সংখ্যালঘুর ওপর হামলার লেন্সে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দেখা
jugantor
সংখ্যালঘুর ওপর হামলার লেন্সে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দেখা

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক মাধ্যমের বাতাসে নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ভেসে বেড়াচ্ছে। আছে নানা গুরুগম্ভীর আধা-তাত্ত্বিক আলোচনাও। আমাদের চায়ের আড্ডাকে এখন অনেক বড় পরিসরে নিয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যম; সামাজিক মাধ্যমে তাই এখন অনেক বৃহৎ পরিসরেই হয় ‘চায়ের আড্ডা’গুলো। আমাদের দিক থেকে যেমন কোনো বিষয়ে শুনতে চাওয়া, জানতে চাওয়ার চাহিদা আছে, ঠিক তেমন বিষয়ের জোগান দেওয়ার জন্যই আছে আলাদা আলাদা ব্যক্তি অথবা পেজ/গ্রুপ। এটাই হচ্ছে বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় ব্যবহৃত হওয়া বিখ্যাত ‘ইকো চেম্বার’।

পূজার সময় ঘটা কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনাটির পর থেকে রংপুরের পীরগঞ্জে ঘটনাটি সব মূলধারার মিডিয়ায় খুব মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। একইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে কারা কী বলছেন, সেটাও বোঝার জন্য ঢুঁ মারলাম কিছু ‘ইকো চেম্বারে’। গভীর কোনো অন্তর্দৃষ্টি না দিলেও সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া কোনো বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়। এ প্রসঙ্গে অনেকে সমাজে মৌলবাদের শিকড় কোন জায়গায় পৌঁছেছে সেটি নিয়ে আলোচনা করছেন, হতাশা প্রকাশ করছেন। অনেকে আবার হিন্দু সমাজের নেতাদের বক্তব্য উল্লেখ করে পালটা যুক্তি দিচ্ছেন যে, মৌলবাদী বলতে যেমন পোশাক ও অবয়বের মানুষ আমরা বুঝি, তেমন মানুষ এবার হামলায় ছিল না।

এর মধ্যেই এসেছে রাষ্ট্রধর্ম বিতর্ক। এসেছে বৈশ্বিকভাবেই পরিচয়বাদী রাজনীতি দেশেও কতটা প্রভাব ফেলছে সে কথা। এসেছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তির জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার প্রেসক্রিপশন। পার্শ্ববর্তী দেশে ধর্মভিত্তিক সহিংসতার প্রভাব কীভাবে আমাদের দেশে এসে পড়ে, সেই আলোচনা হয়েছে। এমনকি এ কথাও বলেছেন অনেকে, বিদেশি কোনো শক্তির মদদেই বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটছে। অবাক হয়েছি এটা দেখে, আগুন যখন লেগে গেছে, তখন আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আগুন লাগার কারণ এবং ভবিষ্যতে আগুন লাগা প্রতিরোধ করার জন্য কী কী করতে হবে সেই আলোচনাই হচ্ছিল মূলত। জ্বলন্ত আগুনকে সামনে রেখে উপস্থিত সবার কাজ হচ্ছে যে কোনো মূল্যে সেই আগুনটা নেভানো; আগুনটা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের সক্ষমতা থাকতে হয়। একেবারে স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপনের সবকিছু করার সক্ষমতা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবে, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে সেই দক্ষতাও খুবই জরুরি।

করোনা ছিল হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া একটা সংকট, যখন দেশের দৈনন্দিন সব প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে চলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময়ে আমরা দেখেছি এ দেশের প্রশাসনযন্ত্র কতটা অদক্ষ, অযোগ্য। করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপ নিতে দেরি করা, জরুরি সিদ্ধান্ত হওয়ারও পর সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে না পারা ইত্যাদি নানা রকম ব্যর্থতার প্রদর্শনী হয়েছে আমাদের সামনে। অর্থাৎ একটা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রত্যাশিত মাত্রার কাছাকাছি মানের দক্ষতা দেখাতে পারেনি।

রাষ্ট্রযন্ত্র আরও বেশি পরীক্ষার মুখোমুখি হলো এবার পূজাকে কেন্দ্র করে যা হলো, তাতে। এটা একবারে একিউট ইমার্জেন্সি ছিল। এ পরীক্ষায় ভীষণভাবে ব্যর্থ হলো রাষ্ট্রযন্ত্র। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে ঘটা প্রথম ঘটনাটি ঠেকানো যেত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যায়। তারপরও এটুকু মেনে নেওয়া যায়, যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করার পরও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। উন্নত, উদার গণতান্ত্রিক, সুশাসন থাকা দেশেও এমন কিছু কখনো কখনো ঘটেছে। অনেক আগে থেকেই দুর্গাপূজায় পুলিশি পাহারা থাকে। এটাও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দেশে সাম্প্রদায়িকভাবে খারাপ কিছু ঘটতে পারে, এমন একটা আশঙ্কাও সরকারের দিক থেকে ছিল। কারণ কুমিল্লার ঘটনার পরপর সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, সেখানে যেন এমন কিছু না হয় যার প্রভাব আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর এসে পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলাই যায়, এ পূজায় গোয়েন্দা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি থাকার কথা ছিল আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও ধরে নেওয়া যাক, কুমিল্লার দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল। এরই মধ্যে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি কুমিল্লায় পূজামণ্ডপ থেকে কুরআন উদ্ধারের পর সেখানে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখের সামনে ফেসবুক লাইভ করছিল একজন। শুধু সেটাই নয়, লাইভকারী ধারা বর্ণনা করছিলেন। এটাই পরে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে সংকট তৈরি করেছে। চোখের সামনে এমন ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ লাইভ হতে দিয়েছিলেন ওসি। এছাড়াও এরপর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সরেজমিন রিপোর্টে আমরা জানতে পারি, ওই ঘটনার পর যখন মানুষ দল পাকাতে শুরু করে, তারপর মিছিল করে, তখনো শক্ত কোনো পদক্ষেপ প্রশাসনের দিক থেকে নেওয়া হয়নি।

কুমিল্লার ভাঙচুরের পর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষ এতটা সংগঠিত হয়ে মারমুখী হতে পারত না। কিন্তু মানুষ সেটা পেরেছে এবং মিছিল নিয়ে পূজামণ্ডপে হামলা করার চেষ্টার সময় পুলিশের গুলিতে চারজন মারা গেছেন। এখানে এ আলোচনাও জরুরি, কী পরিস্থিতিতে পুলিশ মানুষ হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। নাগরিক হিসাবে আমরা দেখতে চাই, মানুষ হত্যার মতো কাজ না করেও এ ধরনের মিছিল বা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে পুলিশ। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ পুলিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে গেলেও একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে। সেখানে এক বড় এলাকায় একসঙ্গে বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। সেই সংঘাত নিয়ে বিবিসি বাংলার রিপোর্টের একটা অংশ এরকম-বেগমগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, গতকাল সারা দেশের পরিস্থিতি দেখে আশঙ্কা থেকেই তারা স্থানীয় প্রশাসনকে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে ১৫টা মন্দিরে হামলা চালালেও পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে।

বেগমগঞ্জের সহিংসতা হয়েছিল কুমিল্লার দুই দিন পর। প্রথম ঘটনাটি ঘটার পরে এত দীর্ঘ সময় পাওয়া, এমনকি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের আহ্বান সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়া সেখানকার হিন্দু মানুষদের জীবনে এক বিভীষিকা নিয়ে আসে। এ সম্প্রদায়ের দুজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সারা দেশের আরও বহু জেলায়। যার ফলে আক্রান্ত হয়েছে পূজামণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এসব ঘটনার আরও পরে ঘটে রংপুরের পীরগঞ্জের ঘটনাটি। ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অজুহাতে একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণকে অভিযোগ করে যখন তার ওপরে হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন নাকি পুলিশ শুধু তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তার বাড়ি গিয়েছিল। অথচ ওই এলাকাতেই একসঙ্গে ছিল অনেক হিন্দু মানুষের বাড়ি। সেখানে গিয়েই অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এর আগেও যখন এ ধরনের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সমস্যা হয়েছে (রামু, নাসিরনগর ইত্যাদি), তখন শুধু পোস্টদাতা নয়, নির্বিচারে আক্রমণের শিকার হয়েছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এইরকম উদাহরণ আমাদের সামনে থাকার পরও কেন পুরো এলাকায় নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি?

জানি না, নিজের রাষ্ট্রকে, সরকারকে এমন পরিস্থিতিতে দেখে কেমন লাগছে এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। আগে তারা দেখেছেন নিয়মিত বিরতিতে একের পর এক ববর্রতা হয়েছে তাদের ওপর, তারপর দায়সারা গ্রেফতার-মামলা হয় হয়তো, কিন্তু কোনো ঘটনার বিচার শেষ হতে দেখেন না তারা। তাদের মর্মবেদনা বেড়ে যায় যখন তারা দেখেন তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো চার্জশিটভুক্ত আসামিকে ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন দেয়। কিন্তু এখন তারা দেখছেন দফায় দফায় সাহায্য চাওয়ার পরেও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে রক্ষায় সঠিকভাবে এগিয়ে আসেনি। তারা দেখছেন কঠোর কিছু ব্যবস্থা নিলে এ ভয়ংকর পরিস্থিতি এড়ানো যেত খুব ভালোভাবেই, কিন্তু সেটা হয়নি।

লেখক: শিক্ষক ওঅ্যাক্টিভিস্ট

সংখ্যালঘুর ওপর হামলার লেন্সে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দেখা

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
২৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক মাধ্যমের বাতাসে নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ভেসে বেড়াচ্ছে। আছে নানা গুরুগম্ভীর আধা-তাত্ত্বিক আলোচনাও। আমাদের চায়ের আড্ডাকে এখন অনেক বড় পরিসরে নিয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যম; সামাজিক মাধ্যমে তাই এখন অনেক বৃহৎ পরিসরেই হয় ‘চায়ের আড্ডা’গুলো। আমাদের দিক থেকে যেমন কোনো বিষয়ে শুনতে চাওয়া, জানতে চাওয়ার চাহিদা আছে, ঠিক তেমন বিষয়ের জোগান দেওয়ার জন্যই আছে আলাদা আলাদা ব্যক্তি অথবা পেজ/গ্রুপ। এটাই হচ্ছে বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় ব্যবহৃত হওয়া বিখ্যাত ‘ইকো চেম্বার’।

পূজার সময় ঘটা কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনাটির পর থেকে রংপুরের পীরগঞ্জে ঘটনাটি সব মূলধারার মিডিয়ায় খুব মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। একইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে কারা কী বলছেন, সেটাও বোঝার জন্য ঢুঁ মারলাম কিছু ‘ইকো চেম্বারে’। গভীর কোনো অন্তর্দৃষ্টি না দিলেও সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া কোনো বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়। এ প্রসঙ্গে অনেকে সমাজে মৌলবাদের শিকড় কোন জায়গায় পৌঁছেছে সেটি নিয়ে আলোচনা করছেন, হতাশা প্রকাশ করছেন। অনেকে আবার হিন্দু সমাজের নেতাদের বক্তব্য উল্লেখ করে পালটা যুক্তি দিচ্ছেন যে, মৌলবাদী বলতে যেমন পোশাক ও অবয়বের মানুষ আমরা বুঝি, তেমন মানুষ এবার হামলায় ছিল না।

এর মধ্যেই এসেছে রাষ্ট্রধর্ম বিতর্ক। এসেছে বৈশ্বিকভাবেই পরিচয়বাদী রাজনীতি দেশেও কতটা প্রভাব ফেলছে সে কথা। এসেছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তির জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার প্রেসক্রিপশন। পার্শ্ববর্তী দেশে ধর্মভিত্তিক সহিংসতার প্রভাব কীভাবে আমাদের দেশে এসে পড়ে, সেই আলোচনা হয়েছে। এমনকি এ কথাও বলেছেন অনেকে, বিদেশি কোনো শক্তির মদদেই বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটছে। অবাক হয়েছি এটা দেখে, আগুন যখন লেগে গেছে, তখন আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আগুন লাগার কারণ এবং ভবিষ্যতে আগুন লাগা প্রতিরোধ করার জন্য কী কী করতে হবে সেই আলোচনাই হচ্ছিল মূলত। জ্বলন্ত আগুনকে সামনে রেখে উপস্থিত সবার কাজ হচ্ছে যে কোনো মূল্যে সেই আগুনটা নেভানো; আগুনটা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের সক্ষমতা থাকতে হয়। একেবারে স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপনের সবকিছু করার সক্ষমতা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবে, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে সেই দক্ষতাও খুবই জরুরি।

করোনা ছিল হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া একটা সংকট, যখন দেশের দৈনন্দিন সব প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে চলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময়ে আমরা দেখেছি এ দেশের প্রশাসনযন্ত্র কতটা অদক্ষ, অযোগ্য। করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপ নিতে দেরি করা, জরুরি সিদ্ধান্ত হওয়ারও পর সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে না পারা ইত্যাদি নানা রকম ব্যর্থতার প্রদর্শনী হয়েছে আমাদের সামনে। অর্থাৎ একটা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রত্যাশিত মাত্রার কাছাকাছি মানের দক্ষতা দেখাতে পারেনি।

রাষ্ট্রযন্ত্র আরও বেশি পরীক্ষার মুখোমুখি হলো এবার পূজাকে কেন্দ্র করে যা হলো, তাতে। এটা একবারে একিউট ইমার্জেন্সি ছিল। এ পরীক্ষায় ভীষণভাবে ব্যর্থ হলো রাষ্ট্রযন্ত্র। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে ঘটা প্রথম ঘটনাটি ঠেকানো যেত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যায়। তারপরও এটুকু মেনে নেওয়া যায়, যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করার পরও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। উন্নত, উদার গণতান্ত্রিক, সুশাসন থাকা দেশেও এমন কিছু কখনো কখনো ঘটেছে। অনেক আগে থেকেই দুর্গাপূজায় পুলিশি পাহারা থাকে। এটাও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দেশে সাম্প্রদায়িকভাবে খারাপ কিছু ঘটতে পারে, এমন একটা আশঙ্কাও সরকারের দিক থেকে ছিল। কারণ কুমিল্লার ঘটনার পরপর সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, সেখানে যেন এমন কিছু না হয় যার প্রভাব আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর এসে পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলাই যায়, এ পূজায় গোয়েন্দা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি থাকার কথা ছিল আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও ধরে নেওয়া যাক, কুমিল্লার দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল। এরই মধ্যে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি কুমিল্লায় পূজামণ্ডপ থেকে কুরআন উদ্ধারের পর সেখানে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখের সামনে ফেসবুক লাইভ করছিল একজন। শুধু সেটাই নয়, লাইভকারী ধারা বর্ণনা করছিলেন। এটাই পরে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে সংকট তৈরি করেছে। চোখের সামনে এমন ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ লাইভ হতে দিয়েছিলেন ওসি। এছাড়াও এরপর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সরেজমিন রিপোর্টে আমরা জানতে পারি, ওই ঘটনার পর যখন মানুষ দল পাকাতে শুরু করে, তারপর মিছিল করে, তখনো শক্ত কোনো পদক্ষেপ প্রশাসনের দিক থেকে নেওয়া হয়নি।

কুমিল্লার ভাঙচুরের পর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষ এতটা সংগঠিত হয়ে মারমুখী হতে পারত না। কিন্তু মানুষ সেটা পেরেছে এবং মিছিল নিয়ে পূজামণ্ডপে হামলা করার চেষ্টার সময় পুলিশের গুলিতে চারজন মারা গেছেন। এখানে এ আলোচনাও জরুরি, কী পরিস্থিতিতে পুলিশ মানুষ হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। নাগরিক হিসাবে আমরা দেখতে চাই, মানুষ হত্যার মতো কাজ না করেও এ ধরনের মিছিল বা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে পুলিশ। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ পুলিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে গেলেও একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে। সেখানে এক বড় এলাকায় একসঙ্গে বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। সেই সংঘাত নিয়ে বিবিসি বাংলার রিপোর্টের একটা অংশ এরকম-বেগমগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, গতকাল সারা দেশের পরিস্থিতি দেখে আশঙ্কা থেকেই তারা স্থানীয় প্রশাসনকে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে ১৫টা মন্দিরে হামলা চালালেও পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে।

বেগমগঞ্জের সহিংসতা হয়েছিল কুমিল্লার দুই দিন পর। প্রথম ঘটনাটি ঘটার পরে এত দীর্ঘ সময় পাওয়া, এমনকি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের আহ্বান সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়া সেখানকার হিন্দু মানুষদের জীবনে এক বিভীষিকা নিয়ে আসে। এ সম্প্রদায়ের দুজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সারা দেশের আরও বহু জেলায়। যার ফলে আক্রান্ত হয়েছে পূজামণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এসব ঘটনার আরও পরে ঘটে রংপুরের পীরগঞ্জের ঘটনাটি। ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অজুহাতে একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণকে অভিযোগ করে যখন তার ওপরে হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন নাকি পুলিশ শুধু তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তার বাড়ি গিয়েছিল। অথচ ওই এলাকাতেই একসঙ্গে ছিল অনেক হিন্দু মানুষের বাড়ি। সেখানে গিয়েই অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এর আগেও যখন এ ধরনের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সমস্যা হয়েছে (রামু, নাসিরনগর ইত্যাদি), তখন শুধু পোস্টদাতা নয়, নির্বিচারে আক্রমণের শিকার হয়েছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এইরকম উদাহরণ আমাদের সামনে থাকার পরও কেন পুরো এলাকায় নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি?

জানি না, নিজের রাষ্ট্রকে, সরকারকে এমন পরিস্থিতিতে দেখে কেমন লাগছে এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। আগে তারা দেখেছেন নিয়মিত বিরতিতে একের পর এক ববর্রতা হয়েছে তাদের ওপর, তারপর দায়সারা গ্রেফতার-মামলা হয় হয়তো, কিন্তু কোনো ঘটনার বিচার শেষ হতে দেখেন না তারা। তাদের মর্মবেদনা বেড়ে যায় যখন তারা দেখেন তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো চার্জশিটভুক্ত আসামিকে ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন দেয়। কিন্তু এখন তারা দেখছেন দফায় দফায় সাহায্য চাওয়ার পরেও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে রক্ষায় সঠিকভাবে এগিয়ে আসেনি। তারা দেখছেন কঠোর কিছু ব্যবস্থা নিলে এ ভয়ংকর পরিস্থিতি এড়ানো যেত খুব ভালোভাবেই, কিন্তু সেটা হয়নি।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন