জিয়া তো যাচ্ছেন, তার রাজনৈতিক কালচার কি যাবে?
jugantor
তৃতীয় মত
জিয়া তো যাচ্ছেন, তার রাজনৈতিক কালচার কি যাবে?

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাস একটি বটবৃক্ষের মতো। সে তার সবুজপাতা ধরে রাখে। ঝরাপাতাগুলোকে ঝরতে দেয়। লন্ডনে তাই দেখছি- বড় বড় লর্ড, সবার নমস্য অনেক মানুষের প্রতিমূর্তি রাজপথে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বহু শতাব্দীর প্রাচীন মূর্তিও ধ্বংস করা হচ্ছে। শুধু লন্ডনে নয়, আমেরিকাতেও চলছে একশ্রেণির মূর্তির ধ্বংস সাধন। এতকাল মানুষ জেনে এসেছে, এসব মূর্তি হচ্ছে সেসব মহামানবের, যারা ছিলেন দানবীর। জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তাদের দানের সীমা-পরিসীমা নেই।

এতকাল পর জানা গেছে, এ মহামানবরা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ দানব। দাস ব্যবসা ছিল তাদের আয়ের উৎস। আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার কালো নর-নারীকে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে সমুদ্রপথে সেকালের কাঠের জাহাজে চড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় আনা হতো। সমুদ্রপথে জাহাজ ডুবে অনেক কালো দাস-দাসী মারা যেতেন। নানা রোগে বিনা চিকিৎসায় মারা যেত আরও অনেক কালো মানুষ। সেদিকে এ দাস ব্যবসায়ীদের নজর ছিল না; বরং তাদের নজর পড়ত সুন্দরী কালো মেয়েদের ওপর। তাদের ওপর চলত অকথ্য যৌন নির্যাতন; চড়া দামে তাদের বিক্রি করা হতো আরব ব্যবসায়ীদের কাছে।

এ নিষ্ঠুর অমানবিক চরিত্রের শ্বেতাঙ্গ দাস ব্যবসায়ীরাই নিজ নিজ দেশে মহামানব সেজেছিলেন। সবার পুজো পাচ্ছিলেন। আজ ইতিহাস তার সত্যের মুখ খুলতেই এরা ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়তে শুরু করেছে। একদিন ওয়েস্ট মিনিস্টারের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি; দেখি, স্যার ওয়েস্টিন চার্চিলের লাইফ-সাইজের মূর্তি মোটা তেরপাল দিয়ে ঢাকা। জানলাম, একদল যুবক চার্চিলের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে স্নোগান দিয়ে মূর্তিটি ভাঙার চেষ্টা করেছিল। তারপর মূর্তিটির ওপর আরও হামলা হয়েছিল। ফলে ব্রিটিশ সরকার তেরপাল দিয়ে মূর্তিটি সাময়িকভাবে ঢেকে রাখে। মূর্তিটি রক্ষার জন্য পুলিশ বসানোও হয়েছিল।

এটা দেখে মনে মনে হেসেছি। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা যখন সামরিক শক্তি অথবা চক্রান্ত দ্বারা কতিপয় দেশ দখলের পর ভাড়াটিয়া গুণ্ডা দ্বারা লেনিন, কার্ল মার্কস, মাও সেতুং, সাদ্দাম হোসেন, গাদ্দাফির মূর্তি ভাঙছে, তখন তাদের দেশেরই জনগণ অসৎ কালো দাস ব্যবসায়ী ও সাম্রাজ্যবাদী দানবদের মূর্তি ভেঙে নদীর জলে ফেলে দিচ্ছে। ইতিহাসের কী বিস্ময়কর প্রতিশোধ! বাংলাদেশে পঁচাত্তরের খুনিদের সম্পর্কেও ইতিহাস তার মাথা দোলাতে শুরু করেছে। আমেরিকার বাল্টিমোর শহরে আমাদের ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি’ জিয়াউর রহমানের নামে একটি রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল, রাস্তাটির নাম ছিল ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’।

সম্প্রতি হঠাৎ ধাতব অক্ষরে লেখা ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’ নামফলকটি আর দেখা যাচ্ছে না। দুষ্টু ছেলেরা দুষ্টুমি করে নামফলকটি সরিয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। পরে জানা গেল, বাল্টিমোর শহরের মেয়রের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। মেয়র জানিয়েছেন, তিনি অনেক প্রমাণপত্র এবং সাক্ষী-সাবুদের কাছ থেকে নিশ্চিতভাবে জেনেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন। এ রকম একজন খুনির নামকে আদর্শ মানুষের প্রতীক হিসাবে রাস্তার নামফলকে রাখা যায় না।

বাংলাদেশেও এ সত্যটি আজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে রাতারাতি তা করা সম্ভব হয় না। তবু হাসিনা সরকার অনেক কষ্ট করে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর থেকে জিয়াউর রহমানের নাম অপসারণ করেছেন। জাতীয় সংসদ চত্বর থেকে জিয়ার কবর নামে অভিহিত কবরটি অন্যত্র সরাতে চাচ্ছেন। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি বেগম জিয়ার দখলমুক্ত করে সামরিক দপ্তরকে দলীয় রাজনীতির পরিবেশ মুক্ত করেছেন।

কিন্তু সারা দেশে এখনো জিয়াউর রহমানের নাম ধারণকারী স্কুল-কলেজ ও নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলোর সংস্কার সাধনে আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ সময় লাগবে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের একটা কৌশল ছিল নানা চাতুর্যে একাত্তরের শহিদদের নামফলক লেখা রাস্তার নাম বদলে মুসলিম লীগ আমলের কোনো নবাব বা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো নেতার নামে নাম রাখতেন। সহজে এ পরিবর্তনটা জনগণের চোখে পড়ত না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদী মহম্মদের পিতা ছিলেন একাত্তরের একজন শহিদ। নাম সলিমুল্লা খান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার বাড়ির রাস্তাটির নামফলকে লেখা হয় শহিদ সলিমুল্লা সড়ক। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর এ রাস্তার নাম এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যা প্রথমে কারও চোখে পড়েনি। প্রথমে নামফলকে শহিদ শব্দটি তুলে নেওয়া হয়। পরে সেখানে স্যার শব্দটি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তাটির নাম হয়ে যায় স্যার সলিমুল্লা সড়ক। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লার নামে সড়ক। এ নাম আর সরায় কে? এ গল্পটি আমার শোনা। সুতরাং এর সত্যতা কতটুকু; অথবা সত্য হলে রাস্তার নামটি আবার পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা, জানি না।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের মেগা উন্নয়নে ব্যস্ত; কিন্তু তাদের সব উন্নয়নের মূলসূত্র অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিএনপি-জামায়াতের অপকৌশলের কাছে বহুকাল আগে মাটিচাপা পড়েছে, সে খবর তারা জানেন কি? দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাকে কবর দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দুটি ছাত্রাবাস ‘সলিমুল্লা মুসলিম হল’ ও ‘ফজলুল হক মুসলিম হল’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের দরজা সব ধর্মের ছাত্রদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িকতার উদার বাতাস বইতে শুরু করে।

তবে সে বাতাস বহুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই আবার সলিমুল্লা ও ফজলুল হক হলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি বসিয়ে দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এখন ধর্মীয় বিভাজন বেশি। যদি পুলিশ হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে শক্তি পরীক্ষায় কোন পক্ষ জয়ী হবে, তা বলা মুশকিল নয়। হজরত ওমর জেরুজালেম শহর দখল করার পর সেনাপতি খালেদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি খ্রিস্টানদের কাছ থেকে জেরুজালেম মুক্ত করেছ, একথা সত্য; কিন্তু তুমি এই শহরের মানুষের মন জয় করতে পেরেছ কি?

আমরা- স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি ১৯৭১ সালে দেশকে হানাদারমুক্ত করতে পেরেছি এ কথা সত্য; কিন্তু অসাম্প্রদায়িক মন্ত্র মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারিনি। নিজেদের মনেও তা শক্তভাবে গেঁথে নিতে পারিনি; বরং গোটা আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বিএনপির পলিটিক্যাল কালচার গ্রহণ করেছে। সেই দাড়ি, টুপি, বক্তৃতার শুরুতে বিসমিল্লাহর উচ্চারণ প্রতিযোগিতায় দেশ আজ সরগরম। আমরা রাস্তার নামফলক থেকে জিয়ার নাম সরাব, চন্দ্রিমা থেকে জিয়ার কবর সরাব, এসবই ইতিহাসের কাজ।

ইতিহাসের এ কাজকে সহজ করার জন্য আমরা যারা মুজিবপন্থি বলে দাবি করি, আমাদেরও কিছু দায়িত্ব পালন করা উচিত। ইতিহাসের উল্টো বাতাসে জিয়ার নাম আজ বাল্টিমোর শহর থেকে উড়ে গেছে। ঢাকায় চন্দ্রিমা থেকেও তার নকল কবর হয়তো সরবে; কিন্তু জিয়া কালচারের যে ভূত আমাদের রাজনীতি, শিক্ষানীতি, সামাজিকনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে রেখেছে, সে ভূতটি তাড়াবে কে? এ ভূত না তাড়ালে আমাদের সমাজ-প্রগতি মুক্ত হবে না। অর্থনীতিও মুক্ত দরজা পাবে না। উন্নয়নের নামে আমরা যেসব বড় বড় ব্রিজ, দালানকোঠা তৈরি করছি, তা ভবিষ্যতে এক সময় প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভগ্নাবশেষ বলে দাঁড়িয়ে থাকবে।

অর্থনৈতিক উন্নতিকে ধরে রাখে সুশাসন ও সামাজিক স্বস্তি। এ দুটিই এখন বাংলাদেশে নেই। আওয়ামী লীগের গত তিন দফা একটানা শাসনে বিএনপি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান থেকে ধার করা জিয়ার পলিটিক্যাল কালচার শক্তিশালী হয়েছে। দেশের টকশোগুলোয় বক্তাদের বক্তব্য শুনলেই মনে হয় জিয়াউর রহমান যেন কথা বলছেন।

জাতীয় জীবনের সর্বস্তর থেকে এ ভৌতিক কালচারের প্রভাব দূর করতে না পারলে শুধু জিয়া এবং তার কফিন সরালেই চলবে না, একটা মধ্যযুগীয় ভৌতিক কালচারের আধিপত্য থেকে আমাদের মন-মানস, জীবনযাপনকে মুক্ত করা দরকার। জাতীয়তাবাদ যদি হয় অসাম্প্রদায়িক, তাহলে তা সমাজকে করে উদার ও অগ্রসরমান। আর সেই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যদি হয় ধর্ম, তাহলে বুঝতে হবে সাম্প্রদায়িকতার ভূত আমাদের জাতীয় সত্তাকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। আমাদের ভবিষ্যতের লড়াইটা হবে ভয়ানক কঠিন। জিয়ার ভৌতিক রাজনৈতিক কালচার থেকে দেশটাকে মুক্ত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর আরও কঠিন উপস্থিতি দরকার হবে আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে। এটা কেবল তার ভাস্কর্য তৈরি, আমলাবেষ্টিত জন্মশতবার্ষিকী পালন দ্বারা হবে না। তাকে আবার হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো আবিষ্কার করতে হবে। তার পেছনে বাংলার নবপ্রজন্মের তারুণ্যকে লাইন দেওয়াতে হবে। তিনি বংশী বাজাবেন। তবে সবাইকে নিয়ে সমুদ্রতলে অদৃশ্য হবেন না। আওয়ামী লীগ দ্বারা যা হবে না, তা হবে বঙ্গবন্ধুর একার দ্বারা। বাঙালি জাতীয়তার যে একটি মোমের শিখা তিনি জ্বালাবেন, এবার বাঙালির ঘরে হবে তা সহস্র মোমের শিখা।

লন্ডন, ১৮ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০২১

তৃতীয় মত

জিয়া তো যাচ্ছেন, তার রাজনৈতিক কালচার কি যাবে?

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাস একটি বটবৃক্ষের মতো। সে তার সবুজপাতা ধরে রাখে। ঝরাপাতাগুলোকে ঝরতে দেয়। লন্ডনে তাই দেখছি- বড় বড় লর্ড, সবার নমস্য অনেক মানুষের প্রতিমূর্তি রাজপথে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বহু শতাব্দীর প্রাচীন মূর্তিও ধ্বংস করা হচ্ছে। শুধু লন্ডনে নয়, আমেরিকাতেও চলছে একশ্রেণির মূর্তির ধ্বংস সাধন। এতকাল মানুষ জেনে এসেছে, এসব মূর্তি হচ্ছে সেসব মহামানবের, যারা ছিলেন দানবীর। জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তাদের দানের সীমা-পরিসীমা নেই।

এতকাল পর জানা গেছে, এ মহামানবরা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ দানব। দাস ব্যবসা ছিল তাদের আয়ের উৎস। আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার কালো নর-নারীকে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে সমুদ্রপথে সেকালের কাঠের জাহাজে চড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় আনা হতো। সমুদ্রপথে জাহাজ ডুবে অনেক কালো দাস-দাসী মারা যেতেন। নানা রোগে বিনা চিকিৎসায় মারা যেত আরও অনেক কালো মানুষ। সেদিকে এ দাস ব্যবসায়ীদের নজর ছিল না; বরং তাদের নজর পড়ত সুন্দরী কালো মেয়েদের ওপর। তাদের ওপর চলত অকথ্য যৌন নির্যাতন; চড়া দামে তাদের বিক্রি করা হতো আরব ব্যবসায়ীদের কাছে।

এ নিষ্ঠুর অমানবিক চরিত্রের শ্বেতাঙ্গ দাস ব্যবসায়ীরাই নিজ নিজ দেশে মহামানব সেজেছিলেন। সবার পুজো পাচ্ছিলেন। আজ ইতিহাস তার সত্যের মুখ খুলতেই এরা ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়তে শুরু করেছে। একদিন ওয়েস্ট মিনিস্টারের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি; দেখি, স্যার ওয়েস্টিন চার্চিলের লাইফ-সাইজের মূর্তি মোটা তেরপাল দিয়ে ঢাকা। জানলাম, একদল যুবক চার্চিলের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে স্নোগান দিয়ে মূর্তিটি ভাঙার চেষ্টা করেছিল। তারপর মূর্তিটির ওপর আরও হামলা হয়েছিল। ফলে ব্রিটিশ সরকার তেরপাল দিয়ে মূর্তিটি সাময়িকভাবে ঢেকে রাখে। মূর্তিটি রক্ষার জন্য পুলিশ বসানোও হয়েছিল।

এটা দেখে মনে মনে হেসেছি। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা যখন সামরিক শক্তি অথবা চক্রান্ত দ্বারা কতিপয় দেশ দখলের পর ভাড়াটিয়া গুণ্ডা দ্বারা লেনিন, কার্ল মার্কস, মাও সেতুং, সাদ্দাম হোসেন, গাদ্দাফির মূর্তি ভাঙছে, তখন তাদের দেশেরই জনগণ অসৎ কালো দাস ব্যবসায়ী ও সাম্রাজ্যবাদী দানবদের মূর্তি ভেঙে নদীর জলে ফেলে দিচ্ছে। ইতিহাসের কী বিস্ময়কর প্রতিশোধ! বাংলাদেশে পঁচাত্তরের খুনিদের সম্পর্কেও ইতিহাস তার মাথা দোলাতে শুরু করেছে। আমেরিকার বাল্টিমোর শহরে আমাদের ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি’ জিয়াউর রহমানের নামে একটি রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল, রাস্তাটির নাম ছিল ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’।

সম্প্রতি হঠাৎ ধাতব অক্ষরে লেখা ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’ নামফলকটি আর দেখা যাচ্ছে না। দুষ্টু ছেলেরা দুষ্টুমি করে নামফলকটি সরিয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। পরে জানা গেল, বাল্টিমোর শহরের মেয়রের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। মেয়র জানিয়েছেন, তিনি অনেক প্রমাণপত্র এবং সাক্ষী-সাবুদের কাছ থেকে নিশ্চিতভাবে জেনেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন। এ রকম একজন খুনির নামকে আদর্শ মানুষের প্রতীক হিসাবে রাস্তার নামফলকে রাখা যায় না।

বাংলাদেশেও এ সত্যটি আজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে রাতারাতি তা করা সম্ভব হয় না। তবু হাসিনা সরকার অনেক কষ্ট করে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর থেকে জিয়াউর রহমানের নাম অপসারণ করেছেন। জাতীয় সংসদ চত্বর থেকে জিয়ার কবর নামে অভিহিত কবরটি অন্যত্র সরাতে চাচ্ছেন। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি বেগম জিয়ার দখলমুক্ত করে সামরিক দপ্তরকে দলীয় রাজনীতির পরিবেশ মুক্ত করেছেন।

কিন্তু সারা দেশে এখনো জিয়াউর রহমানের নাম ধারণকারী স্কুল-কলেজ ও নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলোর সংস্কার সাধনে আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ সময় লাগবে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের একটা কৌশল ছিল নানা চাতুর্যে একাত্তরের শহিদদের নামফলক লেখা রাস্তার নাম বদলে মুসলিম লীগ আমলের কোনো নবাব বা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো নেতার নামে নাম রাখতেন। সহজে এ পরিবর্তনটা জনগণের চোখে পড়ত না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদী মহম্মদের পিতা ছিলেন একাত্তরের একজন শহিদ। নাম সলিমুল্লা খান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার বাড়ির রাস্তাটির নামফলকে লেখা হয় শহিদ সলিমুল্লা সড়ক। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর এ রাস্তার নাম এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যা প্রথমে কারও চোখে পড়েনি। প্রথমে নামফলকে শহিদ শব্দটি তুলে নেওয়া হয়। পরে সেখানে স্যার শব্দটি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তাটির নাম হয়ে যায় স্যার সলিমুল্লা সড়ক। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লার নামে সড়ক। এ নাম আর সরায় কে? এ গল্পটি আমার শোনা। সুতরাং এর সত্যতা কতটুকু; অথবা সত্য হলে রাস্তার নামটি আবার পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা, জানি না।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের মেগা উন্নয়নে ব্যস্ত; কিন্তু তাদের সব উন্নয়নের মূলসূত্র অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিএনপি-জামায়াতের অপকৌশলের কাছে বহুকাল আগে মাটিচাপা পড়েছে, সে খবর তারা জানেন কি? দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাকে কবর দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দুটি ছাত্রাবাস ‘সলিমুল্লা মুসলিম হল’ ও ‘ফজলুল হক মুসলিম হল’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের দরজা সব ধর্মের ছাত্রদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িকতার উদার বাতাস বইতে শুরু করে।

তবে সে বাতাস বহুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই আবার সলিমুল্লা ও ফজলুল হক হলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি বসিয়ে দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এখন ধর্মীয় বিভাজন বেশি। যদি পুলিশ হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে শক্তি পরীক্ষায় কোন পক্ষ জয়ী হবে, তা বলা মুশকিল নয়। হজরত ওমর জেরুজালেম শহর দখল করার পর সেনাপতি খালেদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি খ্রিস্টানদের কাছ থেকে জেরুজালেম মুক্ত করেছ, একথা সত্য; কিন্তু তুমি এই শহরের মানুষের মন জয় করতে পেরেছ কি?

আমরা- স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি ১৯৭১ সালে দেশকে হানাদারমুক্ত করতে পেরেছি এ কথা সত্য; কিন্তু অসাম্প্রদায়িক মন্ত্র মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারিনি। নিজেদের মনেও তা শক্তভাবে গেঁথে নিতে পারিনি; বরং গোটা আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বিএনপির পলিটিক্যাল কালচার গ্রহণ করেছে। সেই দাড়ি, টুপি, বক্তৃতার শুরুতে বিসমিল্লাহর উচ্চারণ প্রতিযোগিতায় দেশ আজ সরগরম। আমরা রাস্তার নামফলক থেকে জিয়ার নাম সরাব, চন্দ্রিমা থেকে জিয়ার কবর সরাব, এসবই ইতিহাসের কাজ।

ইতিহাসের এ কাজকে সহজ করার জন্য আমরা যারা মুজিবপন্থি বলে দাবি করি, আমাদেরও কিছু দায়িত্ব পালন করা উচিত। ইতিহাসের উল্টো বাতাসে জিয়ার নাম আজ বাল্টিমোর শহর থেকে উড়ে গেছে। ঢাকায় চন্দ্রিমা থেকেও তার নকল কবর হয়তো সরবে; কিন্তু জিয়া কালচারের যে ভূত আমাদের রাজনীতি, শিক্ষানীতি, সামাজিকনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে রেখেছে, সে ভূতটি তাড়াবে কে? এ ভূত না তাড়ালে আমাদের সমাজ-প্রগতি মুক্ত হবে না। অর্থনীতিও মুক্ত দরজা পাবে না। উন্নয়নের নামে আমরা যেসব বড় বড় ব্রিজ, দালানকোঠা তৈরি করছি, তা ভবিষ্যতে এক সময় প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভগ্নাবশেষ বলে দাঁড়িয়ে থাকবে।

অর্থনৈতিক উন্নতিকে ধরে রাখে সুশাসন ও সামাজিক স্বস্তি। এ দুটিই এখন বাংলাদেশে নেই। আওয়ামী লীগের গত তিন দফা একটানা শাসনে বিএনপি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান থেকে ধার করা জিয়ার পলিটিক্যাল কালচার শক্তিশালী হয়েছে। দেশের টকশোগুলোয় বক্তাদের বক্তব্য শুনলেই মনে হয় জিয়াউর রহমান যেন কথা বলছেন।

জাতীয় জীবনের সর্বস্তর থেকে এ ভৌতিক কালচারের প্রভাব দূর করতে না পারলে শুধু জিয়া এবং তার কফিন সরালেই চলবে না, একটা মধ্যযুগীয় ভৌতিক কালচারের আধিপত্য থেকে আমাদের মন-মানস, জীবনযাপনকে মুক্ত করা দরকার। জাতীয়তাবাদ যদি হয় অসাম্প্রদায়িক, তাহলে তা সমাজকে করে উদার ও অগ্রসরমান। আর সেই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যদি হয় ধর্ম, তাহলে বুঝতে হবে সাম্প্রদায়িকতার ভূত আমাদের জাতীয় সত্তাকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। আমাদের ভবিষ্যতের লড়াইটা হবে ভয়ানক কঠিন। জিয়ার ভৌতিক রাজনৈতিক কালচার থেকে দেশটাকে মুক্ত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর আরও কঠিন উপস্থিতি দরকার হবে আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে। এটা কেবল তার ভাস্কর্য তৈরি, আমলাবেষ্টিত জন্মশতবার্ষিকী পালন দ্বারা হবে না। তাকে আবার হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো আবিষ্কার করতে হবে। তার পেছনে বাংলার নবপ্রজন্মের তারুণ্যকে লাইন দেওয়াতে হবে। তিনি বংশী বাজাবেন। তবে সবাইকে নিয়ে সমুদ্রতলে অদৃশ্য হবেন না। আওয়ামী লীগ দ্বারা যা হবে না, তা হবে বঙ্গবন্ধুর একার দ্বারা। বাঙালি জাতীয়তার যে একটি মোমের শিখা তিনি জ্বালাবেন, এবার বাঙালির ঘরে হবে তা সহস্র মোমের শিখা।

লন্ডন, ১৮ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০২১

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন