প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম : বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
jugantor
প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম : বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

  মুঈদ রহমান  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকে অনেক আলোচনা-সমালোচনা করেছেন, করছেন। কেউ কেউ দিয়েছেন পরামর্শ। তবে আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগের আয়োজনটি ছিল সব থেকে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাকায় ১৯৯৯ সালের ১৬-২১ সেপ্টেম্বর আয়োজন করে ৬ দিনব্যাপী শিক্ষা সম্মেলন। এ শিক্ষা সম্মেলনে দেশের শিক্ষা কাঠামোর প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষক, দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, নারী নেতৃত্ব, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শ্রমিক নেতৃত্ব, কৃষক-ক্ষেতমজুর নেতৃত্ব, ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার নেতারা বক্তব্য রাখেন। ৬ দিনে মোট ১০টি অধিবেশনে ১২৯ জন আলোচক বক্তব্য রাখেন। সুতরাং গুরুত্ব ও আকার বিবেচনায় তা ছিল এক রকম ঐতিহাসিক। সে সম্মেলনে শিক্ষার নানা দুর্বলতা ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। শিক্ষানীতি ও সংকট প্রসঙ্গে যে কথা উঠে এসেছিল তা হলো : শিক্ষার প্রশ্নে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি নীতিগত। অর্থাৎ কাদের জন্য শিক্ষা, কী হবে শিক্ষার বিষয়বস্তু এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য কী। নীতির ক্ষেত্রে শিক্ষার একটি দর্শনভিত্তি থাকা চাই। এ বিষয়টির সঙ্গে জড়িত রয়েছে কী ধরনের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কোন শ্রেণিচরিত্রের শাসক দ্বারা শিক্ষানীতি প্রণীত হচ্ছে, তারা শিক্ষাকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র কতখানি বহন করছে। দ্বিতীয়টি হলো শিক্ষার পদ্ধতিগত বিষয়। যেমন, শিক্ষাদান রীতি কী ধরনের হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কটি কেমন বা কী রকম হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার গুণ-মান যাচাই কীভাবে হবে। শিক্ষকদের শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণ তথা দেহে-মনে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকবে। শিক্ষার সিলেবাস-কারিকুলাম কাদের দ্বারা কীভাবে রচিত হবে? পরিবর্তনশীল জগৎ- জীবন ও সমাজের বৈপ্লবিক বাস্তবতা তথা প্রগতিশীল রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে পাঠ্যসূচি পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন ও রূপান্তরের বিধান ও সময়সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও পরিচালন ব্যবস্থার নিয়মবিধি কী রকম হবে ইত্যাদি।

সবকিছু মিলে শিক্ষার দর্শন অর্থাৎ শিক্ষাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার ধারা ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিরূপণ করা অত্যন্ত জরুরি। ‘সবার জন্যে শিক্ষা’- এই নীতিকেই সাধারণভাবে সর্বজনীন, গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি বলা হয়। আর ‘টাকা যার, শিক্ষা তার’ অথবা শাসকদের ইচ্ছা যতখানি, শিক্ষা পাবে ততখানি’- এই নীতি পুঁজিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতির পর্যায়ে পড়ে। সেদিক থেকে বিচার করলে এ জাতি কখনোই সর্বজনীন- গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির মুখ দেখেনি।

এখন আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে। বিগত ৫০ বছরে আমরা শিক্ষার নীতিগত দিকটি স্বচ্ছ করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ধারা বর্তমান, যা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রধান অন্তরায়। একটি অভিন্ন পদ্ধতির বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। কারণ, কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের শ্রেণি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। যেহেতু ৫০ বছর যারা দেশ শাসন করেছে, তাদের মধ্যে শ্রেণিগত কোনো পার্থক্য নেই, তাই শিক্ষাতেও মৌলিক পরিবর্তন আনা যায়নি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের নতুন রূপরেখা অনুমোদন করেছে সরকার। এটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন, দর্শনগত বা নীতিগত নয়। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এ শিক্ষাক্রম ও তার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনার দাবি রাখে।

বর্তমানে আমাদের পাঠক্রমে শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা আছে- ৫ম শ্রেণিতে পিইসি, ৮ম শ্রেণিতে জেএসসি, মাধ্যমিক পর্যায়ে এসএসসি এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এইচএসসি। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের এসএসসির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। এখনকার নিয়ম অনুসারে নবম-দশম শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা নামে যে পৃথক তিনটি বিভাগ আছে তা আর থাকবে না। জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করে শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে বিভাগভিত্তিক লেখাপড়া করবে। আবার নবম-দশম শ্রেণির পরিবর্তে শুধু দশম শ্রেণির পাঠক্রম অনুসারে এসএসসি পরীক্ষা হবে। এইচএসসি পরীক্ষার বেলাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে একাদশ শ্রেণিতে একটি পরীক্ষা এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে আরেকটি পরীক্ষা হবে। বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দুটি পরীক্ষার ফল যোগ করে হবে এইচএসসির চূড়ান্ত ফলাফল। শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। নম্বর বণ্টনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসএসসিতে প্রতি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে স্ব স্ব স্কুল। বাকি ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষাবোর্ড। এইচএসসিতে ৩০ নম্বর মূল্যায়ন করবে কলেজগুলো, আর বাকি ৭০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষাবোর্ড। বোর্ডের পরীক্ষায় বিষয়গুলোও হবে বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক। বাকি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবে কলেজ। নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী ২০২৫ সালে এসএসসি এবং ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এইচএসসির দুই পর্বের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- মৌলিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীল ও সুক্ষচিন্তা, সমস্যা সমাধান, স্ব-ব্যবস্থাপনাসহ ১১টি দক্ষতা অর্জন। যে ধরনের জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে সেগুলো হচ্ছে- পাঠ্যবই, আন্তঃবিষয়, বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান ও পদ্ধতিগত জ্ঞান। নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষার চেয়ে ক্লাসের মূল্যায়নে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী কী শিখল, তা মূল্যায়নের ভিত্তি হচ্ছে যোগ্যতা। শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থেই শিখেছে কিনা সেটা সামনে রেখেই মূল্যায়নের কাজটি করা হবে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা হবে না, যা আগেই উল্লেখ করেছি। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র ৪০ শতাংশ নম্বরের বার্ষিক পরীক্ষা হবে। বাকি ৬০ শতাংশের নম্বর দেওয়া হবে সারা বছর ধরে শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল্যায়ন করে। সেখানে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা হবে। বিষয়গুলো হলো : বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান। ধর্মশিক্ষাসহ অন্য বিষয়গুলোতে পরীক্ষার পরিবর্তে শতভাগই হবে মূল্যায়নের মাধ্যমে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ে ক্লাসেই ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা দিতে হবে। এসএসসিতে এসে ওই পাঁচ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন হবে ৫০ শতাংশ এবং আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা হবে ৫০ শতাংশ।

নতুন পাঠক্রমে কর্মঘণ্টাও নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বছরে ৬৮৪ ঘণ্টা পাঠদান করা হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বছরে ৮৫৫ ঘণ্টা। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে বছরে ১০৫০ ঘণ্টা। আর নবম-দশমে তা হবে ১১১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ক্লাসে থাকবে ১১৬৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। সব মিলে বলা চলে, একটি ব্যাপক পরিবর্তনের দিকেই হাঁটতে চাচ্ছে সরকার। যারা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট তারাও এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক দিক হিসাবেই ভাবছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের শিখন কার্যক্রমে ক্লাসরুমের নির্দিষ্ট ছকের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের শিক্ষায় জ্ঞানার্জনটা হবে আনন্দদায়ক। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে এটিকে এক ধরনের মৌলিক পরিবর্তন হিসাবে বিশেষায়িত করছেন।

আবার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কেউ কেউ এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, সরকারকে এ পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দিতে গেলে কতগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এখানে বিপত্তির কোনো কারণ নেই। সমস্যা হলো শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা। এখানে যেহেতু সারা বছর ধরেই একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের বিষয় আছে, সেহেতু পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের প্রয়োজন হবে, যা আমাদের নেই। কেউ কেউ মনে করেন, সর্বোচ্চ ৩০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। দক্ষতার বিষয়টিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে আমরা সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেছিলাম এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। কিন্তু এর পুরো সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। কারণটি হলো এ ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগে যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, আমাদের শিক্ষকদের মাঝে তার ঘাটতি রয়েছে। নতুন পাঠক্রম চালুর আগে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসন সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শেষ কথাটি হলো, আপনি যত ভালো পদ্ধতিই চালু করেন না কেন, যদি এ পেশাকে আকর্ষণীয় করতে না পারেন তাহলে মেধাবী শিক্ষক পাবেন না। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে বেতন-কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন পাঠক্রম থেকে কার্যকর সুফল পেতে হলে সরকারকে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতাকে আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই এর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম : বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

 মুঈদ রহমান 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকে অনেক আলোচনা-সমালোচনা করেছেন, করছেন। কেউ কেউ দিয়েছেন পরামর্শ। তবে আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগের আয়োজনটি ছিল সব থেকে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাকায় ১৯৯৯ সালের ১৬-২১ সেপ্টেম্বর আয়োজন করে ৬ দিনব্যাপী শিক্ষা সম্মেলন। এ শিক্ষা সম্মেলনে দেশের শিক্ষা কাঠামোর প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষক, দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, নারী নেতৃত্ব, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শ্রমিক নেতৃত্ব, কৃষক-ক্ষেতমজুর নেতৃত্ব, ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার নেতারা বক্তব্য রাখেন। ৬ দিনে মোট ১০টি অধিবেশনে ১২৯ জন আলোচক বক্তব্য রাখেন। সুতরাং গুরুত্ব ও আকার বিবেচনায় তা ছিল এক রকম ঐতিহাসিক। সে সম্মেলনে শিক্ষার নানা দুর্বলতা ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। শিক্ষানীতি ও সংকট প্রসঙ্গে যে কথা উঠে এসেছিল তা হলো : শিক্ষার প্রশ্নে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি নীতিগত। অর্থাৎ কাদের জন্য শিক্ষা, কী হবে শিক্ষার বিষয়বস্তু এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য কী। নীতির ক্ষেত্রে শিক্ষার একটি দর্শনভিত্তি থাকা চাই। এ বিষয়টির সঙ্গে জড়িত রয়েছে কী ধরনের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কোন শ্রেণিচরিত্রের শাসক দ্বারা শিক্ষানীতি প্রণীত হচ্ছে, তারা শিক্ষাকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র কতখানি বহন করছে। দ্বিতীয়টি হলো শিক্ষার পদ্ধতিগত বিষয়। যেমন, শিক্ষাদান রীতি কী ধরনের হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কটি কেমন বা কী রকম হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার গুণ-মান যাচাই কীভাবে হবে। শিক্ষকদের শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণ তথা দেহে-মনে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকবে। শিক্ষার সিলেবাস-কারিকুলাম কাদের দ্বারা কীভাবে রচিত হবে? পরিবর্তনশীল জগৎ- জীবন ও সমাজের বৈপ্লবিক বাস্তবতা তথা প্রগতিশীল রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে পাঠ্যসূচি পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন ও রূপান্তরের বিধান ও সময়সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও পরিচালন ব্যবস্থার নিয়মবিধি কী রকম হবে ইত্যাদি।

সবকিছু মিলে শিক্ষার দর্শন অর্থাৎ শিক্ষাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার ধারা ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিরূপণ করা অত্যন্ত জরুরি। ‘সবার জন্যে শিক্ষা’- এই নীতিকেই সাধারণভাবে সর্বজনীন, গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি বলা হয়। আর ‘টাকা যার, শিক্ষা তার’ অথবা শাসকদের ইচ্ছা যতখানি, শিক্ষা পাবে ততখানি’- এই নীতি পুঁজিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতির পর্যায়ে পড়ে। সেদিক থেকে বিচার করলে এ জাতি কখনোই সর্বজনীন- গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির মুখ দেখেনি।

এখন আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে। বিগত ৫০ বছরে আমরা শিক্ষার নীতিগত দিকটি স্বচ্ছ করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ধারা বর্তমান, যা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রধান অন্তরায়। একটি অভিন্ন পদ্ধতির বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। কারণ, কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের শ্রেণি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। যেহেতু ৫০ বছর যারা দেশ শাসন করেছে, তাদের মধ্যে শ্রেণিগত কোনো পার্থক্য নেই, তাই শিক্ষাতেও মৌলিক পরিবর্তন আনা যায়নি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের নতুন রূপরেখা অনুমোদন করেছে সরকার। এটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন, দর্শনগত বা নীতিগত নয়। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এ শিক্ষাক্রম ও তার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনার দাবি রাখে।

বর্তমানে আমাদের পাঠক্রমে শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা আছে- ৫ম শ্রেণিতে পিইসি, ৮ম শ্রেণিতে জেএসসি, মাধ্যমিক পর্যায়ে এসএসসি এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এইচএসসি। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের এসএসসির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। এখনকার নিয়ম অনুসারে নবম-দশম শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা নামে যে পৃথক তিনটি বিভাগ আছে তা আর থাকবে না। জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করে শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে বিভাগভিত্তিক লেখাপড়া করবে। আবার নবম-দশম শ্রেণির পরিবর্তে শুধু দশম শ্রেণির পাঠক্রম অনুসারে এসএসসি পরীক্ষা হবে। এইচএসসি পরীক্ষার বেলাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে একাদশ শ্রেণিতে একটি পরীক্ষা এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে আরেকটি পরীক্ষা হবে। বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দুটি পরীক্ষার ফল যোগ করে হবে এইচএসসির চূড়ান্ত ফলাফল। শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। নম্বর বণ্টনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসএসসিতে প্রতি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে স্ব স্ব স্কুল। বাকি ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষাবোর্ড। এইচএসসিতে ৩০ নম্বর মূল্যায়ন করবে কলেজগুলো, আর বাকি ৭০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষাবোর্ড। বোর্ডের পরীক্ষায় বিষয়গুলোও হবে বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক। বাকি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবে কলেজ। নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী ২০২৫ সালে এসএসসি এবং ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এইচএসসির দুই পর্বের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- মৌলিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীল ও সুক্ষচিন্তা, সমস্যা সমাধান, স্ব-ব্যবস্থাপনাসহ ১১টি দক্ষতা অর্জন। যে ধরনের জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে সেগুলো হচ্ছে- পাঠ্যবই, আন্তঃবিষয়, বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান ও পদ্ধতিগত জ্ঞান। নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষার চেয়ে ক্লাসের মূল্যায়নে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী কী শিখল, তা মূল্যায়নের ভিত্তি হচ্ছে যোগ্যতা। শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থেই শিখেছে কিনা সেটা সামনে রেখেই মূল্যায়নের কাজটি করা হবে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা হবে না, যা আগেই উল্লেখ করেছি। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র ৪০ শতাংশ নম্বরের বার্ষিক পরীক্ষা হবে। বাকি ৬০ শতাংশের নম্বর দেওয়া হবে সারা বছর ধরে শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল্যায়ন করে। সেখানে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা হবে। বিষয়গুলো হলো : বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান। ধর্মশিক্ষাসহ অন্য বিষয়গুলোতে পরীক্ষার পরিবর্তে শতভাগই হবে মূল্যায়নের মাধ্যমে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ে ক্লাসেই ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা দিতে হবে। এসএসসিতে এসে ওই পাঁচ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন হবে ৫০ শতাংশ এবং আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা হবে ৫০ শতাংশ।

নতুন পাঠক্রমে কর্মঘণ্টাও নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বছরে ৬৮৪ ঘণ্টা পাঠদান করা হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বছরে ৮৫৫ ঘণ্টা। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে বছরে ১০৫০ ঘণ্টা। আর নবম-দশমে তা হবে ১১১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ক্লাসে থাকবে ১১৬৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। সব মিলে বলা চলে, একটি ব্যাপক পরিবর্তনের দিকেই হাঁটতে চাচ্ছে সরকার। যারা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট তারাও এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক দিক হিসাবেই ভাবছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের শিখন কার্যক্রমে ক্লাসরুমের নির্দিষ্ট ছকের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের শিক্ষায় জ্ঞানার্জনটা হবে আনন্দদায়ক। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে এটিকে এক ধরনের মৌলিক পরিবর্তন হিসাবে বিশেষায়িত করছেন।

আবার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কেউ কেউ এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, সরকারকে এ পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দিতে গেলে কতগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এখানে বিপত্তির কোনো কারণ নেই। সমস্যা হলো শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা। এখানে যেহেতু সারা বছর ধরেই একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের বিষয় আছে, সেহেতু পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের প্রয়োজন হবে, যা আমাদের নেই। কেউ কেউ মনে করেন, সর্বোচ্চ ৩০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। দক্ষতার বিষয়টিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে আমরা সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেছিলাম এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। কিন্তু এর পুরো সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। কারণটি হলো এ ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগে যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, আমাদের শিক্ষকদের মাঝে তার ঘাটতি রয়েছে। নতুন পাঠক্রম চালুর আগে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসন সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শেষ কথাটি হলো, আপনি যত ভালো পদ্ধতিই চালু করেন না কেন, যদি এ পেশাকে আকর্ষণীয় করতে না পারেন তাহলে মেধাবী শিক্ষক পাবেন না। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে বেতন-কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন পাঠক্রম থেকে কার্যকর সুফল পেতে হলে সরকারকে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতাকে আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই এর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন