বিষণ্নতার আর্থিক ক্ষতি এক লাখ কোটি ডলার!
jugantor
বিষণ্নতার আর্থিক ক্ষতি এক লাখ কোটি ডলার!

  এম এ খালেক  

২৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বিশ্বে করোনার কারণে নানাভাবে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি হচ্ছে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেই। করোনার কারণে মানসিক চাপজনিত হতাশা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। হতাশা বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী মেন্টাল ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা বৃদ্ধির কারণে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা ক্ষতিকর বা আদৌ কোনো ক্ষতি করছে কিনা, তা নিয়ে এর আগে তেমন কোনো জরিপ হয়নি। তাই বিষয়টি এক অর্থে নতুনই বলতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মানসিক চাপের কারণে ব্যক্তি পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। বর্তমানে মানসিক চাপের কারণে প্রতিবছর ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি বিস্ময়কর একটি পরিসংখ্যান। আগে কখনোই এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্বব্যাপী নানা কারণেই হতাশা বাড়ছে। পারিবারিক ছাড়াও পেশাগত কারণে অনেকের মাঝে হতাশা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ নিয়ে অনেকের মাঝেই কোনো ধরনের উদ্বেগ বা সচেতনতা লক্ষ করা যায় না। যারা মানসিক চাপে ভোগেন, তারা একে কোনো সমস্যা বলেই মনে করেন না। বিশ্বব্যাপী পারিবারিক কারণেই সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষ করে এই করোনাকালে পৃথিবীর সব দেশেই মানসিক চাপের মাত্রা এবং আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। ঘরে বন্দি থাকা এবং ইচ্ছামতো বাইরে বেরোতে না পারার কারণে অনেকেই এক ধরনের হতাশায় ভুগছে। এ ছাড়া করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন অথবা কর্র্মস্থলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা হারিয়েছেন। এমন ক্ষেত্রে পরিবারের ব্যয় নির্বাহের বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক চাপ।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেন্টাল ডিপ্রেশন সৃষ্টি হলে একজন মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তার কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা সাংঘাতিকভাবে কমে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন। এটা তার কর্মদক্ষতা বিপন্ন করার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ডিপ্রেশনকে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা বলেই মনে করা হয় না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে ডিপ্রেশনকে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে মনে করা হয়।

বাংলাদেশে কতসংখ্যক মানুষ ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগছে তার পরিসংখ্যান নেই কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে। তাই সমস্যাটি কতটা জটিল তা অনুধাবন করা যায় না। ডিপ্রেশনকে কোনো জটিল সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় না। তাই কেউ একজন মেন্টাল ডিপ্রেশনে ভুগলেও পরিবারের অন্য সদস্যারা একে কোনো সমস্যা বলে মনে করেন না।

তারা মনে করেন, ডিপ্রেশন সাময়িক সমস্যা এবং এক সময় এমনিতেই এর সমাধান হয়ে যাবে। এজন্য কোনো ডাক্তার বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না তারা। কিন্তু এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে মানসিক চাপ অনেকটাই নিরসন করা সম্ভব। কিন্তু এটাকে কোনো সমস্যা মনে না করে অবহেলা করা হলে তা জটিল সমস্যায় পরিণত হতে পারে। আমরা প্রায়ই প্রেমে ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার খবর পাই। অনেক সময় পরিণত বয়সের মানুষও প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে। মানুষের মনের ওপর ডিপ্রেশন মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। যারা এ চাপ সহ্য করার মতো ক্ষমতা রাখেন না, মূলত তারাই আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

আত্মহত্যা করতে যাওয়া একজন মানুষ মনে করেন, পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তার বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন। এ মানুষটিই যদি সময়মতো মানসিক চিকিৎসা পেতেন, তাহলে তার পক্ষে আত্মহত্যা করার প্রয়োজন হতো না। তাকে শুধু বোঝানো দরকার ছিল, তার মতো এমন সমস্যা অনেকেরই হচ্ছে। তাই আত্মহত্যা করার কোনো মানে হয় না।

মানসিক চাপে আক্রান্ত মানুষের কর্মদক্ষতা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। কারণ এ সময় তিনি নির্দিষ্ট সমস্যা ছাড়া অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, কোনো মানুষ তার উদ্দিষ্ট কাজে একান্ত মনোযোগী হতে না পারলে সর্বোত্তমভাবে সেই কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

দেখা যায়, একই গ্রেডের একজন কর্মী যখন তার কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন করছেন, তখন বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষটি সেই সাধারণ কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন না। বারবার জানা কাজটিও করতে তিনি ভুল করছেন।

মানসিক চাপ একজন মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। তারা চাইলেও সাধারণ-স্বাভাবিক মানুষের মতো কাজ করতে পারেন না। ফলে তারা পদে পদে লাঞ্ছিত হতে থাকেন। স্মর্তব্য, কোনো অনিচ্ছুক ঘোড়াকে জোর করে পানিতে নামানো যায়, কিন্তু তাকে জোর করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পানি পান করানো যায় না।

তেমনি একজন বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষকে কোনো কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে দিয়ে উদ্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করানো সম্ভব নয়। তার ইচ্ছা হবে না কাজটি সম্পন্ন করার। এ ছাড়া তার কর্মক্ষমতাও হ্রাস পাবে। ফলে চাইলেও কাজটি তাকে দিয়ে করানো সম্ভব হবে না।

নানা কারণেই একজন কর্র্মীর মাঝে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। কেউ যদি অফিসে তার যোগ্য সম্মান না পান অথবা আর্থিক সুবিধা থেকে কঞ্চিত হন, তাহলে তার মাঝে হতাশা জন্ম নিতে পারে। যারা চাকরি করেন, তাদের জন্য অফিসের কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো অফিসের কর্মপরিবেশ যদি ভালো এবং কাজ করার অনুকূল হয়, তাহলে সেই অফিসের কর্মীদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

এ ক্ষেত্রে চাকরিদাতার আচরণও একটি অফিসের কর্মপরিবেশ উন্নত ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একজন চাকরিদাতা যদি তার অফিসের কর্মীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন, তাহলে সেই অফিসের কর্মপরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। একইসঙ্গে এ ধরনের অফিস পরিবেশে একজন কর্মী তার সর্বোচ্চ দক্ষতা দিয়ে কর্ম সম্পাদন করতে পারেন। কথায় বলে, কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু অনেকেই এ বিষয়টি অনুধাবন করতে চান না।

দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। তাদের বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। নারী শ্রমিকদের তুলনামূলক কম বেতন-ভাতায় কাজ করানো যায়। কিন্তু এসব নারী শ্রমিক কিভাবে বা কোন পরিবেশে কাজ করেন, তা কি আমরা ভেবে দেখি? অনেকেই তাদের ছোট বাচ্চাকে বাসায় রেখে কারখানায় কাজ করতে আসেন। তাদের পক্ষে কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অথচ অফিসে যদি ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে তাদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কাজ আদায় করা যেত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে তাদের নারী কর্মীদের বাচ্চা রাখার জন্য ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনেকেই এটাকে অপচয় মনে করতে পারেন। কিন্তু আসলে এটা কোনোভাবেই অপচয় নয়। বরং এটা কারখানার কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি কার্যকর কৌশল। একটি ডে-কেয়ার তৈরি করা হলে যে ব্যয় হবে, তার চেয়ে অনেক বেশি বর্ণিত কর্মীদের কাছ থেকে উৎপাদনশীলতা আদায় করে নেওয়া সম্ভব। এটা কোনোভাবেই অপচয় নয়।

তাই যেসব কারখানায় নারী শ্রমিক কর্মরত আছেন, তাদের সবারই উচিত হবে ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরি করা। অনুকূল কর্মপরিবেশ তৈরি করা একজন কারখানা মালিকের অন্যতম দায়িত্ব। আর যারা বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন অথবা অন্য কোনো কর্মে নিয়োজিত আছেন, তাদের হতাশা অতিক্রম করার কৌশল জানতে হবে। কোনো কারণে হতাশার সৃষ্টি হলে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে। হতাশামুক্ত ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, হতাশার পরই কোনো ভালো সংবাদ আসতে পারে, যা তাকে উদ্বুদ্ধ করবে।

কথায় বলে, ‘রাত যত গভীর হয়, ভোরের সূর্য ততই নিকটবর্তী হয়।’ অর্থাৎ রাতের পর দিন আসে। আর হতাশার পর আশার সংবাদ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেউ যদি হতাশার পর কোনো আশার সংবাদ পায়, তাহলে তার হতাশা মুহূর্তে উবে যেতে পারে। হয়তো কোনো একজন চাকরি না পেয়ে হতাশ। তিনি যদি অপ্রত্যাশিত বা প্রত্যাশিতভাবে চাকরি পাওয়ার সংবাদ পান তাহলে মুহূর্তের মধ্যে তার মন ভালো হয়ে যাবে। তিনি আগের চেয়েও বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবেন। এটাই বাস্তবতা। তাই কোনো কারণে হতাশার সৃষ্টি হলেও ভেঙে পড়তে নেই। কারণ যিনি হতাশ হন, পরক্ষণেই তিনি আবারও উদীপ্ত হওয়ার মতো খবর পেতে পারেন।

একজন মানুষ হতাশ হলে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই কোনোভাবেই হতাশা কাম্য নয়। মানুষ যখন আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তার মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের উচিত হবে তাকে মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ রাখা, সাপোর্ট দেওয়া। হতাশ মানুষ মনে করে পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন। ফলে তার মাঝে স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়ে যেতে পারে। তাকে বোঝাতে হবে, একজন মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কাজেই তা কখনোই অর্থহীন হতে পারে না। উত্থান-পতন হতেই পারে, কিন্তু জীবন কখনোই অর্থহীন হয় না। জীবনকে জীবনের মতোই চলতে দিতে হবে। তাহলেই জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোনোভাবে হতাশ হলেও আত্মহত্যার চিন্তা করা ঠিক হবে না।

এম এ খালেক : অর্থনীতি বিষয়ক লেখক; অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড

বিষণ্নতার আর্থিক ক্ষতি এক লাখ কোটি ডলার!

 এম এ খালেক 
২৫ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বিশ্বে করোনার কারণে নানাভাবে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি হচ্ছে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেই। করোনার কারণে মানসিক চাপজনিত হতাশা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। হতাশা বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী মেন্টাল ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা বৃদ্ধির কারণে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা ক্ষতিকর বা আদৌ কোনো ক্ষতি করছে কিনা, তা নিয়ে এর আগে তেমন কোনো জরিপ হয়নি। তাই বিষয়টি এক অর্থে নতুনই বলতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মানসিক চাপের কারণে ব্যক্তি পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। বর্তমানে মানসিক চাপের কারণে প্রতিবছর ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি বিস্ময়কর একটি পরিসংখ্যান। আগে কখনোই এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্বব্যাপী নানা কারণেই হতাশা বাড়ছে। পারিবারিক ছাড়াও পেশাগত কারণে অনেকের মাঝে হতাশা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ নিয়ে অনেকের মাঝেই কোনো ধরনের উদ্বেগ বা সচেতনতা লক্ষ করা যায় না। যারা মানসিক চাপে ভোগেন, তারা একে কোনো সমস্যা বলেই মনে করেন না। বিশ্বব্যাপী পারিবারিক কারণেই সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষ করে এই করোনাকালে পৃথিবীর সব দেশেই মানসিক চাপের মাত্রা এবং আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। ঘরে বন্দি থাকা এবং ইচ্ছামতো বাইরে বেরোতে না পারার কারণে অনেকেই এক ধরনের হতাশায় ভুগছে। এ ছাড়া করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন অথবা কর্র্মস্থলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা হারিয়েছেন। এমন ক্ষেত্রে পরিবারের ব্যয় নির্বাহের বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক চাপ।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেন্টাল ডিপ্রেশন সৃষ্টি হলে একজন মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তার কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা সাংঘাতিকভাবে কমে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন। এটা তার কর্মদক্ষতা বিপন্ন করার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ডিপ্রেশনকে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা বলেই মনে করা হয় না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে ডিপ্রেশনকে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে মনে করা হয়।

বাংলাদেশে কতসংখ্যক মানুষ ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগছে তার পরিসংখ্যান নেই কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে। তাই সমস্যাটি কতটা জটিল তা অনুধাবন করা যায় না। ডিপ্রেশনকে কোনো জটিল সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় না। তাই কেউ একজন মেন্টাল ডিপ্রেশনে ভুগলেও পরিবারের অন্য সদস্যারা একে কোনো সমস্যা বলে মনে করেন না।

তারা মনে করেন, ডিপ্রেশন সাময়িক সমস্যা এবং এক সময় এমনিতেই এর সমাধান হয়ে যাবে। এজন্য কোনো ডাক্তার বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না তারা। কিন্তু এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে মানসিক চাপ অনেকটাই নিরসন করা সম্ভব। কিন্তু এটাকে কোনো সমস্যা মনে না করে অবহেলা করা হলে তা জটিল সমস্যায় পরিণত হতে পারে। আমরা প্রায়ই প্রেমে ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার খবর পাই। অনেক সময় পরিণত বয়সের মানুষও প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে। মানুষের মনের ওপর ডিপ্রেশন মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। যারা এ চাপ সহ্য করার মতো ক্ষমতা রাখেন না, মূলত তারাই আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

আত্মহত্যা করতে যাওয়া একজন মানুষ মনে করেন, পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তার বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন। এ মানুষটিই যদি সময়মতো মানসিক চিকিৎসা পেতেন, তাহলে তার পক্ষে আত্মহত্যা করার প্রয়োজন হতো না। তাকে শুধু বোঝানো দরকার ছিল, তার মতো এমন সমস্যা অনেকেরই হচ্ছে। তাই আত্মহত্যা করার কোনো মানে হয় না।

মানসিক চাপে আক্রান্ত মানুষের কর্মদক্ষতা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। কারণ এ সময় তিনি নির্দিষ্ট সমস্যা ছাড়া অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, কোনো মানুষ তার উদ্দিষ্ট কাজে একান্ত মনোযোগী হতে না পারলে সর্বোত্তমভাবে সেই কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

দেখা যায়, একই গ্রেডের একজন কর্মী যখন তার কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন করছেন, তখন বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষটি সেই সাধারণ কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন না। বারবার জানা কাজটিও করতে তিনি ভুল করছেন।

মানসিক চাপ একজন মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। তারা চাইলেও সাধারণ-স্বাভাবিক মানুষের মতো কাজ করতে পারেন না। ফলে তারা পদে পদে লাঞ্ছিত হতে থাকেন। স্মর্তব্য, কোনো অনিচ্ছুক ঘোড়াকে জোর করে পানিতে নামানো যায়, কিন্তু তাকে জোর করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পানি পান করানো যায় না।

তেমনি একজন বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষকে কোনো কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে দিয়ে উদ্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করানো সম্ভব নয়। তার ইচ্ছা হবে না কাজটি সম্পন্ন করার। এ ছাড়া তার কর্মক্ষমতাও হ্রাস পাবে। ফলে চাইলেও কাজটি তাকে দিয়ে করানো সম্ভব হবে না।

নানা কারণেই একজন কর্র্মীর মাঝে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। কেউ যদি অফিসে তার যোগ্য সম্মান না পান অথবা আর্থিক সুবিধা থেকে কঞ্চিত হন, তাহলে তার মাঝে হতাশা জন্ম নিতে পারে। যারা চাকরি করেন, তাদের জন্য অফিসের কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো অফিসের কর্মপরিবেশ যদি ভালো এবং কাজ করার অনুকূল হয়, তাহলে সেই অফিসের কর্মীদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

এ ক্ষেত্রে চাকরিদাতার আচরণও একটি অফিসের কর্মপরিবেশ উন্নত ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একজন চাকরিদাতা যদি তার অফিসের কর্মীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন, তাহলে সেই অফিসের কর্মপরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। একইসঙ্গে এ ধরনের অফিস পরিবেশে একজন কর্মী তার সর্বোচ্চ দক্ষতা দিয়ে কর্ম সম্পাদন করতে পারেন। কথায় বলে, কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু অনেকেই এ বিষয়টি অনুধাবন করতে চান না।

দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। তাদের বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। নারী শ্রমিকদের তুলনামূলক কম বেতন-ভাতায় কাজ করানো যায়। কিন্তু এসব নারী শ্রমিক কিভাবে বা কোন পরিবেশে কাজ করেন, তা কি আমরা ভেবে দেখি? অনেকেই তাদের ছোট বাচ্চাকে বাসায় রেখে কারখানায় কাজ করতে আসেন। তাদের পক্ষে কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অথচ অফিসে যদি ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে তাদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কাজ আদায় করা যেত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে তাদের নারী কর্মীদের বাচ্চা রাখার জন্য ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনেকেই এটাকে অপচয় মনে করতে পারেন। কিন্তু আসলে এটা কোনোভাবেই অপচয় নয়। বরং এটা কারখানার কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি কার্যকর কৌশল। একটি ডে-কেয়ার তৈরি করা হলে যে ব্যয় হবে, তার চেয়ে অনেক বেশি বর্ণিত কর্মীদের কাছ থেকে উৎপাদনশীলতা আদায় করে নেওয়া সম্ভব। এটা কোনোভাবেই অপচয় নয়।

তাই যেসব কারখানায় নারী শ্রমিক কর্মরত আছেন, তাদের সবারই উচিত হবে ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরি করা। অনুকূল কর্মপরিবেশ তৈরি করা একজন কারখানা মালিকের অন্যতম দায়িত্ব। আর যারা বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন অথবা অন্য কোনো কর্মে নিয়োজিত আছেন, তাদের হতাশা অতিক্রম করার কৌশল জানতে হবে। কোনো কারণে হতাশার সৃষ্টি হলে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে। হতাশামুক্ত ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, হতাশার পরই কোনো ভালো সংবাদ আসতে পারে, যা তাকে উদ্বুদ্ধ করবে।

কথায় বলে, ‘রাত যত গভীর হয়, ভোরের সূর্য ততই নিকটবর্তী হয়।’ অর্থাৎ রাতের পর দিন আসে। আর হতাশার পর আশার সংবাদ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেউ যদি হতাশার পর কোনো আশার সংবাদ পায়, তাহলে তার হতাশা মুহূর্তে উবে যেতে পারে। হয়তো কোনো একজন চাকরি না পেয়ে হতাশ। তিনি যদি অপ্রত্যাশিত বা প্রত্যাশিতভাবে চাকরি পাওয়ার সংবাদ পান তাহলে মুহূর্তের মধ্যে তার মন ভালো হয়ে যাবে। তিনি আগের চেয়েও বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবেন। এটাই বাস্তবতা। তাই কোনো কারণে হতাশার সৃষ্টি হলেও ভেঙে পড়তে নেই। কারণ যিনি হতাশ হন, পরক্ষণেই তিনি আবারও উদীপ্ত হওয়ার মতো খবর পেতে পারেন।

একজন মানুষ হতাশ হলে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই কোনোভাবেই হতাশা কাম্য নয়। মানুষ যখন আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তার মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের উচিত হবে তাকে মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ রাখা, সাপোর্ট দেওয়া। হতাশ মানুষ মনে করে পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন। ফলে তার মাঝে স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়ে যেতে পারে। তাকে বোঝাতে হবে, একজন মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কাজেই তা কখনোই অর্থহীন হতে পারে না। উত্থান-পতন হতেই পারে, কিন্তু জীবন কখনোই অর্থহীন হয় না। জীবনকে জীবনের মতোই চলতে দিতে হবে। তাহলেই জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোনোভাবে হতাশ হলেও আত্মহত্যার চিন্তা করা ঠিক হবে না।

এম এ খালেক : অর্থনীতি বিষয়ক লেখক; অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন