বাঙালির মনোজগতে শুভ চিন্তা আনতে দরকার একজন ভলতেয়ার
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
বাঙালির মনোজগতে শুভ চিন্তা আনতে দরকার একজন ভলতেয়ার

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন চারণ গায়ক। তিনি মূলত সিলেট জেলায় বিচরণ করতেন এবং দেশপ্রেমমূলক ও শোষণবিরোধী গান গেয়ে শোষিত মানুষদের সচেতন করে তুলতেন।

এসব গান বেশির ভাগ তিনি নিজেই রচনা করতেন। তার সমতুল্য বা কাছাকাছি পর্যায়ের গণসংগীত শিল্পী ছিলেন শাহ আব্দুল করিম।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস আজ বেঁচে নেই, বেঁচে নেই শাহ আব্দুল করিমও। জীবদ্দশায় শাহ আব্দুল করিম যেভাবে প্রচারিত হচ্ছেন, বেঁচে থাকতে তিনি সেভাবে প্রচার পাননি। এ যেন ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল।’

১৯৬৮ সালের অক্টোবরে আমি সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন সুনামগঞ্জ শাখার সম্মেলন উপলক্ষ্যে। সেই সময় কর্মীদের মুখে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রশংসা শুনেছিলাম। তার গানের গায়কি এতই মনোমুগ্ধকর ছিল যে শ্রোতারা তার গানের সুরের সাগরে ডুবে যেত। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৪৭ সালের পর এদেশে আর থাকেননি। মযহারুল ইসলাম বাবলার লেখা থেকে জানা যায়, ‘উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন। আজন্ম সংগ্রামী, নীতিনিষ্ঠ হেমাঙ্গ বিশ্বাস ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের সাফল্য নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন।

পাশাপাশি ক্ষোভ ও হতাশায় বলেছিলেন, তার গান তার পরিবারের সদস্যরা শোনে না। তার সে আক্ষেপের কথাটির বাস্তবিক প্রমাণ পেয়েছিলাম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটির সংশ্লিষ্টতায়। ঢাকায় তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে এ বিপ্লবী শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছিল। এ উপলক্ষ্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কন্যা রোমিলা বিশ্বাসকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তিনি ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে বক্তৃতাও করেছিলেন। তার পিতা বাংলাদেশের একজন সমাদৃত ব্যক্তিত্ব জানতে পেরে রোমিলা বিশ্বাস আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

রোমিলা বিশ্বাসের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। এ সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিল, ‘আপনার বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শিক চেতনাকে আপনি ধারণ করেন কি?’ এর জবাবে রোমিলা বিশ্বাস সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে চরমভাবে হতাশ করে বলেছিলেন, ‘দেখুন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই মতাদর্শেরও পতন ঘটেছে। সে মতাদর্শ তো এখন চুকেবুকে গেছে। সে মতাদর্শ এখন অচল। তাই সে প্রসঙ্গে ভাবার আর অবকাশ কোথায়?’ রোমিলা বিশ্বাসের জবাব এবং তার উপলব্ধির প্রকাশ এখনো যারা পৃথিবীকে স্বর্গের মতো সুন্দর স্থান হিসাবে গড়ে তুলতে চান অথবা এর জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তাদের জন্য কত বেদনাদায়ক তা বলে শেষ করা যাবে না।

প্রখ্যাত ভারতীয় গায়ক ভুপেন হাজারিকা গণনাট্য সংসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বেশকিছু অমর গণসংগীত গেয়েছিলেন। এগুলোর রেকর্ড এখনো পাওয়া যায় এবং আমার মনে হয় একুশ শতকের শেষেও এ গানগুলো মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়বে না।

যে ভুপেন হাজারিকা গেয়েছিলেন, ‘স্বর্গ যদি কোথাও থাকে নামাও তারে ধরার পর’, সেই ভুপেন হাজারিকা জীবন সায়াহ্নে এসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তার আজন্ম লালিত বিশ্বাস যে গঙ্গাকে লক্ষ্য করে তিনি গেয়েছিলেন, সেই গঙ্গাতেই তিনি তার বিশ্বাসকে বিসর্জন দিলেন। এটা খুবই সত্য যে, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের চিন্তাচেতনায় অনেক পার্থক্য থাকে।

আমি তিন কন্যাসন্তানের জনক। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু আমি তাদের মধ্যে আমার জীবনদর্শন নিয়ে কখনোই কোনো কৌতূহল লক্ষ করিনি। তারা কখনো জিজ্ঞাসা করেনি আমি কেন একটা বই নির্দিষ্ট সময়ে পড়ছি। এ পড়া থেকে আমি কী পেয়েছি অথবা এ পড়াকে আমি কীভাবে ব্যবহার করতে চাই। এ কথা সত্য যে, তারা কখনো আমার লালিত ধ্যানধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেনি। এটা আমার জন্য এক বিরাট পাওয়া।

এ শতাব্দীতে এ প্রাপ্তিটুকু কম মূল্যবান নয়। আমি আনন্দবোধ করি এই ভেবে যে, ওরা রোমিলা বিশ্বাসের মতো অত দূরে যায়নি। বর্তমান বিশ্বকে যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের অধিকাংশেরই মত-পুঁজিবাদ ক্রমান্বয়ে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। একবিংশ শতাব্দীতেই সমাজতন্ত্র তার সীমাবদ্ধতা ও ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে উঠে জগদ্বাসীর জন্য অনন্য উপহার হিসাবে ধরা দেবে।

মযহারুল ইসলাম বাবলার লেখা থেকে আরও জানা যায়, একবার কলকাতায় এক বিজ্ঞজন তাকে হতাশার সুরে বলেছিলেন, ‘তোমাদের পূর্ববঙ্গে বাঙালি মনীষীর বড়ই অভাব। তোমাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঘাটতি নেই। কিন্তু জ্ঞানের পরিসর খুবই সংকীর্ণ।

সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর।’ এ প্রশ্ন শুনে বাবলা সাহেব কিছুটা বিব্রতবোধ করেছিলেন, কিন্তু প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের শক্তিতে তিনি জবাব দিলেন-‘বলুন তো, পশ্চিমবঙ্গে সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখা বাঙালি মনীষীদের কত শতাংশ পশ্চিমবঙ্গীয়?’ তার এ কথায় ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল।

বাবলা সাহেব আরও বললেন, ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞানবিজ্ঞান, চিকিৎসাশস্ত্র-সর্বক্ষেত্রে যাদের নিয়ে গর্ব করেন, তাদের সিংহভাগ কিন্তু পূর্ববঙ্গীয়।’ তারপর তিনি আরও বললেন, ‘দেশভাগের কারণে আমাদের মনীষীরা আপনাদের দেশে এসে শরণার্থী হয়েছিলেন। আশ্রয়হীন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পরও তারা নিজেদের অধ্যবসায়ে আপনাদের ও আপনাদের দেশকে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের নিয়েই আপনারা আজ গর্ব করেন।

তাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী কিন্তু আপনারা নন; আমরাই।’ ক’জন পূর্ববঙ্গবাসীর কথা বলব, যারা পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে সমাজের শ্রেষ্ঠ আসনটি লাভ করেছেন? অমর্ত্য সেনের জন্ম কোথায়?

জীবনানন্দ দাশের জন্ম কোথায়? জ্যোতি বসু কোথায় জন্মেছেন? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পার্থ দাশগুপ্তের জন্ম কোথায়? তার পিতা একে দাশগুপ্তের জন্ম কোথায়? এভাবে নাম বলতে গেলে কম করে দিস্তাখানেক কাগজ লাগবে।

অনেকে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, এ কথা ভেবে দুঃখ পাই। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এ কথা সত্য যে, সমগ্র বঙ্গদেশে হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক অগ্রগতি একরকম ছিল না। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দুদের মধ্যে যারা লেখাপড়া শিখেছিলেন তারা ইংরেজ শাসনকে অভিনন্দিত করেছেন এবং মুসলিম শাসনের অবসানকে ‘যবন শাসনের অবসান’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এভাবে ১০০ বছর কেটে গেল।

মুসলমানরা ইংরেজ ও ইংরেজি ভাষাকে গ্রহণ করতে পারল না। এর ফলাফল হলো সম্প্রদায়গতভাবে বিদ্যা ও জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে পড়া। সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমানরা ছিল গরিব কৃষক প্রজা। অপরদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যাদের ভদ্রলোক বলা হতো তারা ছিলেন জমিদার ও ভূস্বামী।

সাধারণ মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। সেকালে যেসব পেশার মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক শ্রেণি মোটা দাগে সচ্ছল জীবনযাপন করত, সেসব পেশার জন্য প্রয়োজন ছিল ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হওয়া। স্যার সৈয়দ আহমদসহ কিছুসংখ্যক মুসলিম নেতার প্রচেষ্টায় মুসলমানরা ধীরে ধীরে ইংরেজি শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে থাকল।

উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের উদ্ভব ঘটল। এদের মধ্যে আমরা অনেকের নাম করতে পারি। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ অনেকের নামই করা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবির মর্যাদা পেলেন। স্বাধীনতা দাবি করায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। আর কোনো বাঙালি কবি স্বরাজ কিংবা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে কারারুদ্ধ হননি।

ত্রিশের দশক থেকে ভারতের উপনিবেশবাদবিরোধী রাজনীতি কার্যত দুই স্রোতে বিভক্ত হয়ে গেল। নবগঠিত মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠল। ১৯০৬ সালে যারা মুসলিম লীগ গঠন করলেন, তারা ছিলেন নবাব ও উচ্চবর্গীয় মুসলমান।

তাদের সঙ্গে সাধারণ কৃষক-প্রজার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কেন্টওয়েল স্মিথ লিখেছেন, ১৯৩০-এর দশকে যখন ইংরেজি শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্তরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আশায় মুসলিম লীগে যোগদান করতে শুরু করল, তখন থেকে মুসলিম লীগ জনসম্পৃক্তির দিক থেকে অগ্রগণ্য হয়ে উঠল।

মুসলিম মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা ছিল পূর্ববঙ্গীয়, তাদেরকে মহা পরিবর্তনের স্রোতের সঙ্গে সাঁতার কেটে এগোতে হলো। ৮৫ বছরের মধ্যে প্রলয়ংকরী রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজকে এগোতে হয়েছে। বিশ্ব ঝঞ্ঝার বিশাল ঘূর্ণিপাকের মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনার সুযোগ কোথায়?

ইতিহাসের এই লগ্নে ৮৫ বছরের মধ্যে দুটি বিশাল স্বাধীনতাসংগ্রামে জয়ী হওয়া অগ্রাহ্য করার মতো কিছু নয়। তবে ’৭১-উত্তরকালে আমরা তো জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতাম, তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ এখন এক মহাব্যাধির আক্রমণের শিকার। এই ব্যাধি হলো দুটি প্রধান রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে আত্মঘাতী হওয়া। এ যেন বৃক্ষশিখরে ওঠার পর কুঠারাঘাতে বৃক্ষের ডালগুলো কেটে ফেলা। জাতি হিসাবে আমাদের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা আছে। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী কলকাতার কোনো বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে একটু প্রশংসা কিংবা পিঠচাপড়ানি পেলে বর্তে যান। অস্ট্রেলিয়ার মিশর বিশেষজ্ঞ ডেনিস ওয়াকার আমাদের জাতীয় চরিত্রের এ বৈশিষ্ট্যটির ওপর আলোকপাত করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সদ্য স্বাধীন দেশটি দেখার জন্য তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তার লেখা পড়লে বোঝা যায় বাংলা সাহিত্যের ওপরও তার দখল আছে। বাংলাদেশের নবতম প্রজন্ম কেমন তা ব্যাখ্যা করে বলা যাবে না।

তারা কদাচিৎই নিজের মনের কথা প্রকাশ্যে বলাবলি করে। তারা বোঝে যে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তাদের অনেকেই বিদেশে লেখাপড়া করছে। তারা গবেষণায় বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তারা তো কেউ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবে না।

কিন্তু জাতি নামক জাহাজটিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন একজন ক্যাপটেন, যিনি হবেন একজন দিশারি।

ফরাসিদের চিন্তার জগতে শুভ পরিবর্তন এনেছিলেন যেমন ভলতেয়ার, আমাদেরও ঠিক তেমনই প্রয়োজন একজন ভলতেয়ারের। আমার মনে হয়, যে কোনো সৎ নাগরিক এমন একজন দিশারির জন্য অপেক্ষা করছেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

বাঙালির মনোজগতে শুভ চিন্তা আনতে দরকার একজন ভলতেয়ার

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন চারণ গায়ক। তিনি মূলত সিলেট জেলায় বিচরণ করতেন এবং দেশপ্রেমমূলক ও শোষণবিরোধী গান গেয়ে শোষিত মানুষদের সচেতন করে তুলতেন।

এসব গান বেশির ভাগ তিনি নিজেই রচনা করতেন। তার সমতুল্য বা কাছাকাছি পর্যায়ের গণসংগীত শিল্পী ছিলেন শাহ আব্দুল করিম।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস আজ বেঁচে নেই, বেঁচে নেই শাহ আব্দুল করিমও। জীবদ্দশায় শাহ আব্দুল করিম যেভাবে প্রচারিত হচ্ছেন, বেঁচে থাকতে তিনি সেভাবে প্রচার পাননি। এ যেন ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল।’

১৯৬৮ সালের অক্টোবরে আমি সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন সুনামগঞ্জ শাখার সম্মেলন উপলক্ষ্যে। সেই সময় কর্মীদের মুখে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রশংসা শুনেছিলাম। তার গানের গায়কি এতই মনোমুগ্ধকর ছিল যে শ্রোতারা তার গানের সুরের সাগরে ডুবে যেত। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৪৭ সালের পর এদেশে আর থাকেননি। মযহারুল ইসলাম বাবলার লেখা থেকে জানা যায়, ‘উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন। আজন্ম সংগ্রামী, নীতিনিষ্ঠ হেমাঙ্গ বিশ্বাস ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের সাফল্য নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন।

পাশাপাশি ক্ষোভ ও হতাশায় বলেছিলেন, তার গান তার পরিবারের সদস্যরা শোনে না। তার সে আক্ষেপের কথাটির বাস্তবিক প্রমাণ পেয়েছিলাম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটির সংশ্লিষ্টতায়। ঢাকায় তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে এ বিপ্লবী শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছিল। এ উপলক্ষ্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কন্যা রোমিলা বিশ্বাসকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তিনি ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে বক্তৃতাও করেছিলেন। তার পিতা বাংলাদেশের একজন সমাদৃত ব্যক্তিত্ব জানতে পেরে রোমিলা বিশ্বাস আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

রোমিলা বিশ্বাসের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। এ সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিল, ‘আপনার বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শিক চেতনাকে আপনি ধারণ করেন কি?’ এর জবাবে রোমিলা বিশ্বাস সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে চরমভাবে হতাশ করে বলেছিলেন, ‘দেখুন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই মতাদর্শেরও পতন ঘটেছে। সে মতাদর্শ তো এখন চুকেবুকে গেছে। সে মতাদর্শ এখন অচল। তাই সে প্রসঙ্গে ভাবার আর অবকাশ কোথায়?’ রোমিলা বিশ্বাসের জবাব এবং তার উপলব্ধির প্রকাশ এখনো যারা পৃথিবীকে স্বর্গের মতো সুন্দর স্থান হিসাবে গড়ে তুলতে চান অথবা এর জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তাদের জন্য কত বেদনাদায়ক তা বলে শেষ করা যাবে না।

প্রখ্যাত ভারতীয় গায়ক ভুপেন হাজারিকা গণনাট্য সংসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বেশকিছু অমর গণসংগীত গেয়েছিলেন। এগুলোর রেকর্ড এখনো পাওয়া যায় এবং আমার মনে হয় একুশ শতকের শেষেও এ গানগুলো মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়বে না।

যে ভুপেন হাজারিকা গেয়েছিলেন, ‘স্বর্গ যদি কোথাও থাকে নামাও তারে ধরার পর’, সেই ভুপেন হাজারিকা জীবন সায়াহ্নে এসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তার আজন্ম লালিত বিশ্বাস যে গঙ্গাকে লক্ষ্য করে তিনি গেয়েছিলেন, সেই গঙ্গাতেই তিনি তার বিশ্বাসকে বিসর্জন দিলেন। এটা খুবই সত্য যে, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের চিন্তাচেতনায় অনেক পার্থক্য থাকে।

আমি তিন কন্যাসন্তানের জনক। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু আমি তাদের মধ্যে আমার জীবনদর্শন নিয়ে কখনোই কোনো কৌতূহল লক্ষ করিনি। তারা কখনো জিজ্ঞাসা করেনি আমি কেন একটা বই নির্দিষ্ট সময়ে পড়ছি। এ পড়া থেকে আমি কী পেয়েছি অথবা এ পড়াকে আমি কীভাবে ব্যবহার করতে চাই। এ কথা সত্য যে, তারা কখনো আমার লালিত ধ্যানধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেনি। এটা আমার জন্য এক বিরাট পাওয়া।

এ শতাব্দীতে এ প্রাপ্তিটুকু কম মূল্যবান নয়। আমি আনন্দবোধ করি এই ভেবে যে, ওরা রোমিলা বিশ্বাসের মতো অত দূরে যায়নি। বর্তমান বিশ্বকে যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের অধিকাংশেরই মত-পুঁজিবাদ ক্রমান্বয়ে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। একবিংশ শতাব্দীতেই সমাজতন্ত্র তার সীমাবদ্ধতা ও ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে উঠে জগদ্বাসীর জন্য অনন্য উপহার হিসাবে ধরা দেবে।

মযহারুল ইসলাম বাবলার লেখা থেকে আরও জানা যায়, একবার কলকাতায় এক বিজ্ঞজন তাকে হতাশার সুরে বলেছিলেন, ‘তোমাদের পূর্ববঙ্গে বাঙালি মনীষীর বড়ই অভাব। তোমাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঘাটতি নেই। কিন্তু জ্ঞানের পরিসর খুবই সংকীর্ণ।

সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর।’ এ প্রশ্ন শুনে বাবলা সাহেব কিছুটা বিব্রতবোধ করেছিলেন, কিন্তু প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের শক্তিতে তিনি জবাব দিলেন-‘বলুন তো, পশ্চিমবঙ্গে সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখা বাঙালি মনীষীদের কত শতাংশ পশ্চিমবঙ্গীয়?’ তার এ কথায় ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল।

বাবলা সাহেব আরও বললেন, ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞানবিজ্ঞান, চিকিৎসাশস্ত্র-সর্বক্ষেত্রে যাদের নিয়ে গর্ব করেন, তাদের সিংহভাগ কিন্তু পূর্ববঙ্গীয়।’ তারপর তিনি আরও বললেন, ‘দেশভাগের কারণে আমাদের মনীষীরা আপনাদের দেশে এসে শরণার্থী হয়েছিলেন। আশ্রয়হীন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পরও তারা নিজেদের অধ্যবসায়ে আপনাদের ও আপনাদের দেশকে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের নিয়েই আপনারা আজ গর্ব করেন।

তাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী কিন্তু আপনারা নন; আমরাই।’ ক’জন পূর্ববঙ্গবাসীর কথা বলব, যারা পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে সমাজের শ্রেষ্ঠ আসনটি লাভ করেছেন? অমর্ত্য সেনের জন্ম কোথায়?

জীবনানন্দ দাশের জন্ম কোথায়? জ্যোতি বসু কোথায় জন্মেছেন? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পার্থ দাশগুপ্তের জন্ম কোথায়? তার পিতা একে দাশগুপ্তের জন্ম কোথায়? এভাবে নাম বলতে গেলে কম করে দিস্তাখানেক কাগজ লাগবে।

অনেকে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, এ কথা ভেবে দুঃখ পাই। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এ কথা সত্য যে, সমগ্র বঙ্গদেশে হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক অগ্রগতি একরকম ছিল না। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দুদের মধ্যে যারা লেখাপড়া শিখেছিলেন তারা ইংরেজ শাসনকে অভিনন্দিত করেছেন এবং মুসলিম শাসনের অবসানকে ‘যবন শাসনের অবসান’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এভাবে ১০০ বছর কেটে গেল।

মুসলমানরা ইংরেজ ও ইংরেজি ভাষাকে গ্রহণ করতে পারল না। এর ফলাফল হলো সম্প্রদায়গতভাবে বিদ্যা ও জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে পড়া। সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমানরা ছিল গরিব কৃষক প্রজা। অপরদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যাদের ভদ্রলোক বলা হতো তারা ছিলেন জমিদার ও ভূস্বামী।

সাধারণ মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। সেকালে যেসব পেশার মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক শ্রেণি মোটা দাগে সচ্ছল জীবনযাপন করত, সেসব পেশার জন্য প্রয়োজন ছিল ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হওয়া। স্যার সৈয়দ আহমদসহ কিছুসংখ্যক মুসলিম নেতার প্রচেষ্টায় মুসলমানরা ধীরে ধীরে ইংরেজি শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে থাকল।

উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের উদ্ভব ঘটল। এদের মধ্যে আমরা অনেকের নাম করতে পারি। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ অনেকের নামই করা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবির মর্যাদা পেলেন। স্বাধীনতা দাবি করায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। আর কোনো বাঙালি কবি স্বরাজ কিংবা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে কারারুদ্ধ হননি।

ত্রিশের দশক থেকে ভারতের উপনিবেশবাদবিরোধী রাজনীতি কার্যত দুই স্রোতে বিভক্ত হয়ে গেল। নবগঠিত মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠল। ১৯০৬ সালে যারা মুসলিম লীগ গঠন করলেন, তারা ছিলেন নবাব ও উচ্চবর্গীয় মুসলমান।

তাদের সঙ্গে সাধারণ কৃষক-প্রজার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কেন্টওয়েল স্মিথ লিখেছেন, ১৯৩০-এর দশকে যখন ইংরেজি শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্তরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আশায় মুসলিম লীগে যোগদান করতে শুরু করল, তখন থেকে মুসলিম লীগ জনসম্পৃক্তির দিক থেকে অগ্রগণ্য হয়ে উঠল।

মুসলিম মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা ছিল পূর্ববঙ্গীয়, তাদেরকে মহা পরিবর্তনের স্রোতের সঙ্গে সাঁতার কেটে এগোতে হলো। ৮৫ বছরের মধ্যে প্রলয়ংকরী রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজকে এগোতে হয়েছে। বিশ্ব ঝঞ্ঝার বিশাল ঘূর্ণিপাকের মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনার সুযোগ কোথায়?

ইতিহাসের এই লগ্নে ৮৫ বছরের মধ্যে দুটি বিশাল স্বাধীনতাসংগ্রামে জয়ী হওয়া অগ্রাহ্য করার মতো কিছু নয়। তবে ’৭১-উত্তরকালে আমরা তো জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতাম, তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ এখন এক মহাব্যাধির আক্রমণের শিকার। এই ব্যাধি হলো দুটি প্রধান রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে আত্মঘাতী হওয়া। এ যেন বৃক্ষশিখরে ওঠার পর কুঠারাঘাতে বৃক্ষের ডালগুলো কেটে ফেলা। জাতি হিসাবে আমাদের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা আছে। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী কলকাতার কোনো বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে একটু প্রশংসা কিংবা পিঠচাপড়ানি পেলে বর্তে যান। অস্ট্রেলিয়ার মিশর বিশেষজ্ঞ ডেনিস ওয়াকার আমাদের জাতীয় চরিত্রের এ বৈশিষ্ট্যটির ওপর আলোকপাত করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সদ্য স্বাধীন দেশটি দেখার জন্য তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তার লেখা পড়লে বোঝা যায় বাংলা সাহিত্যের ওপরও তার দখল আছে। বাংলাদেশের নবতম প্রজন্ম কেমন তা ব্যাখ্যা করে বলা যাবে না।

তারা কদাচিৎই নিজের মনের কথা প্রকাশ্যে বলাবলি করে। তারা বোঝে যে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তাদের অনেকেই বিদেশে লেখাপড়া করছে। তারা গবেষণায় বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তারা তো কেউ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবে না।

কিন্তু জাতি নামক জাহাজটিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন একজন ক্যাপটেন, যিনি হবেন একজন দিশারি।

ফরাসিদের চিন্তার জগতে শুভ পরিবর্তন এনেছিলেন যেমন ভলতেয়ার, আমাদেরও ঠিক তেমনই প্রয়োজন একজন ভলতেয়ারের। আমার মনে হয়, যে কোনো সৎ নাগরিক এমন একজন দিশারির জন্য অপেক্ষা করছেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন