যার যার ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের কথা বলেছেন মহানবি (সা.)
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
যার যার ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের কথা বলেছেন মহানবি (সা.)

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

২৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগ যুগ ধরে পাক-ভারত উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলে আসছে। এ অবস্থায় আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও মাঝে-মধ্যেই অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর স্বাধীনতার পর এসব ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাধীনতার আগে একবার ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদ থেকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কেশগুচ্ছ চুরির কারণে কাশ্মীরসহ ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে কলকাতার মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের কারণে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মুসলমান পশ্চিমবঙ্গের বনগ্রাম সীমান্ত দিয়ে যশোরে প্রবেশ করেছিলেন। অতঃপর পূর্ব পাকিস্তানের খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা শুরু হলে হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সে সময় আমি স্কুলছাত্র ছিলাম। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে দেখি, হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু নারী-পুরুষ আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কারণ, তারা জানতে পেরেছেন সে রাতে রায়ট (সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা) হবে। ফলে তাদের কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এবং কিছুসংখ্যক আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

আর আমরা সারা রাত জেগে পাহারা দিয়েছিলাম, যদিও সেদিন আমরা তাদের ঘরবাড়ি রক্ষা করতে পারিনি! রাতের অন্ধকারে দাঙ্গাকারী গুণ্ডারা ঘরবাড়িতে লুটপাট চালানোর পর আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর সকালবেলা সেখানে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভস্মীভূত ঘরবাড়ির অবস্থা দেখে অল্প বয়সেই দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে আমার মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জন্মেছিল।

আমার জন্মস্থান পাবনার বাড়ির আশপাশে বেশকিছু হিন্দুর বসবাস ছিল। আর তারা প্রায় সবাই পাল এবং ঘোষ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। অবশিষ্ট যারা ছিলেন, তারা হিন্দিভাষী উড়িষ্যার উড়িয়া সম্প্রদায়ের, যাদের পেশা ছিল জাহাজ বা ইস্টিমারে সুকানির কাজ করা। ১৯৬৪ সালের সেই দাঙ্গায় আমার বাড়ির আশপাশের এসব মানুষের সব ঘরবাড়িই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে সে সময়ে এ দেশের বিহারি সম্প্রদায়সহ চোর, গুণ্ডা, বদমাশরাই কাজটিতে বেশি করে সম্পৃক্ত ছিল।

বাড়িঘর লুটপাট, জ্বালানো-পোড়ানো ছাড়াও সেদিন তারা মানুষও খুন করেছিল এবং আমার সহপাঠী বন্ধু পনুর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ সরকারকে সে রাতে তারা হত্যা করেছিল। নির্যাতিত-নিপীড়িত অসহায় মানুষের সেদিনের সেই কান্না আজও আমার হৃদয়কে আলোড়িত করে। মনে পড়ে, পাল বাড়ির মণি, ঘোষবাড়ির রবি, উড়িয়া সম্প্রদায়ের কেনুয়া, যাকে আমরা ‘মাউরা’ বলতাম তাদের কথা। কারণ তারা সবাই আমার বাল্যবন্ধু ছিল।

সে সময়ে ঘরবাড়ি হারানো এসব বন্ধুকে আমি আমার সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও করেছিলাম। কারণ তাদের কাউকে কাউকে সে সময়ে অভুক্ত থাকতে দেখেছি। অতঃপর, আওয়ামী লীগের সে সময়ের সাধারণ সম্পাদক এবং আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়ে সে সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখে দিয়েছিলেন।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, সেই পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে দরিদ্র ও নিুবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরাই বিশেষভাবে এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়েছেন এবং মূলত তারাই এসব দাঙ্গা-হাঙ্গামার টার্গেট। যেমন কয়দিন আগে পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ার জেলেপল্লিতে আগুন লাগিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করা হলো।

জেলে সম্প্রদায় একটি দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত জনগোষ্ঠী। নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে সেই মাছ হাটে-বাজারে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। আর সেই জেলেপল্লিই জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে সেসব নারী-পুরুষের দুরবস্থাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। আর এমন দুরবস্থা আমরা বহুকাল থেকেই দেখে আসছি এবং এসব দেখতে দেখতে যেন আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

যদিও এখন বলা হচ্ছে, এসব মানুষের ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানসন্ততি নিয়ে এখন তারা থাকবেন কোথায়? তা ছাড়া মাছ ধরার উপকরণ জালসহ সবকিছুই তো তাদের পুড়ে গেছে! ভবিষ্যতে তারা কী করে খাবেন?

অথচ ছোট একটি কারণ, বা বলা চলে অতি তুচ্ছ কারণে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। পাশের গ্রামের অল্পবয়সি একটি ছেলে ফেসবুকে ধর্ম সম্পর্কে কিছু একটা মন্তব্য করায় অন্য গ্রামের জেলেপল্লি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো! আর ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে কত ব্যক্তিই তো সমাজ, দেশ, জাতি, সংগঠন এমনকি ধর্ম সম্পর্কেও অনেক কিছু বলেন বা লেখেন।

এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাব গ্রহণ করা উচিত কিনা সে বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট সবার ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করি। যদিও ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে কোনো বক্তব্য বা লেখালেখি কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এসব যারা করে থাকেন, উপযুক্ত শাস্তিই তাদের প্রাপ্য; তবে সে কাজটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই করতে দেওয়া উচিত। এভাবে একজনের অপরাধে অন্যজনের বা ভিনগাঁয়ের মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া কোনোমতেই উচিত নয়।

ধর্ম মানবসমাজের জন্য সৃষ্টিকর্তা নির্দেশিত একটি অলঙ্ঘনীয় গাইডলাইন। যেমন ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত তথ্যগুলো মানুষের জন্য একটি ‘কমপ্লিট কোড অব লাইফ’। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানই মনেপ্রাণে কথাটি বিশ্বাস, তথা ধারণ করে জীবনযাপন করেন। সুতরাং তার সে বিশ্বাসে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। আর কেউ তা করলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবাদ, প্রতিকার হবে এবং সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কোনো ছেলে-ছোকরা বা ফালতু কোনো লোক যদি ছোটখাটো কোনো ভুল, অন্যায় বা পাগলামি করে থাকে, সে ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়াই ভালো। আর তা না করে এসব নিয়ে মতলববাজি বা রাজনীতি করাও অন্যায়। অথচ আমাদের দেশে হরহামেশা এমনটিই ঘটে থাকে। একদল অন্যদলের ওপর দোষ চাপিয়ে ব্লেম গেম খেলে। বতর্মান অবস্থায় কুমিল্লা থেকে শুরু করে পীরগঞ্জের ঘটনা নিয়েও একই ঘটনা ঘটে চলেছে।

দেউলিয়া রাজনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করা হচ্ছে! দুর্গাপূজার সময় পুলিশসহ পূজা কমিটি এবং সরকারি দলের নেতাকর্মীরা আরও সজাগ থাকলে এমন দুষ্কর্ম ঘটানো সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে কুমিল্লার ঘটনায় পূজামণ্ডপে পালাক্রমে ভলানটিয়ার থাকা উচিত ছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি আরও সচেতন ভূমিকা পালন করতে পারতেন। তা ছাড়া রাতে সেখানে অন্তত দুজন পুলিশ রাখা যেত।

অথচ সেসব করা হয়নি বা করা সম্ভব হয়নি। আর সে সুযোগে রাতে পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন রাখার মতো জঘন্য কাণ্ড ঘটানো হয়েছে! তার মানে এ দাঁড়ায়, রাতে পূজামণ্ডপ অরক্ষিত ছিল। ফলে সেখানে যা খুশি ঘটানো যেত। পূজামণ্ডপসহ মূর্তিগুলোর ক্ষতি করা যেত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পূজা কমিটিসহ স্থানীয় প্রশাসন এমন সুযোগটিই বা অবারিত রেখেছিলেন কেন? যাক সে কথা। যেহেতু ধর্ম নিয়ে আমাদের দেশে বহুকাল ধরে রাজনীতি এবং এক ধরনের ব্যবসা চলে আসছে, সুতরাং এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের শুভবুদ্ধি কামনা করা ছাড়া আমাদের বলার বা করার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

তবে এ কথা ঠিক, ধর্ম সম্পর্কে সব শ্রেণির মানুষেরই সঠিক এবং সম্যক ধ্যান-ধারণা থাকলে স্বার্থান্বেষী মহল এক্ষেত্রে ফায়দা লুটতে পারত না। বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষের জন্য সাধারণ শিক্ষাসহ ধর্ম সম্বন্ধে সঠিক শিক্ষার প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি কোনোদিন মন্দির পোড়ানো বা পবিত্র কুরআন অবমাননার মতো কাজ করতে পারেন না। একমাত্র ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবেই আমাদের এ উপমহাদেশে ধর্ম নিয়ে আজও উন্মাদনা সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।

সনাতন ধর্ম বা সাধারণভাবে আমরা যাকে হিন্দু ধর্ম বলে থাকি, তা অত্যন্ত প্রাচীন। আর দুর্গাপূজা এ ধর্মেরই একটি অংশ; যা বাঙালি হিন্দুদের বৃহত্তম উৎসব। ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ কর্তৃক প্রথম দুর্গাপূজার প্রবর্তন ঘটে। অনেকের মতে, তিনিই সর্বপ্রথম বাংলায় দুর্গাপূজা চালু করেন। তিনি ছিলেন বাংলার বীর বারো ভূঁইয়াদের একজন। তারপর কলকাতাসহ সারা বাংলায় দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় বড় জমিদার পাল্লা দিয়ে এ পূজার আয়োজন করতে থাকেন।

১৮৩০ সালে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। আর এভাবেই সারা বাংলায় দুর্গাপূজা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায় এ সময়টার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করেন। সুতরাং তাদের এ পূজা তথা ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি আমাদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবারই সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।

আমাদের মহান ধর্ম ইসলাম এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে দু-একটি কথা বলেই লেখাটি শেষ করব। আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় গিয়ে দেখেন, সেখানে ইহুদি ধর্মের লোকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তখন তিনি তাদের সঙ্গে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করে মন জয় করেন। তিনি অপরের ধর্মকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে যার যার ধর্ম পালনের অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। সুরা কাফিরুনের শেষ অংশে মহান আল্লাহ কর্তৃকও সেই কথাই বলা হয়েছে, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’। অতঃপর এ দেশে, সবাই নিজ নিজ ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবেন তেমনটিই প্রত্যাশা।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

যার যার ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের কথা বলেছেন মহানবি (সা.)

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
২৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগ যুগ ধরে পাক-ভারত উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলে আসছে। এ অবস্থায় আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও মাঝে-মধ্যেই অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর স্বাধীনতার পর এসব ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাধীনতার আগে একবার ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদ থেকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কেশগুচ্ছ চুরির কারণে কাশ্মীরসহ ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে কলকাতার মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের কারণে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মুসলমান পশ্চিমবঙ্গের বনগ্রাম সীমান্ত দিয়ে যশোরে প্রবেশ করেছিলেন। অতঃপর পূর্ব পাকিস্তানের খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা শুরু হলে হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সে সময় আমি স্কুলছাত্র ছিলাম। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে দেখি, হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু নারী-পুরুষ আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কারণ, তারা জানতে পেরেছেন সে রাতে রায়ট (সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা) হবে। ফলে তাদের কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এবং কিছুসংখ্যক আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

আর আমরা সারা রাত জেগে পাহারা দিয়েছিলাম, যদিও সেদিন আমরা তাদের ঘরবাড়ি রক্ষা করতে পারিনি! রাতের অন্ধকারে দাঙ্গাকারী গুণ্ডারা ঘরবাড়িতে লুটপাট চালানোর পর আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর সকালবেলা সেখানে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভস্মীভূত ঘরবাড়ির অবস্থা দেখে অল্প বয়সেই দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে আমার মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জন্মেছিল।

আমার জন্মস্থান পাবনার বাড়ির আশপাশে বেশকিছু হিন্দুর বসবাস ছিল। আর তারা প্রায় সবাই পাল এবং ঘোষ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। অবশিষ্ট যারা ছিলেন, তারা হিন্দিভাষী উড়িষ্যার উড়িয়া সম্প্রদায়ের, যাদের পেশা ছিল জাহাজ বা ইস্টিমারে সুকানির কাজ করা। ১৯৬৪ সালের সেই দাঙ্গায় আমার বাড়ির আশপাশের এসব মানুষের সব ঘরবাড়িই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে সে সময়ে এ দেশের বিহারি সম্প্রদায়সহ চোর, গুণ্ডা, বদমাশরাই কাজটিতে বেশি করে সম্পৃক্ত ছিল।

বাড়িঘর লুটপাট, জ্বালানো-পোড়ানো ছাড়াও সেদিন তারা মানুষও খুন করেছিল এবং আমার সহপাঠী বন্ধু পনুর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ সরকারকে সে রাতে তারা হত্যা করেছিল। নির্যাতিত-নিপীড়িত অসহায় মানুষের সেদিনের সেই কান্না আজও আমার হৃদয়কে আলোড়িত করে। মনে পড়ে, পাল বাড়ির মণি, ঘোষবাড়ির রবি, উড়িয়া সম্প্রদায়ের কেনুয়া, যাকে আমরা ‘মাউরা’ বলতাম তাদের কথা। কারণ তারা সবাই আমার বাল্যবন্ধু ছিল।

সে সময়ে ঘরবাড়ি হারানো এসব বন্ধুকে আমি আমার সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও করেছিলাম। কারণ তাদের কাউকে কাউকে সে সময়ে অভুক্ত থাকতে দেখেছি। অতঃপর, আওয়ামী লীগের সে সময়ের সাধারণ সম্পাদক এবং আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়ে সে সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখে দিয়েছিলেন।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, সেই পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে দরিদ্র ও নিুবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরাই বিশেষভাবে এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়েছেন এবং মূলত তারাই এসব দাঙ্গা-হাঙ্গামার টার্গেট। যেমন কয়দিন আগে পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ার জেলেপল্লিতে আগুন লাগিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করা হলো।

জেলে সম্প্রদায় একটি দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত জনগোষ্ঠী। নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে সেই মাছ হাটে-বাজারে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। আর সেই জেলেপল্লিই জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে সেসব নারী-পুরুষের দুরবস্থাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। আর এমন দুরবস্থা আমরা বহুকাল থেকেই দেখে আসছি এবং এসব দেখতে দেখতে যেন আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

যদিও এখন বলা হচ্ছে, এসব মানুষের ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানসন্ততি নিয়ে এখন তারা থাকবেন কোথায়? তা ছাড়া মাছ ধরার উপকরণ জালসহ সবকিছুই তো তাদের পুড়ে গেছে! ভবিষ্যতে তারা কী করে খাবেন?

অথচ ছোট একটি কারণ, বা বলা চলে অতি তুচ্ছ কারণে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। পাশের গ্রামের অল্পবয়সি একটি ছেলে ফেসবুকে ধর্ম সম্পর্কে কিছু একটা মন্তব্য করায় অন্য গ্রামের জেলেপল্লি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো! আর ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে কত ব্যক্তিই তো সমাজ, দেশ, জাতি, সংগঠন এমনকি ধর্ম সম্পর্কেও অনেক কিছু বলেন বা লেখেন।

এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাব গ্রহণ করা উচিত কিনা সে বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট সবার ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করি। যদিও ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে কোনো বক্তব্য বা লেখালেখি কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এসব যারা করে থাকেন, উপযুক্ত শাস্তিই তাদের প্রাপ্য; তবে সে কাজটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই করতে দেওয়া উচিত। এভাবে একজনের অপরাধে অন্যজনের বা ভিনগাঁয়ের মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া কোনোমতেই উচিত নয়।

ধর্ম মানবসমাজের জন্য সৃষ্টিকর্তা নির্দেশিত একটি অলঙ্ঘনীয় গাইডলাইন। যেমন ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত তথ্যগুলো মানুষের জন্য একটি ‘কমপ্লিট কোড অব লাইফ’। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানই মনেপ্রাণে কথাটি বিশ্বাস, তথা ধারণ করে জীবনযাপন করেন। সুতরাং তার সে বিশ্বাসে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। আর কেউ তা করলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবাদ, প্রতিকার হবে এবং সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কোনো ছেলে-ছোকরা বা ফালতু কোনো লোক যদি ছোটখাটো কোনো ভুল, অন্যায় বা পাগলামি করে থাকে, সে ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়াই ভালো। আর তা না করে এসব নিয়ে মতলববাজি বা রাজনীতি করাও অন্যায়। অথচ আমাদের দেশে হরহামেশা এমনটিই ঘটে থাকে। একদল অন্যদলের ওপর দোষ চাপিয়ে ব্লেম গেম খেলে। বতর্মান অবস্থায় কুমিল্লা থেকে শুরু করে পীরগঞ্জের ঘটনা নিয়েও একই ঘটনা ঘটে চলেছে।

দেউলিয়া রাজনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করা হচ্ছে! দুর্গাপূজার সময় পুলিশসহ পূজা কমিটি এবং সরকারি দলের নেতাকর্মীরা আরও সজাগ থাকলে এমন দুষ্কর্ম ঘটানো সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে কুমিল্লার ঘটনায় পূজামণ্ডপে পালাক্রমে ভলানটিয়ার থাকা উচিত ছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি আরও সচেতন ভূমিকা পালন করতে পারতেন। তা ছাড়া রাতে সেখানে অন্তত দুজন পুলিশ রাখা যেত।

অথচ সেসব করা হয়নি বা করা সম্ভব হয়নি। আর সে সুযোগে রাতে পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন রাখার মতো জঘন্য কাণ্ড ঘটানো হয়েছে! তার মানে এ দাঁড়ায়, রাতে পূজামণ্ডপ অরক্ষিত ছিল। ফলে সেখানে যা খুশি ঘটানো যেত। পূজামণ্ডপসহ মূর্তিগুলোর ক্ষতি করা যেত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পূজা কমিটিসহ স্থানীয় প্রশাসন এমন সুযোগটিই বা অবারিত রেখেছিলেন কেন? যাক সে কথা। যেহেতু ধর্ম নিয়ে আমাদের দেশে বহুকাল ধরে রাজনীতি এবং এক ধরনের ব্যবসা চলে আসছে, সুতরাং এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের শুভবুদ্ধি কামনা করা ছাড়া আমাদের বলার বা করার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

তবে এ কথা ঠিক, ধর্ম সম্পর্কে সব শ্রেণির মানুষেরই সঠিক এবং সম্যক ধ্যান-ধারণা থাকলে স্বার্থান্বেষী মহল এক্ষেত্রে ফায়দা লুটতে পারত না। বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষের জন্য সাধারণ শিক্ষাসহ ধর্ম সম্বন্ধে সঠিক শিক্ষার প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি কোনোদিন মন্দির পোড়ানো বা পবিত্র কুরআন অবমাননার মতো কাজ করতে পারেন না। একমাত্র ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবেই আমাদের এ উপমহাদেশে ধর্ম নিয়ে আজও উন্মাদনা সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।

সনাতন ধর্ম বা সাধারণভাবে আমরা যাকে হিন্দু ধর্ম বলে থাকি, তা অত্যন্ত প্রাচীন। আর দুর্গাপূজা এ ধর্মেরই একটি অংশ; যা বাঙালি হিন্দুদের বৃহত্তম উৎসব। ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ কর্তৃক প্রথম দুর্গাপূজার প্রবর্তন ঘটে। অনেকের মতে, তিনিই সর্বপ্রথম বাংলায় দুর্গাপূজা চালু করেন। তিনি ছিলেন বাংলার বীর বারো ভূঁইয়াদের একজন। তারপর কলকাতাসহ সারা বাংলায় দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় বড় জমিদার পাল্লা দিয়ে এ পূজার আয়োজন করতে থাকেন।

১৮৩০ সালে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। আর এভাবেই সারা বাংলায় দুর্গাপূজা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায় এ সময়টার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করেন। সুতরাং তাদের এ পূজা তথা ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি আমাদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবারই সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।

আমাদের মহান ধর্ম ইসলাম এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে দু-একটি কথা বলেই লেখাটি শেষ করব। আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় গিয়ে দেখেন, সেখানে ইহুদি ধর্মের লোকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তখন তিনি তাদের সঙ্গে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করে মন জয় করেন। তিনি অপরের ধর্মকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে যার যার ধর্ম পালনের অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। সুরা কাফিরুনের শেষ অংশে মহান আল্লাহ কর্তৃকও সেই কথাই বলা হয়েছে, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’। অতঃপর এ দেশে, সবাই নিজ নিজ ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবেন তেমনটিই প্রত্যাশা।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন