জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই...
jugantor
কিছুমিছু
জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই...

  মোকাম্মেল হোসেন  

২৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা

কেয়ারটেকার লোকটা খারাপ না। ফিরোজ মিয়া তাকে পছন্দ করে ফেলল। ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে শুকতারা ছিল। সে ঘুরেফিরে সবকিছু দেখার পর বাড়ি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে স্বামীকে সবুজ সংকেত দিল। কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর কেয়ারটেকারের কাছে ফিরোজ মিয়া জানতে চাইল-

: তোমার মালিক কী করেন?

: টুকটাক রাজনীতি করেন।

: আর কিছু করেন না?

: নাহ্।

: না মানে?

: ঢাকা শহরে যার বাড়ি আছে, তার আর কিছু করার প্রয়োজন আছে কি?

: তা অবশ্য ঠিক।

ফিরোজ মিয়া কেয়ারটেকারের সঙ্গে একমত পোষণ করল। ঢাকা শহরের তাবৎ ভাড়াটিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে কণ্ঠস্বরে বেদনাভাব ফুটিয়ে তুলে সে বলল-

: ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা হচ্ছেন এ যুগের জমিদার। তারা কর্মে নিযুক্ত হবেন কোন দুঃখে? কর্ম করব আমরা। হাড়-মাংস ক্ষয় করা কর্মের ফসল মাস শেষে খাজনা হিসাবে তাদের হাতে তুলে দেব। সেই খাজনায় তারা নিশ্চিন্তে জীবন কাটাবেন।

ফিরোজ মিয়ার কথা শুনে কেয়ারটেকার ফ্যাচফ্যাচ শব্দে হাসতে থাকে। শুকতারা ভ্রু কুঁচকাল। ফিরোজ মিয়া পুনরায় কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করতেই শুকতারা বাধা দিয়ে বলল-

: তোমার অত লেকচার দেওয়ার প্রয়োজন কী? মুরদ থাকলে তুমিও ঢাকা শহরে একটা না, পাঁচটা বাড়ি বানাও; কে নিষেধ করতেছে?

শুকতারার দাবড়ানি খেয়ে ফিরোজ মিয়া প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসা করল-

: তোমার বাড়িওয়ালার নাম কী?

: স্যারের নাম নজর আলী পেট্টু ভাই।

বাড়িওয়ালার নাম শুনে শুকতারা হেসে ফেলল। বলল-

: পেট্টু ভাই কী রকম নাম! খুব পেটুক নাকি?

শুকতারার অনুমান সত্য। পেট্টু ভাই সাংঘাতিক রকমের পেটুক মানুষ। মূলত খাই-খাই স্বভাবের জন্যই এলাকার লোকজন তাকে পেট্টু ভাই বলে ডাকে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দল ক্ষমতায় আসার পর পেট্টু ভাই খাওয়ার গতি একটু কমিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, দলের জনপ্রিয়তার এ চাদর অন্তত ২০ বছরের মধ্যে ফুটা হবে না। কাজেই খাওয়াদাওয়ার কাজটা ধীরে-সুস্থে করাই ভালো। কিন্তু তিন বছর অতিক্রান্ত হতেই পাবলিকের সেন্টিমেন্ট দেখে তিনি বুঝে ফেলেছেন, গতি কমিয়ে আয়েশ করে খাওয়ার পরিকল্পনা করলে শেষে শুকনা হাড্ডি চুষতে হবে। কাজেই কারবার যা করার নগদ নগদ করে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পেট্টু ভাই ঘোষণা দিলেন, তার এলাকা দিয়ে একটা মাছি উড়ে গেলেও তাকে খাজনা পরিশোধ করতে হবে। পেট্টু ভাইয়ের এ ঘোষণা অক্ষরে অক্ষরে তামিল করার জন্য কর্মীবাহিনী প্রবল বিক্রমে কাজ শুরু করে দিল। একদিন একদল কর্মী একটা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হানা দেওয়ার পর তাদের চাহিদা শুনে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বললেন-

: আমি চাঁদা দেব কেন? এটা তো কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সেবা করা হয়।

নির্বাহীর কথা শোনার পর অনেক কষ্টে রাগ দমন করে একজন কর্মী বলল-

: এইখানে জনসেবা হইতেছে, না প্রাণীসেবা হইতেছে; সেইটা আমাদের দেখার বিষয় না। আপনে পেট্টু ভাইয়ের এলাকায় দোকান খুইলা বসছেন, এইটাই বড় কথা। কাজেই রেগুলার বেসিসে চাঁদা আপনাকে দিতেই হবে। যদি এই সিস্টেমে চলতে পারেন, তাহলে দোকান খোলা রাখেন। আর যদি চলতে না পারেন, তাহলে খোদা হাফেজ। আজকের মধ্যে দোকান বন্ধ কইরা বাড়ির রাস্তা ধরেন।

কর্মীর কথা শুনে নির্বাহী আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন-

: এখানে কেউ দোকানদারি করে না।

নির্বাহীর কথার উত্তরে অন্য একজন কর্মী বলে ওঠল-

: শুনেন, আপনে জনগোষ্ঠীর সেবা করতেছেন-এতে আপনের সুখ আছে, মানবতা আছে; সঙ্গে ধান্ধাও আছে। আপনের ধান্ধায় পেট্টু ভাইয়েরও তো একটা হিস্যা থাকা উচিত। বলেন, উচিত কি না?

এ সময় পেট্টুবাহিনীর একজনের কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবারের একাংশ হঠাৎ জামার ওপরে উঁকি মারায় নির্বাহী তাদের কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি দাবি পূরণে সম্মত হলেন।

এর কয়েকদিন পর পেট্টু ভাইয়ের অন্য একটি কর্মী দল নির্মাণাধীন একটা বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। মালিক নিজেই বাড়ির কাজ তদারকি করছিলেন। কয়েকজন তরুণকে এভাবে হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন-

: কী ব্যাপার!

: ব্যাপার গুরুতর। এই এলাকায় বাড়ি করার আগে আপনে পেট্টু ভাইয়ের দোয়া নিতে গেছিলেন?

: পেট্টু ভাই কে!

: লে হালুয়া! এই এলাকায় বাড়ি খাঁড়া করতেছেন মাগার পেট্টু ভাইরে চেনেন না; আশ্চর্য হইলাম।

: ভাই, আমি এখানকার স্থানীয় না। এই এলাকায় নতুন আসছি।

লোকটার কথা শুনে কর্মীটি মাথা ঝাঁকাল। নেতাগোছের একজনের দিকে তাকিয়ে বলল-

: গুরু, নতুন আমদানি; কী করবা?

: নতুন যখন, তখন আর কী করবি? মাফ কইরা দিয়া পেট্টু ভাইয়ের নিয়মকানুন সব বুঝাইয়া বল।

লোকটাকে পেট্টু ভাইয়ের নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলা হলো। নিয়ম অনুযায়ী আজ সন্ধ্যায় নগদ সেলামিসহ পেট্টু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এটা ফরজ। একজন কর্মী এ ব্যাপারে তাকে সাবধান করার পর বলল-

: না গেলে কইলাম খবর আছে।

মাস শেষে দেখা গেল, সাঁড়াশি অভিযানে ভালোই ফল পাওয়া গেছে। গত মাসের তুলনায় এ মাসে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু পেট্টো ভাই এতেও তুষ্ট নন। আয়ের পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বাড়ানোর উপায় বের করার জন্য তিনি উপদেষ্টা পরিষদের মিটিং ডাকলেন। উপদেষ্টাদের সামনে সূচনা বক্তব্য প্রদানকালে পেট্টু ভাই বললেন-

: জীবনের ঘাটে-ঘাটে কতকিছু যে শেখার আছে, সেইটা ভাবলে আমি বিমোহিত হই। আপনাদের একটা শিক্ষণীয় ঘটনা বলি। কয়েকদিন আগে জ্যামে আটকা পইড়া গাড়িতে বইসা রইছি। আমার গাড়ির পাশেই একটা বাস দাঁড়ানো ছিল। জ্যাম একটু নড়াচড়া করতেই শুনি সেই বাসের হেলপার ড্রাইভারের উদ্দেশে বলতেছে, ‘ওস্তাদ, গিয়ার লাগান।’ হেলপারের কথা শোনার পর বিষয়টা সাংঘাতিকভাবে আমার ব্রেনে ক্যাচ করল-আরে! আমাদেরও তো টাইম প্রায় হওয়ার পথে। এখন গাড়িতে গিয়ার লাগাইয়া উড়াধুড়া চাক্কা না ঘুরাইলে পরে পস্তাইতে হবে। বিষয়টা বুঝতে পারছেন তো?

উপদেষ্টারা মাথা ঝাঁকালেন। তারা পেট্টু ভাইয়ের কথা বুঝতে পেরেছেন। পেট্টু ভাই বললেন-

: এইবার আপনেরা আমারে হাইস্পিডে চাক্কা ঘুরানোর কলাকৌশল বাতলাইয়া দেন।

উপদেষ্টারা কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন। একপর্যায়ে একজন উপদেষ্টা গলা ঝেড়ে বললেন-

: এতদিন ‘নজর আলী পেট্টু ভাই-নজর পড়লে রক্ষা নাই’-এই স্লোগান সামনে রাইখা আমরা রাস্তা-ব্রিজ-কালভার্ট, ভবনসহ সব ধরনের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার কবজা করা ছাড়াও ফুটপাত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নতুন বাড়ি-নতুন গাড়ি, এমনকী নতুন বিয়াশাদিতেও দোয়া বিতরণ করছি। এইবার ‘জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই’ এই স্লোগান লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়তে হবে। এই বিষয়ে আমার একটা প্রস্তাবনা আছে।

উপদেষ্টার কথা শুনে পেট্টু ভাই খোশমেজাজে জানতে চাইলেন-

: কী প্রস্তাবনা, বলেন।

: আমাদের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য কয়েক লাখ টিনের ডিব্বার প্রয়োজন হবে।

ডিব্বার কথা শুনে অন্য উপদেষ্টারা খুবই অবাক হলেন। পেট্টু ভাইও অবাক হলেন; সেই সঙ্গে মজাও পেলেন খুব। মিটিমিটি হেসে তিনি বললেন-

: ডিব্বা লাগবে কীজন্য?

উপদেষ্টা তার পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে বললেন-

: আমরা এই এলাকায় বসবাসরত প্রতিটি পরিবারে ‘জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই’ লেখা সংবলিত একটা করে টিনের ডিব্বা সরবরাহ করব। এরপর প্রতিমাসের শেষদিন আমাদের কর্মীবাহিনী এসব ডিব্বায় জমা হওয়া টাকাপয়সা সংগ্রহ করবে। প্রত্যেক পরিবারের প্রতি নির্দেশ থাকবে-ছাত্রছাত্রীরা যেন ডিব্বায় প্রতিদিন ৫০ টাকা করে বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখে। আমি মনে করি, এর ফলে তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের একটা সু-অভ্যাস গড়ে ওঠবে। পরিবারের কর্তারা যতবার বাজারে যাবে, ততবার ডিব্বার মধ্যে ১০০ টাকা করে রাখবে। এতে তারা বাজার বাবদ কম টাকা খরচ করতে বাধ্য হবে। কম বাজার মানেই কম খাওয়াদাওয়া। পেট্টু ভাইয়ের কল্যাণে কম খেলে তাদের স্বাস্থ্য নিশ্চিতভাবে ভালো থাকবে। এরপর পরিবারের যারা গৃহিণী, তারা প্রতিবার শপিংয়ে যাওয়ার আগে টিনের ডিব্বায় ২০০ টাকা জমা রাখবে। এভাবে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনে মিতব্যয়িতার চর্চা করার সুযোগ পাবে। সরকারি চাকরিজীবীরা অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন ডিব্বার মধ্যে ৩০০ টাকা করে জমা রাখবে। এতে ঘুসখোররা বিবেকের দংশন থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। তারা মনে করবে, ঘুস আমি একাই খাচ্ছি না; নির্মল চরিত্রের মানুষ পেট্টু ভাইও ঘুসের একটা ভাগ পাচ্ছে। পরিবারের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী, তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় ৫০০ টাকা করে ডিব্বার মধ্যে ফেলবে। এর ফলে অতি মুনাফাজনিত কারণে তারা যে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে, এর অবসান ঘটবে। তারা এই ভেবে শান্তি পাবে, অন্যায়ভাবে সংগৃহীত আমার মুনাফার একটা ভাগ জননেতা পেট্টু ভাইও পাচ্ছে। আর পেট্টু ভাইয়ের পাওয়া মানেই দেশের পাওয়া। দেশের কাজে লাগা। বেকার ও কাজের বুয়াদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সিলিং নেই। তবে চাইলে তারাও আমাদের এ মহৎ উদ্যোগে শামিল হতে পারবে। বন্ধুরা, এভাবে অগ্রসর হলে আমরা চাঁদাবাজি করেও প্রত্যেক মানুষের উপকার করতে পারব। সমাজের উপকার করতে পারব। দেশের উপকার করতে পারব। আর এজন্যই এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে-জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই।

পরিকল্পনা শোনার পর অন্য উপদেষ্টারা হাততালি দিলেন। পেট্টু ভাই সপ্রশংস দৃষ্টিতে পরিকল্পনা পেশকারীর উদ্দেশে বললেন-

: তোফা পরিকল্পনা। একেবারে সময়োপযোগী একটা জিনিস আপনে পয়দা করছেন। পোলাপান, তোমরা আজ থেকেই কর্মে লিপ্ত হইয়া পড়...

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

কিছুমিছু

জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই...

 মোকাম্মেল হোসেন 
২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা
প্রতীকী ছবি

কেয়ারটেকার লোকটা খারাপ না। ফিরোজ মিয়া তাকে পছন্দ করে ফেলল। ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে শুকতারা ছিল। সে ঘুরেফিরে সবকিছু দেখার পর বাড়ি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে স্বামীকে সবুজ সংকেত দিল। কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর কেয়ারটেকারের কাছে ফিরোজ মিয়া জানতে চাইল-

: তোমার মালিক কী করেন?

: টুকটাক রাজনীতি করেন।

: আর কিছু করেন না?

: নাহ্।

: না মানে?

: ঢাকা শহরে যার বাড়ি আছে, তার আর কিছু করার প্রয়োজন আছে কি?

: তা অবশ্য ঠিক।

ফিরোজ মিয়া কেয়ারটেকারের সঙ্গে একমত পোষণ করল। ঢাকা শহরের তাবৎ ভাড়াটিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে কণ্ঠস্বরে বেদনাভাব ফুটিয়ে তুলে সে বলল-

: ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা হচ্ছেন এ যুগের জমিদার। তারা কর্মে নিযুক্ত হবেন কোন দুঃখে? কর্ম করব আমরা। হাড়-মাংস ক্ষয় করা কর্মের ফসল মাস শেষে খাজনা হিসাবে তাদের হাতে তুলে দেব। সেই খাজনায় তারা নিশ্চিন্তে জীবন কাটাবেন।

ফিরোজ মিয়ার কথা শুনে কেয়ারটেকার ফ্যাচফ্যাচ শব্দে হাসতে থাকে। শুকতারা ভ্রু কুঁচকাল। ফিরোজ মিয়া পুনরায় কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করতেই শুকতারা বাধা দিয়ে বলল-

: তোমার অত লেকচার দেওয়ার প্রয়োজন কী? মুরদ থাকলে তুমিও ঢাকা শহরে একটা না, পাঁচটা বাড়ি বানাও; কে নিষেধ করতেছে?

শুকতারার দাবড়ানি খেয়ে ফিরোজ মিয়া প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসা করল-

: তোমার বাড়িওয়ালার নাম কী?

: স্যারের নাম নজর আলী পেট্টু ভাই।

বাড়িওয়ালার নাম শুনে শুকতারা হেসে ফেলল। বলল-

: পেট্টু ভাই কী রকম নাম! খুব পেটুক নাকি?

শুকতারার অনুমান সত্য। পেট্টু ভাই সাংঘাতিক রকমের পেটুক মানুষ। মূলত খাই-খাই স্বভাবের জন্যই এলাকার লোকজন তাকে পেট্টু ভাই বলে ডাকে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দল ক্ষমতায় আসার পর পেট্টু ভাই খাওয়ার গতি একটু কমিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, দলের জনপ্রিয়তার এ চাদর অন্তত ২০ বছরের মধ্যে ফুটা হবে না। কাজেই খাওয়াদাওয়ার কাজটা ধীরে-সুস্থে করাই ভালো। কিন্তু তিন বছর অতিক্রান্ত হতেই পাবলিকের সেন্টিমেন্ট দেখে তিনি বুঝে ফেলেছেন, গতি কমিয়ে আয়েশ করে খাওয়ার পরিকল্পনা করলে শেষে শুকনা হাড্ডি চুষতে হবে। কাজেই কারবার যা করার নগদ নগদ করে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পেট্টু ভাই ঘোষণা দিলেন, তার এলাকা দিয়ে একটা মাছি উড়ে গেলেও তাকে খাজনা পরিশোধ করতে হবে। পেট্টু ভাইয়ের এ ঘোষণা অক্ষরে অক্ষরে তামিল করার জন্য কর্মীবাহিনী প্রবল বিক্রমে কাজ শুরু করে দিল। একদিন একদল কর্মী একটা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হানা দেওয়ার পর তাদের চাহিদা শুনে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বললেন-

: আমি চাঁদা দেব কেন? এটা তো কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সেবা করা হয়।

নির্বাহীর কথা শোনার পর অনেক কষ্টে রাগ দমন করে একজন কর্মী বলল-

: এইখানে জনসেবা হইতেছে, না প্রাণীসেবা হইতেছে; সেইটা আমাদের দেখার বিষয় না। আপনে পেট্টু ভাইয়ের এলাকায় দোকান খুইলা বসছেন, এইটাই বড় কথা। কাজেই রেগুলার বেসিসে চাঁদা আপনাকে দিতেই হবে। যদি এই সিস্টেমে চলতে পারেন, তাহলে দোকান খোলা রাখেন। আর যদি চলতে না পারেন, তাহলে খোদা হাফেজ। আজকের মধ্যে দোকান বন্ধ কইরা বাড়ির রাস্তা ধরেন।

কর্মীর কথা শুনে নির্বাহী আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন-

: এখানে কেউ দোকানদারি করে না।

নির্বাহীর কথার উত্তরে অন্য একজন কর্মী বলে ওঠল-

: শুনেন, আপনে জনগোষ্ঠীর সেবা করতেছেন-এতে আপনের সুখ আছে, মানবতা আছে; সঙ্গে ধান্ধাও আছে। আপনের ধান্ধায় পেট্টু ভাইয়েরও তো একটা হিস্যা থাকা উচিত। বলেন, উচিত কি না?

এ সময় পেট্টুবাহিনীর একজনের কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবারের একাংশ হঠাৎ জামার ওপরে উঁকি মারায় নির্বাহী তাদের কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি দাবি পূরণে সম্মত হলেন।

এর কয়েকদিন পর পেট্টু ভাইয়ের অন্য একটি কর্মী দল নির্মাণাধীন একটা বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। মালিক নিজেই বাড়ির কাজ তদারকি করছিলেন। কয়েকজন তরুণকে এভাবে হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন-

: কী ব্যাপার!

: ব্যাপার গুরুতর। এই এলাকায় বাড়ি করার আগে আপনে পেট্টু ভাইয়ের দোয়া নিতে গেছিলেন?

: পেট্টু ভাই কে!

: লে হালুয়া! এই এলাকায় বাড়ি খাঁড়া করতেছেন মাগার পেট্টু ভাইরে চেনেন না; আশ্চর্য হইলাম।

: ভাই, আমি এখানকার স্থানীয় না। এই এলাকায় নতুন আসছি।

লোকটার কথা শুনে কর্মীটি মাথা ঝাঁকাল। নেতাগোছের একজনের দিকে তাকিয়ে বলল-

: গুরু, নতুন আমদানি; কী করবা?

: নতুন যখন, তখন আর কী করবি? মাফ কইরা দিয়া পেট্টু ভাইয়ের নিয়মকানুন সব বুঝাইয়া বল।

লোকটাকে পেট্টু ভাইয়ের নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলা হলো। নিয়ম অনুযায়ী আজ সন্ধ্যায় নগদ সেলামিসহ পেট্টু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এটা ফরজ। একজন কর্মী এ ব্যাপারে তাকে সাবধান করার পর বলল-

: না গেলে কইলাম খবর আছে।

মাস শেষে দেখা গেল, সাঁড়াশি অভিযানে ভালোই ফল পাওয়া গেছে। গত মাসের তুলনায় এ মাসে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু পেট্টো ভাই এতেও তুষ্ট নন। আয়ের পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বাড়ানোর উপায় বের করার জন্য তিনি উপদেষ্টা পরিষদের মিটিং ডাকলেন। উপদেষ্টাদের সামনে সূচনা বক্তব্য প্রদানকালে পেট্টু ভাই বললেন-

: জীবনের ঘাটে-ঘাটে কতকিছু যে শেখার আছে, সেইটা ভাবলে আমি বিমোহিত হই। আপনাদের একটা শিক্ষণীয় ঘটনা বলি। কয়েকদিন আগে জ্যামে আটকা পইড়া গাড়িতে বইসা রইছি। আমার গাড়ির পাশেই একটা বাস দাঁড়ানো ছিল। জ্যাম একটু নড়াচড়া করতেই শুনি সেই বাসের হেলপার ড্রাইভারের উদ্দেশে বলতেছে, ‘ওস্তাদ, গিয়ার লাগান।’ হেলপারের কথা শোনার পর বিষয়টা সাংঘাতিকভাবে আমার ব্রেনে ক্যাচ করল-আরে! আমাদেরও তো টাইম প্রায় হওয়ার পথে। এখন গাড়িতে গিয়ার লাগাইয়া উড়াধুড়া চাক্কা না ঘুরাইলে পরে পস্তাইতে হবে। বিষয়টা বুঝতে পারছেন তো?

উপদেষ্টারা মাথা ঝাঁকালেন। তারা পেট্টু ভাইয়ের কথা বুঝতে পেরেছেন। পেট্টু ভাই বললেন-

: এইবার আপনেরা আমারে হাইস্পিডে চাক্কা ঘুরানোর কলাকৌশল বাতলাইয়া দেন।

উপদেষ্টারা কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন। একপর্যায়ে একজন উপদেষ্টা গলা ঝেড়ে বললেন-

: এতদিন ‘নজর আলী পেট্টু ভাই-নজর পড়লে রক্ষা নাই’-এই স্লোগান সামনে রাইখা আমরা রাস্তা-ব্রিজ-কালভার্ট, ভবনসহ সব ধরনের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার কবজা করা ছাড়াও ফুটপাত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নতুন বাড়ি-নতুন গাড়ি, এমনকী নতুন বিয়াশাদিতেও দোয়া বিতরণ করছি। এইবার ‘জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই’ এই স্লোগান লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়তে হবে। এই বিষয়ে আমার একটা প্রস্তাবনা আছে।

উপদেষ্টার কথা শুনে পেট্টু ভাই খোশমেজাজে জানতে চাইলেন-

: কী প্রস্তাবনা, বলেন।

: আমাদের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য কয়েক লাখ টিনের ডিব্বার প্রয়োজন হবে।

ডিব্বার কথা শুনে অন্য উপদেষ্টারা খুবই অবাক হলেন। পেট্টু ভাইও অবাক হলেন; সেই সঙ্গে মজাও পেলেন খুব। মিটিমিটি হেসে তিনি বললেন-

: ডিব্বা লাগবে কীজন্য?

উপদেষ্টা তার পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে বললেন-

: আমরা এই এলাকায় বসবাসরত প্রতিটি পরিবারে ‘জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই’ লেখা সংবলিত একটা করে টিনের ডিব্বা সরবরাহ করব। এরপর প্রতিমাসের শেষদিন আমাদের কর্মীবাহিনী এসব ডিব্বায় জমা হওয়া টাকাপয়সা সংগ্রহ করবে। প্রত্যেক পরিবারের প্রতি নির্দেশ থাকবে-ছাত্রছাত্রীরা যেন ডিব্বায় প্রতিদিন ৫০ টাকা করে বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখে। আমি মনে করি, এর ফলে তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের একটা সু-অভ্যাস গড়ে ওঠবে। পরিবারের কর্তারা যতবার বাজারে যাবে, ততবার ডিব্বার মধ্যে ১০০ টাকা করে রাখবে। এতে তারা বাজার বাবদ কম টাকা খরচ করতে বাধ্য হবে। কম বাজার মানেই কম খাওয়াদাওয়া। পেট্টু ভাইয়ের কল্যাণে কম খেলে তাদের স্বাস্থ্য নিশ্চিতভাবে ভালো থাকবে। এরপর পরিবারের যারা গৃহিণী, তারা প্রতিবার শপিংয়ে যাওয়ার আগে টিনের ডিব্বায় ২০০ টাকা জমা রাখবে। এভাবে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনে মিতব্যয়িতার চর্চা করার সুযোগ পাবে। সরকারি চাকরিজীবীরা অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন ডিব্বার মধ্যে ৩০০ টাকা করে জমা রাখবে। এতে ঘুসখোররা বিবেকের দংশন থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। তারা মনে করবে, ঘুস আমি একাই খাচ্ছি না; নির্মল চরিত্রের মানুষ পেট্টু ভাইও ঘুসের একটা ভাগ পাচ্ছে। পরিবারের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী, তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় ৫০০ টাকা করে ডিব্বার মধ্যে ফেলবে। এর ফলে অতি মুনাফাজনিত কারণে তারা যে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে, এর অবসান ঘটবে। তারা এই ভেবে শান্তি পাবে, অন্যায়ভাবে সংগৃহীত আমার মুনাফার একটা ভাগ জননেতা পেট্টু ভাইও পাচ্ছে। আর পেট্টু ভাইয়ের পাওয়া মানেই দেশের পাওয়া। দেশের কাজে লাগা। বেকার ও কাজের বুয়াদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সিলিং নেই। তবে চাইলে তারাও আমাদের এ মহৎ উদ্যোগে শামিল হতে পারবে। বন্ধুরা, এভাবে অগ্রসর হলে আমরা চাঁদাবাজি করেও প্রত্যেক মানুষের উপকার করতে পারব। সমাজের উপকার করতে পারব। দেশের উপকার করতে পারব। আর এজন্যই এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে-জনস্বার্থে নজর আলী পেট্টু ভাই।

পরিকল্পনা শোনার পর অন্য উপদেষ্টারা হাততালি দিলেন। পেট্টু ভাই সপ্রশংস দৃষ্টিতে পরিকল্পনা পেশকারীর উদ্দেশে বললেন-

: তোফা পরিকল্পনা। একেবারে সময়োপযোগী একটা জিনিস আপনে পয়দা করছেন। পোলাপান, তোমরা আজ থেকেই কর্মে লিপ্ত হইয়া পড়...

 

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

mokamia@hotmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন