স্বীয় মহিমায় অমর হয়ে আছেন তিনি
jugantor
স্মরণ
স্বীয় মহিমায় অমর হয়ে আছেন তিনি

  সম্পাদকীয়  

১৯ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আলহাজ জহুরুল ইসলাম এমন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, যিনি শুধু একজন সফল শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীই নয়, বরং মানুষ হিসাবেও ছিলেন অনুকরণীয়। এ জগৎ-সংসারে প্রতিদিন কত মানুষের জন্ম হয়, আবার কত মানুষ প্রয়াত হন। এটাই জাগতিক নিয়ম। তবে এ জন্ম-মৃত্যুর মাঝে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও বহুকাল অমর হয়ে থাকেন তাদের কর্মে, সাফল্যে ও মানবহিতৈষী ভূমিকার জন্য। আলহাজ জহুরুল ইসলাম এ জনপদের তেমন একজন মানুষ ছিলেন। আজ তার ২৬তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। অনেকটা অপরিণত বয়সেই তার এ বিদায়। তবে স্বল্পসময়ের এ জীবনেই তিনি এমন কিছু কর্মের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, যে কারণে তিনি মরেও অমর হয়ে আছেন। এ দেশে তার কর্ম ও সাফল্যের অসংখ্য ঘটনার কারণেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনেকদিন। জহুরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলোয় অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে তার সম্পর্কে বিভিন্ন গুণীজনের মতামত ও মূল্যায়ন পড়েছি। তাদের মধ্যে দু’একজনের লেখা উদ্ধৃত করেই তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

এ মাটির একজন সফল রাজনীতিকের নাম তোফায়েল আহমেদ। তিনি জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধে তার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লিখেছেন-‘ব্যক্তিগত জীবনে জহুরুল ইসলাম ছিলেন আমার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকার দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-ভালোবাসায় আমার জীবন সিক্ত। জহুরুল ইসলামকে আমি ছাত্রজীবন থেকেই চিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জহুরুল ইসলামকে ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। বঙ্গবন্ধু যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি, কারাগারে বন্দি, ফাঁসির মঞ্চে দণ্ডায়মান-সেই কঠিন দুঃসময়ের দিনগুলোতে জহুরুল ইসলাম আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন’। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে যখন বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকতে শুরু করি, তখন দেখতাম জহুরুল ইসলাম প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে আসতেন। বঙ্গবন্ধু গভীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা নিয়ে তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কথা বলতেন।’ তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, ‘আমার দেখা মতে, বঙ্গবন্ধুর যখন অর্থের প্রয়োজন হতো, জহুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে তা দিয়ে যেতেন এবং বিষয়টি আমি চিরদিন মনে রাখব।’ তিনি জহুরুল ইসলামকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে ‘তার মতো এমন দূরদৃষ্টি, বেগবান এবং সক্রিয় শক্তিসম্পন্ন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা আমাদের সমাজে বিরল ও ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন একজন বিনয়ী পরমতসহিষ্ণু, সজ্জন ব্যক্তি’।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসে চাকরিতে ছিলেন বাঙালি কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ। যুদ্ধের মাঝামাঝিতে চাকরির মায়া ত্যাগ করে ঝুঁকি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। লন্ডনে তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন।

এ সময়ে বিচারপতি চৌধুরীর সঙ্গে যারা যুক্ত হয়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। চাকরি জীবনের শেষদিকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বছর পাঁচেক আগে জহুরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন, যা দেশের একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মহিউদ্দিন আহমেদ তার নিবন্ধে জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তথ্যটি ছিল এরকম, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জহুরুল ইসলাম প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা ছেড়ে লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। লন্ডনে তিনি বিচারপতি চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার হাতে পাঁচ হাজার পাউন্ড তুলে দেন। সেদিনের পাঁচ হাজার পাউন্ড দেওয়ার মতো এত বড় মাপের মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বিচারপতি চৌধুরী এ অর্থদাতার নাম তখন প্রকাশ করেননি। মহিউদ্দিন সাহেবকে এ পাঁচ হাজার পাউন্ড ‘সুবিদ আলীর’ নামে জমা করার জন্য বলেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এ সুবিদ আলী হচ্ছেন জহুরুল ইসলাম।

মহিউদ্দিন সাহেব কোনো কিছু গোপন না করে স্পষ্ট করে লিখেছেন ‘এই পাঁচ হাজার পাউন্ডের ওপর ভরসা করেই লন্ডনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন খোলা হয়।’ জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য আছে, যা আজকের দিনে অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। এ দেশে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন অনেকেই; কিন্তু পাকিস্তানি জমানায় বাঙালি কোটিপতির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে, অসংখ্য বাঙালি যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এ দেশের রাজনীতিবিদদের সংসার নির্বাহে অর্থের জোগান দিতেন; কিন্তু কখনো প্রকাশ করতেন না। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক দলকে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানসহ নানাভাবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব অতিশয় নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে পালন করে গেছেন।

জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি তার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে একটি উন্নতমানের মেডিকেল কলেজ, একটি নার্সিং কলেজ ও পাঁচশ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শুধু নয়, আশপাশের জেলাগুলো থেকে প্রচুর মানুষ এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন; যা অনেকের পক্ষেই রাজধানীতে এসে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তার প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজ থেকে দেশি-বিদেশি বহু ছাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।

জহুরুল ইসলামকে এ দেশে হাউসিং ব্যবসার জনক বলা হয়। রাজধানী শহরসহ দেশের বড় বড় শহরে তার সৃষ্টি ইস্টার্ন হাউসিংয়ের অসংখ্য স্থাপনা চোখে পড়ে। তিনি মহানগরীতে আফতাবনগর, মহানগর, নিকেতন, বনশ্রীসহ নানা হাউসিং প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গড়ে তুলেছেন পোলট্রি শিল্প, ওষুধ শিল্পসহ নানা প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, তিনি তার উপার্জিত অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করেছেন দেশের মানুষের কল্যাণে। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি নিজ জেলার ১৩ উপজেলার নানা স্থানে লঙ্গরখানা খুলে লাখ লাখ অসহায় মানুষের মুখে আহার তুলে দিয়েছেন। এ লঙ্গরখানা চালু রাখতে ব্যাংক থেকে তাকে ঋণ নিতে হয়েছিল বলেও জানা যায়।

২৬তম প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে নিঃসংকোচে এ কথা বলা যায়, সমাজের অবহেলিত মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে তিনি বাস্তব রূপ দিয়ে গেছেন। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

মো. জিল্লুর রহমান : চেয়ারম্যান, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ

স্মরণ

স্বীয় মহিমায় অমর হয়ে আছেন তিনি

 সম্পাদকীয় 
১৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আলহাজ জহুরুল ইসলাম এমন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, যিনি শুধু একজন সফল শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীই নয়, বরং মানুষ হিসাবেও ছিলেন অনুকরণীয়। এ জগৎ-সংসারে প্রতিদিন কত মানুষের জন্ম হয়, আবার কত মানুষ প্রয়াত হন। এটাই জাগতিক নিয়ম। তবে এ জন্ম-মৃত্যুর মাঝে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও বহুকাল অমর হয়ে থাকেন তাদের কর্মে, সাফল্যে ও মানবহিতৈষী ভূমিকার জন্য। আলহাজ জহুরুল ইসলাম এ জনপদের তেমন একজন মানুষ ছিলেন। আজ তার ২৬তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। অনেকটা অপরিণত বয়সেই তার এ বিদায়। তবে স্বল্পসময়ের এ জীবনেই তিনি এমন কিছু কর্মের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, যে কারণে তিনি মরেও অমর হয়ে আছেন। এ দেশে তার কর্ম ও সাফল্যের অসংখ্য ঘটনার কারণেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনেকদিন। জহুরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলোয় অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে তার সম্পর্কে বিভিন্ন গুণীজনের মতামত ও মূল্যায়ন পড়েছি। তাদের মধ্যে দু’একজনের লেখা উদ্ধৃত করেই তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

এ মাটির একজন সফল রাজনীতিকের নাম তোফায়েল আহমেদ। তিনি জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধে তার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লিখেছেন-‘ব্যক্তিগত জীবনে জহুরুল ইসলাম ছিলেন আমার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকার দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-ভালোবাসায় আমার জীবন সিক্ত। জহুরুল ইসলামকে আমি ছাত্রজীবন থেকেই চিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জহুরুল ইসলামকে ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। বঙ্গবন্ধু যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি, কারাগারে বন্দি, ফাঁসির মঞ্চে দণ্ডায়মান-সেই কঠিন দুঃসময়ের দিনগুলোতে জহুরুল ইসলাম আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন’। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে যখন বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকতে শুরু করি, তখন দেখতাম জহুরুল ইসলাম প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে আসতেন। বঙ্গবন্ধু গভীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা নিয়ে তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কথা বলতেন।’ তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, ‘আমার দেখা মতে, বঙ্গবন্ধুর যখন অর্থের প্রয়োজন হতো, জহুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে তা দিয়ে যেতেন এবং বিষয়টি আমি চিরদিন মনে রাখব।’ তিনি জহুরুল ইসলামকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে ‘তার মতো এমন দূরদৃষ্টি, বেগবান এবং সক্রিয় শক্তিসম্পন্ন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা আমাদের সমাজে বিরল ও ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন একজন বিনয়ী পরমতসহিষ্ণু, সজ্জন ব্যক্তি’।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসে চাকরিতে ছিলেন বাঙালি কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ। যুদ্ধের মাঝামাঝিতে চাকরির মায়া ত্যাগ করে ঝুঁকি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। লন্ডনে তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন।

এ সময়ে বিচারপতি চৌধুরীর সঙ্গে যারা যুক্ত হয়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। চাকরি জীবনের শেষদিকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বছর পাঁচেক আগে জহুরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন, যা দেশের একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মহিউদ্দিন আহমেদ তার নিবন্ধে জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তথ্যটি ছিল এরকম, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জহুরুল ইসলাম প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা ছেড়ে লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। লন্ডনে তিনি বিচারপতি চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার হাতে পাঁচ হাজার পাউন্ড তুলে দেন। সেদিনের পাঁচ হাজার পাউন্ড দেওয়ার মতো এত বড় মাপের মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বিচারপতি চৌধুরী এ অর্থদাতার নাম তখন প্রকাশ করেননি। মহিউদ্দিন সাহেবকে এ পাঁচ হাজার পাউন্ড ‘সুবিদ আলীর’ নামে জমা করার জন্য বলেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এ সুবিদ আলী হচ্ছেন জহুরুল ইসলাম।

মহিউদ্দিন সাহেব কোনো কিছু গোপন না করে স্পষ্ট করে লিখেছেন ‘এই পাঁচ হাজার পাউন্ডের ওপর ভরসা করেই লন্ডনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন খোলা হয়।’ জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য আছে, যা আজকের দিনে অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। এ দেশে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন অনেকেই; কিন্তু পাকিস্তানি জমানায় বাঙালি কোটিপতির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে, অসংখ্য বাঙালি যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এ দেশের রাজনীতিবিদদের সংসার নির্বাহে অর্থের জোগান দিতেন; কিন্তু কখনো প্রকাশ করতেন না। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক দলকে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানসহ নানাভাবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব অতিশয় নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে পালন করে গেছেন।

জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি তার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে একটি উন্নতমানের মেডিকেল কলেজ, একটি নার্সিং কলেজ ও পাঁচশ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শুধু নয়, আশপাশের জেলাগুলো থেকে প্রচুর মানুষ এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন; যা অনেকের পক্ষেই রাজধানীতে এসে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তার প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজ থেকে দেশি-বিদেশি বহু ছাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।

জহুরুল ইসলামকে এ দেশে হাউসিং ব্যবসার জনক বলা হয়। রাজধানী শহরসহ দেশের বড় বড় শহরে তার সৃষ্টি ইস্টার্ন হাউসিংয়ের অসংখ্য স্থাপনা চোখে পড়ে। তিনি মহানগরীতে আফতাবনগর, মহানগর, নিকেতন, বনশ্রীসহ নানা হাউসিং প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গড়ে তুলেছেন পোলট্রি শিল্প, ওষুধ শিল্পসহ নানা প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, তিনি তার উপার্জিত অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করেছেন দেশের মানুষের কল্যাণে। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি নিজ জেলার ১৩ উপজেলার নানা স্থানে লঙ্গরখানা খুলে লাখ লাখ অসহায় মানুষের মুখে আহার তুলে দিয়েছেন। এ লঙ্গরখানা চালু রাখতে ব্যাংক থেকে তাকে ঋণ নিতে হয়েছিল বলেও জানা যায়।

২৬তম প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে নিঃসংকোচে এ কথা বলা যায়, সমাজের অবহেলিত মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে তিনি বাস্তব রূপ দিয়ে গেছেন। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

মো. জিল্লুর রহমান : চেয়ারম্যান, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন