চাঁদ আছে, চাঁদের হাটের দাদুভাই নেই
jugantor
চাঁদ আছে, চাঁদের হাটের দাদুভাই নেই

  সম্পাদকীয়  

১৯ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে অনন্য হিসাবে আলাদা করতে বললে আমি অবশ্যই রফিকুল হক দাদুভাইয়ের নামই বলব। একজন কিশোর হিসাবে আমাকে দাদুভাই সম্মোহিত করেছিলেন সেই ১৯৭৩ সালেই। এ সম্মোহনের মায়াজালে আবিষ্ট করে রেখেছিলেন অনন্তলোকে চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এখনো সেই সম্মোহনের ঘোর কাটেনি।

১৯৭২ সাল। সদ্য স্বাধীন দেশ। ভারতীয় দূতাবাস স্কুল ছাত্রছাত্রীদের জন্য রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আমি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হয়েছিলাম। আমার লেখালেখির প্রেরণা সেখান থেকেই। আমাদের বাড়িতে ইত্তেফাক পত্রিকা আসত তখন। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের কচিকাঁচার আসরের নিয়মিত পাঠক ছিলাম আমি। ১৯৭৩ সালে স্থানীয় পাঠাগারে পূর্বদেশ পত্রিকা পড়তে গিয়ে ছোটদের পাতা চাঁদেরহাটের সঙ্গে পরিচয় হলো। পাতাটি দ্রুত আমাকে আকৃষ্ট করল পাতার সম্পাদক দাদুভাইয়ের কারণে। দাদুভাইকে তখনো চাক্ষুষ করিনি। এর প্রয়োজনও ছিল না। চাঁদেরহাটের পাতাটি তিনি যেভাবে সাজিয়েছিলেন, তাতে পরতে পরতে জীবন্ত হয়ে গিয়েছিলেন দাদুভাই। মনে পড়ে ‘আমার কথা’ শিরোনামে বাঁ পাশের পৃষ্ঠার বাঁ দিকে তার ঝকঝকে বাঁকানো রাবিন্দ্রীক হাতের লেখায় তিনি তার কথা প্রকাশ করতেন। দমবন্ধ করে পাঠ করে ফেলতাম। মনে হতো আমাদের সামনে রেখে গল্প করে যাচ্ছেন দাদুভাই। আমাদের জন্য খুব কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি ছিল ‘প্রীতি নিও’। কী আদর জড়িয়ে ছোটদের চিঠির উত্তর দিতেন। দিতেন পথনির্দেশনা। নবীন লেখকদের লেখা প্রকাশিত হতো ‘আমাদের পাতায়’। আর ‘আমাদের জন্য পাতায়’ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা লিখতেন। সবকিছু মিলে একটি পারিবারিক আয়োজন যেন হয়ে গেল। চাঁদেরহাটের কারণে পূর্বদেশের প্রতি তৈরি হয়ে গেল একটি আকর্ষণ। মাকে রাজি করিয়ে বাড়িতে পূর্বদেশ রাখা নিশ্চিত করলাম। চাঁদেরহাট শিশু-কিশোরদের কাছে একটি পরিবারের প্রতীক হয়ে উঠছিল যেন! টানা দুমাস কয়েকটি ছড়া আর গল্প পাঠালাম পূর্বদেশের ঠিকানায় প্রিয় হয়ে ওঠা দাদুভাইয়ের বরাবর। প্রতি সপ্তাহে অধীর আগ্রহে ও কম্পিত বক্ষে চাঁদেরহাটের পাতা খুলি। তন্ন তন্ন করে খুঁজি, কিন্তু আমার লেখা ছাপা হয় না। প্রীতি নিও পর্বেও কোনো উত্তর নেই। হতাশা থেকে এক সময় অভিমান জমা হলো। অবশেষে তিন মাসের মাথায় ‘প্রীতি নিও’তে দুলাইনের একটি উত্তর ছাপা হলো। ওতেই আমি ধন্য। ভাবা যায়, দাদুভাই নিজে উত্তর লিখেছেন। সত্তরের দশকে অনেক লেখকই মূল নামের সঙ্গে ডাকনাম যুক্ত করতেন। আমিও তখন লেখার চেষ্টা করতাম শাহনাওয়াজ শাহীন নামে। পরে অবশ্য অন্য এক কারণে আমার লেখক নাম হয়ে গিয়েছিল ‘শাহনাজ কালাম’। সে প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর।

দাদুভাইয়ের দেওয়া উত্তর বারবার পড়ে মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। লিখেছিলেন, ‘তুমি বড় ভাবুক শাহীন, তাই ভাবনাগুলো অতিবেশি ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে চাও। এ নিয়ে হয়েছে মুশকিল। এক বৃহস্পতিবার বিকালে পূর্বদেশে চলে এসো, কথা হবে।’ মোহনীয় আকর্ষণ। কর গুনতে থাকি। আরও চারদিন পার করে তবে বৃহস্পতিবার! পরে দাদুভাই বলেছিলেন, তার নাকি মনে হয়েছিল আমি ভালো লিখতে পারব। তবে একটু পথ দেখাতে হবে।

বৃহস্পতিবার বিকালে টয়েনবী সার্কুলার রোডে অবজারভার ভবনে চলে এলাম। এ হাউস থেকেই বেরোত পূর্বদেশ। ধুকপুক করছে বুক। পূর্বদেশের অফিসে ঢুকেছি। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন দাদুভাইয়ের টেবিল। একজন মানুষকে ঘিরে আরও চার পাঁচজন কিশোর-তরুণ বসে আছে। আমি ভেবেছিলাম দাদুভাই যখন, তখন শ্মশ্রুমণ্ডিত প্রৌঢ় কেউ হবেন। দেখলাম ছিপছিপে গড়নের একজন মানুষ। মুখে দাড়ি নেই। বসে থাকলেও বুঝলাম বেশ লম্বা গড়নের আমাদের দাদুভাই। বয়স কত হবে! হয়তো পঞ্চাশের ঘরে।

পরিচয় দিতেই একগাল হেসে বললেন বন্দরের শাহীন! এক তরুণ পাশ থেকে একটি চেয়ার টেনে আনলেন। পরে জেনেছি সম্ভবত তিনি আলিমুজ্জামান হারু ভাই। সেসময় চমৎকার গল্প লিখতেন। দু’তিন মিনিটের মধ্যে আসর জমিয়ে ফেললেন দাদুভাই। বৃহস্পতিবার পেজ মেকআপের দিন। এক দিকে পেজ মেকআপ করছেন, অন্যদিকে গল্পও চালিয়ে যাচ্ছেন। দাদুভাইয়ের সম্মোহনী শক্তিতে মনে হলো না এখানে কেউ দূরের।

দাদুভাই লেখালেখির ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দিয়ে তাড়া দিলেন ফিরে যেতে। বললেন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তুমি নারায়ণগঞ্জ যাবে, তাই আর দেরি করো না। আমি বিদায় নিলাম। পরামর্শ মতো একটি ছড়া লিখে পাঠিয়ে দিলাম দাদুভাইয়ের ঠিকানায়। চাঁদেরহাটের পাতায় পরের সপ্তাহে ছাপা হয়ে গেল ছড়াটি।

দাদুভাইয়ের এমন এক আকর্ষণ ছিল! বৃহস্পতিবার এলেই মন ছুটে যেত অবজারভার ভবনে। শিল্প-সাহিত্য আড্ডায় যাওয়ার উদার অনুমোদন ছিল বাড়ি থেকে। মাঝে মাঝেই চলে যেতাম দাদুভাইয়ের মোহনীয় আড্ডায়। অবাক হয়ে দেখতাম দাদুভাই চাঁদেরহাটের পাতাকে যেন একটি পরিবার বানিয়ে ফেলেছিলেন। আড্ডাতেও এক আত্মার মানুষ বানিয়ে ফেলেছিলেন সবাইকে। ধীরে ধীরে আড্ডার সদস্য কিশোর-তরুণদের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। যাদের অনেকেই আজ যার যার জায়গা থেকে আলো ছড়াচ্ছেন। পরিচিতের তালিকায় যুক্ত হলেন আজকের যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম ভাই, কালেরকণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ভাই, অভিনয় শিল্পী-লেখক আফজাল হোসেন ভাই, সাংবাদিক-কবি হাসান হাফিজ ভাই-এমন অনেক উজ্জ্বল তারকা।

দাদুভাইকে অনুভব করার জন্য অনেক অনেক উজ্জ্বল স্মৃতি রয়েছে। এ পরিসরে তা বলা সম্ভব নয়। তবে সংগঠক দাদুভাইয়ের একটি পরিচয় আমাকে তুলে ধরতেই হবে। ১৯৭৩-এর শেষ বা ১৯৭৪-এর প্রথম দিক তখন। চাঁদেরহাটের পাতা তখন শিশু-কিশোরদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। সারা দেশের ছোটদের সঙ্গে যেন বিনিসুতোর মালাগাঁথা হয়ে গেছে। ‘প্রীতি নিও’ কলামে আবেগের ছড়াছড়ি। এমন এক বিকালে এখনকার শিল্পব্যাংকের উল্টো দিকে, অবজারভার ভবন থেকে কিছুটা দক্ষিণে একটি আইল্যান্ডের ঘাসে দাদুভাইকে নিয়ে আমরা আড্ডায় বসেছি। এক সময় দাদুভাই তার মনের কথা জানালেন। বললেন, চাঁদেরহাট নামে একটি শিশু-কিশোর সংগঠন করলে কেমন হয়! সবাইতো উৎসাহে লাফিয়ে উঠলাম। এভাবেই দাদুভাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে পা রাখল। ১৯৭৪-এ জন্ম নিল শিশু-কিশোর সংগঠন চাঁদেরহাট। এ সংগঠনের তিনটি স্লোগান তৈরি করে দিলেন দাদুভাই। ১. আমরা সূর্যের সাথী, ২. আমরা সুন্দর হবো এবং ৩. চাঁদেরহাট একটি মিষ্টি পরিবার। ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। প্রতি সপ্তাহে চাঁদেরহাটের পাতায় বেরোতে লাগল দেশজুড়ে চাঁদেরহাটের শাখা গঠনের খবর। কোথাও কোথাও উদ্বোধনের জন্য দাদুভাই তার দলবল নিয়ে ছুটছেন।

বন্ধুদের নিয়ে আমরাও ঠিক করলাম বন্দর শাখা খুলব। দাদুভাই সানন্দে সম্মতি দিলেন; কিন্তু আমার শর্ত ছিল উদ্বোধন করতে হবে দাদুভাইকে। সঙ্গে সব ভাই-বন্ধুকেও যেতে হবে। দাদুভাই সদাহাস্যে সম্মতি দিলেন। তখন সময়টা ছিল অন্য রকম। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ ছিল না। ছিল না মোবাইল ফোন। সমাজ-অভিভাবকরা সমাজ সুন্দর রাখার জন্য নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে উৎসাহ দিতেন। আমার বাড়ির লাগোয়া শতবর্ষী সিরাজদৌলা ক্লাব। ক্লাবের বড় ভাইয়েরা এগিয়ে এলেন শাখা উদ্বোধন আয়োজনে। খুব রমরমা একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল সেদিন। বছরখানেক আগে যুগান্তর অফিসে যখন দাদুভাইয়ের সঙ্গে গল্প হচ্ছিল, তখন তিনি সেই অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করলেন। আমি যদি ভুল না করি, তবে বলব এক দেড় বছরের মধ্যেই চাঁদেরহাট দেশের অন্যতম বড় শিশু-কিশোর সংগঠনে পরিণত হলো। এর পুরোটাই হয়েছিল দাদুভাইয়ের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে।

আরেকটি স্মৃতি উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করব। আমার ধারণা, এ দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে অমন আরেকটি উদাহরণ নেই। দাদুভাই ঠিক করলেন পূর্বদেশের ভেতরেই ট্যাবলয়েড আকারে চারপাতা চাঁদেরহাট সংবাদ বিশেষ সংখ্যা বেরোবে। এর পুরোটাই সম্পাদনা করব দাদুভাইয়ের চারপাশে ঘিরে থাকা আমরা। একটি পত্রিকার কাঠামো মতোই সবকিছু তৈরি হলো। সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, শিল্প সম্পাদক, প্রতিবেদক সব আমরা। দাদুভাই শুধু ছায়ার মতো আমাদের পাশে থাকবেন। আমাকে করা হলো নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধি।

আমি দু-তিনটি স্টোরি করলাম। একটি নারায়ণগঞ্জের চিলড্রেন্স পার্কের দুর্দশা নিয়ে, একটি শীতলক্ষ্যা নদীতে খেয়া পারাপারের এক খুদে মাঝির বৃত্তান্ত নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন। আরেকটি আমার স্কুল বন্ধুর অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে স্টোরি। আমাদের মধ্যে দারুণ উত্তেজনায় দিন কাটছে। পূর্বদেশ পত্রিকার ভেতর ছোটদের সম্পাদনা ও পরিচালনায় চাঁদেরহাট নামে আরেকটি পত্রিকা থাকবে। যথারীতি মেকআপের দিন অবজারভার ভবনে গেলাম। আমার বড়ভাই বন্ধুরা যারা অফিসে কাজ করছেন তারা মহাব্যস্ত। দাদুভাই চিরপরিচিত একগাল হেসে বললেন, শাহনাওয়াজ তো ফাটিয়ে দিয়েছো। আমার তিনটি প্রতিবেদনই প্রথম পৃষ্ঠায় যাচ্ছে। ব্যানার-হেডিং হয়েছে আমার চিলড্রেন্স পার্কের রিপোর্টটি। হেডলাইনটি করে দিয়েছেন দাদুভাই, ‘নামেই চিলড্রেন্স পার্ক, আসলে আগাছার মাঠ’। একপাশে নৌকার ছবিসহ মাঝি সুকুমারের সাক্ষাৎকার ‘আমরা যদি ডরাই ভাই তাইলে কাম করুম ক্যামনে’। আর নিচের দিকে ছাপা হলো ‘কারিগরের ছেলে আনোয়ার যন্ত্রবিজ্ঞানী হতে চায়’। যথারীতি সবক’টি হেডিংই দাদুভাইয়ের করা। সত্তরের দশকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছে এ সংবাদ বিশেষ সংখ্যার স্মৃতি বেশ উজ্জ্বল। আর এসব অভিনব আয়োজনের রূপকার ছিলেন দাদুভাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে, পেজ মেকআপের দিন দাদুভাই আমাকে বলেছিলেন, তোমার হাতে গল্প ভালো আসবে। তুমি গল্প লেখায় মন দাও। পরামর্শ শিরোধার্য ছিল। সত্তর ও আশির দশকের অনেকেই তাই শাহনাজ কালামকে গল্প লিখিয়ে হিসাবেই চেনে।

আজ দাদুভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একটি আক্ষেপ মনে চলে আসে। হয়তো সময় এবং সমাজ বাস্তবতার অনেকটা ভূমিকা রয়েছে কোনো কোনো স্খলনের। সত্তর ও আশির দশকে আমাদের শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশের চারণভূমি ছিল পত্রিকার ছোটদের পাতা আর এসব জনপ্রিয় পাতা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল শিশু-কিশোর সংগঠন; যা নতুন প্রজন্মকে নান্দনিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করত। আজ সবই ম্রিয়মাণ। কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর কোনো রকমে টিকে থাকলেও আগের ঔজ্জ্বল্য নেই। অনেক পত্রিকা ছোটদের পাতার জন্য সামান্য জায়গা দেয় বটে; কিন্তু সেখানে দাদুভাইদের মতো পরিকল্পনামাফিক ছোট পাঠকদের মেধা বিকাশের আয়োজন চোখে পড়ে না। আমার মনে হয়, পাতা সম্পাদকদের চেয়ে এ ক্ষেত্রে বড় দায় পত্রিকা পরিচালকদের। কারণ তারা এমন কোনো মহৎ মিশন নিয়ে নামতে পারছেন না। ছোটদের পাতায় প্রকাশিত লেখা দেখলেও মনে হয় না লেখক তৈরির কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, দাদুভাইদের মতো মেধাবী মানুষের অভাব বোধহয় সর্বত্রই প্রকট।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

চাঁদ আছে, চাঁদের হাটের দাদুভাই নেই

 সম্পাদকীয় 
১৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে অনন্য হিসাবে আলাদা করতে বললে আমি অবশ্যই রফিকুল হক দাদুভাইয়ের নামই বলব। একজন কিশোর হিসাবে আমাকে দাদুভাই সম্মোহিত করেছিলেন সেই ১৯৭৩ সালেই। এ সম্মোহনের মায়াজালে আবিষ্ট করে রেখেছিলেন অনন্তলোকে চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এখনো সেই সম্মোহনের ঘোর কাটেনি।

১৯৭২ সাল। সদ্য স্বাধীন দেশ। ভারতীয় দূতাবাস স্কুল ছাত্রছাত্রীদের জন্য রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আমি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হয়েছিলাম। আমার লেখালেখির প্রেরণা সেখান থেকেই। আমাদের বাড়িতে ইত্তেফাক পত্রিকা আসত তখন। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের কচিকাঁচার আসরের নিয়মিত পাঠক ছিলাম আমি। ১৯৭৩ সালে স্থানীয় পাঠাগারে পূর্বদেশ পত্রিকা পড়তে গিয়ে ছোটদের পাতা চাঁদেরহাটের সঙ্গে পরিচয় হলো। পাতাটি দ্রুত আমাকে আকৃষ্ট করল পাতার সম্পাদক দাদুভাইয়ের কারণে। দাদুভাইকে তখনো চাক্ষুষ করিনি। এর প্রয়োজনও ছিল না। চাঁদেরহাটের পাতাটি তিনি যেভাবে সাজিয়েছিলেন, তাতে পরতে পরতে জীবন্ত হয়ে গিয়েছিলেন দাদুভাই। মনে পড়ে ‘আমার কথা’ শিরোনামে বাঁ পাশের পৃষ্ঠার বাঁ দিকে তার ঝকঝকে বাঁকানো রাবিন্দ্রীক হাতের লেখায় তিনি তার কথা প্রকাশ করতেন। দমবন্ধ করে পাঠ করে ফেলতাম। মনে হতো আমাদের সামনে রেখে গল্প করে যাচ্ছেন দাদুভাই। আমাদের জন্য খুব কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি ছিল ‘প্রীতি নিও’। কী আদর জড়িয়ে ছোটদের চিঠির উত্তর দিতেন। দিতেন পথনির্দেশনা। নবীন লেখকদের লেখা প্রকাশিত হতো ‘আমাদের পাতায়’। আর ‘আমাদের জন্য পাতায়’ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা লিখতেন। সবকিছু মিলে একটি পারিবারিক আয়োজন যেন হয়ে গেল। চাঁদেরহাটের কারণে পূর্বদেশের প্রতি তৈরি হয়ে গেল একটি আকর্ষণ। মাকে রাজি করিয়ে বাড়িতে পূর্বদেশ রাখা নিশ্চিত করলাম। চাঁদেরহাট শিশু-কিশোরদের কাছে একটি পরিবারের প্রতীক হয়ে উঠছিল যেন! টানা দুমাস কয়েকটি ছড়া আর গল্প পাঠালাম পূর্বদেশের ঠিকানায় প্রিয় হয়ে ওঠা দাদুভাইয়ের বরাবর। প্রতি সপ্তাহে অধীর আগ্রহে ও কম্পিত বক্ষে চাঁদেরহাটের পাতা খুলি। তন্ন তন্ন করে খুঁজি, কিন্তু আমার লেখা ছাপা হয় না। প্রীতি নিও পর্বেও কোনো উত্তর নেই। হতাশা থেকে এক সময় অভিমান জমা হলো। অবশেষে তিন মাসের মাথায় ‘প্রীতি নিও’তে দুলাইনের একটি উত্তর ছাপা হলো। ওতেই আমি ধন্য। ভাবা যায়, দাদুভাই নিজে উত্তর লিখেছেন। সত্তরের দশকে অনেক লেখকই মূল নামের সঙ্গে ডাকনাম যুক্ত করতেন। আমিও তখন লেখার চেষ্টা করতাম শাহনাওয়াজ শাহীন নামে। পরে অবশ্য অন্য এক কারণে আমার লেখক নাম হয়ে গিয়েছিল ‘শাহনাজ কালাম’। সে প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর।

দাদুভাইয়ের দেওয়া উত্তর বারবার পড়ে মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। লিখেছিলেন, ‘তুমি বড় ভাবুক শাহীন, তাই ভাবনাগুলো অতিবেশি ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে চাও। এ নিয়ে হয়েছে মুশকিল। এক বৃহস্পতিবার বিকালে পূর্বদেশে চলে এসো, কথা হবে।’ মোহনীয় আকর্ষণ। কর গুনতে থাকি। আরও চারদিন পার করে তবে বৃহস্পতিবার! পরে দাদুভাই বলেছিলেন, তার নাকি মনে হয়েছিল আমি ভালো লিখতে পারব। তবে একটু পথ দেখাতে হবে।

বৃহস্পতিবার বিকালে টয়েনবী সার্কুলার রোডে অবজারভার ভবনে চলে এলাম। এ হাউস থেকেই বেরোত পূর্বদেশ। ধুকপুক করছে বুক। পূর্বদেশের অফিসে ঢুকেছি। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন দাদুভাইয়ের টেবিল। একজন মানুষকে ঘিরে আরও চার পাঁচজন কিশোর-তরুণ বসে আছে। আমি ভেবেছিলাম দাদুভাই যখন, তখন শ্মশ্রুমণ্ডিত প্রৌঢ় কেউ হবেন। দেখলাম ছিপছিপে গড়নের একজন মানুষ। মুখে দাড়ি নেই। বসে থাকলেও বুঝলাম বেশ লম্বা গড়নের আমাদের দাদুভাই। বয়স কত হবে! হয়তো পঞ্চাশের ঘরে।

পরিচয় দিতেই একগাল হেসে বললেন বন্দরের শাহীন! এক তরুণ পাশ থেকে একটি চেয়ার টেনে আনলেন। পরে জেনেছি সম্ভবত তিনি আলিমুজ্জামান হারু ভাই। সেসময় চমৎকার গল্প লিখতেন। দু’তিন মিনিটের মধ্যে আসর জমিয়ে ফেললেন দাদুভাই। বৃহস্পতিবার পেজ মেকআপের দিন। এক দিকে পেজ মেকআপ করছেন, অন্যদিকে গল্পও চালিয়ে যাচ্ছেন। দাদুভাইয়ের সম্মোহনী শক্তিতে মনে হলো না এখানে কেউ দূরের।

দাদুভাই লেখালেখির ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দিয়ে তাড়া দিলেন ফিরে যেতে। বললেন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তুমি নারায়ণগঞ্জ যাবে, তাই আর দেরি করো না। আমি বিদায় নিলাম। পরামর্শ মতো একটি ছড়া লিখে পাঠিয়ে দিলাম দাদুভাইয়ের ঠিকানায়। চাঁদেরহাটের পাতায় পরের সপ্তাহে ছাপা হয়ে গেল ছড়াটি।

দাদুভাইয়ের এমন এক আকর্ষণ ছিল! বৃহস্পতিবার এলেই মন ছুটে যেত অবজারভার ভবনে। শিল্প-সাহিত্য আড্ডায় যাওয়ার উদার অনুমোদন ছিল বাড়ি থেকে। মাঝে মাঝেই চলে যেতাম দাদুভাইয়ের মোহনীয় আড্ডায়। অবাক হয়ে দেখতাম দাদুভাই চাঁদেরহাটের পাতাকে যেন একটি পরিবার বানিয়ে ফেলেছিলেন। আড্ডাতেও এক আত্মার মানুষ বানিয়ে ফেলেছিলেন সবাইকে। ধীরে ধীরে আড্ডার সদস্য কিশোর-তরুণদের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। যাদের অনেকেই আজ যার যার জায়গা থেকে আলো ছড়াচ্ছেন। পরিচিতের তালিকায় যুক্ত হলেন আজকের যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম ভাই, কালেরকণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ভাই, অভিনয় শিল্পী-লেখক আফজাল হোসেন ভাই, সাংবাদিক-কবি হাসান হাফিজ ভাই-এমন অনেক উজ্জ্বল তারকা।

দাদুভাইকে অনুভব করার জন্য অনেক অনেক উজ্জ্বল স্মৃতি রয়েছে। এ পরিসরে তা বলা সম্ভব নয়। তবে সংগঠক দাদুভাইয়ের একটি পরিচয় আমাকে তুলে ধরতেই হবে। ১৯৭৩-এর শেষ বা ১৯৭৪-এর প্রথম দিক তখন। চাঁদেরহাটের পাতা তখন শিশু-কিশোরদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। সারা দেশের ছোটদের সঙ্গে যেন বিনিসুতোর মালাগাঁথা হয়ে গেছে। ‘প্রীতি নিও’ কলামে আবেগের ছড়াছড়ি। এমন এক বিকালে এখনকার শিল্পব্যাংকের উল্টো দিকে, অবজারভার ভবন থেকে কিছুটা দক্ষিণে একটি আইল্যান্ডের ঘাসে দাদুভাইকে নিয়ে আমরা আড্ডায় বসেছি। এক সময় দাদুভাই তার মনের কথা জানালেন। বললেন, চাঁদেরহাট নামে একটি শিশু-কিশোর সংগঠন করলে কেমন হয়! সবাইতো উৎসাহে লাফিয়ে উঠলাম। এভাবেই দাদুভাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে পা রাখল। ১৯৭৪-এ জন্ম নিল শিশু-কিশোর সংগঠন চাঁদেরহাট। এ সংগঠনের তিনটি স্লোগান তৈরি করে দিলেন দাদুভাই। ১. আমরা সূর্যের সাথী, ২. আমরা সুন্দর হবো এবং ৩. চাঁদেরহাট একটি মিষ্টি পরিবার। ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। প্রতি সপ্তাহে চাঁদেরহাটের পাতায় বেরোতে লাগল দেশজুড়ে চাঁদেরহাটের শাখা গঠনের খবর। কোথাও কোথাও উদ্বোধনের জন্য দাদুভাই তার দলবল নিয়ে ছুটছেন।

বন্ধুদের নিয়ে আমরাও ঠিক করলাম বন্দর শাখা খুলব। দাদুভাই সানন্দে সম্মতি দিলেন; কিন্তু আমার শর্ত ছিল উদ্বোধন করতে হবে দাদুভাইকে। সঙ্গে সব ভাই-বন্ধুকেও যেতে হবে। দাদুভাই সদাহাস্যে সম্মতি দিলেন। তখন সময়টা ছিল অন্য রকম। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ ছিল না। ছিল না মোবাইল ফোন। সমাজ-অভিভাবকরা সমাজ সুন্দর রাখার জন্য নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে উৎসাহ দিতেন। আমার বাড়ির লাগোয়া শতবর্ষী সিরাজদৌলা ক্লাব। ক্লাবের বড় ভাইয়েরা এগিয়ে এলেন শাখা উদ্বোধন আয়োজনে। খুব রমরমা একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল সেদিন। বছরখানেক আগে যুগান্তর অফিসে যখন দাদুভাইয়ের সঙ্গে গল্প হচ্ছিল, তখন তিনি সেই অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করলেন। আমি যদি ভুল না করি, তবে বলব এক দেড় বছরের মধ্যেই চাঁদেরহাট দেশের অন্যতম বড় শিশু-কিশোর সংগঠনে পরিণত হলো। এর পুরোটাই হয়েছিল দাদুভাইয়ের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে।

আরেকটি স্মৃতি উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করব। আমার ধারণা, এ দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে অমন আরেকটি উদাহরণ নেই। দাদুভাই ঠিক করলেন পূর্বদেশের ভেতরেই ট্যাবলয়েড আকারে চারপাতা চাঁদেরহাট সংবাদ বিশেষ সংখ্যা বেরোবে। এর পুরোটাই সম্পাদনা করব দাদুভাইয়ের চারপাশে ঘিরে থাকা আমরা। একটি পত্রিকার কাঠামো মতোই সবকিছু তৈরি হলো। সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, শিল্প সম্পাদক, প্রতিবেদক সব আমরা। দাদুভাই শুধু ছায়ার মতো আমাদের পাশে থাকবেন। আমাকে করা হলো নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধি।

আমি দু-তিনটি স্টোরি করলাম। একটি নারায়ণগঞ্জের চিলড্রেন্স পার্কের দুর্দশা নিয়ে, একটি শীতলক্ষ্যা নদীতে খেয়া পারাপারের এক খুদে মাঝির বৃত্তান্ত নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন। আরেকটি আমার স্কুল বন্ধুর অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে স্টোরি। আমাদের মধ্যে দারুণ উত্তেজনায় দিন কাটছে। পূর্বদেশ পত্রিকার ভেতর ছোটদের সম্পাদনা ও পরিচালনায় চাঁদেরহাট নামে আরেকটি পত্রিকা থাকবে। যথারীতি মেকআপের দিন অবজারভার ভবনে গেলাম। আমার বড়ভাই বন্ধুরা যারা অফিসে কাজ করছেন তারা মহাব্যস্ত। দাদুভাই চিরপরিচিত একগাল হেসে বললেন, শাহনাওয়াজ তো ফাটিয়ে দিয়েছো। আমার তিনটি প্রতিবেদনই প্রথম পৃষ্ঠায় যাচ্ছে। ব্যানার-হেডিং হয়েছে আমার চিলড্রেন্স পার্কের রিপোর্টটি। হেডলাইনটি করে দিয়েছেন দাদুভাই, ‘নামেই চিলড্রেন্স পার্ক, আসলে আগাছার মাঠ’। একপাশে নৌকার ছবিসহ মাঝি সুকুমারের সাক্ষাৎকার ‘আমরা যদি ডরাই ভাই তাইলে কাম করুম ক্যামনে’। আর নিচের দিকে ছাপা হলো ‘কারিগরের ছেলে আনোয়ার যন্ত্রবিজ্ঞানী হতে চায়’। যথারীতি সবক’টি হেডিংই দাদুভাইয়ের করা। সত্তরের দশকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছে এ সংবাদ বিশেষ সংখ্যার স্মৃতি বেশ উজ্জ্বল। আর এসব অভিনব আয়োজনের রূপকার ছিলেন দাদুভাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে, পেজ মেকআপের দিন দাদুভাই আমাকে বলেছিলেন, তোমার হাতে গল্প ভালো আসবে। তুমি গল্প লেখায় মন দাও। পরামর্শ শিরোধার্য ছিল। সত্তর ও আশির দশকের অনেকেই তাই শাহনাজ কালামকে গল্প লিখিয়ে হিসাবেই চেনে।

আজ দাদুভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একটি আক্ষেপ মনে চলে আসে। হয়তো সময় এবং সমাজ বাস্তবতার অনেকটা ভূমিকা রয়েছে কোনো কোনো স্খলনের। সত্তর ও আশির দশকে আমাদের শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশের চারণভূমি ছিল পত্রিকার ছোটদের পাতা আর এসব জনপ্রিয় পাতা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল শিশু-কিশোর সংগঠন; যা নতুন প্রজন্মকে নান্দনিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করত। আজ সবই ম্রিয়মাণ। কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর কোনো রকমে টিকে থাকলেও আগের ঔজ্জ্বল্য নেই। অনেক পত্রিকা ছোটদের পাতার জন্য সামান্য জায়গা দেয় বটে; কিন্তু সেখানে দাদুভাইদের মতো পরিকল্পনামাফিক ছোট পাঠকদের মেধা বিকাশের আয়োজন চোখে পড়ে না। আমার মনে হয়, পাতা সম্পাদকদের চেয়ে এ ক্ষেত্রে বড় দায় পত্রিকা পরিচালকদের। কারণ তারা এমন কোনো মহৎ মিশন নিয়ে নামতে পারছেন না। ছোটদের পাতায় প্রকাশিত লেখা দেখলেও মনে হয় না লেখক তৈরির কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, দাদুভাইদের মতো মেধাবী মানুষের অভাব বোধহয় সর্বত্রই প্রকট।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন