ঋণখেলাপি ও প্রাসঙ্গিক কথা
jugantor
ঋণখেলাপি ও প্রাসঙ্গিক কথা

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এটি সর্বজনবিদিত যে, সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় জীবন-জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার দোলাচলে কর্মসংস্থান অপরিহার্য নিয়ামক হিসাবে বিবেচিত। হস্তচালিত শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রশিল্পে রূপান্তরিত করে অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠী ও বিভাজিত শ্রমনির্ভর উৎপাদন কৌশলের মিথস্ক্রিয়া বিশ্বকে বর্তমান অবস্থানে উন্নীত করেছে। আমরা জানি, সমকালীন সমাজে শিল্পায়নের সর্বোত্তম পরিচিতির মোড়কে সমৃদ্ধ হয়েছে পরিকল্পিত নগর-নগরসংস্কৃতির বিকাশ। নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্রকৌশলের পর্যাপ্ত যৌক্তিক ব্যবহার-অধিকমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগ-শিল্পোৎপাদনে বৈজ্ঞানিক পন্থা-প্রমিত-বৃহদায়তন পণ্য উৎপাদনে শ্রম দক্ষতার প্রমুদিত অধ্যায় যুগ পরিবর্তনের কীর্তিত দৃষ্টান্ত। যে কোনো জাতিরাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উন্নয়নে সমাজ-ধনবিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গগুলোর প্রয়োগ প্রক্রিয়ার উৎকর্ষকতা কল্যাণমুখী মানবিক সমাজ বিনির্মাণে প্রণিধানযোগ্য অবদান রেখে আসছে। অনগ্রসর থেকে প্রাগ্রসর সমাজে পরিণত হওয়ার পটভূমিতে রয়েছে শিল্প-নগরায়নের শক্তিমান গতিশীলতার ব্যাপক প্রভাব। ক্ষুদ্রায়তনের জনঅধ্যুষিত বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিগত কয়েক দশক শ্রমঘন শিল্পের প্রসার এবং গুণগত মানসম্মত উৎপাদিত পণ্যের বিতরণ-বাণিজ্যিকীকরণ দেশের রাজস্ব খাতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ পরিতোষ সৃজনে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এরই আলোকে দেশে শিল্পঋণ বিতরণ-ব্যবহার-অতিরঞ্জিত প্রতারণা-চিহ্নিত মাফিয়া চক্রের সিন্ডিকেট কর্তৃক ঋণগ্রহণে যথেচ্ছাচার-অপকৌশলে বিদেশে অর্থ পাচার দেশকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।

প্রাসঙ্গিকতায় সংগৃহীত একটি চমকপ্রদ গল্প উপস্থাপনে নিবন্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে চাই, ‘এক রাজা একদিন তার উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা বলেন তো অধিকাংশ মানুষ অসুখী কেন?’ উজির কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাজাকে বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনাকে একটি ছোট কাজ করতে হবে।’ রাজা বললেন, ‘কী কাজ?’ উজির বললেন, ‘আপনাকে একটি থলেতে ৯৯টি স্বর্ণমুদ্রা রাখতে হবে। সঙ্গে একটি কাগজে লিখে রাখতে হবে, যাতে লেখা থাকবে থলেতে ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। তারপর থলেটি রাতে আপনার কোনো কর্মচারীর ঘরের সামনে রেখে আসুন।’ রাজা উজিরের কথা মতো তাই করলেন। মুদ্রা ভরা থলেটি একজন রাজকর্মচারীর ঘরের সামনে রেখে এলেন। কর্মচারী রাতে প্রকৃতির ডাকে ঘর থেকে বের হলে দেখতে পেলেন ঘরের সামনে একটি থলে পড়ে আছে। থলেটা ঘরে নিয়ে খোলার পর স্বর্ণমুদ্রা গোনা শুরু করলেন। গুনে ৯৯টি স্বর্ণমুদ্রা পেলেন; কিন্তু কাগজে লেখা ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা। আরও কয়েকবার গুনেও স্বর্ণমুদ্রা ৯৯টিই পেলেন। একটি মুদ্রা না পেয়ে সেই কর্মচারী ঘরের সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে স্বর্ণমুদ্রা খোঁজার কাজে লাগিয়ে দিলেন। সবাই মিলে সারারাত খোঁজাখুঁজি করেও স্বর্ণমুদ্রাটি আর পেলেন না। এদিকে রাজা আর উজির আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ করছিলেন। সকালে ওই কর্মচারী যখন রাজবাড়ি এলেন, রাজা দেখতে পেলেন কর্মচারীর মুখ মলিন। তার মন যেন অতিমূল্যবান কিছু হারিয়ে যাওয়ার ব্যথায় জর্জরিত। এবার উজির রাজাকে বললেন, ‘রাজা মশাই ওই একের জন্যই আমরা অসুখী! সৃষ্টিকর্তা আমাদের কী দিয়েছেন, সেই হিসাব না করে আমরা শুধু অপ্রাপ্তি বিষয়টি হিসাব করি। এক সময় অপূর্ণতা এমন রূপ ধারণ করে, যাতে কী পেলাম তা কোনোভাবে স্মরণে আসে না। তখন সবদিকে শুধু অপ্রাপ্তিই আমাদের চোখে পড়ে আর অপূর্ণতার হাহাকারে ভরে যায় অন্ধকার হৃদয়।’

গল্পের প্রতিপাদ্য অনুসারে এটি প্রতীয়মান হয়, অর্থ-ক্ষমতালিপ্সু, হিংস্র, নরপশুতুল্য মানুষগুলোর আত্মতৃপ্তির কোনো চৌহদ্দি নেই। যে কোনো কুৎসিত অবৈধ-অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জনই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ব্যক্তিস্বার্থে লোভ-লালসা চরিতার্থে জনগণের জমাকৃত অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠনে তাদের বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। ধর্মপ্রীতি-মৃত্যুভয়-পাপকর্ম, দেশ-মানবপ্রেম কোনো ধরনের অনুভূতি এ কদাচার মানুষগুলোকে স্পর্শ করে বলে অনুমিত হয় না। আধুনিক বাঙালি কবি জাকির হোসেনের কবিতা ‘যত পাই তত চাই’ কবিতাগুচ্ছের পঙ্ক্তি চলমান বিষয় পর্যালোচনায় বিশেষ প্রযোজ্য বলে মনে হয়। ‘পাই যত চাই তত হয় না তো শেষ,/সব শূন্য হলে পূর্ণ রয়ে যায় রেশ।/করি হায় যদি পাই জগতের সুখ,/যত খুঁজি তবু বুঝি ভরে না তো বুক।/ পাই পাই করে যাই হলে সব পূর্ণ,/শুধু ভাবি হলে সবই হবো বুঝি ধন্য।/যা-ই চাও তা-ই পাও ভাগ্য আনুকূল্য,/শূন্য কিছু থাকলে পিছু পূর্ণতা হয় তুল্য।’ যত পাই তত চাই, তত বেশি খাই খাই উদাহরণ সমুদয় প্রতিভাত। উল্লেখ্য বিষয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২, ৪ জুলাই কুমিল্লায় জনসভার বক্তব্য অত্যধিক স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ পয়দা করতে হবে। এই চাটার অভ্যাস ত্যাগ কর। চাটার গোষ্ঠীর জ্বালায় আমি তিতে হয়ে গেলাম। এ চাটার গোষ্ঠীকে আমি বারবার ওয়ার্নিং দিচ্ছি। চাটার গোষ্ঠী আমার দলেই হোক, অন্য দলেই হোক, অন্য জায়গারই হও, তোমাদের আমি ক্ষমা করতে পারব না। আল্লাহ্ও ক্ষমা করবে না।’

২০২০ সালের প্রথম পক্ষকাল থেকে দেশে করোনা মহামারি শুরুর পর প্রায় দেড় বছরের মধ্যে অবলোপনসহ মন্দ ঋণের ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিলকরণসহ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার বিপরীতে ক্রমেই বেড়ে চলছে। ২২ আগস্ট, ২০২১ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মার্চ মাসের শেষে ছিল ৯৪ হাজার ২৬৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শুধু এপ্রিল ’২১-জুন ’২১ সময়কালে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। জুন ’২১ পর্যন্ত দেশে বিতরণকৃত মোট ঋণ ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার মধ্যে বেড়েছে ১০ হাজার ৭০১ কোটি টাকা, যেটি মোট ঋণের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং গত মার্চে এর হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। পাশাপাশি খেলাপির হার বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে।

অতিসম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর কয়েকটি শাখায় মোট ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়াকে অস্বাভাবিকও মনে করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সরকারি খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি ব্যাংকের। জুন ’২১ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ ছাড়া প্রথম, তৃতীয় এবং চতুর্থ বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ১০ হাজার ৩৫১ কোটি, ৭ হাজার ৩০৫ কোটি এবং ৩ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৯ হাজার ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ, বিদেশি ব্যাংকে ২ হাজার ৪৯২ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

সোনালী ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই পাওনা আছে ৪ হাজার ৮৩ কোটি, যেটি মোট খেলাপির ৩৮ শতাংশ। চলতি বছরে এসব খেলাপির কাছ থেকে ২ হাজার ২৩২ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, আগস্ট পর্যন্ত ১৬ খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের ৪৯০ কোটি, মেসার্স হলমার্ক গ্রুপের ৪৮৪ কোটি, তাইপে বাংলা ফেব্রিক্সের ৩৩২ কোটি, মেসার্স ফেয়ার অ্যান্ড ফেব্রিক্সের ৩১৬ কোটি, মেসার্স রহমান গ্রুপের ৩১৪ কোটি, মেসার্স নীলা গ্রুপের ২১৫ কোটি, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলসের ১৮২ কোটি, মেসার্স মেঘনা কনডেন্স মিল্কের ১৩১ কোটি, মেসার্স সোনালি জুট মিলসের ১২৭ কোটি, মেসার্স একে জুট ট্রেডিংয়ের ১১৭ কোটি, মেসার্স ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ১১৬ কোটি, মেসার্স সুপ্রিম জুট অ্যান্ড নিটেক্সের ১০৬ কোটি, মেসার্স ইস্টার্ন ট্রেডার্স ৯৩ কোটি, ফারুক ডাইং নিটিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ৯০ কোটি, মেসার্স সানবীম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৮৬ কোটি এবং মেসার্স সাইয়ান করপোরেশনের ৭৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে সুশাসন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করে প্রতিটি ঋণ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঋণের মান বাড়াতে হবে। ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের শাস্তির দৃশ্যমানতা এবং স্বচ্ছতাই ঋণখেলাপি হ্রাসের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে বলে তাদের মতামতে উঠে আসে। তারা আরও বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন মাস অন্তর খেলাপি ঋণের যে হিসাব তৈরি করে, তাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। এর সঙ্গে অবলোপন করা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে আছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বাইরেও আছে লাখ কোটি টাকার মতো মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ) ঋণ, যেগুলো খেলাপির পূর্ব ধাপে রয়েছে।

ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি করোনাকালেও দেশে কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৩ অক্টোবর, ২০২১ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যসূত্রে জানা যায়, দেশে এখন এক কোটি টাকার ওপরে আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। গত জুন মাস শেষে দেশে মোট আমানত হিসাব সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৬টি, যার মধ্যে কোটি টাকা আমানতকারী হিসাব ৯৯ হাজার ৯১৮টি। মোট আমানত হিসাবে আমানতের পরিমাণ ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা এবং কোটি টাকার আমানতকারী হিসাবে আমানতের পরিমাণ ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে বর্তমান ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪৪ শতাংশই ছিল কোটিপতিদের দখলে। দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদরা করোনাকালে কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অবস্থা মোটামুটি ভালো। এমন কী করোনাকালের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল। এ সময়ে অনেক মানুষের আয়ও বেড়েছে; কিন্তু বিনিয়োগ হয়নি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যে টাকা খাটাচ্ছে না। ঝুঁকি থাকায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকলেও সবাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। এ ছাড়া বিভিন্ন শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্রেও টাকা বিনিয়োগে অনীহা রয়েছে। ফলে যাদের আয় বেড়েছে, তাদের টাকা ব্যাংকে এসেছে আমানত হিসাবে। এতে কোটি টাকার আমানত হিসাব বেড়ে যায়। দেশে যখন প্রবৃদ্ধি তথা আয় বাড়ে, তখন আয় বৈষম্যও বাড়ে। উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে বেশি অর্থ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।’

তবে আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে-৮ অক্টোবর, ২০২১ গণমাধ্যম প্রতিবেদনে প্রকাশিত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২২-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এতে দেশের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা)। বর্তমান মাথাপিছু আয় ২,২২৮ ডলারের বিপরীতে ২০২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট ও গ্লোবাল হেড অব রিসার্চ বলেন, ‘যখন বিশ্বব্যাপী পুনরুদ্ধারের গতি এবং সরবরাহ অত্যন্ত অসম রয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশ ২০২০ সালে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। জোরদার টিকাদান কর্মসূচি এবং কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এলডিসি থেকে দেশের উত্তরণে প্রত্যাশিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি আরও বেড়েছে।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহৎ ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। অতিসম্প্রতি সম্মানিত অর্থমন্ত্রীও আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রভাবশালী ২০টি দেশের তালিকায় আসছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যেসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ থাকবে। ওই সময় বৈশ্বিক জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে এমন শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় যুক্ত হবে বাংলাদেশ।’ বাঙালি বীরের জাতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো পিছপা হয় না। ঋণখেলাপির এই অপগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের পাপিষ্ঠ হাত যতই শক্তিশালী-দীর্ঘায়িত হোক না কেন, জাতির কাছে তারা একদিন সমূলে অবশ্যই পরাস্ত হবে-দেশবাসীর মতো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশাটুকু ব্যক্ত করছি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঋণখেলাপি ও প্রাসঙ্গিক কথা

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
২৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এটি সর্বজনবিদিত যে, সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় জীবন-জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার দোলাচলে কর্মসংস্থান অপরিহার্য নিয়ামক হিসাবে বিবেচিত। হস্তচালিত শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রশিল্পে রূপান্তরিত করে অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠী ও বিভাজিত শ্রমনির্ভর উৎপাদন কৌশলের মিথস্ক্রিয়া বিশ্বকে বর্তমান অবস্থানে উন্নীত করেছে। আমরা জানি, সমকালীন সমাজে শিল্পায়নের সর্বোত্তম পরিচিতির মোড়কে সমৃদ্ধ হয়েছে পরিকল্পিত নগর-নগরসংস্কৃতির বিকাশ। নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্রকৌশলের পর্যাপ্ত যৌক্তিক ব্যবহার-অধিকমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগ-শিল্পোৎপাদনে বৈজ্ঞানিক পন্থা-প্রমিত-বৃহদায়তন পণ্য উৎপাদনে শ্রম দক্ষতার প্রমুদিত অধ্যায় যুগ পরিবর্তনের কীর্তিত দৃষ্টান্ত। যে কোনো জাতিরাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উন্নয়নে সমাজ-ধনবিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গগুলোর প্রয়োগ প্রক্রিয়ার উৎকর্ষকতা কল্যাণমুখী মানবিক সমাজ বিনির্মাণে প্রণিধানযোগ্য অবদান রেখে আসছে। অনগ্রসর থেকে প্রাগ্রসর সমাজে পরিণত হওয়ার পটভূমিতে রয়েছে শিল্প-নগরায়নের শক্তিমান গতিশীলতার ব্যাপক প্রভাব। ক্ষুদ্রায়তনের জনঅধ্যুষিত বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিগত কয়েক দশক শ্রমঘন শিল্পের প্রসার এবং গুণগত মানসম্মত উৎপাদিত পণ্যের বিতরণ-বাণিজ্যিকীকরণ দেশের রাজস্ব খাতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ পরিতোষ সৃজনে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এরই আলোকে দেশে শিল্পঋণ বিতরণ-ব্যবহার-অতিরঞ্জিত প্রতারণা-চিহ্নিত মাফিয়া চক্রের সিন্ডিকেট কর্তৃক ঋণগ্রহণে যথেচ্ছাচার-অপকৌশলে বিদেশে অর্থ পাচার দেশকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।

প্রাসঙ্গিকতায় সংগৃহীত একটি চমকপ্রদ গল্প উপস্থাপনে নিবন্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে চাই, ‘এক রাজা একদিন তার উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা বলেন তো অধিকাংশ মানুষ অসুখী কেন?’ উজির কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাজাকে বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনাকে একটি ছোট কাজ করতে হবে।’ রাজা বললেন, ‘কী কাজ?’ উজির বললেন, ‘আপনাকে একটি থলেতে ৯৯টি স্বর্ণমুদ্রা রাখতে হবে। সঙ্গে একটি কাগজে লিখে রাখতে হবে, যাতে লেখা থাকবে থলেতে ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। তারপর থলেটি রাতে আপনার কোনো কর্মচারীর ঘরের সামনে রেখে আসুন।’ রাজা উজিরের কথা মতো তাই করলেন। মুদ্রা ভরা থলেটি একজন রাজকর্মচারীর ঘরের সামনে রেখে এলেন। কর্মচারী রাতে প্রকৃতির ডাকে ঘর থেকে বের হলে দেখতে পেলেন ঘরের সামনে একটি থলে পড়ে আছে। থলেটা ঘরে নিয়ে খোলার পর স্বর্ণমুদ্রা গোনা শুরু করলেন। গুনে ৯৯টি স্বর্ণমুদ্রা পেলেন; কিন্তু কাগজে লেখা ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা। আরও কয়েকবার গুনেও স্বর্ণমুদ্রা ৯৯টিই পেলেন। একটি মুদ্রা না পেয়ে সেই কর্মচারী ঘরের সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে স্বর্ণমুদ্রা খোঁজার কাজে লাগিয়ে দিলেন। সবাই মিলে সারারাত খোঁজাখুঁজি করেও স্বর্ণমুদ্রাটি আর পেলেন না। এদিকে রাজা আর উজির আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ করছিলেন। সকালে ওই কর্মচারী যখন রাজবাড়ি এলেন, রাজা দেখতে পেলেন কর্মচারীর মুখ মলিন। তার মন যেন অতিমূল্যবান কিছু হারিয়ে যাওয়ার ব্যথায় জর্জরিত। এবার উজির রাজাকে বললেন, ‘রাজা মশাই ওই একের জন্যই আমরা অসুখী! সৃষ্টিকর্তা আমাদের কী দিয়েছেন, সেই হিসাব না করে আমরা শুধু অপ্রাপ্তি বিষয়টি হিসাব করি। এক সময় অপূর্ণতা এমন রূপ ধারণ করে, যাতে কী পেলাম তা কোনোভাবে স্মরণে আসে না। তখন সবদিকে শুধু অপ্রাপ্তিই আমাদের চোখে পড়ে আর অপূর্ণতার হাহাকারে ভরে যায় অন্ধকার হৃদয়।’

গল্পের প্রতিপাদ্য অনুসারে এটি প্রতীয়মান হয়, অর্থ-ক্ষমতালিপ্সু, হিংস্র, নরপশুতুল্য মানুষগুলোর আত্মতৃপ্তির কোনো চৌহদ্দি নেই। যে কোনো কুৎসিত অবৈধ-অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জনই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ব্যক্তিস্বার্থে লোভ-লালসা চরিতার্থে জনগণের জমাকৃত অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠনে তাদের বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। ধর্মপ্রীতি-মৃত্যুভয়-পাপকর্ম, দেশ-মানবপ্রেম কোনো ধরনের অনুভূতি এ কদাচার মানুষগুলোকে স্পর্শ করে বলে অনুমিত হয় না। আধুনিক বাঙালি কবি জাকির হোসেনের কবিতা ‘যত পাই তত চাই’ কবিতাগুচ্ছের পঙ্ক্তি চলমান বিষয় পর্যালোচনায় বিশেষ প্রযোজ্য বলে মনে হয়। ‘পাই যত চাই তত হয় না তো শেষ,/সব শূন্য হলে পূর্ণ রয়ে যায় রেশ।/করি হায় যদি পাই জগতের সুখ,/যত খুঁজি তবু বুঝি ভরে না তো বুক।/ পাই পাই করে যাই হলে সব পূর্ণ,/শুধু ভাবি হলে সবই হবো বুঝি ধন্য।/যা-ই চাও তা-ই পাও ভাগ্য আনুকূল্য,/শূন্য কিছু থাকলে পিছু পূর্ণতা হয় তুল্য।’ যত পাই তত চাই, তত বেশি খাই খাই উদাহরণ সমুদয় প্রতিভাত। উল্লেখ্য বিষয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২, ৪ জুলাই কুমিল্লায় জনসভার বক্তব্য অত্যধিক স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ পয়দা করতে হবে। এই চাটার অভ্যাস ত্যাগ কর। চাটার গোষ্ঠীর জ্বালায় আমি তিতে হয়ে গেলাম। এ চাটার গোষ্ঠীকে আমি বারবার ওয়ার্নিং দিচ্ছি। চাটার গোষ্ঠী আমার দলেই হোক, অন্য দলেই হোক, অন্য জায়গারই হও, তোমাদের আমি ক্ষমা করতে পারব না। আল্লাহ্ও ক্ষমা করবে না।’

২০২০ সালের প্রথম পক্ষকাল থেকে দেশে করোনা মহামারি শুরুর পর প্রায় দেড় বছরের মধ্যে অবলোপনসহ মন্দ ঋণের ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিলকরণসহ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার বিপরীতে ক্রমেই বেড়ে চলছে। ২২ আগস্ট, ২০২১ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মার্চ মাসের শেষে ছিল ৯৪ হাজার ২৬৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শুধু এপ্রিল ’২১-জুন ’২১ সময়কালে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। জুন ’২১ পর্যন্ত দেশে বিতরণকৃত মোট ঋণ ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার মধ্যে বেড়েছে ১০ হাজার ৭০১ কোটি টাকা, যেটি মোট ঋণের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং গত মার্চে এর হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। পাশাপাশি খেলাপির হার বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে।

অতিসম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর কয়েকটি শাখায় মোট ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়াকে অস্বাভাবিকও মনে করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সরকারি খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি ব্যাংকের। জুন ’২১ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ ছাড়া প্রথম, তৃতীয় এবং চতুর্থ বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ১০ হাজার ৩৫১ কোটি, ৭ হাজার ৩০৫ কোটি এবং ৩ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৯ হাজার ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ, বিদেশি ব্যাংকে ২ হাজার ৪৯২ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

সোনালী ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই পাওনা আছে ৪ হাজার ৮৩ কোটি, যেটি মোট খেলাপির ৩৮ শতাংশ। চলতি বছরে এসব খেলাপির কাছ থেকে ২ হাজার ২৩২ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, আগস্ট পর্যন্ত ১৬ খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের ৪৯০ কোটি, মেসার্স হলমার্ক গ্রুপের ৪৮৪ কোটি, তাইপে বাংলা ফেব্রিক্সের ৩৩২ কোটি, মেসার্স ফেয়ার অ্যান্ড ফেব্রিক্সের ৩১৬ কোটি, মেসার্স রহমান গ্রুপের ৩১৪ কোটি, মেসার্স নীলা গ্রুপের ২১৫ কোটি, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলসের ১৮২ কোটি, মেসার্স মেঘনা কনডেন্স মিল্কের ১৩১ কোটি, মেসার্স সোনালি জুট মিলসের ১২৭ কোটি, মেসার্স একে জুট ট্রেডিংয়ের ১১৭ কোটি, মেসার্স ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ১১৬ কোটি, মেসার্স সুপ্রিম জুট অ্যান্ড নিটেক্সের ১০৬ কোটি, মেসার্স ইস্টার্ন ট্রেডার্স ৯৩ কোটি, ফারুক ডাইং নিটিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ৯০ কোটি, মেসার্স সানবীম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৮৬ কোটি এবং মেসার্স সাইয়ান করপোরেশনের ৭৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে সুশাসন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করে প্রতিটি ঋণ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঋণের মান বাড়াতে হবে। ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের শাস্তির দৃশ্যমানতা এবং স্বচ্ছতাই ঋণখেলাপি হ্রাসের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে বলে তাদের মতামতে উঠে আসে। তারা আরও বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন মাস অন্তর খেলাপি ঋণের যে হিসাব তৈরি করে, তাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। এর সঙ্গে অবলোপন করা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে আছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বাইরেও আছে লাখ কোটি টাকার মতো মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ) ঋণ, যেগুলো খেলাপির পূর্ব ধাপে রয়েছে।

ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি করোনাকালেও দেশে কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৩ অক্টোবর, ২০২১ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যসূত্রে জানা যায়, দেশে এখন এক কোটি টাকার ওপরে আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। গত জুন মাস শেষে দেশে মোট আমানত হিসাব সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৬টি, যার মধ্যে কোটি টাকা আমানতকারী হিসাব ৯৯ হাজার ৯১৮টি। মোট আমানত হিসাবে আমানতের পরিমাণ ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা এবং কোটি টাকার আমানতকারী হিসাবে আমানতের পরিমাণ ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে বর্তমান ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪৪ শতাংশই ছিল কোটিপতিদের দখলে। দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদরা করোনাকালে কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অবস্থা মোটামুটি ভালো। এমন কী করোনাকালের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল। এ সময়ে অনেক মানুষের আয়ও বেড়েছে; কিন্তু বিনিয়োগ হয়নি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যে টাকা খাটাচ্ছে না। ঝুঁকি থাকায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকলেও সবাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। এ ছাড়া বিভিন্ন শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্রেও টাকা বিনিয়োগে অনীহা রয়েছে। ফলে যাদের আয় বেড়েছে, তাদের টাকা ব্যাংকে এসেছে আমানত হিসাবে। এতে কোটি টাকার আমানত হিসাব বেড়ে যায়। দেশে যখন প্রবৃদ্ধি তথা আয় বাড়ে, তখন আয় বৈষম্যও বাড়ে। উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে বেশি অর্থ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।’

তবে আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে-৮ অক্টোবর, ২০২১ গণমাধ্যম প্রতিবেদনে প্রকাশিত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২২-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এতে দেশের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা)। বর্তমান মাথাপিছু আয় ২,২২৮ ডলারের বিপরীতে ২০২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট ও গ্লোবাল হেড অব রিসার্চ বলেন, ‘যখন বিশ্বব্যাপী পুনরুদ্ধারের গতি এবং সরবরাহ অত্যন্ত অসম রয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশ ২০২০ সালে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। জোরদার টিকাদান কর্মসূচি এবং কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এলডিসি থেকে দেশের উত্তরণে প্রত্যাশিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি আরও বেড়েছে।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহৎ ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। অতিসম্প্রতি সম্মানিত অর্থমন্ত্রীও আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রভাবশালী ২০টি দেশের তালিকায় আসছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যেসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ থাকবে। ওই সময় বৈশ্বিক জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে এমন শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় যুক্ত হবে বাংলাদেশ।’ বাঙালি বীরের জাতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো পিছপা হয় না। ঋণখেলাপির এই অপগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের পাপিষ্ঠ হাত যতই শক্তিশালী-দীর্ঘায়িত হোক না কেন, জাতির কাছে তারা একদিন সমূলে অবশ্যই পরাস্ত হবে-দেশবাসীর মতো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশাটুকু ব্যক্ত করছি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন