মৃতপ্রায় ডাকব্যবস্থাকে বাঁচাবে কে?
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
মৃতপ্রায় ডাকব্যবস্থাকে বাঁচাবে কে?

  ড. আর এম দেবনাথ  

২৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সপ্তাহ দুয়েক আগে পালিত হয়ে গেল ‘বিশ্ব ডাক দিবস’। বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে তা পালিত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। আমার চোখে একটি কাগজই পড়েছে, যাতে দেখলাম ডাকঘরের ওপর কিছু আলোচনা ও নিবন্ধ। এসব পড়তে পড়তে আমি চলে গিয়েছিলাম ছোটবেলায়, স্কুল জীবনে। ‘ডাকঘর’ (পোস্ট অফিস) ও ‘ডাকপিয়ন’ ছিল আমাদের কাছে বেশ প্রিয়।

পরীক্ষার জন্য কতবার যে মুখস্থ করেছি ‘ডাকপিয়ন’ ও ‘ডাকঘর’ রচনা, তার হিসাব দিতে পারব না। শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, ডাকপিয়নের সঙ্গে ছিল আমাদের বিশেষ সখ্য। আমরা গ্রামের ছেলে। আমাদের সাব-পোস্ট অফিস ছিল বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। সেটা ছিল এক সম্ভ্রান্ত ‘চক্রবর্তী’ সাহেবের বাড়ি। তিনিই ছিলেন আমাদের পোস্টমাস্টার। সপ্তাহে দুদিন আমাদের গ্রামে আসতেন ডাকপিয়ন।

খাটোমতো এক নিখাদ ভদ্রলোক ছিলেন তিনি। একটি ছাতা মাথায় তিনি যখন আসতেন, তার অপেক্ষায় থাকতেন আমার ঠকুরমা। তার সঙ্গে আমিও। বাড়ির পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে, বাঁশঝাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম ডাকপিয়ন আসছেন কিনা। ঠাকুরমা তার জন্য বিশেষভাবে উদগ্রীব থাকতেন। তার অপেক্ষা মেয়ের খবরের জন্য। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর মেয়ে, নাতি-নাতনি ও জামাই চলে যায় আসামে- সেই সুদূর ‘তিন সূকিয়া’তে।

প্রায় সপ্তাহেই ঠাকুরমার কাছে চিঠি আসত। না এলেই তিনি পাগল হয়ে যেতেন। ডাকপিয়ন কোনো চিঠি না নিয়ে এলে ঠাকুরমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম সাব-পোস্ট অফিসে। ভুলে চিঠি সেখানে রয়ে গেল কিনা।

ডাকপিয়ন ও ডাকঘরের সঙ্গে আমার পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয় ‘শুকতারা’ নামের একটি ম্যাগাজিনের কারণে। কলকাতায় ছাপা এ ম্যাগাজিন ছিল ছোটদের জন্য। বাবা এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ‘তিন সূকিয়া’র চিঠির পর ডাকপিয়নের জন্য পাগল আমি। প্রিয় ‘শুকতারা’ এলো কিনা। দেরি হলেই কাউকে না বলেই চলে যেতাম ‘চক্রবর্তী’ সাহেবের সাব-পোস্ট অফিসে, যা ছিল প্রকৃতপক্ষে তার বাড়ি। বিশাল বাড়ি। এর একটি ঘরেই ছিল সাব-পোস্ট অফিস।

‘শুকতারা’র পর নতুনভাবে ‘ডাকপিয়ন’ দাদু আরও ঘনিষ্ঠ হলেন আরেক কারণে। তা হচ্ছে ‘মানি অর্ডার’। আমার এক কাকু ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) চাকরি করতেন। তিনি মাঝে মাঝেই ১০-২০ টাকা মানি অর্ডারে পাঠাতেন আমার নামে। তার জন্য এটা ছিল অধীর অপেক্ষার বিষয়। কবে টাকা পাব? ১০-২০ টাকা অনেক বড় অঙ্কের টাকা। ১০ টাকা দিয়ে তখন আধামন চাল পাওয়া যেত। বড় কাঁঠাল কেনা যেত ২০-২৫টা। ‘পিসিমার’ (ফুফু) চিঠি, ‘শুকতারা’ ও মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। তার বাবা ছিলেন থানা (উপজেলা) পোস্ট অফিসের বড় ‘পোস্টমাস্টার’। সেই পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখতাম এক বিস্ময়কর ঘটনা।

‘টরেটক্কা’। চাচা পাঠাতেন খবর, যার নাম ‘টেলিগ্রাম’। এই ‘টরেটক্কা’ আওয়াজ ছিল আমাদের ছোটদের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। কী করে এর মাধ্যমে খবর পাঠানো হয়! টেলিগ্রাম ছিল জরুরি খবরের জন্য। জন্ম-মৃত্যুর সংবাদ ইত্যাদি। টেলিগ্রাম এলে গ্রামের সবাই উদগ্রীব হয়ে পড়তেন- কী সংবাদ তা জানার জন্য। গ্রামে তখন চিঠি পড়া, চিঠি লেখার লোকের অভাব ছিল। যারা লেখাপড়া জানতেন না, তারা একটা ‘পোস্টকার্ড’ হাতে নিয়ে আসতেন আমার মার কাছে, চিঠি লিখে দেওয়ার জন্য।

মায়ের ‘ডিকটেশনে’ পত্রপ্রেরকের কথা অনেকবার আমার হাতেও লিখেছি। কী যে আনন্দ লেগেছে তখন, সে কথা আজ বোঝানো যাবে না। একবার মার সঙ্গে মামাবাড়ি যাওয়ার সময় রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে এক লোককে দেখলাম পিঠে খাকি বোঝা, হাতে লম্বা লাঠি নিয়ে যাচ্ছে। মা বললেন, উনি যাচ্ছেন স্টেশনে থানা পোস্ট অফিসের ডাক রেলগাড়িতে তুলে দিতে এবং থানার ডাক গ্রহণ করতে।

তখনকার দিনে চিঠিপত্র, মানি অর্ডার, টেলিগ্রাম ইত্যাদি পরিবহণ হতো রেলে। সে জন্য রেলওয়ের ‘রেলওয়ে মেইল সার্ভিস’ (আরএমএস) ছিল। যারা স্টেশনে ‘ডাক’ নিয়ে যেতেন এবং সেখান থেকে ‘ডাক’ নিয়ে আসতেন, তাদের নিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান আছে : ‘রানার... রানার’।

বাল্যকালের আমার প্রিয় ডাকঘর, পোস্টমাস্টার, ডাকপিয়ন ও রানার- এরা এখন কেমন আছেন? বলাই বাহুল্য, প্রতিষ্ঠান হিসাবে ডাকঘর এবং এর সঙ্গে জড়িত পেশাজীবীরা বিলুপ্তির পথে। আধুনিক প্রযুক্তি ডাকব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের হয় ইতোমধ্যে বেকার করেছে অথবা বেকার করবে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রযুক্তি শুধু ডাকব্যবস্থাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে না, প্রযুক্তি নতুন নতুন সেবা নিয়ে আসছে, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিচ্ছে। জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন পেশাজীবীর।

ছোটবেলায় দেখেছি ‘ফেভার-লিউবা’ ঘড়ি, ‘র‌্যালি’ ও ‘হারকিউলিস’ সাইকেল, ‘মারফি’ রেডিও ইত্যাদির খুব কদর। ফটো তুলতে লাগত কোডাক ফিল্ম। ‘হোন্ডা’ মোটরসাইকেল, ‘ভেসপা’ ইত্যাদি ছিল পাকিস্তান আমলের জনপ্রিয় পরিবহণ মাধ্যম। এসব আজকের দিনে বিলীন। ল্যান্ড টেলিফোন, এসটিডি ইত্যাদি ছিল খুবই উপকারী মাধ্যম। একটা ফোন করার জন্য যেতে হতো পাশের বাড়িতে, যাদের ল্যান্ড ফোন আছে। যেতে হতো এসটিডি বুথে।

এই তো সেদিনও কোনো কিছুর কপি করতে হলে ব্যবহার করতে হতো ‘স্টেনসিল’। আজ এসব নেই। এক মোবাইল ফোনেই প্রায় সব শেষ। এর মাধ্যমে কথা বলা যায়, টেলিফোন করা যায়, টেলিফোন রিসিভ করা যায়, ছবি তোলা যায়। সময় বলে দেয় মোবাইল ফোন! ‘জুম’ ব্যবস্থায় কয়েকজন দূরবর্তী অঞ্চলে থেকে সভা করতে পারে। ‘ভিডিও’ করা যায়। হাজার হাজার মাইল দূরের ছবি মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাস্তায় পথের/গন্তব্যের সন্ধান দেয় মোবাইল।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা প্রেরণ এবং টাকা প্রাপ্তি ঘটে ‘মোবাইলের’ কল্যাণে। বিনা পয়সায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায় মোবাইলে, সে ব্যবস্থাও আছে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে এক মোবাইল টেলিফোন ব্যবস্থার মধ্যেই আছে ডজন ডজন সেবা। দ্রুততম সেবা। অন্যান্য বিভাগীয় সেবার কথা বাদ দিলাম, এক ‘মোবাইল ফোনই’ যথেষ্ট ডাকঘর ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে।

যে চিঠি ডাকঘরের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত, সেই চিঠির কাজ করছে এখন ‘এসএমএস’। যত খুশি করা যায়। মুহূর্তের মধ্যে খবর আদান-প্রদান। মানি অর্ডারের কাজ করছে ‘বিকাশ’, ‘নগদ’ ইত্যাদি ব্যবস্থা, যা মোবাইলনির্ভর। জিনিসপত্র পাঠানো, বুক-পোস্ট ইত্যাদি কাজ করে দিচ্ছে বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবস্থা/সার্ভিস।

বলা বাহুল্য, এত দ্রুত সেবা সেকেলে ডাকব্যবস্থা দিতে পারে না। দরকার ছিল আধুনিকায়ন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- অবহেলা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিনিয়োগ বা বরাদ্দের অভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি মরতে বসেছে। অথচ এর অবকাঠামোটি ছিল শক্ত। সারা দেশে ডাকঘর ব্যবস্থার অধীনে ৮-৯ হাজার আউটলেট আছে। রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মী। হয়তো তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ নেই।

আবার আজকের দিনের ডাকঘরে আমানতও (ডিপোজিট) রাখা যায়। সেখান থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। এসবে সরকারি ভর্তুকি আছে। কিন্তু দক্ষ ও দ্রুত সেবার অভাবে এ ডাক-ব্যাংকিং ব্যবস্থাও এগোতে পারেনি। প্রসার ঘটেনি এর বিমা সেবার। ডাকঘরে ‘পোস্টাল লাইফ ইন্সুরেন্স’র ব্যবস্থা ছিল। এর বিস্তৃতিও বাধাগ্রস্ত। সবই একই কারণে। প্রযুক্তিগতভাবে ডাকঘর পিছিয়ে। এ কারণে তাদের অবকাঠামো অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।

ডাকব্যবস্থার যে নড়বড়ে অবস্থা, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য আমরা পাই ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) থেকে। এ সংস্থাটি নির্ভরযোগ্যতা, পরিসর, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে ডাকব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিবছর ‘র‌্যাংকিং’ প্রকাশ করে। এ র‌্যাংকিং থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছর ধরে ডাকব্যবস্থার অবনতি হচ্ছে। ২০১৬ সালে ১৭০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৮তম। র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে স্কোর ছিল ৩৯ দশমিক ৪৮।

অত্যন্ত আশঙ্কাজনক খবর, দেশে ডাকব্যবস্থার ক্রমাবনতির ফলে এর স্কোর ২০২১ সালে ১০ দশমিক ২-এ নেমে আসে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪৩তম। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ৭৮তম থেকে বাংলাদেশ নেমেছে ১৪৩তমে। আর তো অধঃপতনের জায়গা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি-নির্ধারকদের মন-মানসিকতা ডাকব্যস্থার উন্নয়নের বিপক্ষে। এর উন্নয়নের জন্য অন্যান্য দেশ যেভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, আমরা সেভাবে অতীতেও করিনি, এখনো করছি না। অবশ্য ডাকবিভাগ বলেছে, এখন ডাকব্যবস্থার ‘ডিজিটাইজেশন’ চলছে। এরই মধ্যে ‘ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার’ (ইএমটি), স্পিড পোস্ট, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড ইত্যাদি সেবা চালু হয়েছে।

বলা হচ্ছে, একে একে সব সেবা চালু করা হবে এবং তাদের সেবা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রশ্ন হলো, যদি কয়েকটি সেবা যদি চালু হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের ‘স্কোর’ ও র‌্যাংকিং হ্রাস পেল কেন? নির্ভরযোগ্যতা, পরিসর, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতা- এ চার সূচকে এখনো আমরা যে পেছনের দিকে, তা কি স্কোরই বলে দিচ্ছে না?

এরই মধ্যে আশার একটা খবর দেখলাম। খবরটি একটি বেসরকারি ব্যাংকের, সরকারি ব্যাংকের নয়। এ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তারা ৮ হাজার ৫০০ ডিজিটাল ডাকঘরে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারিত করবে। ডাকঘরে ইতোমধ্যেই বেশকিছু সেবা দেওয়া হচ্ছে। যেমন- ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমাদান, ডিপিএস বা মাসে মাসে জমা দেওয়া, এককালীন দীর্ঘমেয়াদি জমা, আঙুলের ছাপের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, চেক ইস্যু, ডেবিট কার্ড সেবা, ‘পিওএস’ টার্মিনাল ব্যবহারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, যে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা প্রদান, বৈদেশিক রেমিটেন্সের টাকা উত্তোলন, কৃষিঋণ প্রদান, পাসপোর্ট ফি প্রদান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বিমার প্রিমিয়াম প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং, ই-কমার্স ইত্যাদি।

যদি এতসব সেবা সত্যি সত্যি চালু হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকের এ কাজের জন্য তাদের ধন্যবাদ দিতেই হবে। তাদের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত লক্ষাধিক কাস্টমার ডিজিটাল ডাকঘরের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় করেছেন। গ্রামাঞ্চলে ঋণ দেওয়াও তারা শুরু করেছেন। আমার ধারণা, এতে উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর কাজের চাপ কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছোট সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকের নানা সেবা পাবে, যা থেকে তারা এতদিন বঞ্চিত ছিল।

এটা নিশ্চিতভাবেই সরকারি ব্যাংকগুলোর বড় ব্যর্থতা। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করার পর ব্যাংকগুলোর গ্রামে গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা উপজেলায় গিয়ে আটকা পড়ে। তাদের সেবা আর নিচের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সেবা পাননি। সে তুলনায় ডাকঘর মানুষের কাছাকাছি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব।

ডাকঘর ব্যবস্থা যেমন আমাদের অবহেলার শিকার, তেমনি আমাদের অবহেলার শিকার ছিল আরও দুটি অবকাঠামো খাত। বলা বাহুল্য, এ দুটি খাত হচ্ছে রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহণ। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে মনে হয়েছিল ‘রেলওয়ে’ পরিবহণের মাধ্যম আর থাকবে না। তখন সরকারের সব মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল সড়কপথের ওপর। নতুন নতুন রাস্তা বানাও, বাস আমদানি কর, ট্রাক আমদানি কর। যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও রাস্তা তৈরি হয়, যার রক্ষণাবেক্ষণ একটা সমস্যা। চলল বাস-ট্রাকের ব্যবসা।

রপ্তানিকারক দেশগুলো খুবই খুশি। সরকার এদিকে অনেক জায়গায় রেললাইন তুলে ফেলল, রেলপথ বন্ধ করল। অনেক রেলস্টেশন বন্ধ করা হলো। রেলের কোনো সংস্কার হলো না। নতুন বগি, ইঞ্জিন আমদানি বন্ধ। পুরোনোগুলোর মেরামতি বন্ধ। দৃশ্যতই বোঝা গেল সরকার রেলপথের উন্নয়ন চায় না, চায় সড়কপথ- বাস-ট্রাক-লরি। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের খরচ গেল অস্বাভাবিক হারে বেড়ে। এর বোঝা পড়ল অর্থনীতির ওপর, সাধারণ মানুষের ওপর, যা আজও বহন করতে হচ্ছে।

আশার কথা, বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। নতুন নতুন ইঞ্জিন ও বগি আমদানি হচ্ছে। নতুন রেললাইন স্থাপিত হচ্ছে। পুরোনো স্টেশন নতুন করে সজ্জিত করা হচ্ছে। নতুন নতুন আন্তঃজেলা ট্রেন চালু হচ্ছে। সরকার যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তা বোঝা যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ হচ্ছে। আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ হচ্ছে।

এসবের একটি ফল- পরিবহণ খরচ নিশ্চিতভাবে কমবে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এর সুবিধা পাবেন সাধারণ মানুষ। সেই সঙ্গে চলবে নদী ড্রেজিং। বেশকিছু নদী ড্রেজিংয়ের ফলে নৌপরিবহণ সহজতর হয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীগুলো নৌপরিবহণের উপযোগী করতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

মৃতপ্রায় ডাকব্যবস্থাকে বাঁচাবে কে?

 ড. আর এম দেবনাথ 
২৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সপ্তাহ দুয়েক আগে পালিত হয়ে গেল ‘বিশ্ব ডাক দিবস’। বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে তা পালিত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। আমার চোখে একটি কাগজই পড়েছে, যাতে দেখলাম ডাকঘরের ওপর কিছু আলোচনা ও নিবন্ধ। এসব পড়তে পড়তে আমি চলে গিয়েছিলাম ছোটবেলায়, স্কুল জীবনে। ‘ডাকঘর’ (পোস্ট অফিস) ও ‘ডাকপিয়ন’ ছিল আমাদের কাছে বেশ প্রিয়।

পরীক্ষার জন্য কতবার যে মুখস্থ করেছি ‘ডাকপিয়ন’ ও ‘ডাকঘর’ রচনা, তার হিসাব দিতে পারব না। শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, ডাকপিয়নের সঙ্গে ছিল আমাদের বিশেষ সখ্য। আমরা গ্রামের ছেলে। আমাদের সাব-পোস্ট অফিস ছিল বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। সেটা ছিল এক সম্ভ্রান্ত ‘চক্রবর্তী’ সাহেবের বাড়ি। তিনিই ছিলেন আমাদের পোস্টমাস্টার। সপ্তাহে দুদিন আমাদের গ্রামে আসতেন ডাকপিয়ন।

খাটোমতো এক নিখাদ ভদ্রলোক ছিলেন তিনি। একটি ছাতা মাথায় তিনি যখন আসতেন, তার অপেক্ষায় থাকতেন আমার ঠকুরমা। তার সঙ্গে আমিও। বাড়ির পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে, বাঁশঝাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম ডাকপিয়ন আসছেন কিনা। ঠাকুরমা তার জন্য বিশেষভাবে উদগ্রীব থাকতেন। তার অপেক্ষা মেয়ের খবরের জন্য। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর মেয়ে, নাতি-নাতনি ও জামাই চলে যায় আসামে- সেই সুদূর ‘তিন সূকিয়া’তে।

প্রায় সপ্তাহেই ঠাকুরমার কাছে চিঠি আসত। না এলেই তিনি পাগল হয়ে যেতেন। ডাকপিয়ন কোনো চিঠি না নিয়ে এলে ঠাকুরমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম সাব-পোস্ট অফিসে। ভুলে চিঠি সেখানে রয়ে গেল কিনা।

ডাকপিয়ন ও ডাকঘরের সঙ্গে আমার পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয় ‘শুকতারা’ নামের একটি ম্যাগাজিনের কারণে। কলকাতায় ছাপা এ ম্যাগাজিন ছিল ছোটদের জন্য। বাবা এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ‘তিন সূকিয়া’র চিঠির পর ডাকপিয়নের জন্য পাগল আমি। প্রিয় ‘শুকতারা’ এলো কিনা। দেরি হলেই কাউকে না বলেই চলে যেতাম ‘চক্রবর্তী’ সাহেবের সাব-পোস্ট অফিসে, যা ছিল প্রকৃতপক্ষে তার বাড়ি। বিশাল বাড়ি। এর একটি ঘরেই ছিল সাব-পোস্ট অফিস।

‘শুকতারা’র পর নতুনভাবে ‘ডাকপিয়ন’ দাদু আরও ঘনিষ্ঠ হলেন আরেক কারণে। তা হচ্ছে ‘মানি অর্ডার’। আমার এক কাকু ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) চাকরি করতেন। তিনি মাঝে মাঝেই ১০-২০ টাকা মানি অর্ডারে পাঠাতেন আমার নামে। তার জন্য এটা ছিল অধীর অপেক্ষার বিষয়। কবে টাকা পাব? ১০-২০ টাকা অনেক বড় অঙ্কের টাকা। ১০ টাকা দিয়ে তখন আধামন চাল পাওয়া যেত। বড় কাঁঠাল কেনা যেত ২০-২৫টা। ‘পিসিমার’ (ফুফু) চিঠি, ‘শুকতারা’ ও মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। তার বাবা ছিলেন থানা (উপজেলা) পোস্ট অফিসের বড় ‘পোস্টমাস্টার’। সেই পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখতাম এক বিস্ময়কর ঘটনা।

‘টরেটক্কা’। চাচা পাঠাতেন খবর, যার নাম ‘টেলিগ্রাম’। এই ‘টরেটক্কা’ আওয়াজ ছিল আমাদের ছোটদের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। কী করে এর মাধ্যমে খবর পাঠানো হয়! টেলিগ্রাম ছিল জরুরি খবরের জন্য। জন্ম-মৃত্যুর সংবাদ ইত্যাদি। টেলিগ্রাম এলে গ্রামের সবাই উদগ্রীব হয়ে পড়তেন- কী সংবাদ তা জানার জন্য। গ্রামে তখন চিঠি পড়া, চিঠি লেখার লোকের অভাব ছিল। যারা লেখাপড়া জানতেন না, তারা একটা ‘পোস্টকার্ড’ হাতে নিয়ে আসতেন আমার মার কাছে, চিঠি লিখে দেওয়ার জন্য।

মায়ের ‘ডিকটেশনে’ পত্রপ্রেরকের কথা অনেকবার আমার হাতেও লিখেছি। কী যে আনন্দ লেগেছে তখন, সে কথা আজ বোঝানো যাবে না। একবার মার সঙ্গে মামাবাড়ি যাওয়ার সময় রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে এক লোককে দেখলাম পিঠে খাকি বোঝা, হাতে লম্বা লাঠি নিয়ে যাচ্ছে। মা বললেন, উনি যাচ্ছেন স্টেশনে থানা পোস্ট অফিসের ডাক রেলগাড়িতে তুলে দিতে এবং থানার ডাক গ্রহণ করতে।

তখনকার দিনে চিঠিপত্র, মানি অর্ডার, টেলিগ্রাম ইত্যাদি পরিবহণ হতো রেলে। সে জন্য রেলওয়ের ‘রেলওয়ে মেইল সার্ভিস’ (আরএমএস) ছিল। যারা স্টেশনে ‘ডাক’ নিয়ে যেতেন এবং সেখান থেকে ‘ডাক’ নিয়ে আসতেন, তাদের নিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান আছে : ‘রানার... রানার’।

বাল্যকালের আমার প্রিয় ডাকঘর, পোস্টমাস্টার, ডাকপিয়ন ও রানার- এরা এখন কেমন আছেন? বলাই বাহুল্য, প্রতিষ্ঠান হিসাবে ডাকঘর এবং এর সঙ্গে জড়িত পেশাজীবীরা বিলুপ্তির পথে। আধুনিক প্রযুক্তি ডাকব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের হয় ইতোমধ্যে বেকার করেছে অথবা বেকার করবে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রযুক্তি শুধু ডাকব্যবস্থাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে না, প্রযুক্তি নতুন নতুন সেবা নিয়ে আসছে, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিচ্ছে। জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন পেশাজীবীর।

ছোটবেলায় দেখেছি ‘ফেভার-লিউবা’ ঘড়ি, ‘র‌্যালি’ ও ‘হারকিউলিস’ সাইকেল, ‘মারফি’ রেডিও ইত্যাদির খুব কদর। ফটো তুলতে লাগত কোডাক ফিল্ম। ‘হোন্ডা’ মোটরসাইকেল, ‘ভেসপা’ ইত্যাদি ছিল পাকিস্তান আমলের জনপ্রিয় পরিবহণ মাধ্যম। এসব আজকের দিনে বিলীন। ল্যান্ড টেলিফোন, এসটিডি ইত্যাদি ছিল খুবই উপকারী মাধ্যম। একটা ফোন করার জন্য যেতে হতো পাশের বাড়িতে, যাদের ল্যান্ড ফোন আছে। যেতে হতো এসটিডি বুথে।

এই তো সেদিনও কোনো কিছুর কপি করতে হলে ব্যবহার করতে হতো ‘স্টেনসিল’। আজ এসব নেই। এক মোবাইল ফোনেই প্রায় সব শেষ। এর মাধ্যমে কথা বলা যায়, টেলিফোন করা যায়, টেলিফোন রিসিভ করা যায়, ছবি তোলা যায়। সময় বলে দেয় মোবাইল ফোন! ‘জুম’ ব্যবস্থায় কয়েকজন দূরবর্তী অঞ্চলে থেকে সভা করতে পারে। ‘ভিডিও’ করা যায়। হাজার হাজার মাইল দূরের ছবি মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাস্তায় পথের/গন্তব্যের সন্ধান দেয় মোবাইল।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা প্রেরণ এবং টাকা প্রাপ্তি ঘটে ‘মোবাইলের’ কল্যাণে। বিনা পয়সায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায় মোবাইলে, সে ব্যবস্থাও আছে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে এক মোবাইল টেলিফোন ব্যবস্থার মধ্যেই আছে ডজন ডজন সেবা। দ্রুততম সেবা। অন্যান্য বিভাগীয় সেবার কথা বাদ দিলাম, এক ‘মোবাইল ফোনই’ যথেষ্ট ডাকঘর ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে।

যে চিঠি ডাকঘরের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত, সেই চিঠির কাজ করছে এখন ‘এসএমএস’। যত খুশি করা যায়। মুহূর্তের মধ্যে খবর আদান-প্রদান। মানি অর্ডারের কাজ করছে ‘বিকাশ’, ‘নগদ’ ইত্যাদি ব্যবস্থা, যা মোবাইলনির্ভর। জিনিসপত্র পাঠানো, বুক-পোস্ট ইত্যাদি কাজ করে দিচ্ছে বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবস্থা/সার্ভিস।

বলা বাহুল্য, এত দ্রুত সেবা সেকেলে ডাকব্যবস্থা দিতে পারে না। দরকার ছিল আধুনিকায়ন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- অবহেলা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিনিয়োগ বা বরাদ্দের অভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি মরতে বসেছে। অথচ এর অবকাঠামোটি ছিল শক্ত। সারা দেশে ডাকঘর ব্যবস্থার অধীনে ৮-৯ হাজার আউটলেট আছে। রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মী। হয়তো তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ নেই।

আবার আজকের দিনের ডাকঘরে আমানতও (ডিপোজিট) রাখা যায়। সেখান থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। এসবে সরকারি ভর্তুকি আছে। কিন্তু দক্ষ ও দ্রুত সেবার অভাবে এ ডাক-ব্যাংকিং ব্যবস্থাও এগোতে পারেনি। প্রসার ঘটেনি এর বিমা সেবার। ডাকঘরে ‘পোস্টাল লাইফ ইন্সুরেন্স’র ব্যবস্থা ছিল। এর বিস্তৃতিও বাধাগ্রস্ত। সবই একই কারণে। প্রযুক্তিগতভাবে ডাকঘর পিছিয়ে। এ কারণে তাদের অবকাঠামো অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।

ডাকব্যবস্থার যে নড়বড়ে অবস্থা, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য আমরা পাই ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) থেকে। এ সংস্থাটি নির্ভরযোগ্যতা, পরিসর, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে ডাকব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিবছর ‘র‌্যাংকিং’ প্রকাশ করে। এ র‌্যাংকিং থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছর ধরে ডাকব্যবস্থার অবনতি হচ্ছে। ২০১৬ সালে ১৭০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৮তম। র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে স্কোর ছিল ৩৯ দশমিক ৪৮।

অত্যন্ত আশঙ্কাজনক খবর, দেশে ডাকব্যবস্থার ক্রমাবনতির ফলে এর স্কোর ২০২১ সালে ১০ দশমিক ২-এ নেমে আসে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪৩তম। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ৭৮তম থেকে বাংলাদেশ নেমেছে ১৪৩তমে। আর তো অধঃপতনের জায়গা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি-নির্ধারকদের মন-মানসিকতা ডাকব্যস্থার উন্নয়নের বিপক্ষে। এর উন্নয়নের জন্য অন্যান্য দেশ যেভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, আমরা সেভাবে অতীতেও করিনি, এখনো করছি না। অবশ্য ডাকবিভাগ বলেছে, এখন ডাকব্যবস্থার ‘ডিজিটাইজেশন’ চলছে। এরই মধ্যে ‘ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার’ (ইএমটি), স্পিড পোস্ট, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড ইত্যাদি সেবা চালু হয়েছে।

বলা হচ্ছে, একে একে সব সেবা চালু করা হবে এবং তাদের সেবা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রশ্ন হলো, যদি কয়েকটি সেবা যদি চালু হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের ‘স্কোর’ ও র‌্যাংকিং হ্রাস পেল কেন? নির্ভরযোগ্যতা, পরিসর, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতা- এ চার সূচকে এখনো আমরা যে পেছনের দিকে, তা কি স্কোরই বলে দিচ্ছে না?

এরই মধ্যে আশার একটা খবর দেখলাম। খবরটি একটি বেসরকারি ব্যাংকের, সরকারি ব্যাংকের নয়। এ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তারা ৮ হাজার ৫০০ ডিজিটাল ডাকঘরে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারিত করবে। ডাকঘরে ইতোমধ্যেই বেশকিছু সেবা দেওয়া হচ্ছে। যেমন- ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমাদান, ডিপিএস বা মাসে মাসে জমা দেওয়া, এককালীন দীর্ঘমেয়াদি জমা, আঙুলের ছাপের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, চেক ইস্যু, ডেবিট কার্ড সেবা, ‘পিওএস’ টার্মিনাল ব্যবহারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, যে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা প্রদান, বৈদেশিক রেমিটেন্সের টাকা উত্তোলন, কৃষিঋণ প্রদান, পাসপোর্ট ফি প্রদান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বিমার প্রিমিয়াম প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং, ই-কমার্স ইত্যাদি।

যদি এতসব সেবা সত্যি সত্যি চালু হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকের এ কাজের জন্য তাদের ধন্যবাদ দিতেই হবে। তাদের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত লক্ষাধিক কাস্টমার ডিজিটাল ডাকঘরের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় করেছেন। গ্রামাঞ্চলে ঋণ দেওয়াও তারা শুরু করেছেন। আমার ধারণা, এতে উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর কাজের চাপ কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছোট সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকের নানা সেবা পাবে, যা থেকে তারা এতদিন বঞ্চিত ছিল।

এটা নিশ্চিতভাবেই সরকারি ব্যাংকগুলোর বড় ব্যর্থতা। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করার পর ব্যাংকগুলোর গ্রামে গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা উপজেলায় গিয়ে আটকা পড়ে। তাদের সেবা আর নিচের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সেবা পাননি। সে তুলনায় ডাকঘর মানুষের কাছাকাছি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব।

ডাকঘর ব্যবস্থা যেমন আমাদের অবহেলার শিকার, তেমনি আমাদের অবহেলার শিকার ছিল আরও দুটি অবকাঠামো খাত। বলা বাহুল্য, এ দুটি খাত হচ্ছে রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহণ। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে মনে হয়েছিল ‘রেলওয়ে’ পরিবহণের মাধ্যম আর থাকবে না। তখন সরকারের সব মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল সড়কপথের ওপর। নতুন নতুন রাস্তা বানাও, বাস আমদানি কর, ট্রাক আমদানি কর। যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও রাস্তা তৈরি হয়, যার রক্ষণাবেক্ষণ একটা সমস্যা। চলল বাস-ট্রাকের ব্যবসা।

রপ্তানিকারক দেশগুলো খুবই খুশি। সরকার এদিকে অনেক জায়গায় রেললাইন তুলে ফেলল, রেলপথ বন্ধ করল। অনেক রেলস্টেশন বন্ধ করা হলো। রেলের কোনো সংস্কার হলো না। নতুন বগি, ইঞ্জিন আমদানি বন্ধ। পুরোনোগুলোর মেরামতি বন্ধ। দৃশ্যতই বোঝা গেল সরকার রেলপথের উন্নয়ন চায় না, চায় সড়কপথ- বাস-ট্রাক-লরি। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের খরচ গেল অস্বাভাবিক হারে বেড়ে। এর বোঝা পড়ল অর্থনীতির ওপর, সাধারণ মানুষের ওপর, যা আজও বহন করতে হচ্ছে।

আশার কথা, বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। নতুন নতুন ইঞ্জিন ও বগি আমদানি হচ্ছে। নতুন রেললাইন স্থাপিত হচ্ছে। পুরোনো স্টেশন নতুন করে সজ্জিত করা হচ্ছে। নতুন নতুন আন্তঃজেলা ট্রেন চালু হচ্ছে। সরকার যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তা বোঝা যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ হচ্ছে। আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ হচ্ছে।

এসবের একটি ফল- পরিবহণ খরচ নিশ্চিতভাবে কমবে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এর সুবিধা পাবেন সাধারণ মানুষ। সেই সঙ্গে চলবে নদী ড্রেজিং। বেশকিছু নদী ড্রেজিংয়ের ফলে নৌপরিবহণ সহজতর হয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীগুলো নৌপরিবহণের উপযোগী করতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন