সচেতনতায় সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব
jugantor
সচেতনতায় সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব

  ডা. রাশেদ মো. খান  

২৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবস। এ রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

শরীরের ভেতরের কলকবজা বিগড়ে গেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে ছুটি। হরেকরকম পরীক্ষা, ওষুধ, ইঞ্জেকশন, মাপা খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে ঘড়ি ধরে। উদ্দেশ্য একটাই-রোগ যেন বেশিদিন কাবু করে রাখতে না পারে। ত্বকের কিছু রোগের ক্ষেত্রে এমন সচেতনতা সচরাচর দেখা যায় না।

খুব বাড়াবাড়ি না হলে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। অথচ উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে ত্বকের অসুখও যথেষ্ট সমস্যায় ফেলতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফেলে রাখলে তা থেকে নানা অসুখও হতে পারে। যেমন, সোরিয়াসিস। পরিচিত রোগ। শতকরা ২ ভাগ মানুষ ত্বকের এ সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে বড় কথা, এ রোগ ক্রনিক। অর্থাৎ এ রোগ থেকে একেবারে রেহাই মেলে না। বারবার এ অসুখ ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু এমনটা কেন হয়? এ অসুখের চিকিৎসাই বা কী?

সোরিয়াসিস কী : ত্বকের এক বিশেষ ধরনের ক্রনিক সমস্যা। আমাদের ত্বকের দুটি প্রধান স্তর থাকে, বাইরের অংশটিকে বলা হয় এপিডার্মিস এবং ভেতরের ত্বককে ডার্মিস। এপিডার্মিসের উপরের দিকে থাকে মৃত কোষ বা কেরাটিন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এ মৃত কোষ ঝরে গিয়ে নিচে থাকা সজীব কোষগুলো উপরে উঠে আসে। আবার তা একসময় খসে পড়ে। এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

কোনো অবস্থায় যদি এ প্রক্রিয়ায় গোলমাল ঘটে, তাহলেই সোরিয়াসিস দেখা দেয়। সাধারণত ২৮ দিন অন্তর ত্বকের এ বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অর্থাৎ ‘এপিডার্মিস টার্নওভার’ চলতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো তা কমে আসে। এমনকি ৩-৪ দিনের মাথাতেও এপিডার্মিস টার্নওভার হয়। এতে ত্বকের কোষগুলো পরিপূর্ণতা লাভ করে না। এ অবস্থাই সোরিয়াসিস।

লক্ষণ : সোরিয়াসিসের গোড়ার দিকে লালচে গুটির মতো প্যাঁচ দেখা যায়। ধীরে ধীরে ত্বকের এ অংশগুলো পুরু হয়ে ওঠে। কখনো আবার তা অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে থাকে, ছাল ওঠে, চুলকানি হয় বা জ্বালা করতে থাকে। সোরিয়াসিস মূলত বুক, পিঠ, কনুই, হাত-পায়ে দেখা যায়। তবে মাথাতেও সোরিয়াসিস হয়। মাথায় অনেক সময় অত্যধিক খুশকি দেখা দিলে সেটিও এ রোগেরই ফল হতে পারে। এতে চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আবার, নেল সোরিয়াসিস নখে গর্ত তৈরি করে, এতে নখের রং বদলে যায়। চিকিৎসা না করালে নখ উঠে আসতে পারে। যদি ত্বকের অনেকটা জায়গা লাল হয়ে ফুলে যায় এবং এর সঙ্গে ব্যথা বা অস্বস্তির ভাব থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, ততই এ রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

অভিজ্ঞ চিকিৎসক সাধারণত পারিবারিক ইতিহাস জেনে নিয়ে এবং উপসর্গগুলো দেখেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্কিন বায়পসিরও প্রয়োজন হয়। শীতে ত্বক দ্রুত শুকিয়ে যায় বলে এ সমস্যা বাড়ে। নিয়মিত ত্বকের যত্ন প্রয়োজন। ত্বক পরিষ্কার তো রাখতেই হবে, সঙ্গে ইমোলিয়েন্ট ব্যবহার করতে হয়। এতে ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকবে, ত্বক নরমও থাকবে।

রিস্ক ফ্যাক্টর : সোরিয়াসিস কেন হয়, তা এখনো অস্পষ্ট। সাধারণত মনে করা হয়, কিছু জিনগত ও পরিবেশগত কারণে এ রোগ হতে পারে। কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সোরিয়াসিস হয় না। তবে রোগটা শরীরে উপস্থিত থাকলে কিছু কিছু ওষুধ সেবন করলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগ বৃদ্ধি পেতে পারে।

অত্যধিক স্ট্রেসজনিত কারণেও সোরিয়াসিস হয়। অতিরিক্ত মদ্যপান, ধূমপান, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বা চড়া রোদও এ ক্ষেত্রে রিস্ক ফ্যাক্টর। তাই এসব যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে পারলেই ভালো। যে কোনো ট্রমা বা আঘাতেও সোরিয়াসিস হতে পারে।

সোরিয়াসিস থেকে হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা : সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস ঠিকমতো চিকিৎসা না করিয়ে ফেলে রাখলে বা নিয়মিত ওষুধ না খেলে পরে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের আশঙ্কা থাকে। এতেও সাধারণ আর্থ্রাইটিসের মতোই গিঁটে ব্যথা হয় এবং জয়েন্টগুলো ফুলে যায়। তবে এমনও দেখা গেছে, শরীরে সোরিয়াসিসের অন্য লক্ষণগুলো অনুপস্থিত। অথচ হাত ও পায়ের আঙুল আক্রান্ত হয়েছে এ রোগে।

সাধারণত সোরিয়াসিসের রোগীদের ক্ষেত্রে ১০-৩৫ শতাংশের মধ্যে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে পাকাপাকিভাবে জয়েন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস কাকে বলে : সোরিয়াসিস হলো ত্বকের একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা, যার ফলে ত্বক রক্তাভ ও আঁশের মতো হয়ে যায়। সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হলো গিঁটের এক ধরনের প্রদাহ (স্ফীতি), যা সোরিয়াসিসের রোগীদের মধ্যে বৃদ্ধি পায়; আক্রান্ত গাঁটগুলো ফুলে যায় এবং প্রায়ই যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। সাধারণত যাদের সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস আছে, তাদের আর্থ্রাইটিসের উপসর্গগুলো বেড়ে ওঠার কয়েক বছর আগে থেকেই সেরিয়াসিস থাকে।

লক্ষণ এবং উপসর্গ : যেহেতু এটি এক ধরনের আর্থ্রাইটিস, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর লক্ষণ ও উপসর্গগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে। এ অবস্থায় থাকা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ ও উপসর্গগুলো হলো-গাঁট ফুলে যাওয়া বা শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশির যন্ত্রণা, ত্বকের বিভিন্ন জায়গায় আঁশের মতো হয়ে যাওয়া। ছোট গাঁটগুলো আক্রান্ত হয়, যেমন হাতের ও পায়ের আঙুল, কবজি, গোড়ালি ও কনুই। কিছু ক্ষেত্রে চোখের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা) ও ইউভিআইটিস।

প্রধান কারণ : সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস সাধারণত বৃদ্ধি পায় এমন মানুষদের মধ্যে, যারা কিছু সময় ধরে সোরিয়াসিসে ভুগছেন। সোরিয়াসিসের মতো সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস রোগটিও সৃষ্টি হয় যখন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে। সেজন্য এটিকে অটোইমিউন অবস্থাও বলা হয়। এ আক্রমণগুলোর সূত্রপাত কীভাবে হয় তা সঠিকভাবে জানা যায়নি; তবে মনে করা হয় জিনগত ও পরিবেশগত উপাদানগুলো, যেমন-স্ট্রেস বা চাপ, ভাইরাস বা একটি আঘাত সম্মিলিতভাবে এর জন্য দায়ী।

নির্ণয় ও চিকিৎসা : গিঁটের সমস্যা অথবা কাঠিন্যের উপসর্গগুলো অনুযায়ী চিকিৎসক কিছু পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন এবং পরে মূল্যায়নের জন্য রোগীকে রিউমাটোলজিস্টের কাছে পাঠাতে পারেন। আর্থ্রাইটিসের প্রকার নির্ণয়ের জন্য সাধারণত যে পরীক্ষাগুলো করা হয় তা হলো এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে এরিথ্রোসাইট সেডিমেন্টেশন রেট ও সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিনের মাত্রা বেশি আছে কিনা দেখা হয়।

কোনো একটি নির্দিষ্ট ওষুধ সবরকম আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়, সুতরাং এর উপযুক্ত ওষুধ পাওয়ার আগে একাধিক ওষুধ পরখ করার দরকার হতে পারে। চলনশীলতা ও গিঁটের সমস্যায় সাহায্য করার জন্য শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি-রিউমাটিক ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।

কর্টিকোস্টেরয়েড, বায়োলজিক বা ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ধরনের ওষুধগুলোও এতে ব্যবহার করা হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিস স্থায়ী হয় এবং একে সম্পূর্ণ দমন করা কঠিন হতে পারে। তবে সঠিক ওষুধ ও থেরাপির সাহায্যে এর পুনরাবনতি এড়ানো যেতে পারে।

যেসব খাবারে সোরিয়াসিস বাড়ে

চিনিযুক্ত সেরিয়াল : গ্রানোলা ও দইয়ের মতো স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্টও সোরিয়াসিসের অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে। এর কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত চিনি। কিছু গ্রানোলার প্যাকে ২০ গ্রামেরও বেশি চিনি ও কর্ন সিরাপ রয়েছে। চিনি শরীরে প্রদাহমূলক রিসেপ্টর বৃদ্ধি করতে পারে।

বেশি লবণের খাবার : চিকেন পট পাইয়ের মতো খাবার থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অন্যথায় সোরিয়াসিস বেড়ে যাবে। চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো এটিও শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। এর কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত লবণ। সোরিয়াসিসকে ডিস্টার্ব করতে না চাইলে যে খাবারে ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ ব্যবহার করা হয়েছে তা এড়িয়ে চলুন।

গ্লুটেনযুক্ত খাবার : প্রায় ২৫ শতাংশ সোরিয়াসিস রোগীর গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীলতা রয়েছে। গ্লুটেন সংবেদনশীলতা যাচাই করতে মেডিকেল টেস্টের প্রয়োজন নেই, আপনি নিজেই শনাক্ত করতে পারেন। দু-একটি গ্লুটেনযুক্ত খাবার খেয়ে দেখুন ত্বকে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। সোরিয়াসিসের উপসর্গের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ডায়েট থেকে গ্লুটেনযুক্ত খাবার সম্পূর্ণরূপে দূর করুন।

সোরিয়াসিসের চিকিৎসা : সোরিয়াসিসের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনধারার গুণগত উন্নতি এবং উপসর্গ থেকে আরাম হয়। সোরিয়াসিসের চিকিৎসা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা থাকে- সাময়িক চিকিৎসা, পদ্ধতিগত ওষুধ এবং ফটোথেরাপি (লাইট থেরাপি)

সাময়িক চিকিৎসা : অল্প সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে সাময়িক চিকিৎসাতেই কাজ হয়। মাঝারি বা প্রবল সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে সাময়িক বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার সঙ্গে মুখে খাওয়ার ওষুধ প্রয়োগ করা হয় বা ফটোথেরাপি করা হয়। সাময়িক বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার মধ্যে আছে-কর্টিকোস্টেরয়েড, ভাইটামিন ডি অ্যানালগ, টপিক্যাল রেটিনয়েড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড, কোল টার, ক্যালসিনিউরিন ইনহিবিটর, অ্যানর্থালিন, ত্বক নরম রাখার ক্রিম (ময়েশ্চারাইজার)।

পদ্ধতিগত ওষুধ : যখন সোরিয়াসিসের আক্রমণ তীব্র হয় বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় সাড়া না দেয়, তখন মুখ দিয়ে খাওয়ার ও ইঞ্জেকশনের সাহায্যে ওষুধ প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত এ ওষুধগুলোর চূড়ান্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ কারণে খুব অল্প সময়ের জন্য এবং অন্য থেরাপির সঙ্গে অদলবদল করে এগুলো ব্যবহার করা হয়। সোরিয়াসিসের চিকিৎসার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার হয় তার মধ্যে আছে-মেথোট্রেক্সেট, সাইক্লোস্পোরাইন, রেটিনয়েডস, ইমিউনোমডুলেটর, লাইট থেরাপি।

আদর্শ ফটোথেরাপিতে ত্বকের যে অংশ আঁশের মতো চেহারা নিয়েছে, সেই অংশগুলো অতিবেগুনি রশ্মির তলায় রাখা হয় (প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম)। সাধারণত মাঝারি অথবা তীব্র সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ওষুধ দিয়ে সাময়িক চিকিৎসার সঙ্গে ফটোথেরাপি করা হয়। বিভিন্ন লাইট থেরাপির মধ্যে আছে- সূর্যরশ্মির নিচে দাঁড়ানো, ন্যারোব্যান্ড ইউভিবি ফটোথেরাপি, এক্সাইমার লেজার থেরাপি, সোরালেন প্লাস অ্যালট্রাভায়োলেট এ থেরাপি।

জীবনশৈলীর ব্যবস্থাপনা : সোরিয়াসিসের ফলে একজন ব্যক্তির জীবনযাপন ও জীবনধারার গুণমান প্রভাবিত হয়। সোরিয়াসিস সম্পর্কে সচেতন থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে এটি মোকাবিলা করা সহজ হয়। ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঙ্গে এ রোগের ফলে যা অসুবিধা হয়, তার সমাধানের উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। ধূমপান ও অ্যালকোহল পান পরিহার করে চলতে হবে। নিয়ন্ত্রণের কৌশলের মধ্যে আছে-

চুলকানি কম করা : সাধারণত চুলকানি একটি অচ্ছেদ্যচক্র, অর্থাৎ যত চুলকাবেন তত বেশি চুলকাতে ইচ্ছা করবে। কাজেই চুলকানি এড়িয়ে যেতে পারলে খুব ভালো কাজ হয়; বিশেষত দাগড়া দাগড়া সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে। ত্বক নরম রাখার ক্রিম (ময়েশ্চারাইজার) ব্যবহার করলে ভালো হয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণ : ওজন কমানো বা বিএমআইয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে সোরিয়াসিসের উপসর্গের তীব্রতা কমে। তাছাড়া খাদ্যতালিকায় ফল, সবজি, শস্যদানা, কম চর্বির মাংস ও মাছ থাকলে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে বেশি চর্বিসমৃদ্ধ মাংস, অতিরিক্ত স্নেহ পদার্থসমৃদ্ধ ডেয়ারি পণ্য, পরিশ্রুত ফল ও মদ্যপান সোরিয়াসিসের কুফল বৃদ্ধি করে।

যোগ ব্যায়াম : সোরিয়াসিসের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মানসিক চাপ। যোগ ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল এবং একান্ত চিত্তে ধ্যান করতে পারলে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সোরিয়াসিসের তীব্রতা কমে।

কিছু জরুরি কথা : সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে অসুখ নয়। এটি মূলত জিনঘটিত রোগ। তাই রোগীর ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলার প্রয়োজন নেই। যে কোনো ধরনের আঘাত যেমন-শারীরিক, কেমিক্যাল এবং ফটো বা আলো সোরিয়াসিস সৃষ্টি করতে বা এর প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে। এ রোগে বেশি ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয়।

গ্লিসারিনযুক্ত সাবান বা বেবি সোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। ময়েশ্চারাইজার বা নারিকেল তেলও এ রোগে বেশ উপকারী। পোশাক ফুলস্লিভ এবং সুতির হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ সিনথেটিক জাতীয় পোশাক এ রোগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ নজর রাখতে হবে খাওয়াদাওয়ার দিকেও। রোজ অন্তত দু-ধরনের মৌসুমি ফল রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়।

ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল খেতে পারলে সবচেয়ে ভালো। প্রোটিনের পরিমাণও বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হবে। মনে রাখতে হবে, সোরিয়াসিস মোটামুটি সারা জীবনের সঙ্গী। তাই নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলা এক্ষেত্রে খুব জরুরি। নিজের ইচ্ছামতো দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া বা হঠাৎ চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া-দুই-ই সমান ক্ষতিকর।

এ রোগ একেবারে সেরে যায় না ঠিকই। কিন্তু নিয়ম মেনে চললে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে সোরিয়াসিসের উপসর্গগুলো। জটিলতাও বাড়ে না। তাই রোগকে কাবু করতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান : বিভাগীয় প্রধান, ত্বক ও যৌন ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; ভাইস প্রেসিডেন্ট, সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাব

সচেতনতায় সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব

 ডা. রাশেদ মো. খান 
২৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবস। এ রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

শরীরের ভেতরের কলকবজা বিগড়ে গেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে ছুটি। হরেকরকম পরীক্ষা, ওষুধ, ইঞ্জেকশন, মাপা খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে ঘড়ি ধরে। উদ্দেশ্য একটাই-রোগ যেন বেশিদিন কাবু করে রাখতে না পারে। ত্বকের কিছু রোগের ক্ষেত্রে এমন সচেতনতা সচরাচর দেখা যায় না।

খুব বাড়াবাড়ি না হলে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। অথচ উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে ত্বকের অসুখও যথেষ্ট সমস্যায় ফেলতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফেলে রাখলে তা থেকে নানা অসুখও হতে পারে। যেমন, সোরিয়াসিস। পরিচিত রোগ। শতকরা ২ ভাগ মানুষ ত্বকের এ সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে বড় কথা, এ রোগ ক্রনিক। অর্থাৎ এ রোগ থেকে একেবারে রেহাই মেলে না। বারবার এ অসুখ ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু এমনটা কেন হয়? এ অসুখের চিকিৎসাই বা কী?

সোরিয়াসিস কী : ত্বকের এক বিশেষ ধরনের ক্রনিক সমস্যা। আমাদের ত্বকের দুটি প্রধান স্তর থাকে, বাইরের অংশটিকে বলা হয় এপিডার্মিস এবং ভেতরের ত্বককে ডার্মিস। এপিডার্মিসের উপরের দিকে থাকে মৃত কোষ বা কেরাটিন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এ মৃত কোষ ঝরে গিয়ে নিচে থাকা সজীব কোষগুলো উপরে উঠে আসে। আবার তা একসময় খসে পড়ে। এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

কোনো অবস্থায় যদি এ প্রক্রিয়ায় গোলমাল ঘটে, তাহলেই সোরিয়াসিস দেখা দেয়। সাধারণত ২৮ দিন অন্তর ত্বকের এ বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অর্থাৎ ‘এপিডার্মিস টার্নওভার’ চলতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো তা কমে আসে। এমনকি ৩-৪ দিনের মাথাতেও এপিডার্মিস টার্নওভার হয়। এতে ত্বকের কোষগুলো পরিপূর্ণতা লাভ করে না। এ অবস্থাই সোরিয়াসিস।

লক্ষণ : সোরিয়াসিসের গোড়ার দিকে লালচে গুটির মতো প্যাঁচ দেখা যায়। ধীরে ধীরে ত্বকের এ অংশগুলো পুরু হয়ে ওঠে। কখনো আবার তা অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে থাকে, ছাল ওঠে, চুলকানি হয় বা জ্বালা করতে থাকে। সোরিয়াসিস মূলত বুক, পিঠ, কনুই, হাত-পায়ে দেখা যায়। তবে মাথাতেও সোরিয়াসিস হয়। মাথায় অনেক সময় অত্যধিক খুশকি দেখা দিলে সেটিও এ রোগেরই ফল হতে পারে। এতে চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আবার, নেল সোরিয়াসিস নখে গর্ত তৈরি করে, এতে নখের রং বদলে যায়। চিকিৎসা না করালে নখ উঠে আসতে পারে। যদি ত্বকের অনেকটা জায়গা লাল হয়ে ফুলে যায় এবং এর সঙ্গে ব্যথা বা অস্বস্তির ভাব থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, ততই এ রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

অভিজ্ঞ চিকিৎসক সাধারণত পারিবারিক ইতিহাস জেনে নিয়ে এবং উপসর্গগুলো দেখেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্কিন বায়পসিরও প্রয়োজন হয়। শীতে ত্বক দ্রুত শুকিয়ে যায় বলে এ সমস্যা বাড়ে। নিয়মিত ত্বকের যত্ন প্রয়োজন। ত্বক পরিষ্কার তো রাখতেই হবে, সঙ্গে ইমোলিয়েন্ট ব্যবহার করতে হয়। এতে ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকবে, ত্বক নরমও থাকবে।

রিস্ক ফ্যাক্টর : সোরিয়াসিস কেন হয়, তা এখনো অস্পষ্ট। সাধারণত মনে করা হয়, কিছু জিনগত ও পরিবেশগত কারণে এ রোগ হতে পারে। কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সোরিয়াসিস হয় না। তবে রোগটা শরীরে উপস্থিত থাকলে কিছু কিছু ওষুধ সেবন করলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগ বৃদ্ধি পেতে পারে।

অত্যধিক স্ট্রেসজনিত কারণেও সোরিয়াসিস হয়। অতিরিক্ত মদ্যপান, ধূমপান, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বা চড়া রোদও এ ক্ষেত্রে রিস্ক ফ্যাক্টর। তাই এসব যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে পারলেই ভালো। যে কোনো ট্রমা বা আঘাতেও সোরিয়াসিস হতে পারে।

সোরিয়াসিস থেকে হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা : সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস ঠিকমতো চিকিৎসা না করিয়ে ফেলে রাখলে বা নিয়মিত ওষুধ না খেলে পরে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের আশঙ্কা থাকে। এতেও সাধারণ আর্থ্রাইটিসের মতোই গিঁটে ব্যথা হয় এবং জয়েন্টগুলো ফুলে যায়। তবে এমনও দেখা গেছে, শরীরে সোরিয়াসিসের অন্য লক্ষণগুলো অনুপস্থিত। অথচ হাত ও পায়ের আঙুল আক্রান্ত হয়েছে এ রোগে।

সাধারণত সোরিয়াসিসের রোগীদের ক্ষেত্রে ১০-৩৫ শতাংশের মধ্যে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে পাকাপাকিভাবে জয়েন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস কাকে বলে : সোরিয়াসিস হলো ত্বকের একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা, যার ফলে ত্বক রক্তাভ ও আঁশের মতো হয়ে যায়। সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হলো গিঁটের এক ধরনের প্রদাহ (স্ফীতি), যা সোরিয়াসিসের রোগীদের মধ্যে বৃদ্ধি পায়; আক্রান্ত গাঁটগুলো ফুলে যায় এবং প্রায়ই যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। সাধারণত যাদের সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস আছে, তাদের আর্থ্রাইটিসের উপসর্গগুলো বেড়ে ওঠার কয়েক বছর আগে থেকেই সেরিয়াসিস থাকে।

লক্ষণ এবং উপসর্গ : যেহেতু এটি এক ধরনের আর্থ্রাইটিস, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর লক্ষণ ও উপসর্গগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে। এ অবস্থায় থাকা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ ও উপসর্গগুলো হলো-গাঁট ফুলে যাওয়া বা শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশির যন্ত্রণা, ত্বকের বিভিন্ন জায়গায় আঁশের মতো হয়ে যাওয়া। ছোট গাঁটগুলো আক্রান্ত হয়, যেমন হাতের ও পায়ের আঙুল, কবজি, গোড়ালি ও কনুই। কিছু ক্ষেত্রে চোখের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা) ও ইউভিআইটিস।

প্রধান কারণ : সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস সাধারণত বৃদ্ধি পায় এমন মানুষদের মধ্যে, যারা কিছু সময় ধরে সোরিয়াসিসে ভুগছেন। সোরিয়াসিসের মতো সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস রোগটিও সৃষ্টি হয় যখন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে। সেজন্য এটিকে অটোইমিউন অবস্থাও বলা হয়। এ আক্রমণগুলোর সূত্রপাত কীভাবে হয় তা সঠিকভাবে জানা যায়নি; তবে মনে করা হয় জিনগত ও পরিবেশগত উপাদানগুলো, যেমন-স্ট্রেস বা চাপ, ভাইরাস বা একটি আঘাত সম্মিলিতভাবে এর জন্য দায়ী।

নির্ণয় ও চিকিৎসা : গিঁটের সমস্যা অথবা কাঠিন্যের উপসর্গগুলো অনুযায়ী চিকিৎসক কিছু পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন এবং পরে মূল্যায়নের জন্য রোগীকে রিউমাটোলজিস্টের কাছে পাঠাতে পারেন। আর্থ্রাইটিসের প্রকার নির্ণয়ের জন্য সাধারণত যে পরীক্ষাগুলো করা হয় তা হলো এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে এরিথ্রোসাইট সেডিমেন্টেশন রেট ও সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিনের মাত্রা বেশি আছে কিনা দেখা হয়।

কোনো একটি নির্দিষ্ট ওষুধ সবরকম আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়, সুতরাং এর উপযুক্ত ওষুধ পাওয়ার আগে একাধিক ওষুধ পরখ করার দরকার হতে পারে। চলনশীলতা ও গিঁটের সমস্যায় সাহায্য করার জন্য শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি-রিউমাটিক ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।

কর্টিকোস্টেরয়েড, বায়োলজিক বা ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ধরনের ওষুধগুলোও এতে ব্যবহার করা হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিস স্থায়ী হয় এবং একে সম্পূর্ণ দমন করা কঠিন হতে পারে। তবে সঠিক ওষুধ ও থেরাপির সাহায্যে এর পুনরাবনতি এড়ানো যেতে পারে।

যেসব খাবারে সোরিয়াসিস বাড়ে

চিনিযুক্ত সেরিয়াল : গ্রানোলা ও দইয়ের মতো স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্টও সোরিয়াসিসের অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে। এর কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত চিনি। কিছু গ্রানোলার প্যাকে ২০ গ্রামেরও বেশি চিনি ও কর্ন সিরাপ রয়েছে। চিনি শরীরে প্রদাহমূলক রিসেপ্টর বৃদ্ধি করতে পারে।

বেশি লবণের খাবার : চিকেন পট পাইয়ের মতো খাবার থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অন্যথায় সোরিয়াসিস বেড়ে যাবে। চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো এটিও শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। এর কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত লবণ। সোরিয়াসিসকে ডিস্টার্ব করতে না চাইলে যে খাবারে ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ ব্যবহার করা হয়েছে তা এড়িয়ে চলুন।

গ্লুটেনযুক্ত খাবার : প্রায় ২৫ শতাংশ সোরিয়াসিস রোগীর গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীলতা রয়েছে। গ্লুটেন সংবেদনশীলতা যাচাই করতে মেডিকেল টেস্টের প্রয়োজন নেই, আপনি নিজেই শনাক্ত করতে পারেন। দু-একটি গ্লুটেনযুক্ত খাবার খেয়ে দেখুন ত্বকে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। সোরিয়াসিসের উপসর্গের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ডায়েট থেকে গ্লুটেনযুক্ত খাবার সম্পূর্ণরূপে দূর করুন।

সোরিয়াসিসের চিকিৎসা : সোরিয়াসিসের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনধারার গুণগত উন্নতি এবং উপসর্গ থেকে আরাম হয়। সোরিয়াসিসের চিকিৎসা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা থাকে- সাময়িক চিকিৎসা, পদ্ধতিগত ওষুধ এবং ফটোথেরাপি (লাইট থেরাপি)

সাময়িক চিকিৎসা : অল্প সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে সাময়িক চিকিৎসাতেই কাজ হয়। মাঝারি বা প্রবল সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে সাময়িক বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার সঙ্গে মুখে খাওয়ার ওষুধ প্রয়োগ করা হয় বা ফটোথেরাপি করা হয়। সাময়িক বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার মধ্যে আছে-কর্টিকোস্টেরয়েড, ভাইটামিন ডি অ্যানালগ, টপিক্যাল রেটিনয়েড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড, কোল টার, ক্যালসিনিউরিন ইনহিবিটর, অ্যানর্থালিন, ত্বক নরম রাখার ক্রিম (ময়েশ্চারাইজার)।

পদ্ধতিগত ওষুধ : যখন সোরিয়াসিসের আক্রমণ তীব্র হয় বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় সাড়া না দেয়, তখন মুখ দিয়ে খাওয়ার ও ইঞ্জেকশনের সাহায্যে ওষুধ প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত এ ওষুধগুলোর চূড়ান্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ কারণে খুব অল্প সময়ের জন্য এবং অন্য থেরাপির সঙ্গে অদলবদল করে এগুলো ব্যবহার করা হয়। সোরিয়াসিসের চিকিৎসার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার হয় তার মধ্যে আছে-মেথোট্রেক্সেট, সাইক্লোস্পোরাইন, রেটিনয়েডস, ইমিউনোমডুলেটর, লাইট থেরাপি।

আদর্শ ফটোথেরাপিতে ত্বকের যে অংশ আঁশের মতো চেহারা নিয়েছে, সেই অংশগুলো অতিবেগুনি রশ্মির তলায় রাখা হয় (প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম)। সাধারণত মাঝারি অথবা তীব্র সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ওষুধ দিয়ে সাময়িক চিকিৎসার সঙ্গে ফটোথেরাপি করা হয়। বিভিন্ন লাইট থেরাপির মধ্যে আছে- সূর্যরশ্মির নিচে দাঁড়ানো, ন্যারোব্যান্ড ইউভিবি ফটোথেরাপি, এক্সাইমার লেজার থেরাপি, সোরালেন প্লাস অ্যালট্রাভায়োলেট এ থেরাপি।

জীবনশৈলীর ব্যবস্থাপনা : সোরিয়াসিসের ফলে একজন ব্যক্তির জীবনযাপন ও জীবনধারার গুণমান প্রভাবিত হয়। সোরিয়াসিস সম্পর্কে সচেতন থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে এটি মোকাবিলা করা সহজ হয়। ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঙ্গে এ রোগের ফলে যা অসুবিধা হয়, তার সমাধানের উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। ধূমপান ও অ্যালকোহল পান পরিহার করে চলতে হবে। নিয়ন্ত্রণের কৌশলের মধ্যে আছে-

চুলকানি কম করা : সাধারণত চুলকানি একটি অচ্ছেদ্যচক্র, অর্থাৎ যত চুলকাবেন তত বেশি চুলকাতে ইচ্ছা করবে। কাজেই চুলকানি এড়িয়ে যেতে পারলে খুব ভালো কাজ হয়; বিশেষত দাগড়া দাগড়া সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে। ত্বক নরম রাখার ক্রিম (ময়েশ্চারাইজার) ব্যবহার করলে ভালো হয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণ : ওজন কমানো বা বিএমআইয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে সোরিয়াসিসের উপসর্গের তীব্রতা কমে। তাছাড়া খাদ্যতালিকায় ফল, সবজি, শস্যদানা, কম চর্বির মাংস ও মাছ থাকলে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে বেশি চর্বিসমৃদ্ধ মাংস, অতিরিক্ত স্নেহ পদার্থসমৃদ্ধ ডেয়ারি পণ্য, পরিশ্রুত ফল ও মদ্যপান সোরিয়াসিসের কুফল বৃদ্ধি করে।

যোগ ব্যায়াম : সোরিয়াসিসের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মানসিক চাপ। যোগ ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল এবং একান্ত চিত্তে ধ্যান করতে পারলে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সোরিয়াসিসের তীব্রতা কমে।

কিছু জরুরি কথা : সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে অসুখ নয়। এটি মূলত জিনঘটিত রোগ। তাই রোগীর ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলার প্রয়োজন নেই। যে কোনো ধরনের আঘাত যেমন-শারীরিক, কেমিক্যাল এবং ফটো বা আলো সোরিয়াসিস সৃষ্টি করতে বা এর প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে। এ রোগে বেশি ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয়।

গ্লিসারিনযুক্ত সাবান বা বেবি সোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। ময়েশ্চারাইজার বা নারিকেল তেলও এ রোগে বেশ উপকারী। পোশাক ফুলস্লিভ এবং সুতির হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ সিনথেটিক জাতীয় পোশাক এ রোগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ নজর রাখতে হবে খাওয়াদাওয়ার দিকেও। রোজ অন্তত দু-ধরনের মৌসুমি ফল রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়।

ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল খেতে পারলে সবচেয়ে ভালো। প্রোটিনের পরিমাণও বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হবে। মনে রাখতে হবে, সোরিয়াসিস মোটামুটি সারা জীবনের সঙ্গী। তাই নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলা এক্ষেত্রে খুব জরুরি। নিজের ইচ্ছামতো দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া বা হঠাৎ চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া-দুই-ই সমান ক্ষতিকর।

এ রোগ একেবারে সেরে যায় না ঠিকই। কিন্তু নিয়ম মেনে চললে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে সোরিয়াসিসের উপসর্গগুলো। জটিলতাও বাড়ে না। তাই রোগকে কাবু করতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান : বিভাগীয় প্রধান, ত্বক ও যৌন ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; ভাইস প্রেসিডেন্ট, সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাব

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন