলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ প্রকল্প থেকে পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু পরিবেশবাদীরা তাদের মতের পক্ষে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন, তা তাদের দাবির কিছুটা হলেও যৌক্তিকতার প্রমাণ দেয়। তা না হলে বিষয়টি ইউনেস্কো পর্যন্ত গড়াত না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও কথা উঠেছে। তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকার কারণে বিশ্বে এখন আর এ ধরনের প্রকল্প প্রচলিত নেই। সেখানে আমরা কেন ঝুঁকির মধ্যে গেলাম-এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

বিতরণ ও বিপণন নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ‘সিস্টেম লস’ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। উৎপাদন থেকে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যে সঞ্চালন পথ, সে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বিদ্যুতের একটা অংশ ক্ষয় হয়, একেই আমরা সিস্টেম লস বলি। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ৫ শতাংশেরও নিচে; আর আমাদের দেশে তা ১০ শতাংশের উপরে। কেন? কারণ হলো বিদ্যুৎ চুরি রোধ করতে না পারা। এই সিস্টেম লসের পুরো টাকাটাই যোগ হয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে। ফলে খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের তরফ থেকে দামবৃদ্ধির নির্দেশনা আসতে থাকে। এই অজুহাতে গত ১১ বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১০ বার, যার মধ্যে পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৯০ শতাংশ। তারপরও হাজার হাজার কোটি টাকা এ খাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যে টাকা আবার আসে জনগণেরই দেওয়া কর থেকে। অঙ্কটা যা দাঁড়াল তা হলো, বিশাল জনগোষ্ঠীর কষ্টার্জিত করের টাকা ঢুকছে গুটিকয় মানুষের পকেটে। ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।’ এই ভর্তুকির টাকা কোথায় গেল তার খোঁজ পাওয়া যাবে মন্ত্রীর বক্তব্যের তিন মাস আগের ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে উঠিয়ে নিয়েছে ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে ৬ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায়। চাহিদার কথা বিবেচনায় না নিয়ে তড়িঘড়ি করে, কোনো প্রকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে, অনেক রকমের সুবিধা দিয়ে বেসরকারি খাতে বেশকিছু তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয় সরকার। এই অলস কেন্দ্রগুলোর জন্য সরকারকে দিতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ। এভাবে স্থাপিত প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু হলে তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আইপিপি নামের এসব কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ টানতে হবে ১৫ থেকে ২২ বছর।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালন ও বিতরণে বার্ষিক অযৌক্তিক ব্যয় যথাক্রমে ৮ হাজার ৫৯১ এবং ২ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এই অযৌক্তিক ব্যয় কাম্য নয়। আমাদের অর্থনীতিতে দিনকে দিন প্রকল্প চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সেই গতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। ফলে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত ৬ বছরের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালে আমাদের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৩৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এসে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ১৬ বিলিয়িন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি)। স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পগুলোতে ব্যয়ের স্বচ্ছতা আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন