আফগান পরিস্থিতি কি আরও জটিল আকার ধারণ করবে?
jugantor
আফগান পরিস্থিতি কি আরও জটিল আকার ধারণ করবে?

  একেএম শামসুদ্দিন  

১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো ভবিষ্যতে যেন বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য আফগানিস্তান হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেই মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের মূল পরিকল্পনাই ছিল তালেবান গোষ্ঠীকে একেবারেই ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে তারা আফগানিস্তানের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। তাদের সেই মহাপরিকল্পনার মধ্যে ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে একটি কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা এবং বহুজাতিক জীবনব্যবস্থা চালু করা। এজন্য তারা ১ লাখ বিদেশি সৈনিকের অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক ঠিকাদারও নিয়োগ দিয়েছিল। এসব করতে তাদের বছরে ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল। ২০ বছর পর যখন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ আফগানিস্তান থেকে সৈনিক প্রত্যাহার করে নিয়ে গেছে; তখন দেখা গেছে, তাদের সে লক্ষ্য অর্জনে তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনাও হচ্ছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার অনেক কারণ থাকতে পারে; তবে এসব কারণের মধ্যে প্রথম যে দুটো কারণ সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য, তা হলো, প্রথমত, ‘পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের মতো আফগানিস্তানকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা’ এবং দ্বিতীয়ত, ‘আফগানিস্তানে সাফল্যের সম্ভাবনা ও অগ্রগতি নিয়ে আফগানিস্তান দখলযুদ্ধের মূল পরিকল্পনাকারী (Mastermind) ও সেখানে নিয়োজিত সেনা কমান্ডারদের প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করা’।

গত ২০ বছর দখলদারিত্ব কায়েম করলেও যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তাদের পরিকল্পনামাফিক যে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছিল, তা যে আদৌ অর্জন করা সম্ভব নয়, তা বুঝতেও তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণেই, যে তালেবানদের আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ২০ বছর পর আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে যুক্তরাষ্ট্র অবনত শিরে সেই তালেবানদের সঙ্গেই সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।

যদিও আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগে তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়েছে; তবে, এ চুক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কোনো এজেন্ডা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে। আফগানিস্তান দখলের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো বলেছিল, তাদের লক্ষ্য হলো, আল কায়দাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং ওসামা বিন লাদেনকে আটক করে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বিচার করা। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। আফগানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের হাজার হাজার সৈন্য হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। কথা হলো, আল কায়দাকে নিশ্চিহ্ন করা এবং ওসামা বিন লাদেনকে আটক করাই যদি তাদের মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে তো, এ দুটো লক্ষ্য ১০ বছর আগেই অর্জিত হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে এতদিন পর কেন সেনা প্রত্যাহার করা হলো? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আক্ষরিক অর্থেই অনেকটা ঔপনিবেশিক আমলের মতো পশ্চিমাঘেঁষা একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং আপাতত সে লক্ষ্য পূরণের ন্যূনতম সম্ভাবনা না থাকায় একরকম হতাশা থেকেই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো বাহিনীর সৈন্য প্রত্যাহারের পর তালেবান বাহিনী পুনরায় আফগানিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেছে। তারা ইতোমধ্যে একটি সরকারও গঠন করে নিয়েছে। তালেবানের এ নব উত্থানের পরপরই তারা বেশকিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা দিয়েছিল, যা বিশ্ববাসীকে অনেকটা আশ্বস্ত করেছিল। তারা ক্ষমতা দখলের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এমনকি তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়াও নারী স্বাধীনতায় কিছুটা ছাড় দেওয়ার কথাও বলেছিল; কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের আসল রূপ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। পিতার অপরাধে শিশুপুত্রকে হত্যা করা, শরিয়াহ আইন লঙ্ঘন করায় অভিযুক্তকে হত্যা করে উন্মুক্ত জায়গায় বাঁশের আগায় ঝুলিয়ে রেখে চারদিকে আতঙ্কের সৃষ্টি করা, নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানে বাধা প্রদান ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে তাদের আগের রূপই যেন প্রকাশ পেয়েছে। এসব কার্যকলাপ পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, তালেবানের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মী বা সৈন্যদের মন ও মানসিকতায় বিস্তর পার্থক্য আছে। তালেবান যোদ্ধারা পূর্বতন সরকারের সঙ্গে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তাদের খোঁজে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখেছে এমন সাংবাদিক ও মানবাধিকার সদস্যদের তারা খুঁজে ফিরছে। তালেবানরা মুখে যাই বলুক, তাদের কার্যকলাপে কিন্তু তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া জানা গেছে, চরমপন্থি তালেবানরা বেশকিছু ভিন্নমত পোষণকারীকে গোপনে আটক করে রেখেছে। অনেককে গুম করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতাদের নিু পর্যায়ের কট্টরপন্থিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই অনেকে ধারণা করছে।

অপরদিকে নবগঠিত তালেবান সরকার পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সাহায্যের চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তান আপাতত এ সরকারের প্রতি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; তবে এ সহায়তার মেয়াদ নির্ভর করবে দেশগুলোকে দেওয়া তালেবান সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ওপর। ৯ অক্টোবর কাতারের দোহায় তালেবানের শীর্ষনেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আফগান নারীদের মানবাধিকার রক্ষা, জরুরি সহায়তা নির্বিঘ্নে বিতরণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি মেনে চলা, আফগানিস্তানে এখনো আটকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা আফগানদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে তালেবানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়াও আফগানিস্তানে যেন আল কায়দা বা অন্য কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে এমন প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়েছে। ১২ অক্টোবর কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তালেবানের মধ্যে অনুরূপ অপর একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এ বৈঠকে তালেবান নেতারা আফগানিস্তানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। তারা পশ্চিমা কূটনীতিকদের বলেন, নিষেধাজ্ঞা আফগান সরকারকে দুর্বল করে তুলবে, তাতে কারও লাভ হবে না। বরং এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর পড়বে এবং প্রকট হবে শরণার্থী সংকট। এ কথা ঠিক, পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন, আন্তর্জাতিক মহলকে আফগানিস্তানে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে হলে দেশটিতে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। শীতকাল আসন্ন; এ অবস্থায় লাখ লাখ মানুষের খাদ্য জোগাড় করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও খাদ্যাভাবে শরণার্থীর চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও দেখা দেবে।

আফগান পরিস্থিতি লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা দিন দিন ভেঙে পড়ছে। ৯ অক্টোবর কাতারে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছিল, ঠিক তার আগেরদিন ৮ অক্টোবর আফগানিস্তানের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৫৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এ হামলায় ‘ইসলামিক স্টেট ইন দি খোরাসান প্রভিন্স বা ‘আইএসপি’ অথবা ‘আইএস-কে’ দায় স্বীকার করেছে। এ আইএস-কে পশ্চিমাদের সৃষ্ট ইসলামিক স্টেট বা আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে এবং তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই এ ধরনের হামলা চালায় বলে জানা গেছে। ১৫ অক্টোবরও একই ঘটনা ঘটে। এবারও লক্ষ্য শিয়াদের মসজিদ। এবার কুন্দুজ শহরে জুমার নামাজের সময় এ বোমা হামলাটি ঘটে। তবে কোনো পক্ষই দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। এ পরিস্থিতি তালেবানরা কীভাবে মোকাবিলা করে এখন তা দেখার বিষয়। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ধর্মভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে সামাল দেওয়া তালেবানদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আইএস-কে। ২০২১ সালের প্রথম চার মাসেই আইএস-কে ৭৭টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ আগস্ট কাবুল বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলাকালে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে ১৩ জন মার্কিন সেনা ও ১৭০ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। আইএস-কে ‘আইএস’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও এটি স্বতন্ত্র নেটওয়ার্কে অভিযানিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। তারা আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সমন্বয়ে বিশ্ব ইসলামিক খেলাফতের অংশ হিসাবে ঐতিহাসিক খোরাসান রিজিয়ন পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা জারি রেখেছে। সম্প্রতি তারা তাদের নেটওয়ার্ক বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বড় বড় শহরগুলোতে যেমন-কাবুল, জালালাবাদ, কুদ্দুজ ইত্যাদি শহরে ‘শহরকেন্দ্রিক’ কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। তারা বিদেশি সাহায্য সংস্থা, শিয়া সম্প্রদায়, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমে তাদের আক্রমণ শানিত করবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সহজেই বোঝা যায়, আফগানিস্তান দিনে দিনে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক ও সিরিয়া থেকেও সন্ত্রাসবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তালেবানের কোনো কোনো নেতা এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে পরপর কয়েকটি বোমা হামলার পর এসব হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন আছে বলে দাবি করেছে। দৈনিক যুগান্তরেই প্রকাশিত আমার একটি নিবন্ধে আমি বলেছিলাম, তালবানের নব উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাণিজ্যের অংশ। সৈন্য প্রত্যাহারের লজ্জা নিবারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা করবে সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমার সেই নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন করবে তার সবিস্তার উল্লেখ করেছি। পরিস্থিতি দেখে প্রশ্ন জাগে, প্রতিশোধ নিতে আফগান জঙ্গিগোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র কি সাহায্য করছে? পাশাপাশি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা যে রাখবে তা বলাই বাহুল্য। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে একই ধারণায় বিশ্বাসী গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। তালেবান, হাক্কানি নেট ওয়ার্ক, আল কায়দা, যারা একসময় সম্মিলিতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সৈনিকদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছে, তাদের এ পারস্পরিক সম্পর্ক কতদিন বজায় থাকে তার ওপরও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করছে।

দিন যতই গড়াচ্ছে, আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি যেন আরও সংকটময় আকার ধারণ করছে। ভবিষ্যতে এ দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে তালেবান সরকারের কঠোর অবস্থানের জন্য। তালেবান সরকার কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার পক্ষে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি পেতে এটি কঠিন ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া তালেবানের কট্টরপন্থি অনড় আদর্শগত অবস্থানের জন্য নবগঠিত সরকারব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও যেমন তারা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, ঠিক তেমনই দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও তারা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কাবুল দখলের পরপর ‘বদলে যাওয়া তালেবান’ বলে তারা যে দাবি করেছিল, তাদের বর্তমান কার্যকলাপে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের সেই দাবি গ্রহণযোগ্যতাও হারাতে বসেছে। এ অবস্থায় তালেবানরা নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তন না করলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

আফগান পরিস্থিতি কি আরও জটিল আকার ধারণ করবে?

 একেএম শামসুদ্দিন 
১৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো ভবিষ্যতে যেন বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য আফগানিস্তান হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেই মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের মূল পরিকল্পনাই ছিল তালেবান গোষ্ঠীকে একেবারেই ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে তারা আফগানিস্তানের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। তাদের সেই মহাপরিকল্পনার মধ্যে ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে একটি কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা এবং বহুজাতিক জীবনব্যবস্থা চালু করা। এজন্য তারা ১ লাখ বিদেশি সৈনিকের অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক ঠিকাদারও নিয়োগ দিয়েছিল। এসব করতে তাদের বছরে ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল। ২০ বছর পর যখন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ আফগানিস্তান থেকে সৈনিক প্রত্যাহার করে নিয়ে গেছে; তখন দেখা গেছে, তাদের সে লক্ষ্য অর্জনে তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনাও হচ্ছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার অনেক কারণ থাকতে পারে; তবে এসব কারণের মধ্যে প্রথম যে দুটো কারণ সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য, তা হলো, প্রথমত, ‘পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের মতো আফগানিস্তানকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা’ এবং দ্বিতীয়ত, ‘আফগানিস্তানে সাফল্যের সম্ভাবনা ও অগ্রগতি নিয়ে আফগানিস্তান দখলযুদ্ধের মূল পরিকল্পনাকারী (Mastermind) ও সেখানে নিয়োজিত সেনা কমান্ডারদের প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করা’।

গত ২০ বছর দখলদারিত্ব কায়েম করলেও যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তাদের পরিকল্পনামাফিক যে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছিল, তা যে আদৌ অর্জন করা সম্ভব নয়, তা বুঝতেও তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণেই, যে তালেবানদের আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ২০ বছর পর আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে যুক্তরাষ্ট্র অবনত শিরে সেই তালেবানদের সঙ্গেই সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।

যদিও আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগে তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়েছে; তবে, এ চুক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কোনো এজেন্ডা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে। আফগানিস্তান দখলের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো বলেছিল, তাদের লক্ষ্য হলো, আল কায়দাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং ওসামা বিন লাদেনকে আটক করে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বিচার করা। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। আফগানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের হাজার হাজার সৈন্য হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। কথা হলো, আল কায়দাকে নিশ্চিহ্ন করা এবং ওসামা বিন লাদেনকে আটক করাই যদি তাদের মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে তো, এ দুটো লক্ষ্য ১০ বছর আগেই অর্জিত হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে এতদিন পর কেন সেনা প্রত্যাহার করা হলো? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আক্ষরিক অর্থেই অনেকটা ঔপনিবেশিক আমলের মতো পশ্চিমাঘেঁষা একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং আপাতত সে লক্ষ্য পূরণের ন্যূনতম সম্ভাবনা না থাকায় একরকম হতাশা থেকেই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো বাহিনীর সৈন্য প্রত্যাহারের পর তালেবান বাহিনী পুনরায় আফগানিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেছে। তারা ইতোমধ্যে একটি সরকারও গঠন করে নিয়েছে। তালেবানের এ নব উত্থানের পরপরই তারা বেশকিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা দিয়েছিল, যা বিশ্ববাসীকে অনেকটা আশ্বস্ত করেছিল। তারা ক্ষমতা দখলের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এমনকি তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়াও নারী স্বাধীনতায় কিছুটা ছাড় দেওয়ার কথাও বলেছিল; কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের আসল রূপ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। পিতার অপরাধে শিশুপুত্রকে হত্যা করা, শরিয়াহ আইন লঙ্ঘন করায় অভিযুক্তকে হত্যা করে উন্মুক্ত জায়গায় বাঁশের আগায় ঝুলিয়ে রেখে চারদিকে আতঙ্কের সৃষ্টি করা, নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানে বাধা প্রদান ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে তাদের আগের রূপই যেন প্রকাশ পেয়েছে। এসব কার্যকলাপ পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, তালেবানের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মী বা সৈন্যদের মন ও মানসিকতায় বিস্তর পার্থক্য আছে। তালেবান যোদ্ধারা পূর্বতন সরকারের সঙ্গে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তাদের খোঁজে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখেছে এমন সাংবাদিক ও মানবাধিকার সদস্যদের তারা খুঁজে ফিরছে। তালেবানরা মুখে যাই বলুক, তাদের কার্যকলাপে কিন্তু তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া জানা গেছে, চরমপন্থি তালেবানরা বেশকিছু ভিন্নমত পোষণকারীকে গোপনে আটক করে রেখেছে। অনেককে গুম করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতাদের নিু পর্যায়ের কট্টরপন্থিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই অনেকে ধারণা করছে।

অপরদিকে নবগঠিত তালেবান সরকার পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সাহায্যের চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তান আপাতত এ সরকারের প্রতি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; তবে এ সহায়তার মেয়াদ নির্ভর করবে দেশগুলোকে দেওয়া তালেবান সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ওপর। ৯ অক্টোবর কাতারের দোহায় তালেবানের শীর্ষনেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আফগান নারীদের মানবাধিকার রক্ষা, জরুরি সহায়তা নির্বিঘ্নে বিতরণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি মেনে চলা, আফগানিস্তানে এখনো আটকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা আফগানদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে তালেবানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়াও আফগানিস্তানে যেন আল কায়দা বা অন্য কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে এমন প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়েছে। ১২ অক্টোবর কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তালেবানের মধ্যে অনুরূপ অপর একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এ বৈঠকে তালেবান নেতারা আফগানিস্তানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। তারা পশ্চিমা কূটনীতিকদের বলেন, নিষেধাজ্ঞা আফগান সরকারকে দুর্বল করে তুলবে, তাতে কারও লাভ হবে না। বরং এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর পড়বে এবং প্রকট হবে শরণার্থী সংকট। এ কথা ঠিক, পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন, আন্তর্জাতিক মহলকে আফগানিস্তানে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে হলে দেশটিতে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। শীতকাল আসন্ন; এ অবস্থায় লাখ লাখ মানুষের খাদ্য জোগাড় করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও খাদ্যাভাবে শরণার্থীর চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও দেখা দেবে।

আফগান পরিস্থিতি লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা দিন দিন ভেঙে পড়ছে। ৯ অক্টোবর কাতারে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছিল, ঠিক তার আগেরদিন ৮ অক্টোবর আফগানিস্তানের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৫৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এ হামলায় ‘ইসলামিক স্টেট ইন দি খোরাসান প্রভিন্স বা ‘আইএসপি’ অথবা ‘আইএস-কে’ দায় স্বীকার করেছে। এ আইএস-কে পশ্চিমাদের সৃষ্ট ইসলামিক স্টেট বা আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে এবং তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই এ ধরনের হামলা চালায় বলে জানা গেছে। ১৫ অক্টোবরও একই ঘটনা ঘটে। এবারও লক্ষ্য শিয়াদের মসজিদ। এবার কুন্দুজ শহরে জুমার নামাজের সময় এ বোমা হামলাটি ঘটে। তবে কোনো পক্ষই দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। এ পরিস্থিতি তালেবানরা কীভাবে মোকাবিলা করে এখন তা দেখার বিষয়। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ধর্মভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে সামাল দেওয়া তালেবানদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আইএস-কে। ২০২১ সালের প্রথম চার মাসেই আইএস-কে ৭৭টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ আগস্ট কাবুল বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলাকালে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে ১৩ জন মার্কিন সেনা ও ১৭০ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। আইএস-কে ‘আইএস’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও এটি স্বতন্ত্র নেটওয়ার্কে অভিযানিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। তারা আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সমন্বয়ে বিশ্ব ইসলামিক খেলাফতের অংশ হিসাবে ঐতিহাসিক খোরাসান রিজিয়ন পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা জারি রেখেছে। সম্প্রতি তারা তাদের নেটওয়ার্ক বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বড় বড় শহরগুলোতে যেমন-কাবুল, জালালাবাদ, কুদ্দুজ ইত্যাদি শহরে ‘শহরকেন্দ্রিক’ কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। তারা বিদেশি সাহায্য সংস্থা, শিয়া সম্প্রদায়, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমে তাদের আক্রমণ শানিত করবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সহজেই বোঝা যায়, আফগানিস্তান দিনে দিনে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক ও সিরিয়া থেকেও সন্ত্রাসবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তালেবানের কোনো কোনো নেতা এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে পরপর কয়েকটি বোমা হামলার পর এসব হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন আছে বলে দাবি করেছে। দৈনিক যুগান্তরেই প্রকাশিত আমার একটি নিবন্ধে আমি বলেছিলাম, তালবানের নব উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাণিজ্যের অংশ। সৈন্য প্রত্যাহারের লজ্জা নিবারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা করবে সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমার সেই নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন করবে তার সবিস্তার উল্লেখ করেছি। পরিস্থিতি দেখে প্রশ্ন জাগে, প্রতিশোধ নিতে আফগান জঙ্গিগোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র কি সাহায্য করছে? পাশাপাশি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা যে রাখবে তা বলাই বাহুল্য। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে একই ধারণায় বিশ্বাসী গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। তালেবান, হাক্কানি নেট ওয়ার্ক, আল কায়দা, যারা একসময় সম্মিলিতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সৈনিকদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছে, তাদের এ পারস্পরিক সম্পর্ক কতদিন বজায় থাকে তার ওপরও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করছে।

দিন যতই গড়াচ্ছে, আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি যেন আরও সংকটময় আকার ধারণ করছে। ভবিষ্যতে এ দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে তালেবান সরকারের কঠোর অবস্থানের জন্য। তালেবান সরকার কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার পক্ষে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি পেতে এটি কঠিন ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া তালেবানের কট্টরপন্থি অনড় আদর্শগত অবস্থানের জন্য নবগঠিত সরকারব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও যেমন তারা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, ঠিক তেমনই দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও তারা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কাবুল দখলের পরপর ‘বদলে যাওয়া তালেবান’ বলে তারা যে দাবি করেছিল, তাদের বর্তমান কার্যকলাপে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের সেই দাবি গ্রহণযোগ্যতাও হারাতে বসেছে। এ অবস্থায় তালেবানরা নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তন না করলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থান