প্রশান্তি পরিবহণে আজ যা ঘটেছিল...
jugantor
প্রশান্তি পরিবহণে আজ যা ঘটেছিল...

  মোকাম্মেল হোসেন  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি বসেছি পেছনের দিকের একটা সিটে। নিয়ম অনুযায়ী এই বাসে সিটের অতিরিক্ত কোনো যাত্রী উঠানোর কথা নয়। এরা সেই নিয়মটা মানছে না। এ নিয়ে সামনে বসা যাত্রীরা কন্ডাকটরের সঙ্গে হৈচৈ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনে ‘সিটিংয়ের’ নামে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এটাও সে ধরনেরই একটা বাস সার্ভিস। নাম প্রশান্তি পরিবহন। নামের সঙ্গে বাসের ভেতরের পরিবেশের মিল খুঁজতে গিয়ে হাসি পেল। হাসতে দেখে সহযাত্রী বললেন-

: ভাই, ডোন্ট মাইন্ড; কীজন্য হাসলেন জানতে পারি?

: হাসলাম দুঃখে।

: স্যরি! আমি আরও ভাবলাম- মজার কোনো জিনিস দেইখা...

: দুঃখটা মজা থেইকাই উৎপন্ন হইছে।

: কীরকম?

: মালিকপক্ষ এই বাসটার নাম রাখছে প্রশান্তি; কিন্তু কোথায় প্রশান্তি? এর বাইরে যেমন-তেমন, ভেতরের অবস্থাটা একবার দেখেন। অর্ধেক সিটই ভাঙ্গা। এর মধ্যে কয়েকটা আবার দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখছে। হা! কী তার নাম; অথচ কী তার চেহারা!

: এই ধরনের জিল্লতিরে কী বলে জানেন?

: কী বলে?

: ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম।

: হাঃ হাঃ হাঃ। হানড্রেড পার্সেন্ট সত্য কথা বলছেন। আইচ্ছা, আমারে একটা কথা বলেন তো। লোকাল সার্ভিস হিসাবেও রাস্তায় চলার যোগ্য না- এইরকম লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা একটা বাস সিটিং সার্ভিসের অনুমোদন পাইল কীভাবে?

: এর উত্তর খুবই সোজা। অনুমোদনের ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত, তারা বাসের নাট-বল্টু ঠিক আছে কিনা, সেইটা লইয়া মাথা ঘামায় না। প্রতিমাসে তাদের হাতে টাকার যে বান্ডিলটা ধরাইয়া দেওয়া হয়, সেইগুলার মধ্যে ছেঁড়াফাটা কোনো নোট আছে কিনা, তারা শুধু সেইটা দেখে। আপনে জানেন, কয়েকদিন আগে কী ভয়াবহ কাণ্ড হইছিল?

: কী?

: এই কোম্পানির একটা বাস মহাখালি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ ঘুমাইয়া পড়ছিল। বাসের ড্রাইভার হাজার চেষ্টা কইরাও তারে সজাগ করতে পারে নাই। শেষে একটা ট্রেন আইসা ফালা ফালা করার পর বাসটা বুঝতে পারছে- কোনখানে সে বিছানা পেতেছিল!

: বলেন কী! নিচে গেছিল কী করতে? এই বাসের তো ফ্লাইওভারের উপর দিয়া চলাচল করার কথা।

: নিচে দিয়া গেছিল যাত্রী টুকাইতে।

: কেউ মাইনাস হয় নাই?

: ট্রেন আসার আগেই ধুসমুস কইরা নাইমা যাওয়ায় কোনো যাত্রী আহত-নিহত হওয়ার সুযোগ পায় নাই; তবে ট্রেনে হিট খাইয়া বাসের বডি বিভিন্ন জায়গায় ছিটকাইয়া পড়ার সময় জনাছয়েক পথচারী ও দোকানদার আহত হইছে। তাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর।

প্রশান্তি পরিবহনের শুধু চেহারা নয়, চরিত্রও খারাপ। কারও চরিত্রে দোষ থাকলে দশজন দশরকম কথা বলার সুযোগ পায়। এর বেলায়ও তাই ঘটল। কন্ডাকটরের উদ্দেশে একজনকে বলতে শুনলাম-

: অই হারামজাদা, এইটা সিটিং সার্ভিস, নাকি ফিটিং সার্ভিস?

লোকটার কথা শুনে কন্ডাকটর সরু চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল-

: গালি দেন ক্যা!

এ সময় পাশ থেকে অন্য একজন বলে উঠল-

: গালি তো তর জন্য কম হইয়া যায়। তর পাছায় কইষ্যা একটা লাত্থি দেওন দরকার।

: দেন লাত্থি!

ভদ্রলোক উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন-

: লাত্থি দিলে কী করবি তুই?

: আগে দিয়া দেখেন না!

ভদ্রলোক জামার হাতা গুটিয়ে প্রস্তুত হলেন। এরপর চিৎকার করে বললেন-

: অই ফকিন্নির পুত! শনি-মঙ্গলবার দেইখা তর পাছায় আমার লাত্থি দেওন লাগব ভাবছস?

: আমি ফকিন্নির পুত, ঠিক আছে! কিন্তু আপনে জমিদারের পুত হইয়া বাসে উঠছেন ক্যান? প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে পারেন না!

: আমি কিসে চলাফেরা করব, এইটা তুই বলার কে? এমন চড় দিব- বাড়িতে যাওয়ার পর তর বৌ মুখে কোনো দাঁত খুঁইজা পাবে না।

: এইটা পারবেন! একবার লাত্থি মারবেন, একবার চড় মারবেন। তবে ওস্তাদের মাইর শেষরাইতে। মাইর-গুতা যাই দেন, আমরা একবার ধরলে কিন্তু আর ছাড়ি না। বৈশাখীর মনে আছে আছে তো?

পাশে বসা ভদ্রলোক ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাইলেন-

: বৈশাখ মাসে কী ঘটেছিল?

বৈশাখী পরিবহনের ঘটনাটা আমি জানি। বিষণ্নকণ্ঠে বললাম-

: বৈশাখ মাস না, ও বলছে সাভার থেইকা গুলশান-নতুনবাজার রুটে চলাচলকারী বৈশাখী পরিবহনের কথা। ওই বাসে একদিন এইরকম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের মারামারি লাইগা যায়। এর জের ধইরা পরিবহন শ্রমিকরা ৭জন বাসযাত্রীকে পিটাইয়া মাইরা ফেলছিল।

: আরে! এ তো সাংঘাতিক লোক! খুন করার কথা কেমন বুক ফুলাইয়া বলতেছে দেখছেন!

: সাংঘাতিকের দেখছেন কী? এই ব্যাটা এখন অন্যদের খুনের গল্প শুনাইতেছে। দুইদিন পরে ও নিজেই মানুষ খুন করার কারবারে নাইমা পড়বে।

: কীভাবে!

: ড্রাইভারের খাতায় নাম লেখানোর মাধ্যমে।

ভদ্রলোক আমার দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কন্ডাকটরের দিকে ইশারা করে বললেন-

: বলেন কী! এই লোক টাকা গুনতে-গুনতে ড্রাইভার হইয়া যাবে! ড্রাইভার হওয়ার জন্য মৌলিক কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে না?

: না। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার আগে তারে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে-

: তুমি গরু চেন?

: জে স্যার, চিনি।

: বল তো, গরুর কয়টা মাথা?

: আপনের মতো গরুরও একটাই মাথা স্যার।

: গুড। কয়টা লেজ?

: লেজও স্যার একটাই।

: ভেরি গুড। তুমি তো দেখতেছি হেভি ট্যালেন্ট। আইচ্ছা, এইবার বল, ছাগলের কয়টা চোখ?

: দুইটা।

: কয়টা ঠ্যাং?

: চাইরটা।

: ভেরি ফাইন। যাও, বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে গাড়ি চালাইতে তোমার আর কোনো বাধা নাই।

আমার কথা ও অভিনয় দেখে ভদ্রলোক মজা পেয়ে হো হো করে উঠলেন। বললেন-

: বাস্তবে সত্যি সত্যি এইরকম হয় নাকি?

: হয় না মানে? বেশুমার হইতেছে।

কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর কম ভাড়া দেওয়ার সূত্র ধরে বাসের পরিবেশ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এ কথা সে কথার পর কন্ডাকটর তার উদ্দেশে বলল-

: ধুনপুন না কইরা ৩৫ টাকা ভাড়া দেন।

: কোন দুঃখে ৩৫ টাকা দিব?

: ভাড়া ৩৫ টাকা।

: শ্যামলী থেইকা শেওড়া পর্যন্ত ৩৫ টাকা ভাড়া নেওয়ার পারমিশন তরে কে দিছে?

: এইটা সিটিং সার্ভিস।

: অই চিটার, তর এই বাস সিটিং সার্ভিস হইলে আমি দাঁড়াইয়া রইছি কীজন্য?

: আমি কি আপনেরে জোর কইরা উঠাইছি? আপনে নিজের ইচ্ছায় উঠছেন।

: দরজা খোলা পাইছি, তাই উঠছি। দরজা বন্ধ থাকলে উঠতাম?

: ক্যাচাল না কইরা ভাড়া দেন।

: ভাড়া তো দিছি।

: আরও দেওন লাগব।

: অসম্ভব। তুই আমার হাতে সয়াবিন তেল ধরাইয়া দিয়া বলবি- ঘিয়ের দাম দেন, এইটা তো হইতে পারে না! যেমন দই, তেমন পয়সা।

শেওড়া পৌঁছার পর সেই যাত্রী বাস থেকে নামার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই কন্ডাকটর তাকে আটকাল। যাত্রী ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন-

: তুই আমার হাত ধরছস ক্যান?

: আগে টাকা দেন, তারপর নামেন।

: টাকা না দিলে কী করবি? বাস থেইকা নামতে দিবি না? আয়, সাহস থাকলে আটকা।

ভদ্রলোক কন্ডাকটরকে ধাক্কা দিয়ে বাসের দরজার কাছে যেতেই সে চিৎকার করে ড্রাইভারের উদ্দেশে বলল-

: ওস্তাদ, গাড়ি টান দেন। আবদুল্লাহপুরের আগে গাড়ি বেরেক হবে না।

ড্রাইভার গাড়ির গিয়ার বদল করতেই সেই যাত্রী লাফ দিয়ে ড্রাইভারের পাশে দাঁড়িয়ে বলল-

: খবরদার। গাড়ি চালাবি না...

যাত্রী ভদ্রলোকের হম্বিতম্বি শুনে ড্রাইভার কয়েক সেকেন্ড থ মেরে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একবার ডানে একবার বামে বাস ঘোরাতে লাগল। শেওড়ার পরের স্টপেজ কুড়িল বিশ্বরোড। সেখানেই আমার নেমে যাওয়ার কথা। কুড়িল ফ্লাইওভার চালুর পর এ জায়গায় যানবাহনের ভিড় কম থাকে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ড্রাইভার বাসের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

: সবগুলারে পানিতে ডুবাইয়া মারমু...

সড়কের পাশেই সরকার দৃষ্টিনন্দন একটি লেক তৈরি করেছে। প্রশান্তি পরিবহনের ড্রাইভার সব যাত্রীকে সেখানেই ডুবিয়ে মারতে চাচ্ছে! অবাক হয়ে ড্রাইভারের কাণ্ড দেখছিলাম আর নিজের অসহায়ত্বের কথা ভাবছিলাম। বাসে থাকা মহিলা ও শিশুরা ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার করার পরও ড্রাইভারের মন নরম হলো না; বরং সে গতি আরও বাড়িয়ে দিল। বাসটা যখন খিলক্ষেত স্টপেজেও থামল না, তখন যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ভর করল। সবাই মিলে অনেক অনুরোধ আর অনুনয় করার পর শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের সামনে এসে ড্রাইভার বাস দাঁড় করাল। আমাকে এখন রাস্তার ওপাশে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাস ধরে কুড়িল যেতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজে উঠে সামনের দিকে তাকালাম। সড়কের কোথাও শৃঙ্খলা নেই। যতদূর চোখ যায়- এলোমেলো-বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর দৃশ্যটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। ঝাপসা চোখে নিচে তাকাতেই দেখলাম- ফুটওভার ব্রিজের রেলিংয়ে থাকা একটা গুবরেপোকা হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগুনোর চেষ্টা করছে।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

প্রশান্তি পরিবহণে আজ যা ঘটেছিল...

 মোকাম্মেল হোসেন 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি বসেছি পেছনের দিকের একটা সিটে। নিয়ম অনুযায়ী এই বাসে সিটের অতিরিক্ত কোনো যাত্রী উঠানোর কথা নয়। এরা সেই নিয়মটা মানছে না। এ নিয়ে সামনে বসা যাত্রীরা কন্ডাকটরের সঙ্গে হৈচৈ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনে ‘সিটিংয়ের’ নামে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এটাও সে ধরনেরই একটা বাস সার্ভিস। নাম প্রশান্তি পরিবহন। নামের সঙ্গে বাসের ভেতরের পরিবেশের মিল খুঁজতে গিয়ে হাসি পেল। হাসতে দেখে সহযাত্রী বললেন-

: ভাই, ডোন্ট মাইন্ড; কীজন্য হাসলেন জানতে পারি?

: হাসলাম দুঃখে।

: স্যরি! আমি আরও ভাবলাম- মজার কোনো জিনিস দেইখা...

: দুঃখটা মজা থেইকাই উৎপন্ন হইছে।

: কীরকম?

: মালিকপক্ষ এই বাসটার নাম রাখছে প্রশান্তি; কিন্তু কোথায় প্রশান্তি? এর বাইরে যেমন-তেমন, ভেতরের অবস্থাটা একবার দেখেন। অর্ধেক সিটই ভাঙ্গা। এর মধ্যে কয়েকটা আবার দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখছে। হা! কী তার নাম; অথচ কী তার চেহারা!

: এই ধরনের জিল্লতিরে কী বলে জানেন?

: কী বলে?

: ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম।

: হাঃ হাঃ হাঃ। হানড্রেড পার্সেন্ট সত্য কথা বলছেন। আইচ্ছা, আমারে একটা কথা বলেন তো। লোকাল সার্ভিস হিসাবেও রাস্তায় চলার যোগ্য না- এইরকম লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা একটা বাস সিটিং সার্ভিসের অনুমোদন পাইল কীভাবে?

: এর উত্তর খুবই সোজা। অনুমোদনের ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত, তারা বাসের নাট-বল্টু ঠিক আছে কিনা, সেইটা লইয়া মাথা ঘামায় না। প্রতিমাসে তাদের হাতে টাকার যে বান্ডিলটা ধরাইয়া দেওয়া হয়, সেইগুলার মধ্যে ছেঁড়াফাটা কোনো নোট আছে কিনা, তারা শুধু সেইটা দেখে। আপনে জানেন, কয়েকদিন আগে কী ভয়াবহ কাণ্ড হইছিল?

: কী?

: এই কোম্পানির একটা বাস মহাখালি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ ঘুমাইয়া পড়ছিল। বাসের ড্রাইভার হাজার চেষ্টা কইরাও তারে সজাগ করতে পারে নাই। শেষে একটা ট্রেন আইসা ফালা ফালা করার পর বাসটা বুঝতে পারছে- কোনখানে সে বিছানা পেতেছিল!

: বলেন কী! নিচে গেছিল কী করতে? এই বাসের তো ফ্লাইওভারের উপর দিয়া চলাচল করার কথা।

: নিচে দিয়া গেছিল যাত্রী টুকাইতে।

: কেউ মাইনাস হয় নাই?

: ট্রেন আসার আগেই ধুসমুস কইরা নাইমা যাওয়ায় কোনো যাত্রী আহত-নিহত হওয়ার সুযোগ পায় নাই; তবে ট্রেনে হিট খাইয়া বাসের বডি বিভিন্ন জায়গায় ছিটকাইয়া পড়ার সময় জনাছয়েক পথচারী ও দোকানদার আহত হইছে। তাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর।

প্রশান্তি পরিবহনের শুধু চেহারা নয়, চরিত্রও খারাপ। কারও চরিত্রে দোষ থাকলে দশজন দশরকম কথা বলার সুযোগ পায়। এর বেলায়ও তাই ঘটল। কন্ডাকটরের উদ্দেশে একজনকে বলতে শুনলাম-

: অই হারামজাদা, এইটা সিটিং সার্ভিস, নাকি ফিটিং সার্ভিস?

লোকটার কথা শুনে কন্ডাকটর সরু চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল-

: গালি দেন ক্যা!

এ সময় পাশ থেকে অন্য একজন বলে উঠল-

: গালি তো তর জন্য কম হইয়া যায়। তর পাছায় কইষ্যা একটা লাত্থি দেওন দরকার।

: দেন লাত্থি!

ভদ্রলোক উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন-

: লাত্থি দিলে কী করবি তুই?

: আগে দিয়া দেখেন না!

ভদ্রলোক জামার হাতা গুটিয়ে প্রস্তুত হলেন। এরপর চিৎকার করে বললেন-

: অই ফকিন্নির পুত! শনি-মঙ্গলবার দেইখা তর পাছায় আমার লাত্থি দেওন লাগব ভাবছস?

: আমি ফকিন্নির পুত, ঠিক আছে! কিন্তু আপনে জমিদারের পুত হইয়া বাসে উঠছেন ক্যান? প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে পারেন না!

: আমি কিসে চলাফেরা করব, এইটা তুই বলার কে? এমন চড় দিব- বাড়িতে যাওয়ার পর তর বৌ মুখে কোনো দাঁত খুঁইজা পাবে না।

: এইটা পারবেন! একবার লাত্থি মারবেন, একবার চড় মারবেন। তবে ওস্তাদের মাইর শেষরাইতে। মাইর-গুতা যাই দেন, আমরা একবার ধরলে কিন্তু আর ছাড়ি না। বৈশাখীর মনে আছে আছে তো?

পাশে বসা ভদ্রলোক ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাইলেন-

: বৈশাখ মাসে কী ঘটেছিল?

বৈশাখী পরিবহনের ঘটনাটা আমি জানি। বিষণ্নকণ্ঠে বললাম-

: বৈশাখ মাস না, ও বলছে সাভার থেইকা গুলশান-নতুনবাজার রুটে চলাচলকারী বৈশাখী পরিবহনের কথা। ওই বাসে একদিন এইরকম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের মারামারি লাইগা যায়। এর জের ধইরা পরিবহন শ্রমিকরা ৭জন বাসযাত্রীকে পিটাইয়া মাইরা ফেলছিল।

: আরে! এ তো সাংঘাতিক লোক! খুন করার কথা কেমন বুক ফুলাইয়া বলতেছে দেখছেন!

: সাংঘাতিকের দেখছেন কী? এই ব্যাটা এখন অন্যদের খুনের গল্প শুনাইতেছে। দুইদিন পরে ও নিজেই মানুষ খুন করার কারবারে নাইমা পড়বে।

: কীভাবে!

: ড্রাইভারের খাতায় নাম লেখানোর মাধ্যমে।

ভদ্রলোক আমার দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কন্ডাকটরের দিকে ইশারা করে বললেন-

: বলেন কী! এই লোক টাকা গুনতে-গুনতে ড্রাইভার হইয়া যাবে! ড্রাইভার হওয়ার জন্য মৌলিক কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে না?

: না। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার আগে তারে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে-

: তুমি গরু চেন?

: জে স্যার, চিনি।

: বল তো, গরুর কয়টা মাথা?

: আপনের মতো গরুরও একটাই মাথা স্যার।

: গুড। কয়টা লেজ?

: লেজও স্যার একটাই।

: ভেরি গুড। তুমি তো দেখতেছি হেভি ট্যালেন্ট। আইচ্ছা, এইবার বল, ছাগলের কয়টা চোখ?

: দুইটা।

: কয়টা ঠ্যাং?

: চাইরটা।

: ভেরি ফাইন। যাও, বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে গাড়ি চালাইতে তোমার আর কোনো বাধা নাই।

আমার কথা ও অভিনয় দেখে ভদ্রলোক মজা পেয়ে হো হো করে উঠলেন। বললেন-

: বাস্তবে সত্যি সত্যি এইরকম হয় নাকি?

: হয় না মানে? বেশুমার হইতেছে।

কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর কম ভাড়া দেওয়ার সূত্র ধরে বাসের পরিবেশ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এ কথা সে কথার পর কন্ডাকটর তার উদ্দেশে বলল-

: ধুনপুন না কইরা ৩৫ টাকা ভাড়া দেন।

: কোন দুঃখে ৩৫ টাকা দিব?

: ভাড়া ৩৫ টাকা।

: শ্যামলী থেইকা শেওড়া পর্যন্ত ৩৫ টাকা ভাড়া নেওয়ার পারমিশন তরে কে দিছে?

: এইটা সিটিং সার্ভিস।

: অই চিটার, তর এই বাস সিটিং সার্ভিস হইলে আমি দাঁড়াইয়া রইছি কীজন্য?

: আমি কি আপনেরে জোর কইরা উঠাইছি? আপনে নিজের ইচ্ছায় উঠছেন।

: দরজা খোলা পাইছি, তাই উঠছি। দরজা বন্ধ থাকলে উঠতাম?

: ক্যাচাল না কইরা ভাড়া দেন।

: ভাড়া তো দিছি।

: আরও দেওন লাগব।

: অসম্ভব। তুই আমার হাতে সয়াবিন তেল ধরাইয়া দিয়া বলবি- ঘিয়ের দাম দেন, এইটা তো হইতে পারে না! যেমন দই, তেমন পয়সা।

শেওড়া পৌঁছার পর সেই যাত্রী বাস থেকে নামার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই কন্ডাকটর তাকে আটকাল। যাত্রী ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন-

: তুই আমার হাত ধরছস ক্যান?

: আগে টাকা দেন, তারপর নামেন।

: টাকা না দিলে কী করবি? বাস থেইকা নামতে দিবি না? আয়, সাহস থাকলে আটকা।

ভদ্রলোক কন্ডাকটরকে ধাক্কা দিয়ে বাসের দরজার কাছে যেতেই সে চিৎকার করে ড্রাইভারের উদ্দেশে বলল-

: ওস্তাদ, গাড়ি টান দেন। আবদুল্লাহপুরের আগে গাড়ি বেরেক হবে না।

ড্রাইভার গাড়ির গিয়ার বদল করতেই সেই যাত্রী লাফ দিয়ে ড্রাইভারের পাশে দাঁড়িয়ে বলল-

: খবরদার। গাড়ি চালাবি না...

যাত্রী ভদ্রলোকের হম্বিতম্বি শুনে ড্রাইভার কয়েক সেকেন্ড থ মেরে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একবার ডানে একবার বামে বাস ঘোরাতে লাগল। শেওড়ার পরের স্টপেজ কুড়িল বিশ্বরোড। সেখানেই আমার নেমে যাওয়ার কথা। কুড়িল ফ্লাইওভার চালুর পর এ জায়গায় যানবাহনের ভিড় কম থাকে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ড্রাইভার বাসের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

: সবগুলারে পানিতে ডুবাইয়া মারমু...

সড়কের পাশেই সরকার দৃষ্টিনন্দন একটি লেক তৈরি করেছে। প্রশান্তি পরিবহনের ড্রাইভার সব যাত্রীকে সেখানেই ডুবিয়ে মারতে চাচ্ছে! অবাক হয়ে ড্রাইভারের কাণ্ড দেখছিলাম আর নিজের অসহায়ত্বের কথা ভাবছিলাম। বাসে থাকা মহিলা ও শিশুরা ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার করার পরও ড্রাইভারের মন নরম হলো না; বরং সে গতি আরও বাড়িয়ে দিল। বাসটা যখন খিলক্ষেত স্টপেজেও থামল না, তখন যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ভর করল। সবাই মিলে অনেক অনুরোধ আর অনুনয় করার পর শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের সামনে এসে ড্রাইভার বাস দাঁড় করাল। আমাকে এখন রাস্তার ওপাশে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাস ধরে কুড়িল যেতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজে উঠে সামনের দিকে তাকালাম। সড়কের কোথাও শৃঙ্খলা নেই। যতদূর চোখ যায়- এলোমেলো-বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর দৃশ্যটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। ঝাপসা চোখে নিচে তাকাতেই দেখলাম- ফুটওভার ব্রিজের রেলিংয়ে থাকা একটা গুবরেপোকা হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগুনোর চেষ্টা করছে।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন