কম দামে বেশি বিক্রি, নাকি বেশি দামে কম বিক্রি?
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
কম দামে বেশি বিক্রি, নাকি বেশি দামে কম বিক্রি?

  ড. আর এম দেবনাথ  

১৬ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কম দামে বেশি বিক্রি, বেশি দামে কম বিক্রি’- এ দুই বিক্রয়নীতির মধ্যে কোনটি শ্রেয়? ছোটবেলায় শুনেছি গুরুজনরা বলতেন কম দামে বেশি বিক্রি ভালো। এতে মুনাফার কোনো হেরফের হয় না। বেশি বিক্রি হলে কম দামের লোকসান পুষিয়ে যায়।

মুশকিল হচ্ছে তবু সব দোকানদার এ নীতি মানতেন না। যার যখন খুশি অথবা সুবিধা, সেই সবই বিক্রি করত। তবে কমদামে একই গুণের মাল যে দিত তার দোকানেই ভিড় লেগে থাকত। যেসব দোকানদার দাম বেশি নিত, তারা ছিল চিহ্নিত। অনেক ক্রেতা সেসব দোকানে যেত না।

ছোটবেলায় একবার এক দোকানদারকে দেখেছি কম দামে বিক্রয়কারী দোকানদারকে অপমান করতে। এর অবশ্য বিচারও হয়। এর অর্থ কম দামে বেশি বিক্রির ঝামেলাও আছে। প্রশ্ন, আজকাল কি ‘কম দামে বেশি বিক্রির’ নীতি দোকানদাররা অনুসরণ করে? এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।

তবে দৃশ্যত মনে হয় তা দোকানদার, ফড়িয়া-দালালরা করেন না। মুনাফা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তা না হলে যে ফুলকপি ঢাকার আশপাশের অঞ্চলে ১৫-২০ টাকায়ও বিক্রি হয় না, তার দাম ঢাকার বাজারে ৪০ টাকা হয় কী করে?

কাগজে প্রায়ই প্রতিবেদন ছাপা হয়, কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল কলোনি বাজার, শান্তিনগর বাজার, এলিফ্যান্ট রোড বাজার ইত্যাদিতে কাঁচামাল এলেই এগুলোর দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘মার্কেটিং কস্টের’ কোনো ফর্মুলাতেই এর উত্তর পাওয়া যায় না। বই-পুস্তকে ‘মার্কেটিংয়ের’ (বিপণন) যে সংজ্ঞা, এর মধ্যে যে কাজগুলো পড়ে তার মূল্য ধরে হিসাব করলে কাওরান বাজারের পাইকারি মূল্য ও এলিফ্যান্ট রোডের খুচরা মূল্যের আকাশ-পাতাল তফাতের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

খরচ বাদে সাধারণত ৫-১০ শতাংশ লাভে জিনিসপত্র খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু স্পষ্টতই তা হয় না। এর জন্য ভোগে ক্রেতা সাধারণত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতা। শুধু শাকসবজি নয়, মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, মুদি দোকানের সামগ্রী ইত্যাদিতেও একই অবস্থা। বাদাম বিক্রেতা, ভ্যান গাড়িতে করে ফল বিক্রি, রিকশাচালক- সবাই মনে হয় একই নীতিতে যার যার ব্যবসা, বেচাকেনা, পরিবহণের কাজ করে।

কাস্টমার বুঝে, অবস্থা বুঝে, সুযোগ-সুবিধা বুঝে দোকানদাররা পণ্য বিক্রিতেই অভ্যস্ত। অথচ এক সময় ছিল অল্প দামেই দোকানদাররা পণ্য ছেড়ে দিত। বলা বাহুল্য, সেই দিন আর নেই। এখনকার দোকানদারির নিয়ম আলাদা। এ আলাদা রীতিনীতি বোঝার কায়দা নেই। তবে একটু বোঝার চেষ্টা করলে দেখা যায়, দোকানদাররা হিসাব করে কত শতাংশ লাভ করা হবে, এই ভিত্তিতে পণ্য বিক্রি করে না।

দৃশ্যত তারা ‘পড়তা’ ফেলে তাদের সংসার খরচের ওপর ভিত্তি করে। একদিন এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করি- তোমার দোকানে পণ্যের দাম বেশি কেন? তার সোজা উত্তর- স্যার বাসা ভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। বাসা ভাড়ার সঙ্গে জিনিসপত্রের দামের সম্পর্ক কী? আছে। আসলে তাদের সংসার চালাতে হয় এ দোকানের আয় থেকে। ঢাকায় খুপচিতে থাকতে হলেও মাসিক খরচ ৪ জনের সংসারে কম করে হলেও ২৫-৩০ হাজার টাকা।

একজন কলাওয়ালার কথা ধরা যাক। ও বলল, তার বাসা ভাড়া ১৫ হাজার। গ্যাস, বিদ্যুতে চলে যায় আরও কিছু টাকা। এক ছেলে পড়াশোনা করে। তাকে টিউটরের কাছে দেওয়া হয়েছে। তার পেছনে খরচ আছে। মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, জামা-কাপড়, যাতায়াত, ডাক্তার, ওষুধ এসব খরচ মেটাতে গিয়ে কোনো মাসেই তার খরচ ৪০ হাজারের নিচে হয় না। পাড়াতে মাছ বিক্রি করে ভ্যানে করে, মাথায় করে, তারও সংসার ঢাকাতে। এক ছেলে তার কলেজে পড়ে। তার বাসা ভাড়া ১০ হাজার টাকা। কোনো মাসেই তার খরচ ২৫-৩০ হাজার টাকার নিচে নয়।

মুদি দোকানি, মাছের খুচরা ব্যবসায়ী, ফল বিক্রেতা, চিঁড়া-মুড়ি বিক্রেতা, সবজি দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির দোকানদারের ঘর-সংসার, অবস্থা ভেদে মাসিক খরচ ২৫-৩০-৪০ হাজার টাকা। যারা ভাসমান তাদের কথা আলাদা। তারা একা ঢাকায়, মেসে থাকে। কিছুদিন পরপর বাড়ি যায়। যেমন- রিকশাওয়ালা। তারা ভাসমান। তাদের খুব কমেরই ঢাকায় বাসা আছে। তারা সাধারণত রিকশা মালিকের গ্যারেজে থাকে, খায়ও সেখানে। তারা রোজগারের টাকা নিয়ে ২-৩ মাস পরপর বাড়ি চলে যায়।

যেসব ছোট দোকানি বাসা-বাড়ি করে ঢাকায় থাকে, তাদের মাসিক খরচ মোটামুটি খারাপ না। এদের ‘পড়তা’ এবং বিক্রির হিসাব হয় সংসার খরচ দিয়ে। মাসে যদি তাদের খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা, তাহলে দিনের বেচাকেনা থেকে কমপক্ষে এক হাজার টাকা লাভ করতে হবে। তারপর কাঁচামাল ও মাছের ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতি আছে। তার একটা কস্ট্ আছে। এসব হিসাব করে তারা মালের বিক্রয় মূল্য ঠিক করে।

এমন নয় যে, মালের ওপর ৫-১০ শতাংশ লাভ করা হবে। যেহেতু সংসার খরচের ওপর নির্ভর করে জিনিসপত্রের দাম, তাই জিনিসপত্রের দাম নিত্য পরিবর্তনশীল। কারণ সব জিনিসেরই দাম প্রতিদিন বাড়ছে। এ বৃদ্ধির বোঝা ক্রেতাদের ওপর। ক্রেতারা অসহায়, তাদের ব্যবসা বুদ্ধি নেই।

মুদি দোকানি, সবজিওয়ালা, ফলওয়ালা, মাছ বিক্রেতা, চিঁড়া-মুড়ি বিক্রেতা, কলাওয়ালা ইত্যাদি শ্রেণির ব্যবসায়ীদের কথা বোঝা গেল। বড় বড় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, আড়তদার ইত্যাদি শ্রেণির ব্যবসায়ী কোন নীতি অনুসরণ করে? তারা কম দাম বেশি বিক্রি, না বেশি দাম কম বিক্রির নীতি মানে? দৃশ্যত মনে হয় তাদের ওইসব নীতির ধারে কাছে না গেলেও চলে। এর প্রধান কারণ তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা বড় বড় আমদানিকারক, তাদের গুদামজাতকরণের ক্ষমতা আছে, অর্থের সমস্যা নেই, মাল বিক্রির জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না। ক্রেতারাই তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে।

অধিকন্তু অনেকের রয়েছে এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর ইত্যাদি। তারা মালের আমদানি-রপ্তানির খবর রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারের খবর রাখে। সরকারের সঙ্গে তাদের রয়েছে সখ্য। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও রয়েছে সখ্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। মালের সরবরাহ (সাপ্লাই), মালের দাম, মালের ডিস্ট্রিবিউশন ইত্যাদি বিষয় তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

কাজেই মূল্য তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তাদের কাছে বড় বিষয় হচ্ছে লাভ-মুনাফা। বলা যায় অতি মুনাফা (ম্যাক্সিমাইজেশন অব প্রফিট)। এর জন্য তারা ‘কার্টেল’, ‘মনোপলি’ তৈরি করে। এ কার্টেল হয় পণ্যভিত্তিক। সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, রসুন, খেজুর, মসলাপাতি ইত্যাদি প্রতিটি পণ্যের জন্য রয়েছে ‘মনোপলি’। সরকার জানে, মিডিয়া জানে, ব্যবসায়ীরা জানে কোন পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ কে কে নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্য ধরে রাখার ক্ষমতা কার কতটুকু এটাও সবাই যানে।

কাজেই পণ্যের কম দাম, বেশি দাম ইত্যাদি তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। মুনাফার জন্য, অতি মুনাফার জন্য দাম যেখানে ‘ফিক্সড’ করা দরকার, সেখানেই তারা তা করে। এখানে ক্রেতাসাধারণের কী ক্ষতি হলো, তাদের স্বার্থ কতটুকু বিঘ্নিত হলো এসব তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। মাঝে মাঝে সরকারের সঙ্গে তাদের স্বার্থের মৃদু সংঘর্ষ হয়। শত হোক সরকার পণ্যের মূল্য যাচ্ছেতাইভাবে বাড়তে দিতে পারে না। বাড়লে সরকার হস্তক্ষেপ করে। ব্যবসায়ীদের ক্ষান্ত করার চেষ্টা করে।

খোলাবাজারে জিনিস বিক্রির চেষ্টা করে। এতে বাজার যতটুকু স্বাভাবিক হওয়ার ততটুকু হয়। কিন্তু মোটের ওপর বাজার উপরের দিকেই স্থিতিশীল হয়। দাম বেড়ে, বেড়ে উপরের দিকেই স্থিতিশীল হয়। বল বাহুল্য, শুধু আমদানিকৃত পণ্যের বেলায় নয়, দেশীয় পণ্যের বাজারও পণ্যভিত্তিক ‘মনোপলির’ নিয়ন্ত্রণে। যেমন চালের বাজার। এ বাজার মিল-মালিক ও আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে। কয়েকটি হাউজই এ চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার অনেক সময় তাদের কারসাজির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। এদের প্রচুর অর্থ সম্পদ। কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার ক্ষমতা এদের অপরিসীম।

কাজেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো অসুবিধা হয় না। হয় না অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনও বিঘ্নিত। বস্তুত গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে পণ্যভিত্তিক বড় বড় হাউজের জন্ম হয়েছে। তারা খুবই বিত্তশালী, ক্ষমতাধর। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ইত্যাদির মালিকও তারা। অতএব তাদের নীতি হচ্ছে পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা, অতিরিক্ত মুনাফা করা। ক্রেতার কী হলো সেই কথা ভাবার সময় তাদের নেই।

বড় বড় ব্যবসায়ীর বিক্রয়নীতির কথা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। এর মধ্যে কি ব্যাংক ব্যবসা পড়ে? ব্যাংক ব্যবসা সংগঠিত ব্যবসা। সব ব্যাংকই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এরা একটু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করে। বস্তুত ব্যাংক হচ্ছে ‘হাইলি রেগুলেইটেড’ ব্যবসা। অন্যদিকে পণ্যের বড় বড় ব্যবসা সাধারণভাবে সবই ‘পারিবারিক ব্যবসা’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো হচ্ছে একক ‘মালিকানাধীন ব্যবসা’।

অনেক ক্ষেত্রে পার্টনারশিপ, তাও পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বল। তবে দৃশ্যমান যে, উভয় ক্ষেত্রেই মুনাফা, অতি মুনাফা অর্জনই লক্ষ্য। ব্যাংক মুনাফা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, আর বড় বড় পণ্য ব্যবসা মুনাফা করে অনেকটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে। তবে উদ্দেশ্যে কোনো হেরফের নেই। ব্যাংকগুলোকে সার্ভিস বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলা হতো। এখন আর তা নয়। ব্যাংকও এখন মালামালের মতো ‘প্রডাক্ট বা পণ্য’ বিক্রি করে।

ব্যাংকের বিজ্ঞাপন দেখলেই তা বোঝা যায়। ব্যাংক কি কম দামে বেশি পণ্য বিক্রির রীতি অনুসরণ করে, না বেশি দামে কম পণ্য বিক্রির নীতি অনুসরণ করে? দৃশ্যত মনে হয়, এসব নীতি-রীতি ব্যাংকগুলো সাধারণভাবে অনুসরণ করে না। দেশে যখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (১৯৭২-৮২) ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক ছিল না, তখন ‘সামাজিক মুনাফা’ (সোশ্যাল প্রফিটিবিলিটি) বলে একটা ধারণা চালু হয়েছিল।

অর্থাৎ ‘ফিন্যান্সিয়াল প্রফিটিবিলিটি’ নয়, দেখতে হবে ব্যাংক মানুষের উপার্জন বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে কিনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কিনা, এলাকার উন্নয়ন করছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। টাকার অংকে লাভের হিসাবটা ছিল গৌণ। কথা ছিল তারা গ্রামে গ্রামে যাবে। গ্রামের মানুষ সঞ্চয় সংগ্রহ করবে, গ্রামের মানুষকে ঋণ দেবে। এ কাজটি হয়নি। বিগত ৫০ বছরেও সরকারি ব্যাংক গ্রামে যেতে পারেনি। বড় জোর তারা আছে উপজেলা পর্যন্ত।

এদিকে ১৯৮২ সাল থেকেই এসে যায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক। প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, লিজিং কোম্পানি, বিমা কোম্পানি। ফলে বদলে যায় পুরো চিত্র। ‘সোশ্যাল প্রফিটিবিলিটি’ মাঠে মারা যায়। সামনে আসে ফিন্যান্সিয়াল প্রফিবিলিটি। কোন ব্যাংক কত মুনাফা করতে পারল তাই হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। পুরোনো ধারণা নতুন করে চালু হলো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাই চায় মুনাফা। মালিকরা চায় মুনাফা।

বছরের প্রথমেই মালিকরা কর্মকর্তাদের বলে দেয় তারা কত টাকা মুনাফা চায়। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সেই মুনাফা অর্জন করা, না হয় বিদায় হওয়া। মুনাফার লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণের পর কর্মকর্তারা ব্যবসার পরিকল্পনা করে। সাধারণভাবে তারা আমানত, ঋণ, গ্যারান্টি ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, নন-ফান্ডেড ব্যবসা ইত্যাদি ঠিক করে। আজকাল তো সুদের হার নির্ণয়ও তাদের কাজ। এক সময় সুদের হার ঠিক করত বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তা ছেড়ে দেওয়া হলো ব্যাংকের ওপর। এখন আবার এসব নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার অর্থনীতি এখানে পরাস্ত।

দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বড় বড় আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসার উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন করা, বলা যায় অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা। এখানে আমানতকারীদের স্বার্থ পরে। আগে মালিকদের স্বার্থ। তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে কর্মকর্তাদের চেষ্টা করতে হয় মুনাফা বেশি বেশি করতে। এর জন্য খরচ কমানো, কর্মচারী-কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতি, ছোট চাকরিতে বেতন হ্রাস, বড় চাকরিতে বেতন বৃদ্ধি, নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ প্রবর্তন ইত্যাদি করতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

এছাড়া মালিকদের ‘সেবার’ প্রশ্ন তো আছেই। ব্যাংকের মালিকদের সংসার খরচের মতো বিষয় নেই। তাদের সংসার খরচের টাকা রোজগারের জন্য ব্যাংক নয়। তাদের কাজ হচ্ছে মুনাফা বৃদ্ধি। যেভাবেই হোক মুনাফা চাই। এর জন্য যা করতে হয় তা করতে হবে। ১৩ মাসে যদি বছর করতে হয়, তাই করতে হবে (বস্তুত এ ঘটনা কেউ কেউ করেছে)। একই সার্ভিসের জন্য যদি দুবার ‘চার্জ’ করতে হয়, তাই করতে হবে। সুদের হিসাবকরণে নানা পদ্ধতি অবলম্বন, সেবামূলক প্রডাক্টই বাতিল করা, কম লাভজনক প্রডাক্ট নিরুৎসাহিত করা ইত্যাদি তো হবেই। এসব কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘প্রেসার’ বাড়ে, ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

কম দামে বেশি বিক্রি, নাকি বেশি দামে কম বিক্রি?

 ড. আর এম দেবনাথ 
১৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কম দামে বেশি বিক্রি, বেশি দামে কম বিক্রি’- এ দুই বিক্রয়নীতির মধ্যে কোনটি শ্রেয়? ছোটবেলায় শুনেছি গুরুজনরা বলতেন কম দামে বেশি বিক্রি ভালো। এতে মুনাফার কোনো হেরফের হয় না। বেশি বিক্রি হলে কম দামের লোকসান পুষিয়ে যায়।

মুশকিল হচ্ছে তবু সব দোকানদার এ নীতি মানতেন না। যার যখন খুশি অথবা সুবিধা, সেই সবই বিক্রি করত। তবে কমদামে একই গুণের মাল যে দিত তার দোকানেই ভিড় লেগে থাকত। যেসব দোকানদার দাম বেশি নিত, তারা ছিল চিহ্নিত। অনেক ক্রেতা সেসব দোকানে যেত না।

ছোটবেলায় একবার এক দোকানদারকে দেখেছি কম দামে বিক্রয়কারী দোকানদারকে অপমান করতে। এর অবশ্য বিচারও হয়। এর অর্থ কম দামে বেশি বিক্রির ঝামেলাও আছে। প্রশ্ন, আজকাল কি ‘কম দামে বেশি বিক্রির’ নীতি দোকানদাররা অনুসরণ করে? এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।

তবে দৃশ্যত মনে হয় তা দোকানদার, ফড়িয়া-দালালরা করেন না। মুনাফা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তা না হলে যে ফুলকপি ঢাকার আশপাশের অঞ্চলে ১৫-২০ টাকায়ও বিক্রি হয় না, তার দাম ঢাকার বাজারে ৪০ টাকা হয় কী করে?

কাগজে প্রায়ই প্রতিবেদন ছাপা হয়, কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল কলোনি বাজার, শান্তিনগর বাজার, এলিফ্যান্ট রোড বাজার ইত্যাদিতে কাঁচামাল এলেই এগুলোর দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘মার্কেটিং কস্টের’ কোনো ফর্মুলাতেই এর উত্তর পাওয়া যায় না। বই-পুস্তকে ‘মার্কেটিংয়ের’ (বিপণন) যে সংজ্ঞা, এর মধ্যে যে কাজগুলো পড়ে তার মূল্য ধরে হিসাব করলে কাওরান বাজারের পাইকারি মূল্য ও এলিফ্যান্ট রোডের খুচরা মূল্যের আকাশ-পাতাল তফাতের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

খরচ বাদে সাধারণত ৫-১০ শতাংশ লাভে জিনিসপত্র খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু স্পষ্টতই তা হয় না। এর জন্য ভোগে ক্রেতা সাধারণত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতা। শুধু শাকসবজি নয়, মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, মুদি দোকানের সামগ্রী ইত্যাদিতেও একই অবস্থা। বাদাম বিক্রেতা, ভ্যান গাড়িতে করে ফল বিক্রি, রিকশাচালক- সবাই মনে হয় একই নীতিতে যার যার ব্যবসা, বেচাকেনা, পরিবহণের কাজ করে।

কাস্টমার বুঝে, অবস্থা বুঝে, সুযোগ-সুবিধা বুঝে দোকানদাররা পণ্য বিক্রিতেই অভ্যস্ত। অথচ এক সময় ছিল অল্প দামেই দোকানদাররা পণ্য ছেড়ে দিত। বলা বাহুল্য, সেই দিন আর নেই। এখনকার দোকানদারির নিয়ম আলাদা। এ আলাদা রীতিনীতি বোঝার কায়দা নেই। তবে একটু বোঝার চেষ্টা করলে দেখা যায়, দোকানদাররা হিসাব করে কত শতাংশ লাভ করা হবে, এই ভিত্তিতে পণ্য বিক্রি করে না।

দৃশ্যত তারা ‘পড়তা’ ফেলে তাদের সংসার খরচের ওপর ভিত্তি করে। একদিন এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করি- তোমার দোকানে পণ্যের দাম বেশি কেন? তার সোজা উত্তর- স্যার বাসা ভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। বাসা ভাড়ার সঙ্গে জিনিসপত্রের দামের সম্পর্ক কী? আছে। আসলে তাদের সংসার চালাতে হয় এ দোকানের আয় থেকে। ঢাকায় খুপচিতে থাকতে হলেও মাসিক খরচ ৪ জনের সংসারে কম করে হলেও ২৫-৩০ হাজার টাকা।

একজন কলাওয়ালার কথা ধরা যাক। ও বলল, তার বাসা ভাড়া ১৫ হাজার। গ্যাস, বিদ্যুতে চলে যায় আরও কিছু টাকা। এক ছেলে পড়াশোনা করে। তাকে টিউটরের কাছে দেওয়া হয়েছে। তার পেছনে খরচ আছে। মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, জামা-কাপড়, যাতায়াত, ডাক্তার, ওষুধ এসব খরচ মেটাতে গিয়ে কোনো মাসেই তার খরচ ৪০ হাজারের নিচে হয় না। পাড়াতে মাছ বিক্রি করে ভ্যানে করে, মাথায় করে, তারও সংসার ঢাকাতে। এক ছেলে তার কলেজে পড়ে। তার বাসা ভাড়া ১০ হাজার টাকা। কোনো মাসেই তার খরচ ২৫-৩০ হাজার টাকার নিচে নয়।

মুদি দোকানি, মাছের খুচরা ব্যবসায়ী, ফল বিক্রেতা, চিঁড়া-মুড়ি বিক্রেতা, সবজি দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির দোকানদারের ঘর-সংসার, অবস্থা ভেদে মাসিক খরচ ২৫-৩০-৪০ হাজার টাকা। যারা ভাসমান তাদের কথা আলাদা। তারা একা ঢাকায়, মেসে থাকে। কিছুদিন পরপর বাড়ি যায়। যেমন- রিকশাওয়ালা। তারা ভাসমান। তাদের খুব কমেরই ঢাকায় বাসা আছে। তারা সাধারণত রিকশা মালিকের গ্যারেজে থাকে, খায়ও সেখানে। তারা রোজগারের টাকা নিয়ে ২-৩ মাস পরপর বাড়ি চলে যায়।

যেসব ছোট দোকানি বাসা-বাড়ি করে ঢাকায় থাকে, তাদের মাসিক খরচ মোটামুটি খারাপ না। এদের ‘পড়তা’ এবং বিক্রির হিসাব হয় সংসার খরচ দিয়ে। মাসে যদি তাদের খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা, তাহলে দিনের বেচাকেনা থেকে কমপক্ষে এক হাজার টাকা লাভ করতে হবে। তারপর কাঁচামাল ও মাছের ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতি আছে। তার একটা কস্ট্ আছে। এসব হিসাব করে তারা মালের বিক্রয় মূল্য ঠিক করে।

এমন নয় যে, মালের ওপর ৫-১০ শতাংশ লাভ করা হবে। যেহেতু সংসার খরচের ওপর নির্ভর করে জিনিসপত্রের দাম, তাই জিনিসপত্রের দাম নিত্য পরিবর্তনশীল। কারণ সব জিনিসেরই দাম প্রতিদিন বাড়ছে। এ বৃদ্ধির বোঝা ক্রেতাদের ওপর। ক্রেতারা অসহায়, তাদের ব্যবসা বুদ্ধি নেই।

মুদি দোকানি, সবজিওয়ালা, ফলওয়ালা, মাছ বিক্রেতা, চিঁড়া-মুড়ি বিক্রেতা, কলাওয়ালা ইত্যাদি শ্রেণির ব্যবসায়ীদের কথা বোঝা গেল। বড় বড় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, আড়তদার ইত্যাদি শ্রেণির ব্যবসায়ী কোন নীতি অনুসরণ করে? তারা কম দাম বেশি বিক্রি, না বেশি দাম কম বিক্রির নীতি মানে? দৃশ্যত মনে হয় তাদের ওইসব নীতির ধারে কাছে না গেলেও চলে। এর প্রধান কারণ তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা বড় বড় আমদানিকারক, তাদের গুদামজাতকরণের ক্ষমতা আছে, অর্থের সমস্যা নেই, মাল বিক্রির জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না। ক্রেতারাই তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে।

অধিকন্তু অনেকের রয়েছে এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর ইত্যাদি। তারা মালের আমদানি-রপ্তানির খবর রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারের খবর রাখে। সরকারের সঙ্গে তাদের রয়েছে সখ্য। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও রয়েছে সখ্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। মালের সরবরাহ (সাপ্লাই), মালের দাম, মালের ডিস্ট্রিবিউশন ইত্যাদি বিষয় তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

কাজেই মূল্য তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তাদের কাছে বড় বিষয় হচ্ছে লাভ-মুনাফা। বলা যায় অতি মুনাফা (ম্যাক্সিমাইজেশন অব প্রফিট)। এর জন্য তারা ‘কার্টেল’, ‘মনোপলি’ তৈরি করে। এ কার্টেল হয় পণ্যভিত্তিক। সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, রসুন, খেজুর, মসলাপাতি ইত্যাদি প্রতিটি পণ্যের জন্য রয়েছে ‘মনোপলি’। সরকার জানে, মিডিয়া জানে, ব্যবসায়ীরা জানে কোন পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ কে কে নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্য ধরে রাখার ক্ষমতা কার কতটুকু এটাও সবাই যানে।

কাজেই পণ্যের কম দাম, বেশি দাম ইত্যাদি তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। মুনাফার জন্য, অতি মুনাফার জন্য দাম যেখানে ‘ফিক্সড’ করা দরকার, সেখানেই তারা তা করে। এখানে ক্রেতাসাধারণের কী ক্ষতি হলো, তাদের স্বার্থ কতটুকু বিঘ্নিত হলো এসব তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। মাঝে মাঝে সরকারের সঙ্গে তাদের স্বার্থের মৃদু সংঘর্ষ হয়। শত হোক সরকার পণ্যের মূল্য যাচ্ছেতাইভাবে বাড়তে দিতে পারে না। বাড়লে সরকার হস্তক্ষেপ করে। ব্যবসায়ীদের ক্ষান্ত করার চেষ্টা করে।

খোলাবাজারে জিনিস বিক্রির চেষ্টা করে। এতে বাজার যতটুকু স্বাভাবিক হওয়ার ততটুকু হয়। কিন্তু মোটের ওপর বাজার উপরের দিকেই স্থিতিশীল হয়। দাম বেড়ে, বেড়ে উপরের দিকেই স্থিতিশীল হয়। বল বাহুল্য, শুধু আমদানিকৃত পণ্যের বেলায় নয়, দেশীয় পণ্যের বাজারও পণ্যভিত্তিক ‘মনোপলির’ নিয়ন্ত্রণে। যেমন চালের বাজার। এ বাজার মিল-মালিক ও আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে। কয়েকটি হাউজই এ চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার অনেক সময় তাদের কারসাজির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। এদের প্রচুর অর্থ সম্পদ। কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার ক্ষমতা এদের অপরিসীম।

কাজেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো অসুবিধা হয় না। হয় না অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনও বিঘ্নিত। বস্তুত গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে পণ্যভিত্তিক বড় বড় হাউজের জন্ম হয়েছে। তারা খুবই বিত্তশালী, ক্ষমতাধর। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ইত্যাদির মালিকও তারা। অতএব তাদের নীতি হচ্ছে পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা, অতিরিক্ত মুনাফা করা। ক্রেতার কী হলো সেই কথা ভাবার সময় তাদের নেই।

বড় বড় ব্যবসায়ীর বিক্রয়নীতির কথা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। এর মধ্যে কি ব্যাংক ব্যবসা পড়ে? ব্যাংক ব্যবসা সংগঠিত ব্যবসা। সব ব্যাংকই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এরা একটু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করে। বস্তুত ব্যাংক হচ্ছে ‘হাইলি রেগুলেইটেড’ ব্যবসা। অন্যদিকে পণ্যের বড় বড় ব্যবসা সাধারণভাবে সবই ‘পারিবারিক ব্যবসা’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো হচ্ছে একক ‘মালিকানাধীন ব্যবসা’।

অনেক ক্ষেত্রে পার্টনারশিপ, তাও পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বল। তবে দৃশ্যমান যে, উভয় ক্ষেত্রেই মুনাফা, অতি মুনাফা অর্জনই লক্ষ্য। ব্যাংক মুনাফা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, আর বড় বড় পণ্য ব্যবসা মুনাফা করে অনেকটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে। তবে উদ্দেশ্যে কোনো হেরফের নেই। ব্যাংকগুলোকে সার্ভিস বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলা হতো। এখন আর তা নয়। ব্যাংকও এখন মালামালের মতো ‘প্রডাক্ট বা পণ্য’ বিক্রি করে।

ব্যাংকের বিজ্ঞাপন দেখলেই তা বোঝা যায়। ব্যাংক কি কম দামে বেশি পণ্য বিক্রির রীতি অনুসরণ করে, না বেশি দামে কম পণ্য বিক্রির নীতি অনুসরণ করে? দৃশ্যত মনে হয়, এসব নীতি-রীতি ব্যাংকগুলো সাধারণভাবে অনুসরণ করে না। দেশে যখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (১৯৭২-৮২) ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক ছিল না, তখন ‘সামাজিক মুনাফা’ (সোশ্যাল প্রফিটিবিলিটি) বলে একটা ধারণা চালু হয়েছিল।

অর্থাৎ ‘ফিন্যান্সিয়াল প্রফিটিবিলিটি’ নয়, দেখতে হবে ব্যাংক মানুষের উপার্জন বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে কিনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কিনা, এলাকার উন্নয়ন করছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। টাকার অংকে লাভের হিসাবটা ছিল গৌণ। কথা ছিল তারা গ্রামে গ্রামে যাবে। গ্রামের মানুষ সঞ্চয় সংগ্রহ করবে, গ্রামের মানুষকে ঋণ দেবে। এ কাজটি হয়নি। বিগত ৫০ বছরেও সরকারি ব্যাংক গ্রামে যেতে পারেনি। বড় জোর তারা আছে উপজেলা পর্যন্ত।

এদিকে ১৯৮২ সাল থেকেই এসে যায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক। প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, লিজিং কোম্পানি, বিমা কোম্পানি। ফলে বদলে যায় পুরো চিত্র। ‘সোশ্যাল প্রফিটিবিলিটি’ মাঠে মারা যায়। সামনে আসে ফিন্যান্সিয়াল প্রফিবিলিটি। কোন ব্যাংক কত মুনাফা করতে পারল তাই হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। পুরোনো ধারণা নতুন করে চালু হলো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাই চায় মুনাফা। মালিকরা চায় মুনাফা।

বছরের প্রথমেই মালিকরা কর্মকর্তাদের বলে দেয় তারা কত টাকা মুনাফা চায়। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সেই মুনাফা অর্জন করা, না হয় বিদায় হওয়া। মুনাফার লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণের পর কর্মকর্তারা ব্যবসার পরিকল্পনা করে। সাধারণভাবে তারা আমানত, ঋণ, গ্যারান্টি ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, নন-ফান্ডেড ব্যবসা ইত্যাদি ঠিক করে। আজকাল তো সুদের হার নির্ণয়ও তাদের কাজ। এক সময় সুদের হার ঠিক করত বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তা ছেড়ে দেওয়া হলো ব্যাংকের ওপর। এখন আবার এসব নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার অর্থনীতি এখানে পরাস্ত।

দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বড় বড় আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসার উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন করা, বলা যায় অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা। এখানে আমানতকারীদের স্বার্থ পরে। আগে মালিকদের স্বার্থ। তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে কর্মকর্তাদের চেষ্টা করতে হয় মুনাফা বেশি বেশি করতে। এর জন্য খরচ কমানো, কর্মচারী-কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতি, ছোট চাকরিতে বেতন হ্রাস, বড় চাকরিতে বেতন বৃদ্ধি, নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ প্রবর্তন ইত্যাদি করতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

এছাড়া মালিকদের ‘সেবার’ প্রশ্ন তো আছেই। ব্যাংকের মালিকদের সংসার খরচের মতো বিষয় নেই। তাদের সংসার খরচের টাকা রোজগারের জন্য ব্যাংক নয়। তাদের কাজ হচ্ছে মুনাফা বৃদ্ধি। যেভাবেই হোক মুনাফা চাই। এর জন্য যা করতে হয় তা করতে হবে। ১৩ মাসে যদি বছর করতে হয়, তাই করতে হবে (বস্তুত এ ঘটনা কেউ কেউ করেছে)। একই সার্ভিসের জন্য যদি দুবার ‘চার্জ’ করতে হয়, তাই করতে হবে। সুদের হিসাবকরণে নানা পদ্ধতি অবলম্বন, সেবামূলক প্রডাক্টই বাতিল করা, কম লাভজনক প্রডাক্ট নিরুৎসাহিত করা ইত্যাদি তো হবেই। এসব কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘প্রেসার’ বাড়ে, ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন