সংস্কৃতিমনারা ঘুরে দাঁড়ালেই সম্ভব
jugantor
সংস্কৃতিমনারা ঘুরে দাঁড়ালেই সম্ভব

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২৭ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এগারো শতকের মাঝ পর্বের কথা। পাল রাজাদের সৈন্য বাহিনীতে নিয়োগ পেয়েছিল দাক্ষিণাত্যের কর্নাট থেকে আসা ব্রাহ্মণ সেন বংশীয়রা। প্রায় চারশ বছর শাসন করা পাল রাজবংশের তখন ক্ষয়িষ্ণু দশা। সেন সামরিক কর্মকর্তারা পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়।

এভাবে সেন বংশের শাসন শুরু হয় বাংলায়। প্রতিবাদী বাঙালির ইতিহাস জানা ছিল সেনদের। তারা অন্যায়ভাবে জেঁকে বসা বিদেশি শাসনকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয় না। সেই খ্রিষ্টপূর্ব যুগে আর্য আক্রমণও ঠেকিয়ে দিয়েছিল বিপ্লবী বাঙালি। এ কারণে সেন রাজারা সাধারণ বাঙালিকে ভয়ের চোখে দেখতেন। কারণ তারা জানেন তাদের রাজক্ষমতায় বসা আইনসম্মতভাবে হয়নি। তাই সাধারণ বাঙালির কাছ থেকে প্রতিবাদের আশঙ্কা ছিল।

এ সংকটের কারণেই বল্লাল সেন চেয়েছিলেন ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বাঙালিকে অন্ধত্বের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে। ক্ষমতা দখল করেই সেনরা বৌদ্ধ পীড়ন শুরু করেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু-ধর্মাশ্রয়ী হয়ে যায়। বল্লাল সেন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ দেশের সাধারণ মানুষকে বর্ণপ্রথার নামাবরণে শ্রেণি বিভক্ত করে ফেলেন। বহিরাগত শাসকগোষ্ঠী ব্রাহ্মণ শ্রেণিভুক্ত হয়। সবচেয়ে সুবিধা ভোগ করে তারা। বহিরাগত সৈন্য বাহিনীর সদস্যরা দ্বিতীয় সুবিধাভোগী শ্রেণিতে চিহ্নিত হয়। তাদের উপাধি হয় ক্ষত্রিয়। টাকা-কড়ি আছে বলে বণিক ও ভূস্বামীদের তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত করে নাম দেওয়া হয় বৈশ্য। আর সাধারণ বাঙালি হিন্দু যারা বরাবর প্রতিবাদী তাদের সর্বনিু শ্রেণিতে ফেলে শূদ্র নাম দেওয়া হয়।

ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যেহেতু মানুষকে বিভ্রান্ত করে শাসন করবে, তাই তারা সতর্ক থাকল মানুষ যাতে প্রকৃত ধর্মকথা জানতে না পারে। তাই শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত করা হলো শূদ্রদের। বলা হলো, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় লেখা। সংস্কৃত দেবতাদের ভাষা। তাই অপবিত্র শূদ্রের জন্য সংস্কৃত পাঠ নিষিদ্ধ। ভুলেও সংস্কৃত পড়লে পাপাচারী শূদ্রের জায়গা হবে নরকে। সতর্ক থাকল অনুবাদ করেও যাতে ধর্মগ্রন্থ পড়ে না ফেলে। তাই বলা হলো, দেবভাষা বাংলায় অর্থাৎ প্রকৃত ভাষায় অনুবাদ করলে তার জায়গা হবে রৌরব নরকে। এসবের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্রাহ্মণ শাসকরা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মান্ধ মানুষ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।

ইতিহাসের এ প্রেক্ষাপট টানতে হলো বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝার জন্য। পাকিস্তান আমলেও ইসলাম ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ বাঙালি মুসলমানকে অন্ধ বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল পশ্চিমা শাসকরা। তখন প্রকৃত শিক্ষিত আলেমের অভাব ছিল সমাজে। বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন জানার সুযোগ তেমন ছিল না। উর্দু বর্ণ যেহেতু দেখতে অনেকটা আরবির মতো, সেই সুযোগ নিয়ে আইয়ুব খানরা বলতেন উর্দু হচ্ছে কুরআনের ভাষা আর বাংলা হিন্দুর ভাষা।

স্বাধীন বাংলাদেশেও কি আমাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে না? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাপ্রত্যাশী তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা তাদের তালবে এলেমদের ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে আবেগ ছড়িয়ে অন্ধ বানাতে চাইছে। পাশাপাশি রাজনীতির মাঠের কোনো কোনো সেয়ানা পক্ষ এ অবস্থার সুবিধা নিয়ে অন্যায়ের আগুনে হাওয়া দিতে থাকে। তাই দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের বাংলাদেশে এরা সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়ে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে চায়।

সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া অঘটনগুলো এসবেরই বহিঃপ্রকাশ। পূজামণ্ডপের বাইরে মূর্তির ঊরুতে পবিত্র কুরআন রাখা, রংপুরের জেলেপল্লিতে আগুন দেওয়া, বিভিন্ন মন্দির ভাঙচুর সব একই ষড়যন্ত্রের অংশ।

সব ধর্ম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একই সত্য প্রযোজ্য-তা হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে যারা কম জানে তাদের অনেকের ধর্ম নিয়ে আবেগ বেশি থাকে। অন্ধকারের জীব যারা, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় এ আবেগী মানুষের আবেগ উসকে দেয়। তারা এভাবে এ মূর্খদের দিয়েই ঘটায় মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ। অন্যদিকে যাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মজ্ঞান ও চর্চা রয়েছে, ধর্মের মানবিক দিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাদের মধ্যে সক্রিয় থাকে।

এরা জানে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে। আবার গভীরভাবে ধর্মশিক্ষা না থাকলেও যেহেতু উসকে দেওয়া অসাধু মানুষ পাশে থাকে না, তাই যুগ যুগ ধরে সাধারণ বাঙালি মুসলমান প্রতিবেশী ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে ভাই-বন্ধু হিসাবে ভালোবেসে এসেছে। একে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আনন্দের ভাগ নিয়েছে। আনন্দের ভাগ ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এ সাম্প্রদায়িক অঘটনগুলো সমাজ বাস্তবতা থেকে উৎসারিত হয়েছে তেমন কিন্তু নয়। আমরা প্রত্যেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতিবেশী মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে অমন সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ অসুস্থতায় আচ্ছন্ন মানুষদের সহজে দেখতে পাব না। বরঞ্চ দেখব সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে অন্যায় ছড়ানো মানুষদের প্রতি সাধারণ মুসলমানের ক্ষোভ। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোতে তো সমাজের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন ধরছে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের। বহির্বিশ্বের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছি আমরা।

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ এখানে যুক্ত করতে চাই। আমার এক হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রী এখন সরকারের বড় কর্মকর্তা। আমি কাছ থেকে দেখেছি সে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ভীষণ রকম অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। মাঝে মাঝে ওর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অভিভূত হই। ওরা নিজ প্রতিবেশীর উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থেকে আনন্দ করে। গত রমজান মাসে পোস্ট দেখলাম নিুমাধ্যমিকে পড়ুয়া ওর ছেলেমেয়ে দুজন ইফতারের জন্য সন্ধ্যায় টেবিলে বসে আছে। ছেলেমেয়েদের আবদারে ছাত্রীটিকে ইফতারের আয়োজন করতে হয়। জোর করে এক আধটা রোজাও করতে চায় ওরা। পূজার মতো ঈদেও ওদের নতুন পোশাক দিতে হয়। ঈদে বিশেষ রান্নাবান্নাও করতে হয়। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম দুই সংস্কৃতির সঙ্গে ওরা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অন্ধকারের জীবরা সাম্প্রদায়িক সংকট তৈরি করার পর আমার এ ছাত্রীটির পোস্ট দেখে খুব বিপন্নবোধ করছি। ও লিখেছে, পূজার পর ওর দুই মুসলমান বন্ধু এসেছিল দাওয়াতে। ওরা পোশাকে-দাড়িতে মুসল্লি ধরনের; কিন্তু প্রথমবার সে লক্ষ করল ছেলেমেয়ের মুখে ভয়ের ছাপ। নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

আমি দীর্ঘশ্বাস না ছেড়ে পারলাম না। এ দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার দীর্ঘ ঐতিহ্যের সুন্দর সরোবরে হঠাৎ কিছুসংখ্যক অমানুষ বিষ ঢেলে দিয়ে আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।

ইসলামের আদর্শ আর সৌন্দর্য থেকে এরা কত দূরে সরে গেছে! মহানবীর বিদায় হজের ভাষণটি এখন বাংলা ভাষায়ও ইউটিউবে পাওয়া যায়। সেখানে কত পরিষ্কারভাবে সব ধর্মের অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। এরা আরেকটু ইসলামী ইতিহাস পড়ার সুযোগ পেলে দেখতো হজরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, কোনো সংঘাতে যদি অন্যধর্মের উপাসনালয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে মুসলমানেরই দায়িত্ব থাকে ওসব সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করে দেওয়ার। অথচ কেমন উলটোপথে হাঁটছে কিছুসংখ্যক অমানুষ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হঠাৎ করে এবার দুর্গাপূজা সামনে রেখে এতগুলো সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ালো কেমন করে? আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যত কথাই বলুক না কেন, এদেশে গোয়েন্দা ব্যর্থতা তো বারবারই প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মুখপাত্ররা প্রতিদিন এ সংকটে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন না করে প্রতিদিন পরস্পরকে আক্রমণ করা রাজনৈতিক ঝগড়ায় মানুষের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন। এসব বচন শুনে মনে হয়, আমরা রাজনৈতিক শোভন-সংস্কৃতিকে নির্বাসনে দিয়েছি। তাদের বচন যে কৌতুকে পরিণত হচ্ছে, তা যেন বুঝতেই চাইছেন না। সব আলোর উৎস যেন নির্বাপিত হয়ে যাচ্ছে। আর তাই ক্রমে জেঁকে বসছে অন্ধকার।

এখনো এ দেশের সিংহভাগ মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে। সাধারণ মানুষ এত বোকা নয় যে, হঠাৎ এতসব নৈরাজ্যের রহস্য বুঝতে পারছে না। নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠলেই অন্ধকারের পেঁচা-বাদুড়রা ভ্যাম্পায়ার হয়ে ওঠে। সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা যখন থেকে হারিয়ে ফেলেছি, তখন থেকেই এসব অসুস্থতা আঁকড়ে ধরেছে। জনগণের মনোরঞ্জন করে নিরপেক্ষ বলয়ে দাঁড়িয়ে জনমত যাচাই করার আত্মবিশ্বাস কোনো পক্ষের নেই। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভ্যাম্পায়ারদের শক্তি সঞ্চিত হয়। এরা তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস পায়।

আমরা মনে করি, এমন অসুস্থতার ভেতর থেকে মুক্তি পেতে সংস্কৃতিমনা মানুষদের সব জরা ও ব্যর্থতা ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে মানবিকতার বাণী নিয়ে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষদের সামনে ধর্মের মানবিক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। অন্ধকার বিদূরিত করতে হলে আলো ছড়ানোর বিকল্প নেই। সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর উসকানিদাতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। আমরা মনে করি, শুভ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অসাম্প্রদায়িক সৌন্দর্যের বাংলাদেশ আবার স্বমহিমায় নিজেকে প্রকাশ করবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@Gmail.com

সংস্কৃতিমনারা ঘুরে দাঁড়ালেই সম্ভব

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এগারো শতকের মাঝ পর্বের কথা। পাল রাজাদের সৈন্য বাহিনীতে নিয়োগ পেয়েছিল দাক্ষিণাত্যের কর্নাট থেকে আসা ব্রাহ্মণ সেন বংশীয়রা। প্রায় চারশ বছর শাসন করা পাল রাজবংশের তখন ক্ষয়িষ্ণু দশা। সেন সামরিক কর্মকর্তারা পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়।

এভাবে সেন বংশের শাসন শুরু হয় বাংলায়। প্রতিবাদী বাঙালির ইতিহাস জানা ছিল সেনদের। তারা অন্যায়ভাবে জেঁকে বসা বিদেশি শাসনকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয় না। সেই খ্রিষ্টপূর্ব যুগে আর্য আক্রমণও ঠেকিয়ে দিয়েছিল বিপ্লবী বাঙালি। এ কারণে সেন রাজারা সাধারণ বাঙালিকে ভয়ের চোখে দেখতেন। কারণ তারা জানেন তাদের রাজক্ষমতায় বসা আইনসম্মতভাবে হয়নি। তাই সাধারণ বাঙালির কাছ থেকে প্রতিবাদের আশঙ্কা ছিল।

এ সংকটের কারণেই বল্লাল সেন চেয়েছিলেন ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বাঙালিকে অন্ধত্বের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে। ক্ষমতা দখল করেই সেনরা বৌদ্ধ পীড়ন শুরু করেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু-ধর্মাশ্রয়ী হয়ে যায়। বল্লাল সেন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ দেশের সাধারণ মানুষকে বর্ণপ্রথার নামাবরণে শ্রেণি বিভক্ত করে ফেলেন। বহিরাগত শাসকগোষ্ঠী ব্রাহ্মণ শ্রেণিভুক্ত হয়। সবচেয়ে সুবিধা ভোগ করে তারা। বহিরাগত সৈন্য বাহিনীর সদস্যরা দ্বিতীয় সুবিধাভোগী শ্রেণিতে চিহ্নিত হয়। তাদের উপাধি হয় ক্ষত্রিয়। টাকা-কড়ি আছে বলে বণিক ও ভূস্বামীদের তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত করে নাম দেওয়া হয় বৈশ্য। আর সাধারণ বাঙালি হিন্দু যারা বরাবর প্রতিবাদী তাদের সর্বনিু শ্রেণিতে ফেলে শূদ্র নাম দেওয়া হয়।

ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যেহেতু মানুষকে বিভ্রান্ত করে শাসন করবে, তাই তারা সতর্ক থাকল মানুষ যাতে প্রকৃত ধর্মকথা জানতে না পারে। তাই শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত করা হলো শূদ্রদের। বলা হলো, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় লেখা। সংস্কৃত দেবতাদের ভাষা। তাই অপবিত্র শূদ্রের জন্য সংস্কৃত পাঠ নিষিদ্ধ। ভুলেও সংস্কৃত পড়লে পাপাচারী শূদ্রের জায়গা হবে নরকে। সতর্ক থাকল অনুবাদ করেও যাতে ধর্মগ্রন্থ পড়ে না ফেলে। তাই বলা হলো, দেবভাষা বাংলায় অর্থাৎ প্রকৃত ভাষায় অনুবাদ করলে তার জায়গা হবে রৌরব নরকে। এসবের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্রাহ্মণ শাসকরা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মান্ধ মানুষ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।

ইতিহাসের এ প্রেক্ষাপট টানতে হলো বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝার জন্য। পাকিস্তান আমলেও ইসলাম ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ বাঙালি মুসলমানকে অন্ধ বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল পশ্চিমা শাসকরা। তখন প্রকৃত শিক্ষিত আলেমের অভাব ছিল সমাজে। বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন জানার সুযোগ তেমন ছিল না। উর্দু বর্ণ যেহেতু দেখতে অনেকটা আরবির মতো, সেই সুযোগ নিয়ে আইয়ুব খানরা বলতেন উর্দু হচ্ছে কুরআনের ভাষা আর বাংলা হিন্দুর ভাষা।

স্বাধীন বাংলাদেশেও কি আমাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে না? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাপ্রত্যাশী তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা তাদের তালবে এলেমদের ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে আবেগ ছড়িয়ে অন্ধ বানাতে চাইছে। পাশাপাশি রাজনীতির মাঠের কোনো কোনো সেয়ানা পক্ষ এ অবস্থার সুবিধা নিয়ে অন্যায়ের আগুনে হাওয়া দিতে থাকে। তাই দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের বাংলাদেশে এরা সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়ে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে চায়।

সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া অঘটনগুলো এসবেরই বহিঃপ্রকাশ। পূজামণ্ডপের বাইরে মূর্তির ঊরুতে পবিত্র কুরআন রাখা, রংপুরের জেলেপল্লিতে আগুন দেওয়া, বিভিন্ন মন্দির ভাঙচুর সব একই ষড়যন্ত্রের অংশ।

সব ধর্ম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একই সত্য প্রযোজ্য-তা হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে যারা কম জানে তাদের অনেকের ধর্ম নিয়ে আবেগ বেশি থাকে। অন্ধকারের জীব যারা, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় এ আবেগী মানুষের আবেগ উসকে দেয়। তারা এভাবে এ মূর্খদের দিয়েই ঘটায় মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ। অন্যদিকে যাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মজ্ঞান ও চর্চা রয়েছে, ধর্মের মানবিক দিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাদের মধ্যে সক্রিয় থাকে।

এরা জানে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে। আবার গভীরভাবে ধর্মশিক্ষা না থাকলেও যেহেতু উসকে দেওয়া অসাধু মানুষ পাশে থাকে না, তাই যুগ যুগ ধরে সাধারণ বাঙালি মুসলমান প্রতিবেশী ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে ভাই-বন্ধু হিসাবে ভালোবেসে এসেছে। একে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আনন্দের ভাগ নিয়েছে। আনন্দের ভাগ ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এ সাম্প্রদায়িক অঘটনগুলো সমাজ বাস্তবতা থেকে উৎসারিত হয়েছে তেমন কিন্তু নয়। আমরা প্রত্যেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতিবেশী মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে অমন সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ অসুস্থতায় আচ্ছন্ন মানুষদের সহজে দেখতে পাব না। বরঞ্চ দেখব সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে অন্যায় ছড়ানো মানুষদের প্রতি সাধারণ মুসলমানের ক্ষোভ। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোতে তো সমাজের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন ধরছে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের। বহির্বিশ্বের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছি আমরা।

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ এখানে যুক্ত করতে চাই। আমার এক হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রী এখন সরকারের বড় কর্মকর্তা। আমি কাছ থেকে দেখেছি সে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ভীষণ রকম অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। মাঝে মাঝে ওর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অভিভূত হই। ওরা নিজ প্রতিবেশীর উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থেকে আনন্দ করে। গত রমজান মাসে পোস্ট দেখলাম নিুমাধ্যমিকে পড়ুয়া ওর ছেলেমেয়ে দুজন ইফতারের জন্য সন্ধ্যায় টেবিলে বসে আছে। ছেলেমেয়েদের আবদারে ছাত্রীটিকে ইফতারের আয়োজন করতে হয়। জোর করে এক আধটা রোজাও করতে চায় ওরা। পূজার মতো ঈদেও ওদের নতুন পোশাক দিতে হয়। ঈদে বিশেষ রান্নাবান্নাও করতে হয়। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম দুই সংস্কৃতির সঙ্গে ওরা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অন্ধকারের জীবরা সাম্প্রদায়িক সংকট তৈরি করার পর আমার এ ছাত্রীটির পোস্ট দেখে খুব বিপন্নবোধ করছি। ও লিখেছে, পূজার পর ওর দুই মুসলমান বন্ধু এসেছিল দাওয়াতে। ওরা পোশাকে-দাড়িতে মুসল্লি ধরনের; কিন্তু প্রথমবার সে লক্ষ করল ছেলেমেয়ের মুখে ভয়ের ছাপ। নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

আমি দীর্ঘশ্বাস না ছেড়ে পারলাম না। এ দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার দীর্ঘ ঐতিহ্যের সুন্দর সরোবরে হঠাৎ কিছুসংখ্যক অমানুষ বিষ ঢেলে দিয়ে আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।

ইসলামের আদর্শ আর সৌন্দর্য থেকে এরা কত দূরে সরে গেছে! মহানবীর বিদায় হজের ভাষণটি এখন বাংলা ভাষায়ও ইউটিউবে পাওয়া যায়। সেখানে কত পরিষ্কারভাবে সব ধর্মের অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। এরা আরেকটু ইসলামী ইতিহাস পড়ার সুযোগ পেলে দেখতো হজরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, কোনো সংঘাতে যদি অন্যধর্মের উপাসনালয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে মুসলমানেরই দায়িত্ব থাকে ওসব সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করে দেওয়ার। অথচ কেমন উলটোপথে হাঁটছে কিছুসংখ্যক অমানুষ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হঠাৎ করে এবার দুর্গাপূজা সামনে রেখে এতগুলো সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ালো কেমন করে? আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যত কথাই বলুক না কেন, এদেশে গোয়েন্দা ব্যর্থতা তো বারবারই প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মুখপাত্ররা প্রতিদিন এ সংকটে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন না করে প্রতিদিন পরস্পরকে আক্রমণ করা রাজনৈতিক ঝগড়ায় মানুষের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন। এসব বচন শুনে মনে হয়, আমরা রাজনৈতিক শোভন-সংস্কৃতিকে নির্বাসনে দিয়েছি। তাদের বচন যে কৌতুকে পরিণত হচ্ছে, তা যেন বুঝতেই চাইছেন না। সব আলোর উৎস যেন নির্বাপিত হয়ে যাচ্ছে। আর তাই ক্রমে জেঁকে বসছে অন্ধকার।

এখনো এ দেশের সিংহভাগ মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে। সাধারণ মানুষ এত বোকা নয় যে, হঠাৎ এতসব নৈরাজ্যের রহস্য বুঝতে পারছে না। নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠলেই অন্ধকারের পেঁচা-বাদুড়রা ভ্যাম্পায়ার হয়ে ওঠে। সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা যখন থেকে হারিয়ে ফেলেছি, তখন থেকেই এসব অসুস্থতা আঁকড়ে ধরেছে। জনগণের মনোরঞ্জন করে নিরপেক্ষ বলয়ে দাঁড়িয়ে জনমত যাচাই করার আত্মবিশ্বাস কোনো পক্ষের নেই। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভ্যাম্পায়ারদের শক্তি সঞ্চিত হয়। এরা তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস পায়।

আমরা মনে করি, এমন অসুস্থতার ভেতর থেকে মুক্তি পেতে সংস্কৃতিমনা মানুষদের সব জরা ও ব্যর্থতা ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে মানবিকতার বাণী নিয়ে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষদের সামনে ধর্মের মানবিক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। অন্ধকার বিদূরিত করতে হলে আলো ছড়ানোর বিকল্প নেই। সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর উসকানিদাতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। আমরা মনে করি, শুভ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অসাম্প্রদায়িক সৌন্দর্যের বাংলাদেশ আবার স্বমহিমায় নিজেকে প্রকাশ করবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@Gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন