সম্প্রীতিতে পূর্ণ হোক ধরা
jugantor
সম্প্রীতিতে পূর্ণ হোক ধরা

  ড. সুকোমল বড়ুয়া  

২০ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। এটি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব; শারদীয় উৎসব। এটি শুধু বাংলাদেশি বৌদ্ধদের জন্য নয়, বিশ্বের সব বৌদ্ধরা এ শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায়, ভাবগাম্ভীর্যে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করে থাকে। তবে এবারের প্রবারণা উৎসবটি বাংলাদেশের বৌদ্ধদের জন্য বেদনা এনে দিয়েছে ওই রামু-উখিয়া-পটিয়ার ঘটনার মতো।

নানা গোত্রের, নানা ধর্মের মানুষের আবাসভূমি হচ্ছে আমাদের এ বাংলাদেশ। এ যেন আমাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি। এই তো শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হতে না হতেই আজ আবার বৌদ্ধদের শারদীয় উৎসব প্রবারণা উদযাপিত হচ্ছে শিশিরভেজা গ্রামবাংলার নগর-প্রান্তর বৌদ্ধ জনপদকে মুখরিত করে। আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার ও জনপদ। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির এ ধারা আমাদের ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, জাতি-গোষ্ঠী সবার জন্য আনন্দের ও গর্বের। এটি আমাদের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও বহন করে। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর তাণ্ডবলীলা আমাদের ব্যথিত করে।

অতীত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সমতা, ত্যাগ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতিবোধ, উদার বিশ্বাস ও মানসিকতা; সর্বোপরি স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশচিন্তা আমাদের জাতীয় উন্নয়ন-সমৃদ্ধির বিকাশ এবং জাতীয় মানস গঠনে অসম্ভব সহায়তা দান করে। আজকের গ্লোবাল ভিলেজের ConceptI তাই। বৌদ্ধ প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান। এর আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষু জীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়। শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে সাহায্য করে। বহুমাত্রিকতাপূর্ণ এ ধর্মীয় উৎসব আচার-অনুষ্ঠান তো বটেই, এ ছাড়া আত্মশাসন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসমর্পণের মতো জীবনবোধ-সংবেদ তৈরি করতে যথেষ্ট সহায়তা দান করে। বিশেষ করে আত্মদর্শনের জন্য এটি খুবই কার্যকরী হয়। বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে নানা ধরনের পাপকর্ম ও অশুভ চিন্তা থেকে মুক্ত থাকা যায়। সুন্দর জীবন তৈরির জন্য সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সাধনা ও ব্রতাচরণকে আহ্বান জানানো হয়। শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞাসাধনার পাশাপাশি সংযম, ত্যাগ প্রভৃতি ব্রতানুশীলনের মাধ্যমে প্রবারণার শিক্ষা সত্য, সুন্দর মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আমাদের উদ্দীপনা জোগায়। এজন্যই বৌদ্ধ প্রবারণার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে এবং আধ্যাত্মিক গুণাবলি অর্জনে অপরিসীম বলে বিবেচিত হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মীয় মতে, বৌদ্ধভিক্ষু-শ্রমণ ও উপাসক-উপাসিকা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা-এ তিন মাস শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনার ব্রত অধিষ্ঠান নেয়। তিন মাসের অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা এবং সার্বক্ষণিক ধ্যানচিন্তা, উপবাস, সংযম প্রভৃতি অভ্যাসের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ মানবসত্তা প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত গ্রহণ করে। ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের শেষ দিবসটিকে বলা হয় ‘প্রবারণা’। এটি মুসলিম বিশ্বের পবিত্র ঈদুল ফিতরের মতো। অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে ও ধর্মীয় আমেজে এটি উদযাপিত হয়। এর শিক্ষা পাপকর্মকে বারণ করে, পাপকর্ম করতে নিষেধ করে এবং সব ধরনের অকুশল ও পাপকর্ম থেকে দূরে রাখে বলেই এর নাম প্রবারণা। তিন মাসব্যাপী শিক্ষা সমাপ্তির জন্য একে বৌদ্ধ জীবনে ‘আশার তৃপ্তি’ বা ‘অভিলাষ পূরণ’ও বলা হয়। সেদিন সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে প্রবারণার শুভেচ্ছা বিনিময় করে। পারস্পরিক একতা, মৈত্রী, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের ভাব বাড়িয়ে দেয়।

প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। আগেই বলেছি, এর আবেদন পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়তা দান করে। কারণ সব মানুষের সর্বাঙ্গীণ সুখ যেখানে নিহিত, সেটাই বৌদ্ধধর্ম। তাই বৌদ্ধধর্ম কোনো জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম-বর্ণ, দেশ ও ভূখণ্ডের কৃত্রিম ও ব্যক্তিসুখ কামনা করে না। বৌদ্ধরা সব মানুষের, বিশ্বের সব জীবের অখণ্ড সুখ, অখণ্ড কল্যাণ এবং সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও শান্তি কামনা করেন। তাই বুদ্ধ বলেন, সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু, অবেরো হোন্তু, অব্বপজ্জ হোন্তু, অনীঘ হোন্তু-বিশ্বের সব জীব সুখী হোক, ভয়হীন হোক এবং শত্রুহীন হোক।

প্রবারণা বৌদ্ধদের একটি জাতীয় উৎসব বলেই এটি উদযাপনের জন্য প্রতিটি বিহার ও গ্রামকে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে বিহার এবং বিহারের চারপাশ বর্ণাঢ্যভাবে সাজানো হয়। বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-পৌঢ় বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেদিন আনন্দে মেতে ওঠে। ছেলেমেয়েরা বাগান থেকে ফুল এনে নানা উপকরণ দিয়ে নিজগৃহ, গ্রাম এবং বিহারকে সাজিয়ে তোলে। রঙিন কাগজ দিয়ে ছেলেরা নানা ধরনের ফানুস তৈরি করে। বাড়িতে তৈরি করে নানারকমের মিষ্টি ও সুস্বাদু আহার। প্রবারণার প্রভাত থেকেই বৌদ্ধ নর-নারীরা নতুন ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে শোভাযাত্রা করে। পূজার অর্ঘ্য আর দানীয় সামগ্রী হাতে নিয়ে বিহারে উপস্থিত হয়। তারা এদিন পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করে, পূজা দেয় এবং ধর্ম শ্রবণ করে। সাধুবাদ ও ধর্মীয় আবেশে মুখরিত হয় সেদিন বিহার প্রাঙ্গণ। দানের জন্য বিহারে সুদৃশ্য কল্পতরু তৈরি করা হয়। ছেলেমেয়েরা সবাই মনের আনন্দে সেখানে গিয়ে নানা ধরনের দানীয় সামগ্রী বেঁধে দেয়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধের কেশধাতুকে পূজার উদ্দেশ্যে আকাশে ফানুস ওড়ানো হয়। তারপর সবাই সমবেতভাবে দেশ ও জাতির মঙ্গল, কল্যাণ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করে। ভিক্ষুসংঘ সীমাঘর কিংবা বুদ্ধের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রবারণার বিনয়কর্ম সম্পাদন করেন এবং তাদের ত্রৈমাসিক বর‌্যাব্রত অধিষ্ঠান পরিত্যাগ করেন। তার পরদিন থেকে শুরু হয় শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব।

বৌদ্ধধর্ম শীল সমাধি প্রজ্ঞা নির্ভরশীল ধর্ম। বৌদ্ধ মতে তাই জীবনের সব ক্ষেত্রে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা অপরিহার্য। সুতরাং, প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন একতা ও সঙ্ঘশক্তি তৈরিতে প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করে। তাই তো বলা হয়েছে-সুখ সঙ্ঘসস সামগ্গি সামগ্গনং তপো সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যা করাও সর্বতো কল্যাণ ও সুখকর। অতএব প্রবারণার এ আবেদন ও শিক্ষায় যদি আমরা বিশ্বাসী হই, তাহলে এ মুহূর্তেই আমাদের সব ধরনের অশুভ চিন্তা ও অকল্যাণ পরিত্যাগ করা উচিত। সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করা উচিত। আমরা তো সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আমাদের মধ্যে এ হীনতা থাকা উচিত নয়। এতে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন উপকৃত হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের বসবাসও নিরাপদ হবে। অতএব চলুন, আমরা আজ ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে বিনাশ করি। এর বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে ব্রতী হই; সংযম, ত্যাগ, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সদাচরণে কর্তব্যপরায়ণ হই। জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরি করি। ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে দেশ গড়ার কাজে আমরা সবাই নিবেদিত হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু-জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক।

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

skbaruadu@gmail.com

সম্প্রীতিতে পূর্ণ হোক ধরা

 ড. সুকোমল বড়ুয়া 
২০ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। এটি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব; শারদীয় উৎসব। এটি শুধু বাংলাদেশি বৌদ্ধদের জন্য নয়, বিশ্বের সব বৌদ্ধরা এ শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায়, ভাবগাম্ভীর্যে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করে থাকে। তবে এবারের প্রবারণা উৎসবটি বাংলাদেশের বৌদ্ধদের জন্য বেদনা এনে দিয়েছে ওই রামু-উখিয়া-পটিয়ার ঘটনার মতো।

নানা গোত্রের, নানা ধর্মের মানুষের আবাসভূমি হচ্ছে আমাদের এ বাংলাদেশ। এ যেন আমাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি। এই তো শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হতে না হতেই আজ আবার বৌদ্ধদের শারদীয় উৎসব প্রবারণা উদযাপিত হচ্ছে শিশিরভেজা গ্রামবাংলার নগর-প্রান্তর বৌদ্ধ জনপদকে মুখরিত করে। আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার ও জনপদ। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির এ ধারা আমাদের ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, জাতি-গোষ্ঠী সবার জন্য আনন্দের ও গর্বের। এটি আমাদের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও বহন করে। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর তাণ্ডবলীলা আমাদের ব্যথিত করে।

অতীত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সমতা, ত্যাগ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতিবোধ, উদার বিশ্বাস ও মানসিকতা; সর্বোপরি স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশচিন্তা আমাদের জাতীয় উন্নয়ন-সমৃদ্ধির বিকাশ এবং জাতীয় মানস গঠনে অসম্ভব সহায়তা দান করে। আজকের গ্লোবাল ভিলেজের ConceptI তাই। বৌদ্ধ প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান। এর আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষু জীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়। শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে সাহায্য করে। বহুমাত্রিকতাপূর্ণ এ ধর্মীয় উৎসব আচার-অনুষ্ঠান তো বটেই, এ ছাড়া আত্মশাসন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসমর্পণের মতো জীবনবোধ-সংবেদ তৈরি করতে যথেষ্ট সহায়তা দান করে। বিশেষ করে আত্মদর্শনের জন্য এটি খুবই কার্যকরী হয়। বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে নানা ধরনের পাপকর্ম ও অশুভ চিন্তা থেকে মুক্ত থাকা যায়। সুন্দর জীবন তৈরির জন্য সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সাধনা ও ব্রতাচরণকে আহ্বান জানানো হয়। শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞাসাধনার পাশাপাশি সংযম, ত্যাগ প্রভৃতি ব্রতানুশীলনের মাধ্যমে প্রবারণার শিক্ষা সত্য, সুন্দর মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আমাদের উদ্দীপনা জোগায়। এজন্যই বৌদ্ধ প্রবারণার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে এবং আধ্যাত্মিক গুণাবলি অর্জনে অপরিসীম বলে বিবেচিত হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মীয় মতে, বৌদ্ধভিক্ষু-শ্রমণ ও উপাসক-উপাসিকা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা-এ তিন মাস শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনার ব্রত অধিষ্ঠান নেয়। তিন মাসের অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা এবং সার্বক্ষণিক ধ্যানচিন্তা, উপবাস, সংযম প্রভৃতি অভ্যাসের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ মানবসত্তা প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত গ্রহণ করে। ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের শেষ দিবসটিকে বলা হয় ‘প্রবারণা’। এটি মুসলিম বিশ্বের পবিত্র ঈদুল ফিতরের মতো। অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে ও ধর্মীয় আমেজে এটি উদযাপিত হয়। এর শিক্ষা পাপকর্মকে বারণ করে, পাপকর্ম করতে নিষেধ করে এবং সব ধরনের অকুশল ও পাপকর্ম থেকে দূরে রাখে বলেই এর নাম প্রবারণা। তিন মাসব্যাপী শিক্ষা সমাপ্তির জন্য একে বৌদ্ধ জীবনে ‘আশার তৃপ্তি’ বা ‘অভিলাষ পূরণ’ও বলা হয়। সেদিন সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে প্রবারণার শুভেচ্ছা বিনিময় করে। পারস্পরিক একতা, মৈত্রী, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের ভাব বাড়িয়ে দেয়।

প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। আগেই বলেছি, এর আবেদন পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়তা দান করে। কারণ সব মানুষের সর্বাঙ্গীণ সুখ যেখানে নিহিত, সেটাই বৌদ্ধধর্ম। তাই বৌদ্ধধর্ম কোনো জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম-বর্ণ, দেশ ও ভূখণ্ডের কৃত্রিম ও ব্যক্তিসুখ কামনা করে না। বৌদ্ধরা সব মানুষের, বিশ্বের সব জীবের অখণ্ড সুখ, অখণ্ড কল্যাণ এবং সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও শান্তি কামনা করেন। তাই বুদ্ধ বলেন, সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু, অবেরো হোন্তু, অব্বপজ্জ হোন্তু, অনীঘ হোন্তু-বিশ্বের সব জীব সুখী হোক, ভয়হীন হোক এবং শত্রুহীন হোক।

প্রবারণা বৌদ্ধদের একটি জাতীয় উৎসব বলেই এটি উদযাপনের জন্য প্রতিটি বিহার ও গ্রামকে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে বিহার এবং বিহারের চারপাশ বর্ণাঢ্যভাবে সাজানো হয়। বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-পৌঢ় বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেদিন আনন্দে মেতে ওঠে। ছেলেমেয়েরা বাগান থেকে ফুল এনে নানা উপকরণ দিয়ে নিজগৃহ, গ্রাম এবং বিহারকে সাজিয়ে তোলে। রঙিন কাগজ দিয়ে ছেলেরা নানা ধরনের ফানুস তৈরি করে। বাড়িতে তৈরি করে নানারকমের মিষ্টি ও সুস্বাদু আহার। প্রবারণার প্রভাত থেকেই বৌদ্ধ নর-নারীরা নতুন ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে শোভাযাত্রা করে। পূজার অর্ঘ্য আর দানীয় সামগ্রী হাতে নিয়ে বিহারে উপস্থিত হয়। তারা এদিন পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করে, পূজা দেয় এবং ধর্ম শ্রবণ করে। সাধুবাদ ও ধর্মীয় আবেশে মুখরিত হয় সেদিন বিহার প্রাঙ্গণ। দানের জন্য বিহারে সুদৃশ্য কল্পতরু তৈরি করা হয়। ছেলেমেয়েরা সবাই মনের আনন্দে সেখানে গিয়ে নানা ধরনের দানীয় সামগ্রী বেঁধে দেয়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধের কেশধাতুকে পূজার উদ্দেশ্যে আকাশে ফানুস ওড়ানো হয়। তারপর সবাই সমবেতভাবে দেশ ও জাতির মঙ্গল, কল্যাণ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করে। ভিক্ষুসংঘ সীমাঘর কিংবা বুদ্ধের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রবারণার বিনয়কর্ম সম্পাদন করেন এবং তাদের ত্রৈমাসিক বর‌্যাব্রত অধিষ্ঠান পরিত্যাগ করেন। তার পরদিন থেকে শুরু হয় শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব।

বৌদ্ধধর্ম শীল সমাধি প্রজ্ঞা নির্ভরশীল ধর্ম। বৌদ্ধ মতে তাই জীবনের সব ক্ষেত্রে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা অপরিহার্য। সুতরাং, প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন একতা ও সঙ্ঘশক্তি তৈরিতে প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করে। তাই তো বলা হয়েছে-সুখ সঙ্ঘসস সামগ্গি সামগ্গনং তপো সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যা করাও সর্বতো কল্যাণ ও সুখকর। অতএব প্রবারণার এ আবেদন ও শিক্ষায় যদি আমরা বিশ্বাসী হই, তাহলে এ মুহূর্তেই আমাদের সব ধরনের অশুভ চিন্তা ও অকল্যাণ পরিত্যাগ করা উচিত। সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করা উচিত। আমরা তো সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আমাদের মধ্যে এ হীনতা থাকা উচিত নয়। এতে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন উপকৃত হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের বসবাসও নিরাপদ হবে। অতএব চলুন, আমরা আজ ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে বিনাশ করি। এর বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে ব্রতী হই; সংযম, ত্যাগ, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সদাচরণে কর্তব্যপরায়ণ হই। জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরি করি। ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে দেশ গড়ার কাজে আমরা সবাই নিবেদিত হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু-জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক।

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

skbaruadu@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন