এসএসসির ফলাফল ও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ
jugantor
খোলা জানালা
এসএসসির ফলাফল ও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ

  তারেক শামসুর রেহমান  

১২ মে ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এসএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ৬ মে। এবারে ৮টি সাধারণ বোর্ডের পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৪৫ জন। মাদ্রাসা বোর্ড আর কারিগরি বোর্ডের পাসের হার যথাক্রমে ৭০.৮৯ ও ৭১.৯৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৩৭১ ও ৪ হাজার ৪১৩। এ পাসের হারে ও জিপিএ বৃদ্ধিতে আনন্দিত ছোট ছোট বাচ্চারা।

রোববার ফেসবুকে দেখেছি তাদের ছবি- কার মেয়ে, কার ভাই জিপিএ-৫ পেয়েছে- ফেসবুকে এসবেরই ছড়াছড়ি। দোয়া চেয়েছে সবাই ফেসবুকে- এটাই স্বভাবিক। আর শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিলেন পরীক্ষার খাতা ভালোভাবে দেখা হয়েছে! তাই তার প্রভাব ফলাফলে পড়েছে।

পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ফলাফলে আদৌ প্রভাব ফেলেছে কিনা, এ সম্পর্কে অবশ্যি শিক্ষামন্ত্রী কিছুই বলেননি। তিনি বোধকরি এটাকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখেছেন! যারা ভালো ফলাফল করেছে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও যে প্রশ্নটি আমাকে ভাবিত করে, তা হচ্ছে এ জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা আগামী দু’বছর পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছবে, ওদের মাঝে কতজন তখন জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হতে পারবে? অভিজ্ঞতা তো আমাদের ভালো নয়।

দুই.

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার একদিন আগে একটি জনপ্রিয় দৈনিকে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে সংখ্যাগত উন্নয়ন হলেও, গুণগত উন্নতি হয়নি (বণিক বার্তা, ৫ মে)। প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে শিক্ষার মানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার মানের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় বৈশ্বিকভাবে ভারতের অবস্থান ২৭।

শ্রীলংকার অবস্থান ৩৮, পাকিস্তানের ৬৬, আর নেপালের অবস্থান ৭০তম। এর অর্থ শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা নেপালের নিচে অবস্থান করছি! অথচ নেপালি ছেলে-মেয়েরা কিনা বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে! তাদের মান আমাদের চেয়েও বেশি! আমি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্টকে হালকাভাবে নিতে চাই না। এই রিপোর্ট পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, সে কথাটাও আমি বলব না। এই রিপোর্টের ভিত্তি আছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তা শিকারও করি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দি হিউম্যান ক্যাপিটাল রিপোর্ট-২০১৭’ এ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে জনবহুল দেশটিতে পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ বেকার থাকে। দেশটির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও নিুমানের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত বিষয়ের সংখ্যা খুবই কম। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যাল পর্যায়ে পড়াই, এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করতে পারি না।

তিন.

আমরা মানি, আর নাই মানি আমরা এদেশে জিপিএ-৫ মার্কা একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও উচ্ছ্বসিত হন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বেড়েছে দাবি করে! কিন্তু শিক্ষার মান তো আদৌ বাড়েনি। এটা সত্য দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি আর বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন অনেক। মানুষ বেড়েছে। এদের উচ্চশিক্ষা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। সরকার তাই একের পর এক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি প্রধানমন্ত্রী কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে কখনই করা হয় না- তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না।

প্রতিষ্ঠানের হয়তো প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা। ভালো শিক্ষক আমরা তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যর্থতা একজন শিক্ষক হিসেবে আমারও। যারা টেক্সাসে এসেছেন, তারা দেখবেন ডালাস, অস্ট্রিন বা হিউস্টনে প্রচুর ভারতীয় বাস করেন। এরা কিন্তু সবাই অভিবাসীর সন্তান নন। এরা সরাসরি রিক্রুট হয়েই এদেশে এসেছেন। ভারত তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করেছে, যুুগোপযোগী করেছে। বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আইটি সেক্টরে প্রতি বছর ভারত যত গ্রাজুয়েট তৈরি করে, তা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরও বিদেশে এই দক্ষ জনশক্তি ‘রফতানি’ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞরা একটি বড় স্থান দখল করে আছেন। এরা সরাসরি ভারত থেকেই রিক্রুট হয়ে আসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চাচ্ছেন বটে। কিন্তু আইটি ফার্মগুলোর চাহিদা এত বেশি যে এটা বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে না। ইউরোপে আইটি জগতে জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করছে ভারতীয় ও চীনা ছাত্ররা। আমাদের এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম রয়েছে।

এই তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও এদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে দিতে পারি। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট নীতি। এই নীতিটি প্রণয়ন করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু আমরা তা পারিনি। নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে যেসব বিষয় চালু করা হয়েছে, তার আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এতে করে বরং শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়ছে।

আমি অবাক হয়ে যাই যখন দেখি নতুন নতুন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু ‘দলীয় ও ব্যক্তিগত’ স্বার্থ রক্ষায় এমন সব বিষয় চালু করা হয়েছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল শুধু প্রান্তিক জনপদকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে। গোপালগঞ্জ কিংবা পাবনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ লক্ষেই। কিন্তু সেখানে সাধারণ বিষয় চালু করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু যারা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান, তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের খাতিরে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে চলেছে।

আমি অবাক হয়ে যাই এটা দেখে যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সাধারণ বিষয় চালু করার অনুমতিও দিয়েছে। দেশের বড় বড় যে ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে সাধারণ বিষয় রয়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয় চালু করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের অভ্যন্তরীণ মার্কেটের জন্য সাধারণ বিষয়ে পাস করা গ্রাজুয়েটরা চাহিদা মেটাতে সম্ভব।

নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় চালু করে আমরা শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়াচ্ছি মাত্র। রাষ্ট্র তো এত বিপুল সংখ্যক সাধারণ গ্রাজুয়েটদের চাকরি দিতে পারবে না। আর বেসরকারি পর্যায়ে দরকার বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত গ্রাজুয়েট।

প্রয়োজন আইটি সেক্টরের গ্রাজুয়েট। আমরা তা পারছি না। আমাদের শিক্ষানীতির দুর্বলতা এখানেই। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি নামে একটি কমিটি আছে। এই কমিটির সঙ্গে মাঝে মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী মিটিং করেন। তারা তাকে কী পরামর্শ দেন জানি না। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। আসলে দলীয় লোকদের নিয়ে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করলে, তা দিয়ে তেমন কোনো ‘ফল’ আশা করা যায় না। এরা তো শিক্ষামন্ত্রীর তোষামোদ করেই ব্যস্ত! নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত! শিক্ষামন্ত্রীকে তোষামোদেই ব্যস্ত! নিজেদের আগের গোছাতে ব্যস্ত। শিক্ষামন্ত্রীকে সঠিক পরামর্শ দেয়ার ইচ্ছে তাদের কৈ?

চার.

দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আর দক্ষ জনশক্তি দরকার এ কারণে যে আমাদের এর মধ্যে প্রথম ধাপে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে।

২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যায়েও আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব। আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব শর্ত পূরণে সক্ষম হব। ফলে অনেক সুবিধা আমরা হারাব। আমাদের বিশ্ববাজার ধরে রাখতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ, আইটিনির্ভর ব্যবসা, কৃষি ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য দরকার হবে দক্ষ জনশক্তি। এ দক্ষ জনশক্তি আমরা গড়ে তুলতে পারব কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা আমাদের তৈরি করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেই এগিয়ে আসতে হবে।

এক্ষেত্রে অনেক বিষয় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে একটি শক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে দক্ষ জনশক্তি আমরা তৈরি করতে পারব। এ জন্য দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক আমাদের দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যরা বাদ পড়ছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অর্থ। টিআইবি তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে! দুদক টিআইবির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে পারে। কিন্তু দুদক তা করেনি। ফলে এই প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা জানেন বিষয়টি। এই প্রবণতা যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে আমরা বিশাল জনগোষ্ঠীকে কখনই দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। এজন্য আমার আবারও সুপারিশ শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মঞ্জুরি কমিশনের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। অথবা পিএসসির মডেলে শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করতে হবে। এটা খুবই জরুরি।

সরকারি কলেজের শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা হবেন না কেন? এক সময় এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না, এটা সত্যি। কিন্তু তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক, প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭টি। নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ও হতে যাচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন যখন জড়িত, তখন প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষকের। ব্যক্তি পরিচয়, সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড হতে পারে না।

দুই.

বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বিবিএ আর এমবিএ’র ‘মাকাল ফল’ আমাদের উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব বিবিএ গ্রাজুয়েটের নামে শিক্ষিত কেরানি তৈরি করছি! ‘স্যুটেড-ব্যুটেড’ হয়ে এসব অর্ধশিক্ষিত তরুণরা কোনোক্রমে বাবার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একখানা বিবিএর সার্টিফিকেট নিচ্ছেন! বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিকসহ) একাধিক নামের এমবিএ কোর্স আছে। যিনি কোনোদিন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তিনি অর্থের বিনিময়ে আবার ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সার্টিফিকেট কিনছেন!

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে যেসব শিক্ষার চাহিদা রয়েছে (আইটির বিভিন্ন শাখা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, কৃষি ইত্যাদি), সেসব বিষয় চালু করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করারও প্রস্তাব করছি।

তিন.

আমাদের অনেক সিনিয়র শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পরও ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী থাকেন। তাদের স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে। বিশেষ করে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝেমধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট আর পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটের মান এক নয়। ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার মানের উন্নতি করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

চার.

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো ভেঙে সাতটি বিভাগে সাতটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিভাগে অন্তর্ভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে সিলেবাস প্রণয়ন করবেন। নিজেরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোতে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। পাঁচ. মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় এখানে নিয়োগ হচ্ছে। ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন সরকারের তোষামোদে। পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লিখে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ আদায় করছেন।

পাঁচ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়েও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা তখন একশ’ অতিক্রম করেছে। এটা ভালো কী মন্দ, আমি সেই বিতর্কে যাব না। এরা জনশক্তি গড়তে একটা ভূমিকা রাখছে, এটা অস্বীকার করি না। তবে এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ। দরকার আধুনিক উপযোগী বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন।

ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অনুচিত। এক্রিডিটেশন কাউন্সিল নিজেদের স্বার্থেই করা দরকার। প্রয়োজন ভালো ও সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ। সেই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলাদা একটি ইউজিসি টাইপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। একুশ শতকে আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের জন্য একটা বড় সংকট তৈরি করবে আগামী দিনে।

(ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র)

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য

খোলা জানালা

এসএসসির ফলাফল ও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ

 তারেক শামসুর রেহমান 
১২ মে ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এসএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ৬ মে। এবারে ৮টি সাধারণ বোর্ডের পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৪৫ জন। মাদ্রাসা বোর্ড আর কারিগরি বোর্ডের পাসের হার যথাক্রমে ৭০.৮৯ ও ৭১.৯৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৩৭১ ও ৪ হাজার ৪১৩। এ পাসের হারে ও জিপিএ বৃদ্ধিতে আনন্দিত ছোট ছোট বাচ্চারা।

রোববার ফেসবুকে দেখেছি তাদের ছবি- কার মেয়ে, কার ভাই জিপিএ-৫ পেয়েছে- ফেসবুকে এসবেরই ছড়াছড়ি। দোয়া চেয়েছে সবাই ফেসবুকে- এটাই স্বভাবিক। আর শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিলেন পরীক্ষার খাতা ভালোভাবে দেখা হয়েছে! তাই তার প্রভাব ফলাফলে পড়েছে।

পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ফলাফলে আদৌ প্রভাব ফেলেছে কিনা, এ সম্পর্কে অবশ্যি শিক্ষামন্ত্রী কিছুই বলেননি। তিনি বোধকরি এটাকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখেছেন! যারা ভালো ফলাফল করেছে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও যে প্রশ্নটি আমাকে ভাবিত করে, তা হচ্ছে এ জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা আগামী দু’বছর পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছবে, ওদের মাঝে কতজন তখন জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হতে পারবে? অভিজ্ঞতা তো আমাদের ভালো নয়।

দুই.

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার একদিন আগে একটি জনপ্রিয় দৈনিকে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে সংখ্যাগত উন্নয়ন হলেও, গুণগত উন্নতি হয়নি (বণিক বার্তা, ৫ মে)। প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে শিক্ষার মানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার মানের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় বৈশ্বিকভাবে ভারতের অবস্থান ২৭।

শ্রীলংকার অবস্থান ৩৮, পাকিস্তানের ৬৬, আর নেপালের অবস্থান ৭০তম। এর অর্থ শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা নেপালের নিচে অবস্থান করছি! অথচ নেপালি ছেলে-মেয়েরা কিনা বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে! তাদের মান আমাদের চেয়েও বেশি! আমি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্টকে হালকাভাবে নিতে চাই না। এই রিপোর্ট পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, সে কথাটাও আমি বলব না। এই রিপোর্টের ভিত্তি আছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তা শিকারও করি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দি হিউম্যান ক্যাপিটাল রিপোর্ট-২০১৭’ এ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে জনবহুল দেশটিতে পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ বেকার থাকে। দেশটির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও নিুমানের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত বিষয়ের সংখ্যা খুবই কম। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যাল পর্যায়ে পড়াই, এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করতে পারি না।

তিন.

আমরা মানি, আর নাই মানি আমরা এদেশে জিপিএ-৫ মার্কা একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও উচ্ছ্বসিত হন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বেড়েছে দাবি করে! কিন্তু শিক্ষার মান তো আদৌ বাড়েনি। এটা সত্য দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি আর বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন অনেক। মানুষ বেড়েছে। এদের উচ্চশিক্ষা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। সরকার তাই একের পর এক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি প্রধানমন্ত্রী কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে কখনই করা হয় না- তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না।

প্রতিষ্ঠানের হয়তো প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা। ভালো শিক্ষক আমরা তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যর্থতা একজন শিক্ষক হিসেবে আমারও। যারা টেক্সাসে এসেছেন, তারা দেখবেন ডালাস, অস্ট্রিন বা হিউস্টনে প্রচুর ভারতীয় বাস করেন। এরা কিন্তু সবাই অভিবাসীর সন্তান নন। এরা সরাসরি রিক্রুট হয়েই এদেশে এসেছেন। ভারত তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করেছে, যুুগোপযোগী করেছে। বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আইটি সেক্টরে প্রতি বছর ভারত যত গ্রাজুয়েট তৈরি করে, তা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরও বিদেশে এই দক্ষ জনশক্তি ‘রফতানি’ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞরা একটি বড় স্থান দখল করে আছেন। এরা সরাসরি ভারত থেকেই রিক্রুট হয়ে আসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চাচ্ছেন বটে। কিন্তু আইটি ফার্মগুলোর চাহিদা এত বেশি যে এটা বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে না। ইউরোপে আইটি জগতে জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করছে ভারতীয় ও চীনা ছাত্ররা। আমাদের এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম রয়েছে।

এই তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও এদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে দিতে পারি। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট নীতি। এই নীতিটি প্রণয়ন করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু আমরা তা পারিনি। নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে যেসব বিষয় চালু করা হয়েছে, তার আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এতে করে বরং শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়ছে।

আমি অবাক হয়ে যাই যখন দেখি নতুন নতুন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু ‘দলীয় ও ব্যক্তিগত’ স্বার্থ রক্ষায় এমন সব বিষয় চালু করা হয়েছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল শুধু প্রান্তিক জনপদকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে। গোপালগঞ্জ কিংবা পাবনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ লক্ষেই। কিন্তু সেখানে সাধারণ বিষয় চালু করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু যারা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান, তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের খাতিরে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে চলেছে।

আমি অবাক হয়ে যাই এটা দেখে যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সাধারণ বিষয় চালু করার অনুমতিও দিয়েছে। দেশের বড় বড় যে ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে সাধারণ বিষয় রয়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয় চালু করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের অভ্যন্তরীণ মার্কেটের জন্য সাধারণ বিষয়ে পাস করা গ্রাজুয়েটরা চাহিদা মেটাতে সম্ভব।

নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় চালু করে আমরা শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়াচ্ছি মাত্র। রাষ্ট্র তো এত বিপুল সংখ্যক সাধারণ গ্রাজুয়েটদের চাকরি দিতে পারবে না। আর বেসরকারি পর্যায়ে দরকার বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত গ্রাজুয়েট।

প্রয়োজন আইটি সেক্টরের গ্রাজুয়েট। আমরা তা পারছি না। আমাদের শিক্ষানীতির দুর্বলতা এখানেই। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি নামে একটি কমিটি আছে। এই কমিটির সঙ্গে মাঝে মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী মিটিং করেন। তারা তাকে কী পরামর্শ দেন জানি না। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। আসলে দলীয় লোকদের নিয়ে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করলে, তা দিয়ে তেমন কোনো ‘ফল’ আশা করা যায় না। এরা তো শিক্ষামন্ত্রীর তোষামোদ করেই ব্যস্ত! নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত! শিক্ষামন্ত্রীকে তোষামোদেই ব্যস্ত! নিজেদের আগের গোছাতে ব্যস্ত। শিক্ষামন্ত্রীকে সঠিক পরামর্শ দেয়ার ইচ্ছে তাদের কৈ?

চার.

দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আর দক্ষ জনশক্তি দরকার এ কারণে যে আমাদের এর মধ্যে প্রথম ধাপে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে।

২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যায়েও আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব। আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব শর্ত পূরণে সক্ষম হব। ফলে অনেক সুবিধা আমরা হারাব। আমাদের বিশ্ববাজার ধরে রাখতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ, আইটিনির্ভর ব্যবসা, কৃষি ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য দরকার হবে দক্ষ জনশক্তি। এ দক্ষ জনশক্তি আমরা গড়ে তুলতে পারব কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা আমাদের তৈরি করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেই এগিয়ে আসতে হবে।

এক্ষেত্রে অনেক বিষয় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে একটি শক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে দক্ষ জনশক্তি আমরা তৈরি করতে পারব। এ জন্য দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক আমাদের দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যরা বাদ পড়ছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অর্থ। টিআইবি তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে! দুদক টিআইবির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে পারে। কিন্তু দুদক তা করেনি। ফলে এই প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা জানেন বিষয়টি। এই প্রবণতা যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে আমরা বিশাল জনগোষ্ঠীকে কখনই দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। এজন্য আমার আবারও সুপারিশ শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মঞ্জুরি কমিশনের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। অথবা পিএসসির মডেলে শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করতে হবে। এটা খুবই জরুরি।

সরকারি কলেজের শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা হবেন না কেন? এক সময় এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না, এটা সত্যি। কিন্তু তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক, প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭টি। নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ও হতে যাচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন যখন জড়িত, তখন প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষকের। ব্যক্তি পরিচয়, সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড হতে পারে না।

দুই.

বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বিবিএ আর এমবিএ’র ‘মাকাল ফল’ আমাদের উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব বিবিএ গ্রাজুয়েটের নামে শিক্ষিত কেরানি তৈরি করছি! ‘স্যুটেড-ব্যুটেড’ হয়ে এসব অর্ধশিক্ষিত তরুণরা কোনোক্রমে বাবার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একখানা বিবিএর সার্টিফিকেট নিচ্ছেন! বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিকসহ) একাধিক নামের এমবিএ কোর্স আছে। যিনি কোনোদিন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তিনি অর্থের বিনিময়ে আবার ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সার্টিফিকেট কিনছেন!

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে যেসব শিক্ষার চাহিদা রয়েছে (আইটির বিভিন্ন শাখা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, কৃষি ইত্যাদি), সেসব বিষয় চালু করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করারও প্রস্তাব করছি।

তিন.

আমাদের অনেক সিনিয়র শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পরও ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী থাকেন। তাদের স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে। বিশেষ করে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝেমধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট আর পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটের মান এক নয়। ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার মানের উন্নতি করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

চার.

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো ভেঙে সাতটি বিভাগে সাতটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিভাগে অন্তর্ভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে সিলেবাস প্রণয়ন করবেন। নিজেরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোতে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। পাঁচ. মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় এখানে নিয়োগ হচ্ছে। ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন সরকারের তোষামোদে। পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লিখে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ আদায় করছেন।

পাঁচ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়েও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা তখন একশ’ অতিক্রম করেছে। এটা ভালো কী মন্দ, আমি সেই বিতর্কে যাব না। এরা জনশক্তি গড়তে একটা ভূমিকা রাখছে, এটা অস্বীকার করি না। তবে এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ। দরকার আধুনিক উপযোগী বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন।

ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অনুচিত। এক্রিডিটেশন কাউন্সিল নিজেদের স্বার্থেই করা দরকার। প্রয়োজন ভালো ও সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ। সেই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলাদা একটি ইউজিসি টাইপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। একুশ শতকে আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের জন্য একটা বড় সংকট তৈরি করবে আগামী দিনে।

(ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র)

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য