সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কাম্য
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কাম্য

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

১৭ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার পর ওই সফরের বিষয়ে জানাতে ৪ অক্টোবর গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে এবং তাদের ভোট নিয়েই আবার ক্ষমতায় আসতে চাই। জনগণ ভোট দিলে আসব, নইলে আসব না’ (যুগান্তর, ৫ অক্টোবর)। এর আগে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালেও তিনি এমন কথা বলেছিলেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের (ডিসেম্বর, ২০১৮) এক মাস আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জনগণ ভোট দিলে আবার ক্ষমতায় আসব। না দিলেও আফসোস নেই।’ কিন্তু ওই নির্বাচন নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২৮টি বিরোধী দল বর্জিত তৎপূর্ববর্তী দশম জাতীয় নির্বাচন (জানুয়ারি, ২০১৪) কেবল শাসক দল এবং তাদের সমর্থক গুটিকয়েক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। এ দুটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের আশঙ্কা, আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না এবং তারা ভোট প্রদানেরও সুযোগ পাবে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণই এখন জাতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এসব শর্ত খুব কমই পূরণ হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম দুই দশকে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক হয়নি। এসব নির্বাচনে দলীয় সরকারগুলো তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে। এসব নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল গৌণ, মুখ্য হয়ে উঠেছিল দলীয় সরকারের ভূমিকা। নির্বাচনের ফল ছিল এক অর্থে পূর্বনির্ধারিত। ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় তা একদিকে যেমন ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫৫.৪, ৭৫.০০, ৭৪.৯৬ ও ৮৭.১৩ শতাংশ।

নির্বাচনের ওপর ভোটারদের ফিরে পাওয়া বিশ্বাস বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে বিএনপির শাসনামলে প্রবর্তিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে। উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সময়কালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দুর্বার আন্দোলন এবং জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে।

জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা ৮টি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়। এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন না ঘটায় দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গণতন্ত্রকামী বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন করে নির্বাচন দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি ভারত দশম সংসদ নির্বাচন সমর্থন করলেও তারা একইসঙ্গে দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচনের জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নিতে সরকারকে পরামর্শ দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে নির্বাচন-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি ও অন্যসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তার সে কথা থেকে সরে আসেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ভোট গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব ঘটেছে। ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন দেশের জনগণ। নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যদিও পরবর্তীকালে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ওই নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে অপারগতা স্বীকার করতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও সুযোগ নেই।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোটে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার ও রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ডেমোক্র্যাসি ইন রিট্রিট : ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসাবে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অনিয়মগুলোকে দায়ী করা হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এখন প্রশ্ন হলো, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা যায় কীভাবে? এজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। যে নামেই হোক, জাতীয় নির্বাচনকালে একটি নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুই. জাতীয় সংসদ বহাল রেখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে এমন কোনো দেশে এরূপ ব্যবস্থা আছে বলে জানা নেই। উপর্যুক্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে। তিন. নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান নির্দেশিত আইন প্রণয়ন করতে হবে। চার. দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনের সব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। পাঁচ. প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনকালে যাতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে তাদের ভোট নিয়ে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার সেই ইচ্ছা পূরণ হোক, যা হতে পারে কেবল অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের পথ ধরে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কাম্য

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
১৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার পর ওই সফরের বিষয়ে জানাতে ৪ অক্টোবর গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে এবং তাদের ভোট নিয়েই আবার ক্ষমতায় আসতে চাই। জনগণ ভোট দিলে আসব, নইলে আসব না’ (যুগান্তর, ৫ অক্টোবর)। এর আগে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালেও তিনি এমন কথা বলেছিলেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের (ডিসেম্বর, ২০১৮) এক মাস আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জনগণ ভোট দিলে আবার ক্ষমতায় আসব। না দিলেও আফসোস নেই।’ কিন্তু ওই নির্বাচন নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২৮টি বিরোধী দল বর্জিত তৎপূর্ববর্তী দশম জাতীয় নির্বাচন (জানুয়ারি, ২০১৪) কেবল শাসক দল এবং তাদের সমর্থক গুটিকয়েক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। এ দুটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের আশঙ্কা, আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না এবং তারা ভোট প্রদানেরও সুযোগ পাবে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণই এখন জাতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এসব শর্ত খুব কমই পূরণ হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম দুই দশকে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক হয়নি। এসব নির্বাচনে দলীয় সরকারগুলো তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে। এসব নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল গৌণ, মুখ্য হয়ে উঠেছিল দলীয় সরকারের ভূমিকা। নির্বাচনের ফল ছিল এক অর্থে পূর্বনির্ধারিত। ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় তা একদিকে যেমন ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫৫.৪, ৭৫.০০, ৭৪.৯৬ ও ৮৭.১৩ শতাংশ।

নির্বাচনের ওপর ভোটারদের ফিরে পাওয়া বিশ্বাস বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে বিএনপির শাসনামলে প্রবর্তিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে। উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সময়কালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দুর্বার আন্দোলন এবং জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে।

জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা ৮টি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়। এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন না ঘটায় দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গণতন্ত্রকামী বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন করে নির্বাচন দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি ভারত দশম সংসদ নির্বাচন সমর্থন করলেও তারা একইসঙ্গে দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচনের জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নিতে সরকারকে পরামর্শ দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে নির্বাচন-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি ও অন্যসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তার সে কথা থেকে সরে আসেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ভোট গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব ঘটেছে। ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন দেশের জনগণ। নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যদিও পরবর্তীকালে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ওই নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে অপারগতা স্বীকার করতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও সুযোগ নেই।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোটে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার ও রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ডেমোক্র্যাসি ইন রিট্রিট : ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসাবে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অনিয়মগুলোকে দায়ী করা হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এখন প্রশ্ন হলো, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা যায় কীভাবে? এজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। যে নামেই হোক, জাতীয় নির্বাচনকালে একটি নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুই. জাতীয় সংসদ বহাল রেখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে এমন কোনো দেশে এরূপ ব্যবস্থা আছে বলে জানা নেই। উপর্যুক্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে। তিন. নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান নির্দেশিত আইন প্রণয়ন করতে হবে। চার. দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনের সব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। পাঁচ. প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনকালে যাতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে তাদের ভোট নিয়ে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার সেই ইচ্ছা পূরণ হোক, যা হতে পারে কেবল অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের পথ ধরে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন