বিলম্বিত প্রেসক্রিপশনে রোগী ভালো হবে কি?
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
বিলম্বিত প্রেসক্রিপশনে রোগী ভালো হবে কি?

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৬ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চাশ বছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার মানের বারোটা বাজানোর পর সম্প্রতি আমরা সরকারদলীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সমালোচনা শুনেছি। জনাব কাদের সরকার প্রচারিত উন্নয়নের তীব্র ডিজিটাল গতির মাঝেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের বাস্তবোচিত সমালোচনা করায় তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়। ৫০ বছরে রাজনৈতিক দলবাজি ও লেনদেনের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাকে পাশ কাটিয়ে অযোগ্যদের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সুযোগ্যদের বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে কম যোগ্য ও তদবিরকারী অধ্যাপকদের উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে পদে পদে ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ/আইন লঙ্ঘন করে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে মুমূর্ষু বানানোর পর জনাব কাদেরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের উল্লিখিত সমালোচনাকে শিক্ষাপ্রেমীদের কাছে অনেকটা রোগী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার পর ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার মতো মনে হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের অবনমন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আমি নিজে যথেষ্ট লিখেছি।

টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বরূপ ও প্রতিকার’ শীর্ষক একটি গবেষণায় সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে উচ্চশিক্ষার সমস্যা ও সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। টিআইবি এ গবেষণা কাজটিকে ২০০৮ সালে প্রকাশক না হয়েও গ্রন্থাকারে প্রকাশ করলে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। তবে ওই পর্যন্তই।

কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বর্ণের আবরণে চলমান দলীয় রাজনীতির চর্চা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বের করে লেখাপড়া ও গবেষণার জগতে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নামে একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়েছে। এবার জনাব ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক। দেখা যাক তার বক্তব্যে নতুন কিছু আছে কিনা।

জনাব কাদের বলেছেন, ‘অবাক লাগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষার মূল দায়িত্বে আছেন, তারা সেখানকার প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন আর বসেন। এই ব্যক্তিত্বহীনতা শিক্ষকতার মর্যাদাকে ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করে।’ জনাব কাদেরের এ বক্তব্য সত্য। তবে তার এ কথাও ভাবা উচিত যে, ক’জন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অধ্যাপক সম্প্রতি উপাচার্য হতে পারছেন। তদবির না করে কি কেউ উপাচার্য হতে পেরেছেন? আর উপাচার্য হতে তদবিরকারী অধ্যাপককে কি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অধ্যাপক বলা যায়? উপাচার্য হওয়ার রেসে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপকদের অনেকেই যে ছাত্রনেতাদের সহায়তা নেন, সে বিষয়টি তো ওপেন সিক্রেট।

কাজেই জনাব কাদেরের এ বক্তব্যে কোনো নতুনত্ব আছে বলে মনে করা যায় না। তার বলা উচিত ছিল, ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি একস্রোতে প্রবাহিত হওয়ায় শিক্ষকদের মহান নিরপেক্ষতার অহঙ্কারের জায়গাটির দুর্বল হয়ে গেছে। শিক্ষক যদি তার সব শিক্ষার্থীকে একচোখে না দেখতে পারেন তাহলে বড় রকমের অপরাধ করা হয়।

তবে জনাব কাদেরের বক্তব্যের মধ্যে ‘প্রভাবশালী ছাত্রনেতা’দের পরিচয় বিধৃত না হলেও এ বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার নয় যে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের নেতাদের অধীনেই থাকে হলগুলোর কর্তৃত্ব এবং ক্যাম্পাসের দখলদারিত্ব। কাজেই তিনি না বললেও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, কোন ছাত্রসংগঠনের কথায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ‘ওঠেন আর বসেন’।

জনাব কাদের আরও বলেছেন, ‘প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মেধা, যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে নিয়োগ হচ্ছে।’ জনাব কাদেরের এ বক্তব্যের যথার্থতার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক প্রকটতা এবং একাডেমিক মুমূর্ষুতার কারণ নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো সর্বোচ্চ একাডেমিক বিদ্যাপীঠ। সেখানে সবচেয়ে মেধাবীদের নিয়োগ সুনিশ্চিত করতে না পারলে জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই অমেধাবীরাও মেধাবীদের পেছনে ফেলে তদবিরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ পান। এখানে জনাব কাদের আর একটি বিষয় মনে হয় ইচ্ছা করে না বলে চেপে গেছেন।

বিষয়টি হলো, তদবিরের সঙ্গে লেনদেনের প্রভাবও প্রভাষক নিয়োগকে কলুষিত করেছে। জনাব কাদের এড়িয়ে গেলেও টিআইবি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগের ওপর ২০১৬ সালে পরিচালিত ও প্রকাশিত এক গবেষণায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছে (মো. রেযাউল করিম, দিপু রায়, ও মো. মোস্তফা কামাল, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগ : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’, টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদন, ২০১৬)। ১৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পরিচালিত উপরোক্ত গবেষণায় টিআইবি গবেষকরা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। কাজেই জনাব কাদের তার বক্তব্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে প্রভাবশালীদের তদবিরের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও যোগ করলে তার এ প্রাসঙ্গিক বক্তব্য অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবোচিত হতো।

এরপর জনাব কাদের তার বক্তব্যে আরেকটি গা শিউরে ওঠার মতো হলেও বাস্তবোচিত তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এমন অভিযোগ আছে, পছন্দের কাউকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমবর্ষ থেকেই তার ওপর দেওয়া হয় বিশেষ নজর। নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে দেওয়া হয় বিশেষ বিবেচনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেওয়া হয় বিশেষ কৌশল। বাদ দেওয়া হয় সর্বোচ্চ মেধাবীদের।’ এ বিষয়টি অবশ্য টিআইবি রিপোর্টে অধিকতর বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

সেখানে এমনও বলা হয়েছে যে, অনার্স-মাস্টার্সে বিশেষ পছন্দের প্রার্থী আনুকূল্য পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে তাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পরে এমফিল করিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করানোর যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বাস্তবতা আরও বেদনাদায়ক। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পছন্দের প্রার্থীর প্রভাষক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় তিনি নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় জিপিএ কমিয়ে পছন্দের প্রার্থীর নিয়োগ সম্পন্ন করে পরে আবার সে যোগ্যতা সংশোধন করেছেন। এমন ঘটনা নিকট অতীতে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে বলে জানি। এর চেয়ে বড় অনৈতিকতা আর কী হতে পারে?

এ পর্যন্ত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণ হলেও শাস্তির নমুনা বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তে উপাচার্যের দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন তিনি নিজ বিভাগে ফিরে শিক্ষকতায় যোগ দেন। কৃত অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় এমন দৃষ্টান্তকে উপাচার্যদের দুর্নীতিকে আশকারা দেওয়ার শামিল বিবেচনা করা যায়।

নবাগত উপাচার্য পদে এসে ভাবেন, আমার আগের উপাচার্যের দুর্নীতি ধরা পড়ায় তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কাজেই আমি যদি দুর্নীতি করে ধরা পড়ি, তাহলে আমাকেও পদ থেকে সরিয়ে বিভাগে পাঠানো হবে। সে জন্য তিনি দুর্নীতি করতে ভয় পান না।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা বিশ্বমানের নয়। গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিশ্বের অনেক দেশেই সম্ভব নয়। বিশ্বের নানা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে পিএইচডি ডিগ্রি লাগে। আমরাও যদি পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিতে পারতাম তবে এ সমালোচনাগুলো হতো না।’ সম্মানিত ইউজিসি সদস্যের এমন বক্তব্য বাস্তবায়ন করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।

তখন দেখতে হবে কে কার থিসিস লিখে দিয়েছেন, বা কেউ নকল করে থিসিস লিখেছেন কিনা। এমন চর্চা যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একেবারেই হচ্ছে না, এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারলে আমি একজন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসাবে খুশি হতাম। তারপর আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব থিসিস হচ্ছে, তার মধ্যে কিছুসংখ্যক থিসিস যে ভালো মানের হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু অনেক থিসিসেই হচ্ছে গতানুগতিক বিষয়বস্তুর উপস্থাপন। অনেক সম্মানিত সুপারভাইজার গবেষণা শিক্ষার্থীকে ভালো করে না খাটিয়ে তাকে সহজে ডিগ্রি দিয়ে দিচ্ছেন।

এর ফলে পিএইচডি ডিগ্রির মান কমে যাচ্ছে। কাজেই ইউজিসি সদস্যের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়বে এমনটা বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা জরুরি। যেখানে স্কুল-কলেজে শিক্ষক হতে হলেও কয়েক রকম পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে কেবলমাত্র একটি লোকদেখানো মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ করা কতটা যৌক্তিক হচ্ছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। ইউজিসি এ ব্যাপারে কেন চিন্তাভাবনা করছে না তা বোধগম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় না, হয় ভোটার নিয়োগ। শিক্ষকরা সারা বছর নির্বাচন করেন; কিন্তু ছাত্রদের কোনো নির্বাচন হয় না।’ দেড় যুগ আগে একই বক্তব্য দিয়েছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের শিক্ষাবিষয়ক একজন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ড. মাছুম (সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বরূপ ও প্রতিকার, পৃষ্ঠা-২৩)। এসব বক্তব্য থেকে অনুধাবন করা যায় যে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিভাগে অনেক সময় লোকবল থাকা সত্ত্বেও দলীয় ও অন্যান্য স্বার্থগত কারণে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।

আর এসব নিয়োগে মেধা প্রাধান্য না পাওয়ায় ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষকতার মানের অবনমন হচ্ছে। অমেধাবীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিতে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভাবমূর্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে এর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের এশীয় ও আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুঁজতে গিয়ে শক্তিশালী দূরবীন ব্যবহার করেও তাদের অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

উচ্চশিক্ষার এমনই এক নৈরাজ্যিক অবস্থায় সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের আগুনে ঘি ঢেলেছেন। বহু বছর ধরে শিক্ষার উন্নয়নে আমরা যেসব কথা বলে আসছি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব অসংগতি তুলে ধরেছি, জনাব কাদেরের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বড় দেরি করে মুখ খোলায় তার এ বক্তব্যকে মুমূর্ষু মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য দেরি করে প্রেসক্রিপশন লেখার মতো মনে হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখন ধ্বংসের কার্নিশে। মৃতপ্রায়কে এমন প্রেসক্রিপশন লিখে সুস্থ-সবল করা যাবে বলে মনে হয় না।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

বিলম্বিত প্রেসক্রিপশনে রোগী ভালো হবে কি?

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চাশ বছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার মানের বারোটা বাজানোর পর সম্প্রতি আমরা সরকারদলীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সমালোচনা শুনেছি। জনাব কাদের সরকার প্রচারিত উন্নয়নের তীব্র ডিজিটাল গতির মাঝেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের বাস্তবোচিত সমালোচনা করায় তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়। ৫০ বছরে রাজনৈতিক দলবাজি ও লেনদেনের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাকে পাশ কাটিয়ে অযোগ্যদের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সুযোগ্যদের বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে কম যোগ্য ও তদবিরকারী অধ্যাপকদের উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে পদে পদে ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ/আইন লঙ্ঘন করে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে মুমূর্ষু বানানোর পর জনাব কাদেরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের উল্লিখিত সমালোচনাকে শিক্ষাপ্রেমীদের কাছে অনেকটা রোগী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার পর ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার মতো মনে হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের অবনমন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আমি নিজে যথেষ্ট লিখেছি।

টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বরূপ ও প্রতিকার’ শীর্ষক একটি গবেষণায় সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে উচ্চশিক্ষার সমস্যা ও সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। টিআইবি এ গবেষণা কাজটিকে ২০০৮ সালে প্রকাশক না হয়েও গ্রন্থাকারে প্রকাশ করলে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। তবে ওই পর্যন্তই।

কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বর্ণের আবরণে চলমান দলীয় রাজনীতির চর্চা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বের করে লেখাপড়া ও গবেষণার জগতে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নামে একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়েছে। এবার জনাব ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক। দেখা যাক তার বক্তব্যে নতুন কিছু আছে কিনা।

জনাব কাদের বলেছেন, ‘অবাক লাগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষার মূল দায়িত্বে আছেন, তারা সেখানকার প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন আর বসেন। এই ব্যক্তিত্বহীনতা শিক্ষকতার মর্যাদাকে ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করে।’ জনাব কাদেরের এ বক্তব্য সত্য। তবে তার এ কথাও ভাবা উচিত যে, ক’জন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অধ্যাপক সম্প্রতি উপাচার্য হতে পারছেন। তদবির না করে কি কেউ উপাচার্য হতে পেরেছেন? আর উপাচার্য হতে তদবিরকারী অধ্যাপককে কি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অধ্যাপক বলা যায়? উপাচার্য হওয়ার রেসে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপকদের অনেকেই যে ছাত্রনেতাদের সহায়তা নেন, সে বিষয়টি তো ওপেন সিক্রেট।

কাজেই জনাব কাদেরের এ বক্তব্যে কোনো নতুনত্ব আছে বলে মনে করা যায় না। তার বলা উচিত ছিল, ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি একস্রোতে প্রবাহিত হওয়ায় শিক্ষকদের মহান নিরপেক্ষতার অহঙ্কারের জায়গাটির দুর্বল হয়ে গেছে। শিক্ষক যদি তার সব শিক্ষার্থীকে একচোখে না দেখতে পারেন তাহলে বড় রকমের অপরাধ করা হয়।

তবে জনাব কাদেরের বক্তব্যের মধ্যে ‘প্রভাবশালী ছাত্রনেতা’দের পরিচয় বিধৃত না হলেও এ বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার নয় যে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের নেতাদের অধীনেই থাকে হলগুলোর কর্তৃত্ব এবং ক্যাম্পাসের দখলদারিত্ব। কাজেই তিনি না বললেও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, কোন ছাত্রসংগঠনের কথায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ‘ওঠেন আর বসেন’।

জনাব কাদের আরও বলেছেন, ‘প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মেধা, যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে নিয়োগ হচ্ছে।’ জনাব কাদেরের এ বক্তব্যের যথার্থতার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক প্রকটতা এবং একাডেমিক মুমূর্ষুতার কারণ নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো সর্বোচ্চ একাডেমিক বিদ্যাপীঠ। সেখানে সবচেয়ে মেধাবীদের নিয়োগ সুনিশ্চিত করতে না পারলে জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই অমেধাবীরাও মেধাবীদের পেছনে ফেলে তদবিরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ পান। এখানে জনাব কাদের আর একটি বিষয় মনে হয় ইচ্ছা করে না বলে চেপে গেছেন।

বিষয়টি হলো, তদবিরের সঙ্গে লেনদেনের প্রভাবও প্রভাষক নিয়োগকে কলুষিত করেছে। জনাব কাদের এড়িয়ে গেলেও টিআইবি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগের ওপর ২০১৬ সালে পরিচালিত ও প্রকাশিত এক গবেষণায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছে (মো. রেযাউল করিম, দিপু রায়, ও মো. মোস্তফা কামাল, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগ : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’, টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদন, ২০১৬)। ১৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পরিচালিত উপরোক্ত গবেষণায় টিআইবি গবেষকরা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। কাজেই জনাব কাদের তার বক্তব্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে প্রভাবশালীদের তদবিরের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও যোগ করলে তার এ প্রাসঙ্গিক বক্তব্য অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবোচিত হতো।

এরপর জনাব কাদের তার বক্তব্যে আরেকটি গা শিউরে ওঠার মতো হলেও বাস্তবোচিত তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এমন অভিযোগ আছে, পছন্দের কাউকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমবর্ষ থেকেই তার ওপর দেওয়া হয় বিশেষ নজর। নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে দেওয়া হয় বিশেষ বিবেচনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেওয়া হয় বিশেষ কৌশল। বাদ দেওয়া হয় সর্বোচ্চ মেধাবীদের।’ এ বিষয়টি অবশ্য টিআইবি রিপোর্টে অধিকতর বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

সেখানে এমনও বলা হয়েছে যে, অনার্স-মাস্টার্সে বিশেষ পছন্দের প্রার্থী আনুকূল্য পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে তাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পরে এমফিল করিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করানোর যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বাস্তবতা আরও বেদনাদায়ক। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পছন্দের প্রার্থীর প্রভাষক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় তিনি নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় জিপিএ কমিয়ে পছন্দের প্রার্থীর নিয়োগ সম্পন্ন করে পরে আবার সে যোগ্যতা সংশোধন করেছেন। এমন ঘটনা নিকট অতীতে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে বলে জানি। এর চেয়ে বড় অনৈতিকতা আর কী হতে পারে?

এ পর্যন্ত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণ হলেও শাস্তির নমুনা বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তে উপাচার্যের দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন তিনি নিজ বিভাগে ফিরে শিক্ষকতায় যোগ দেন। কৃত অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় এমন দৃষ্টান্তকে উপাচার্যদের দুর্নীতিকে আশকারা দেওয়ার শামিল বিবেচনা করা যায়।

নবাগত উপাচার্য পদে এসে ভাবেন, আমার আগের উপাচার্যের দুর্নীতি ধরা পড়ায় তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কাজেই আমি যদি দুর্নীতি করে ধরা পড়ি, তাহলে আমাকেও পদ থেকে সরিয়ে বিভাগে পাঠানো হবে। সে জন্য তিনি দুর্নীতি করতে ভয় পান না।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা বিশ্বমানের নয়। গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিশ্বের অনেক দেশেই সম্ভব নয়। বিশ্বের নানা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে পিএইচডি ডিগ্রি লাগে। আমরাও যদি পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিতে পারতাম তবে এ সমালোচনাগুলো হতো না।’ সম্মানিত ইউজিসি সদস্যের এমন বক্তব্য বাস্তবায়ন করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।

তখন দেখতে হবে কে কার থিসিস লিখে দিয়েছেন, বা কেউ নকল করে থিসিস লিখেছেন কিনা। এমন চর্চা যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একেবারেই হচ্ছে না, এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারলে আমি একজন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসাবে খুশি হতাম। তারপর আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব থিসিস হচ্ছে, তার মধ্যে কিছুসংখ্যক থিসিস যে ভালো মানের হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু অনেক থিসিসেই হচ্ছে গতানুগতিক বিষয়বস্তুর উপস্থাপন। অনেক সম্মানিত সুপারভাইজার গবেষণা শিক্ষার্থীকে ভালো করে না খাটিয়ে তাকে সহজে ডিগ্রি দিয়ে দিচ্ছেন।

এর ফলে পিএইচডি ডিগ্রির মান কমে যাচ্ছে। কাজেই ইউজিসি সদস্যের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়বে এমনটা বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা জরুরি। যেখানে স্কুল-কলেজে শিক্ষক হতে হলেও কয়েক রকম পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে কেবলমাত্র একটি লোকদেখানো মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ করা কতটা যৌক্তিক হচ্ছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। ইউজিসি এ ব্যাপারে কেন চিন্তাভাবনা করছে না তা বোধগম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় না, হয় ভোটার নিয়োগ। শিক্ষকরা সারা বছর নির্বাচন করেন; কিন্তু ছাত্রদের কোনো নির্বাচন হয় না।’ দেড় যুগ আগে একই বক্তব্য দিয়েছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের শিক্ষাবিষয়ক একজন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ড. মাছুম (সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বরূপ ও প্রতিকার, পৃষ্ঠা-২৩)। এসব বক্তব্য থেকে অনুধাবন করা যায় যে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিভাগে অনেক সময় লোকবল থাকা সত্ত্বেও দলীয় ও অন্যান্য স্বার্থগত কারণে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।

আর এসব নিয়োগে মেধা প্রাধান্য না পাওয়ায় ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষকতার মানের অবনমন হচ্ছে। অমেধাবীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিতে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভাবমূর্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে এর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের এশীয় ও আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুঁজতে গিয়ে শক্তিশালী দূরবীন ব্যবহার করেও তাদের অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

উচ্চশিক্ষার এমনই এক নৈরাজ্যিক অবস্থায় সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের আগুনে ঘি ঢেলেছেন। বহু বছর ধরে শিক্ষার উন্নয়নে আমরা যেসব কথা বলে আসছি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব অসংগতি তুলে ধরেছি, জনাব কাদেরের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বড় দেরি করে মুখ খোলায় তার এ বক্তব্যকে মুমূর্ষু মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য দেরি করে প্রেসক্রিপশন লেখার মতো মনে হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখন ধ্বংসের কার্নিশে। মৃতপ্রায়কে এমন প্রেসক্রিপশন লিখে সুস্থ-সবল করা যাবে বলে মনে হয় না।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন