আইনের শাসন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
আইনের শাসন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা গণতন্ত্র চান, তারা অবশ্যই আইনের শাসনও চাইবেন। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আইনের শাসন অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, আইনের শাসন হলেই কি তা কল্যাণকর হবে? যারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন না। তবে আইনের প্রসঙ্গ আলোচনায় এলে অবশ্যম্ভাবীভাবে কালো আইনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়।

স্বাধীনতা-পূর্বকালে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরে মাত্র কয়েকটি কালো আইন গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিশেষ ক্ষমতা আইন, জরুরি আইন এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতন্ত্রকে প্রতিবন্ধী করে ফেলেছে।

পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক নিরাপত্তা আইন, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা আইন, ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস এবং জরুরি আইন নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অর্থহীন করে তুলেছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে, কালো আইন কথাটি কোথা থেকে এসেছে। ইংল্যান্ডে এক সময় সাধারণ চাষিরা ভূ-স্বামীর জমিকে পশুর চারণভূমি হিসাবে ব্যবহার করত, ভূ-স্বামীর মালিকানাধীন বনভূমিতে পশু-পাখি শিকার করত।

কিন্তু ভূ-স্বামীদের স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে রাজা আইন করলেন, এসব করা চলবে না। অথচ যুগ যুগ ধরে ইংল্যান্ডের কৃষকরা জমির মালিক না হয়েও এ অধিকারগুলো ভোগ করত। আজকাল এসব অধিকার প্রথাসিদ্ধ আইন তথা কাস্টমারি ল’ দ্বারা কৃষকের অধিকার হিসাবে স্বীকৃত।

ভূ-স্বামীর জমিতে পশুপাখি শিকার করা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে এসব রোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকরা তাদের যাতে পাহারাদাররা চিনতে না পারে সেজন্য মুখে কালো রঙের আচ্ছাদন দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলত। এরপর আইনটিকে আরও কঠিন করে তোলা হলো।

আর তা হলো যে কেউ মুখে কালো রং মাখলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে বলে আইনের বিধান করা হলো। এ আইনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিক হলো, পশু-পাখি শিকার করা ছাড়াও যদি কেউ মজা করার জন্য মুখে কালো রং মাখতো, সেও তখন অপরাধী বলে সাব্যস্ত হতো।

ইংল্যান্ডে যখন মুখে কালো রং মাখাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন থেকেই কালো আইন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রতিবাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কালো আইন কথাটি তখন থেকে চালু হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা আছে।

অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এ আইনগুলো প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আইন করার দাবি উঠেছে। যদি বিদ্যমান সংসদ, যেটির বৈধতা বিতর্কিত, এটি যদি আলোচ্য আইনটি প্রণয়ন করে তাহলে হয়তো অনেকেই নিরাশ হবেন।

ইউরোপের রাজনৈতিক বিকাশ ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। কারণ ইউরোপীয় সমাজ অন্য দেশের তুলনায় আগে থেকেই গোত্রব্যবস্থা থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়। এটা সম্ভব হয়েছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কাঠামোভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার না করে। ইউরোপ রাষ্ট্র গঠনের দিক থেকেও ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। এ রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় সামরিক শক্তি সংহত না হওয়া সত্ত্বেও বিচার নিশ্চিতকরণের সক্ষমতা প্রদর্শন করে।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার বিকাশ ও বৈধতা আইনের শাসনের বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। প্রথম দিককার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো বিচার-আচার করত, তবে তার সঙ্গে আইনের তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। আইনের শেকড় অন্যত্র প্রোথিত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধর্ম, গোত্র সমাজে বিদ্যমান প্রথা ইত্যাদি।

এখান থেকে দেখা যায় প্রথা পদ্ধতি আইনের একটি শক্তিশালী উৎস। ইউরোপের প্রথম দিককার রাষ্ট্রগুলো নতুন আইন তৈরি করার জন্য ব্যস্ত থাকেনি। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং বৈধতা নির্ভর করতো পক্ষপাতহীনভাবে আইন প্রয়োগ করে, যে আইন তারা প্রণয়ন করেনি।

আইনের শাসন বুঝতে হলে আইন এবং আইন প্রণয়নের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা বুঝতে হবে। গণতন্ত্রকে যেমন অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, ঠিক একইভাবে আইনের শাসনও এর গবেষণায় নিয়োজিত পণ্ডিতদের ব্যাখ্যার বৈচিত্র্যে খুঁজে পাওয়া যায়। আইন হলো বিচারের বিমূর্ত নিয়ম-কানুন। বিচারের নিয়ম-কানুন এমনটি হতে হবে, যার ফলে গোষ্ঠী অথবা সম্প্রদায়কে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব হয়। প্রাক-আধুনিক সমাজে বিশ্বাস করা হতো আইন মানুষ দ্বারা সৃষ্ট নয়।

আইন প্রণীত হতো আইন প্রণয়নকারীর ঊর্ধ্বে। এ কর্তৃপক্ষ হতে পারে স্বর্গীয় কর্তৃপক্ষ। অথবা অনাদিকাল থেকে প্রচলিত প্রথা অথবা স্বয়ং প্রকৃতি। অপরদিকে বর্তমানকালে আইন প্রণয়ন ইতিবাচক আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটা অবশ্যই রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।

রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক ধরনের হতে পারে। এ ব্যবস্থায় ক্ষমতাধর হন রাজা, ব্যারন, প্রেসিডেন্ট, আইনসভার সদস্য, এমনকি যুদ্ধ প্রভু। এরা নতুন আইন তৈরি করে একে কার্যকর করার জন্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যোগাযোগকে ব্যবহার করেন। আইনের শাসন তখনই নিশ্চিত হয়, যখন পূর্বে প্রয়োগকৃত আইনের সমষ্টি আইন প্রণয়ন ব্যবস্থার ওপর সার্বভৌম হয়। এর অর্থ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি আইনের বন্ধন অতিক্রম করতে পারে না।

যদি তারা আইনের শাসন বলবৎ করতে চায় তাহলে তাদের এমনভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে যা পূর্বে বিরাজমান আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তাদের খেয়ালখুশি বা মর্জির ওপর নির্ভর করে না। একটি রাষ্ট্রে বহু আইন চালু থাকে। যদি কোনো নতুন আইন তৈরি করতে হয়, তাহলে এ নতুন আইন কোনোক্রমেই বিদ্যমান অন্য সব আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।

এ কারণে নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করতে গিয়ে এ আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদ্যমান অন্য আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয়। সম্ভবত এ কারণেই যে কোনো আইনের বৈধতা বিচার করতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হয় আইনটি সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হচ্ছে কিনা।

আইন সম্পর্কে মূল ধারণা ছিল আইনের উৎপত্তি স্বর্গীয় কর্তৃপক্ষ, নিয়ম প্রথা অথবা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ মানুষ আইন পরিবর্তন করতে পারে না। অথচ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনের পর্যালোচনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের শক্তি হ্রাস পেয়েছে।

আধুনিককালে মানুষ প্রাকৃতিক আইন বিশ্বাস করে। আমাদের বুঝতে হবে আইনের স্রষ্টা মানুষ। তবে আইন তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু কঠিন নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। কাজটি এমনভাবে করতে হবে যা সমাজের বৃহত্তর অংশ মেনে নিতে সম্মত হয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এমন কোনো আইন করা যাবে না যার প্রতি গণসম্মতি নেই। এরকম আইন করা হলেও তা বহাল রাখা সম্ভব হয় না।

আইন ও আইন প্রণয়নের মধ্যে পার্থক্য হলো, সাংবিধানিক আইন এবং সাধারণ আইনের পার্থক্যের সমতুল্য। সমসাময়িক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস যদি কোনো নতুন আইন পাশ করতে চায়, তাহলে এ আইনকে অতীতের এবং উচ্চতর সংস্থার দ্বারা প্রণীত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এর অর্থ হলো আইনটি সুপ্রিমকোর্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

আইনের শাসন রাজনৈতিক ব্যবস্থার এমন একটি বিষয়, যা শেষ বিচারে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। শাসন বিভাগের ক্ষমতাকে রাশ টেনে ধরার জন্য প্রথম দিকে গণতান্ত্রিক সংসদ অথবা নির্বাচনকে ব্যবহার করা হয়নি। সেই সময় সমাজে বিদ্যমান কিছু সমিতি ও সংগঠন জনমত সৃষ্টি করেছিল যে, যারা দেশ শাসন করবেন তাদের তা করতে হবে আইনানুগভাবে।

এভাবে আমরা অনুমান করতে পারি রাষ্ট্র গঠন এবং আইনের শাসনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে। বাংলাদেশে একটি আইনি ইস্যু তৈরি হয়েছিল যার মধ্য দিয়ে শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এ উত্তেজনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বিচারকদের অসদাচরণের বিচার কীভাবে হবে।

একদিকে দেখা যায় শাসকরা তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়াতে পারেন আইন অনুযায়ী এবং আইনকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে আইনও পারে শাসন কর্তৃপক্ষকে যা ইচ্ছা তা করা থেকে বিরত রাখতে। এর লক্ষ্য হবে কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থকে রক্ষা করা নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বার্থকে রক্ষা করা।

এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আইনের শাসন প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়াস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে রাজা চাইতেন সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে। বিংশ শতাব্দীতে এসে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে সন্ত্রাস প্রতিহত করার নামে বিচারবহির্ভূত ডেথ স্কোয়াড ব্যবহার করা হয়েছে।

বর্তমানকালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে আইনের শাসনের দুর্বলতা। ফলে এসব দেশের রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে এক ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একটি কঠিন কাজ। সমস্যার সমাধান হিসাবে সামরিক সংস্থা এবং রাজস্ব সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে সমস্যার সমাধান হিসাবে যে সহজাত প্রবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়, তাকে ভিত্তি করে অগণতান্ত্রিক শক্তি বাড়-বাড়ন্ত হয়ে ওঠে।

যুদ্ধবাজ নেতারা তাদের বাহিনীকে ব্যবহার করে যে সম্পদ আহরণ করে, তার কোনো আইনি বৈধতা নেই। বাংলাদেশে বিদ্যমান নানা রকম চাঁদাবাজি এবং বাণিজ্য অনেককে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে সাহায্য করেছে। এসবের আশু কোনো প্রতিকার হবে এমনটি দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সহজ। একে অনুষ্ঠান না বলে অনুষ্ঠানের নাটক বলাই শ্রেয়। এখন অনেক দেশে এ ধরনের নির্বাচন করার জন্য বিশাল আন্তর্জাতিক অবকাঠামোর সহযোগিতা প্রদান করা হয়। আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সমগ্র দেশে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে থাকা প্রয়োজন। আইনের শাসন কার্যকর করার জন্য বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। আইনজীবী, বিচারক এবং আদালতের অন্য অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য এ অর্থ ব্যবহার করতে হয়।

এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এরা নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে যে একটি ভালো নির্বাচনের পরিবেশ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে অবৈধ কিছু হচ্ছে না। যা কিছু হচ্ছে তা আইনি কর্তৃত্বের মধ্যেই হচ্ছে। আস্থার ব্যাপারটি যাতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

তবে এলিটরা সংখ্যায় কম, কিন্তু ক্ষমতার দিক থেকে বিশাল। এরা নির্বাচনে নানাভাবে কলকাঠি নাড়তে পারে। পরিস্থিতি এমন যে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য দিবাস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ভালো নির্বাচন যে কত প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে চাচ্ছে না। কারণ তাদের আস্থা খুব সামান্যই। এ হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজসাধ্য নয়। ল্যাটিন আমেরিকা বর্তমানে যথেষ্ট গণতান্ত্রিক।

কিন্তু এ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো আইনের শাসনের দিক থেকে অত্যন্ত নাজুক। এসব দেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপক। পুলিশ ঘুষ খায় এবং বিচারপতিরা কর দেয় না। রুশ ফেডারেশনে নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু দেশটিতে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নিচের দিকের ক্ষুদ্র শক্তিমানরা বিচারহীন অবস্থায় আইন ভঙ্গ করে চলছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর অনেক লেখালেখি এবং গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণা আমাদের সমস্যার মূলে যেতে সাহায্য করছে। আধুনিক বিশ্ব, যার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং এর পূর্বশর্ত ছিল আইনের শাসনের অস্তিত্ব-এ রকম কিছু এখন আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায় না। আইনের শাসন চুলচেরাভাবে পালিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আশা করা যায় না।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে গতি সঞ্চারিত হয়েছে তা আগামী দিনে অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তা আছে। আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্পর্কিত তা নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। আপাতত আমরা যদি বুঝি আইনের শাসন কত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, তাহলে এ উপলব্ধি আমাদের অনেক দূর নিয়ে যাবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

আইনের শাসন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা গণতন্ত্র চান, তারা অবশ্যই আইনের শাসনও চাইবেন। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আইনের শাসন অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, আইনের শাসন হলেই কি তা কল্যাণকর হবে? যারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন না। তবে আইনের প্রসঙ্গ আলোচনায় এলে অবশ্যম্ভাবীভাবে কালো আইনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়।

স্বাধীনতা-পূর্বকালে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরে মাত্র কয়েকটি কালো আইন গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিশেষ ক্ষমতা আইন, জরুরি আইন এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতন্ত্রকে প্রতিবন্ধী করে ফেলেছে।

পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক নিরাপত্তা আইন, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা আইন, ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস এবং জরুরি আইন নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অর্থহীন করে তুলেছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে, কালো আইন কথাটি কোথা থেকে এসেছে। ইংল্যান্ডে এক সময় সাধারণ চাষিরা ভূ-স্বামীর জমিকে পশুর চারণভূমি হিসাবে ব্যবহার করত, ভূ-স্বামীর মালিকানাধীন বনভূমিতে পশু-পাখি শিকার করত।

কিন্তু ভূ-স্বামীদের স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে রাজা আইন করলেন, এসব করা চলবে না। অথচ যুগ যুগ ধরে ইংল্যান্ডের কৃষকরা জমির মালিক না হয়েও এ অধিকারগুলো ভোগ করত। আজকাল এসব অধিকার প্রথাসিদ্ধ আইন তথা কাস্টমারি ল’ দ্বারা কৃষকের অধিকার হিসাবে স্বীকৃত।

ভূ-স্বামীর জমিতে পশুপাখি শিকার করা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে এসব রোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকরা তাদের যাতে পাহারাদাররা চিনতে না পারে সেজন্য মুখে কালো রঙের আচ্ছাদন দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলত। এরপর আইনটিকে আরও কঠিন করে তোলা হলো।

আর তা হলো যে কেউ মুখে কালো রং মাখলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে বলে আইনের বিধান করা হলো। এ আইনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিক হলো, পশু-পাখি শিকার করা ছাড়াও যদি কেউ মজা করার জন্য মুখে কালো রং মাখতো, সেও তখন অপরাধী বলে সাব্যস্ত হতো।

ইংল্যান্ডে যখন মুখে কালো রং মাখাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন থেকেই কালো আইন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রতিবাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কালো আইন কথাটি তখন থেকে চালু হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা আছে।

অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এ আইনগুলো প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আইন করার দাবি উঠেছে। যদি বিদ্যমান সংসদ, যেটির বৈধতা বিতর্কিত, এটি যদি আলোচ্য আইনটি প্রণয়ন করে তাহলে হয়তো অনেকেই নিরাশ হবেন।

ইউরোপের রাজনৈতিক বিকাশ ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। কারণ ইউরোপীয় সমাজ অন্য দেশের তুলনায় আগে থেকেই গোত্রব্যবস্থা থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়। এটা সম্ভব হয়েছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কাঠামোভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার না করে। ইউরোপ রাষ্ট্র গঠনের দিক থেকেও ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। এ রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় সামরিক শক্তি সংহত না হওয়া সত্ত্বেও বিচার নিশ্চিতকরণের সক্ষমতা প্রদর্শন করে।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার বিকাশ ও বৈধতা আইনের শাসনের বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। প্রথম দিককার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো বিচার-আচার করত, তবে তার সঙ্গে আইনের তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। আইনের শেকড় অন্যত্র প্রোথিত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধর্ম, গোত্র সমাজে বিদ্যমান প্রথা ইত্যাদি।

এখান থেকে দেখা যায় প্রথা পদ্ধতি আইনের একটি শক্তিশালী উৎস। ইউরোপের প্রথম দিককার রাষ্ট্রগুলো নতুন আইন তৈরি করার জন্য ব্যস্ত থাকেনি। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং বৈধতা নির্ভর করতো পক্ষপাতহীনভাবে আইন প্রয়োগ করে, যে আইন তারা প্রণয়ন করেনি।

আইনের শাসন বুঝতে হলে আইন এবং আইন প্রণয়নের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা বুঝতে হবে। গণতন্ত্রকে যেমন অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, ঠিক একইভাবে আইনের শাসনও এর গবেষণায় নিয়োজিত পণ্ডিতদের ব্যাখ্যার বৈচিত্র্যে খুঁজে পাওয়া যায়। আইন হলো বিচারের বিমূর্ত নিয়ম-কানুন। বিচারের নিয়ম-কানুন এমনটি হতে হবে, যার ফলে গোষ্ঠী অথবা সম্প্রদায়কে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব হয়। প্রাক-আধুনিক সমাজে বিশ্বাস করা হতো আইন মানুষ দ্বারা সৃষ্ট নয়।

আইন প্রণীত হতো আইন প্রণয়নকারীর ঊর্ধ্বে। এ কর্তৃপক্ষ হতে পারে স্বর্গীয় কর্তৃপক্ষ। অথবা অনাদিকাল থেকে প্রচলিত প্রথা অথবা স্বয়ং প্রকৃতি। অপরদিকে বর্তমানকালে আইন প্রণয়ন ইতিবাচক আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটা অবশ্যই রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।

রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক ধরনের হতে পারে। এ ব্যবস্থায় ক্ষমতাধর হন রাজা, ব্যারন, প্রেসিডেন্ট, আইনসভার সদস্য, এমনকি যুদ্ধ প্রভু। এরা নতুন আইন তৈরি করে একে কার্যকর করার জন্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যোগাযোগকে ব্যবহার করেন। আইনের শাসন তখনই নিশ্চিত হয়, যখন পূর্বে প্রয়োগকৃত আইনের সমষ্টি আইন প্রণয়ন ব্যবস্থার ওপর সার্বভৌম হয়। এর অর্থ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি আইনের বন্ধন অতিক্রম করতে পারে না।

যদি তারা আইনের শাসন বলবৎ করতে চায় তাহলে তাদের এমনভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে যা পূর্বে বিরাজমান আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তাদের খেয়ালখুশি বা মর্জির ওপর নির্ভর করে না। একটি রাষ্ট্রে বহু আইন চালু থাকে। যদি কোনো নতুন আইন তৈরি করতে হয়, তাহলে এ নতুন আইন কোনোক্রমেই বিদ্যমান অন্য সব আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।

এ কারণে নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করতে গিয়ে এ আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদ্যমান অন্য আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয়। সম্ভবত এ কারণেই যে কোনো আইনের বৈধতা বিচার করতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হয় আইনটি সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হচ্ছে কিনা।

আইন সম্পর্কে মূল ধারণা ছিল আইনের উৎপত্তি স্বর্গীয় কর্তৃপক্ষ, নিয়ম প্রথা অথবা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ মানুষ আইন পরিবর্তন করতে পারে না। অথচ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনের পর্যালোচনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের শক্তি হ্রাস পেয়েছে।

আধুনিককালে মানুষ প্রাকৃতিক আইন বিশ্বাস করে। আমাদের বুঝতে হবে আইনের স্রষ্টা মানুষ। তবে আইন তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু কঠিন নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। কাজটি এমনভাবে করতে হবে যা সমাজের বৃহত্তর অংশ মেনে নিতে সম্মত হয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এমন কোনো আইন করা যাবে না যার প্রতি গণসম্মতি নেই। এরকম আইন করা হলেও তা বহাল রাখা সম্ভব হয় না।

আইন ও আইন প্রণয়নের মধ্যে পার্থক্য হলো, সাংবিধানিক আইন এবং সাধারণ আইনের পার্থক্যের সমতুল্য। সমসাময়িক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস যদি কোনো নতুন আইন পাশ করতে চায়, তাহলে এ আইনকে অতীতের এবং উচ্চতর সংস্থার দ্বারা প্রণীত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এর অর্থ হলো আইনটি সুপ্রিমকোর্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

আইনের শাসন রাজনৈতিক ব্যবস্থার এমন একটি বিষয়, যা শেষ বিচারে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। শাসন বিভাগের ক্ষমতাকে রাশ টেনে ধরার জন্য প্রথম দিকে গণতান্ত্রিক সংসদ অথবা নির্বাচনকে ব্যবহার করা হয়নি। সেই সময় সমাজে বিদ্যমান কিছু সমিতি ও সংগঠন জনমত সৃষ্টি করেছিল যে, যারা দেশ শাসন করবেন তাদের তা করতে হবে আইনানুগভাবে।

এভাবে আমরা অনুমান করতে পারি রাষ্ট্র গঠন এবং আইনের শাসনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে। বাংলাদেশে একটি আইনি ইস্যু তৈরি হয়েছিল যার মধ্য দিয়ে শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এ উত্তেজনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বিচারকদের অসদাচরণের বিচার কীভাবে হবে।

একদিকে দেখা যায় শাসকরা তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়াতে পারেন আইন অনুযায়ী এবং আইনকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে আইনও পারে শাসন কর্তৃপক্ষকে যা ইচ্ছা তা করা থেকে বিরত রাখতে। এর লক্ষ্য হবে কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থকে রক্ষা করা নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বার্থকে রক্ষা করা।

এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আইনের শাসন প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়াস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে রাজা চাইতেন সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে। বিংশ শতাব্দীতে এসে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে সন্ত্রাস প্রতিহত করার নামে বিচারবহির্ভূত ডেথ স্কোয়াড ব্যবহার করা হয়েছে।

বর্তমানকালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে আইনের শাসনের দুর্বলতা। ফলে এসব দেশের রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে এক ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একটি কঠিন কাজ। সমস্যার সমাধান হিসাবে সামরিক সংস্থা এবং রাজস্ব সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে সমস্যার সমাধান হিসাবে যে সহজাত প্রবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়, তাকে ভিত্তি করে অগণতান্ত্রিক শক্তি বাড়-বাড়ন্ত হয়ে ওঠে।

যুদ্ধবাজ নেতারা তাদের বাহিনীকে ব্যবহার করে যে সম্পদ আহরণ করে, তার কোনো আইনি বৈধতা নেই। বাংলাদেশে বিদ্যমান নানা রকম চাঁদাবাজি এবং বাণিজ্য অনেককে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে সাহায্য করেছে। এসবের আশু কোনো প্রতিকার হবে এমনটি দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সহজ। একে অনুষ্ঠান না বলে অনুষ্ঠানের নাটক বলাই শ্রেয়। এখন অনেক দেশে এ ধরনের নির্বাচন করার জন্য বিশাল আন্তর্জাতিক অবকাঠামোর সহযোগিতা প্রদান করা হয়। আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সমগ্র দেশে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে থাকা প্রয়োজন। আইনের শাসন কার্যকর করার জন্য বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। আইনজীবী, বিচারক এবং আদালতের অন্য অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য এ অর্থ ব্যবহার করতে হয়।

এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এরা নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে যে একটি ভালো নির্বাচনের পরিবেশ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে অবৈধ কিছু হচ্ছে না। যা কিছু হচ্ছে তা আইনি কর্তৃত্বের মধ্যেই হচ্ছে। আস্থার ব্যাপারটি যাতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

তবে এলিটরা সংখ্যায় কম, কিন্তু ক্ষমতার দিক থেকে বিশাল। এরা নির্বাচনে নানাভাবে কলকাঠি নাড়তে পারে। পরিস্থিতি এমন যে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য দিবাস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ভালো নির্বাচন যে কত প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে চাচ্ছে না। কারণ তাদের আস্থা খুব সামান্যই। এ হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজসাধ্য নয়। ল্যাটিন আমেরিকা বর্তমানে যথেষ্ট গণতান্ত্রিক।

কিন্তু এ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো আইনের শাসনের দিক থেকে অত্যন্ত নাজুক। এসব দেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপক। পুলিশ ঘুষ খায় এবং বিচারপতিরা কর দেয় না। রুশ ফেডারেশনে নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু দেশটিতে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নিচের দিকের ক্ষুদ্র শক্তিমানরা বিচারহীন অবস্থায় আইন ভঙ্গ করে চলছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর অনেক লেখালেখি এবং গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণা আমাদের সমস্যার মূলে যেতে সাহায্য করছে। আধুনিক বিশ্ব, যার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং এর পূর্বশর্ত ছিল আইনের শাসনের অস্তিত্ব-এ রকম কিছু এখন আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায় না। আইনের শাসন চুলচেরাভাবে পালিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আশা করা যায় না।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে গতি সঞ্চারিত হয়েছে তা আগামী দিনে অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তা আছে। আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্পর্কিত তা নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। আপাতত আমরা যদি বুঝি আইনের শাসন কত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, তাহলে এ উপলব্ধি আমাদের অনেক দূর নিয়ে যাবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন