ফিরে আসুক সহিষ্ণুতা
jugantor
ফিরে আসুক সহিষ্ণুতা

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা  

২৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সেই দেশ, যে দেশটি ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে এখন। আর এ সময়েই ঘটে গেল সবচেয়ে মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষের ঘটনা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য, সমগ্র উপমহাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। যারা এত বড় উদ্বেগ উপহার দেয়, তাদের পক্ষে এসব বোঝা সম্ভব নয়। কেননা, তারা নিজেরাও জানে না, তারা তাদের জন্যই কতটা ক্ষতিকারক! তারা অন্যের ক্ষতি করা, হিংসা-বিদ্বেষ আর সন্ত্রাস ছড়ানো এবং বিবেকহীন ও না বোঝার মানসিকতার ভারে অন্ধ। কয়েক হাজার অমানুষ নামের এ প্রাণীগুলো সমগ্র পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য কত বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেটুকু অনুধাবন করার স্বাভাবিক জ্ঞানটুকুও তাদের নেই। এ উপমহাদেশের দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার লগ্নে দেশভাগের যে যন্ত্রণা সহ্য করেছে, মানুষের ছিন্নমূল হওয়ার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছে-সেই সত্যতা তাদের বোঝার কথা নয়। তাই তারা বুঝতে পারবে না-একজন তাড়া-খাওয়া হিন্দু নিজের বাড়ি-ঘর, ব্যবসা পেছনে ফেলে ছিন্নমূল হয়ে অন্য দেশে উদ্বাস্তু হয়ে কী ভয়াবহ জীবনযাপন করতে পারে! তারা এ-ও বুঝবে না, তাদের এমন জঘন্য কাজ তাদের দেশের মাথার ওপর কতখানি অপমানের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের মানসিকতা শুধু পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অজ্ঞতাকেই প্রশ্রয় দেয়, বিশ্বাস বা সহনশীলতা কিংবা সহিষ্ণুতাকে নয়। তাই তাদের শুভবুদ্ধির দয়া ভিক্ষা করার কোনো জায়গা নেই। তারা অপরাধী, তারা মানবতার শত্রু। সমাজের মুষ্টিমেয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে হয়তো বর্তমান সমাজের অভিমুখ বদল করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও তাদের নীরব থাকলে চলবে না। সমাজ-সচেতন মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলে, তা বিপদকে আরও ঘনীভূত করে, বিপদমুক্তির পথ দেখায় না।

দেবালয়, উপাসনালয় যারই উপাসনার জায়গা হোক না কেন, তা পুড়লে জনপদ নিরাপদ থাকে না। আমাদের সবার এ কথা মানতেই হবে-ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসাবে দেখা এক বিষয়। তা মানুষের ব্যক্তিগত; আর ধর্মকে রাজনৈতিক মতাদর্শে ব্যবহার করা অন্য বিষয়। দ্বিতীয়টি একদিকে যেমন বিপজ্জনক, অন্যদিকে তা সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার পরিপন্থি। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার আগুন আমরা আফগানিস্তানে দেখেছি, পাকিস্তানে দেখেছি, আর আজ বাংলাদেশে দেখছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে সচেতন শ্রেণি তথা রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য মত-ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা-বিদ্বেষ শুধু অন্য ধর্মের ক্ষতি করবে না, ক্ষতি ও কলুষিত করবে নিজের অস্তিত্ব এবং নিজের দেশেরও। লুণ্ঠিত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যে বধূ দেখেছে দাঙ্গার নামে গুণ্ডারা তাদের চাল-ডাল, টাকা-পয়সা সব নিয়ে যাচ্ছে-সে কি এ ভেবে একটু ভরসা পাবে, তার পরিবার একা নয়, সঙ্গে আছে আরও কিছু মানুষ? এটুকু সান্ত্বনা বা ভরসা পাওয়ার জায়গাটুকু কি তৈরি হতে পারে না?

সভ্যতার আদিপর্ব থেকেই ধর্ম আছে মানুষের সঙ্গে। প্রকৃতির নানা শক্তির উপাসনা থেকে শুরু করে সে এসেছে সাকার ঈশ্বরের সাধনায় অথবা নিরাকারের উপাসনায়। রাষ্ট্র যখন থেকে ধর্মের নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়ে পড়ল, গোষ্ঠী যখন পরাভূত করতে শুরু করল মানবাধিকারকে, তখন থেকেই শুরু হলো ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের সংকট। পৃথিবীজুড়েই তখন থেকে চলতে লাগল দুর্বল আর প্রান্তিকের ওপর অত্যাচার। বহু শতাব্দী ধরেই চলছে এমনটা। ঔপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েও জীবনপণ স্বাধীনতার লড়াই করেও আমরা রক্ষা পেলাম না ধর্মব্যবসায়ীদের হাত থেকে। বাংলাদেশের জন্ম-পূর্ববর্তীকাল রাঙা হয়েছে লাখ লাখ মানুষের আত্মবলিদানে, নারীর অসম্মানে। সেখানেও ধর্মের নামে একদল পশু হত্যা করেছে মানুষকে, সম্ভ্রমহানি করেছে নারীকে। আজও তাই চলছে।

ধর্মের নামেই মানুষকে অত্যাচারিত করা হচ্ছে, লুটপাট করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। জনসংখ্যার একটা বড় অংশ যেখানে হতদরিদ্র, অপুষ্টিতে ভোগে শিশুরা, রক্তস্বল্পতায় কাতর হয় প্রসূতি মায়েরা, সেখানে রক্তপিপাসু ধর্মব্যবসায়ীদের অধ্যবসায়ের কোনো শেষ নেই। তাদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। আমরা যারা মননের চর্চা করে কিঞ্চিৎ উচ্চবর্গের ভাবতে ভালোবাসি, যারা বিশ্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঠ নিয়েছি, যারা পাবলিকের টাকায় ভালো স্কুল-কলেজে পড়েছি, যারা শিক্ষক হয়েছি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি, উকিল-মোক্তার হয়েছি, সরকারি আমলা-ব্যবসায়ী হয়েছি-তারা কি সত্যিই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি ধর্মের নামে অমানবিক আগ্রাসনের ঘটনাবলি থেকে?

না, একদল মানুষ সেই দায়িত্ব থেকে কখনো সরে যান না। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। মাথায় কাগজের মুকুট। তাতে লেখা-‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই’, ‘যদি তুমি মানুষ হও, ধর্মান্ধতা রুখে দাও’। পিঠে ব্যানার ঝুলছে-‘বাংলার হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালি’, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। কিছু মানুষ ঢাকার রাজপথে, চট্টগ্রামের রাজপথে। চট্টগ্রামের সম্প্রীতি সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মিঠু ধর। ছবিটি তার হাতে ছিল প্রতিবাদ হিসাবে। ইন্টারনেটে ছবিটি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। কার আঁকা তা-ও জানতেন না। কলকাতার সায়নীও জানতেন না, তার আঁকা ছবিটা এভাবে বাংলাদেশের সম্প্রীতির মুখ হয়ে উঠবে। সায়নীর কথায়-‘স্বপ্নেও ভাবিনি, পুরোটাই চমক ছিল। আমার আঁকা ছবি যে এভাবে বাংলাদেশে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠবে, সেটা ভেবেই অসম্ভব ভালো লাগছে।’

কলকাতার বাকুড়ার বাসিন্দা ২০ বছরের সায়নী দত্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ভালোবাসেন ছবি আঁকতে। ছবিটি এঁকেছিলেন দুবছর আগে। ইন্টারনেটে আপলোডও করেছিলেন। অত্যাচারিত সব মেয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দুর্গা, সে জেগে উঠবেই-এই ভেবে ছবিটি এঁকেছিলেন সায়নী। আর সে ছবিই হয়ে উঠল প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদের ভাষা। ক্ষোভে-বিক্ষোভে দু’বাংলার এভাবে মিলনের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে এভাবেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নিগ্রহের ঘটনায় বিক্ষোভের স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘হোক কলরব’। পরবর্তীকালে তা প্রতিবাদের ভাষা হয় বাংলাদেশের গায়ক অর্ণবের-হোক কলরব...; কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের যে বদনাম হলো, তা কি কোনোদিন পূরণ হবে? শুধু কি কিছু হিন্দুর বাড়ি আর মন্দির ভাঙা হলো; নাকি চুরমার করা হলো বাংলাদেশের সম্প্রীতির ভাবমূর্তিটা? এ ধর্মউন্মাদরা জানে না, দেশভাগ আর দেশত্যাগের ফলে পূর্ববঙ্গ এবং বাংলাদেশকে আসলে যা হারাতে হয়েছে, সেটা মানবসম্পদ।

১৯৪৭ পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতে নানা ক্ষেত্রে যে বিরাট অগ্রগতি ঘটেছিল, তাতে অপরিমেয় অবদান রেখেছিলেন পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসা একঝাঁক প্রতিভাবান মানুষ। পূর্ববঙ্গে সম্প্রীতির অভাব না ঘটলে এ প্রতিভাবান মানুষগুলো এ দেশেরই নানা ধরনের উন্নয়নের সঙ্গী হতে পারতেন। মনে রাখতে হবে, ২১ কোটি ৩০ লাখ মুসলমানদের বাড়ি ভারতে; সেখানে তাদের পূর্বপুরুষরাও থাকতেন। ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে এখনো দেড় কোটি হিন্দু আছে। তাদের পূর্বপুরুষরাও এখানকার বাসিন্দা ছিলেন। দেশের প্রতি তাদের ততটাই অধিকার আছে, যতটা অধিকার অন্য নাগরিকের আছে।

প্রগতিশীল প্রতিবাদীদের যুক্তি ভোঁতা করে দিচ্ছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের পরিস্থিতি। এ তিন দেশের কোথাও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান নেই। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও তার অন্য হাতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়েছে। আফগানিস্তানে চেপে বসেছে তালেবান শাসন। ভারতে চেপে বসেছে মৌলবাদী মোদি সরকার। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রচলন করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। পরবর্তীকালে সংবিধান বদল করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল করা হয়, যা আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করে নিয়েছে এবং এখনো চলছে।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষার একটাই উপায়-সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা, বহুত্ববাদীকে শ্রদ্ধায় গ্রহণ করা, যা এ সময়ে বাংলাদেশের জন্য কঠিন নয়। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত এ বলয়ে ধর্মান্ধ রাজনীতির উঠতি লগ্নে বাংলাদেশ দিয়েই ধর্মান্ধ রাজনীতি অবসানের কাজটি শুরু হোক।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

[email protected]

ফিরে আসুক সহিষ্ণুতা

 মেজর (অব.) সুধীর সাহা 
২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সেই দেশ, যে দেশটি ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে এখন। আর এ সময়েই ঘটে গেল সবচেয়ে মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষের ঘটনা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য, সমগ্র উপমহাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। যারা এত বড় উদ্বেগ উপহার দেয়, তাদের পক্ষে এসব বোঝা সম্ভব নয়। কেননা, তারা নিজেরাও জানে না, তারা তাদের জন্যই কতটা ক্ষতিকারক! তারা অন্যের ক্ষতি করা, হিংসা-বিদ্বেষ আর সন্ত্রাস ছড়ানো এবং বিবেকহীন ও না বোঝার মানসিকতার ভারে অন্ধ। কয়েক হাজার অমানুষ নামের এ প্রাণীগুলো সমগ্র পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য কত বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেটুকু অনুধাবন করার স্বাভাবিক জ্ঞানটুকুও তাদের নেই। এ উপমহাদেশের দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার লগ্নে দেশভাগের যে যন্ত্রণা সহ্য করেছে, মানুষের ছিন্নমূল হওয়ার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছে-সেই সত্যতা তাদের বোঝার কথা নয়। তাই তারা বুঝতে পারবে না-একজন তাড়া-খাওয়া হিন্দু নিজের বাড়ি-ঘর, ব্যবসা পেছনে ফেলে ছিন্নমূল হয়ে অন্য দেশে উদ্বাস্তু হয়ে কী ভয়াবহ জীবনযাপন করতে পারে! তারা এ-ও বুঝবে না, তাদের এমন জঘন্য কাজ তাদের দেশের মাথার ওপর কতখানি অপমানের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের মানসিকতা শুধু পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অজ্ঞতাকেই প্রশ্রয় দেয়, বিশ্বাস বা সহনশীলতা কিংবা সহিষ্ণুতাকে নয়। তাই তাদের শুভবুদ্ধির দয়া ভিক্ষা করার কোনো জায়গা নেই। তারা অপরাধী, তারা মানবতার শত্রু। সমাজের মুষ্টিমেয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে হয়তো বর্তমান সমাজের অভিমুখ বদল করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও তাদের নীরব থাকলে চলবে না। সমাজ-সচেতন মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলে, তা বিপদকে আরও ঘনীভূত করে, বিপদমুক্তির পথ দেখায় না।

দেবালয়, উপাসনালয় যারই উপাসনার জায়গা হোক না কেন, তা পুড়লে জনপদ নিরাপদ থাকে না। আমাদের সবার এ কথা মানতেই হবে-ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসাবে দেখা এক বিষয়। তা মানুষের ব্যক্তিগত; আর ধর্মকে রাজনৈতিক মতাদর্শে ব্যবহার করা অন্য বিষয়। দ্বিতীয়টি একদিকে যেমন বিপজ্জনক, অন্যদিকে তা সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার পরিপন্থি। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার আগুন আমরা আফগানিস্তানে দেখেছি, পাকিস্তানে দেখেছি, আর আজ বাংলাদেশে দেখছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে সচেতন শ্রেণি তথা রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য মত-ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা-বিদ্বেষ শুধু অন্য ধর্মের ক্ষতি করবে না, ক্ষতি ও কলুষিত করবে নিজের অস্তিত্ব এবং নিজের দেশেরও। লুণ্ঠিত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যে বধূ দেখেছে দাঙ্গার নামে গুণ্ডারা তাদের চাল-ডাল, টাকা-পয়সা সব নিয়ে যাচ্ছে-সে কি এ ভেবে একটু ভরসা পাবে, তার পরিবার একা নয়, সঙ্গে আছে আরও কিছু মানুষ? এটুকু সান্ত্বনা বা ভরসা পাওয়ার জায়গাটুকু কি তৈরি হতে পারে না?

সভ্যতার আদিপর্ব থেকেই ধর্ম আছে মানুষের সঙ্গে। প্রকৃতির নানা শক্তির উপাসনা থেকে শুরু করে সে এসেছে সাকার ঈশ্বরের সাধনায় অথবা নিরাকারের উপাসনায়। রাষ্ট্র যখন থেকে ধর্মের নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়ে পড়ল, গোষ্ঠী যখন পরাভূত করতে শুরু করল মানবাধিকারকে, তখন থেকেই শুরু হলো ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের সংকট। পৃথিবীজুড়েই তখন থেকে চলতে লাগল দুর্বল আর প্রান্তিকের ওপর অত্যাচার। বহু শতাব্দী ধরেই চলছে এমনটা। ঔপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েও জীবনপণ স্বাধীনতার লড়াই করেও আমরা রক্ষা পেলাম না ধর্মব্যবসায়ীদের হাত থেকে। বাংলাদেশের জন্ম-পূর্ববর্তীকাল রাঙা হয়েছে লাখ লাখ মানুষের আত্মবলিদানে, নারীর অসম্মানে। সেখানেও ধর্মের নামে একদল পশু হত্যা করেছে মানুষকে, সম্ভ্রমহানি করেছে নারীকে। আজও তাই চলছে।

ধর্মের নামেই মানুষকে অত্যাচারিত করা হচ্ছে, লুটপাট করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। জনসংখ্যার একটা বড় অংশ যেখানে হতদরিদ্র, অপুষ্টিতে ভোগে শিশুরা, রক্তস্বল্পতায় কাতর হয় প্রসূতি মায়েরা, সেখানে রক্তপিপাসু ধর্মব্যবসায়ীদের অধ্যবসায়ের কোনো শেষ নেই। তাদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। আমরা যারা মননের চর্চা করে কিঞ্চিৎ উচ্চবর্গের ভাবতে ভালোবাসি, যারা বিশ্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঠ নিয়েছি, যারা পাবলিকের টাকায় ভালো স্কুল-কলেজে পড়েছি, যারা শিক্ষক হয়েছি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি, উকিল-মোক্তার হয়েছি, সরকারি আমলা-ব্যবসায়ী হয়েছি-তারা কি সত্যিই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি ধর্মের নামে অমানবিক আগ্রাসনের ঘটনাবলি থেকে?

না, একদল মানুষ সেই দায়িত্ব থেকে কখনো সরে যান না। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। মাথায় কাগজের মুকুট। তাতে লেখা-‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই’, ‘যদি তুমি মানুষ হও, ধর্মান্ধতা রুখে দাও’। পিঠে ব্যানার ঝুলছে-‘বাংলার হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালি’, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। কিছু মানুষ ঢাকার রাজপথে, চট্টগ্রামের রাজপথে। চট্টগ্রামের সম্প্রীতি সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মিঠু ধর। ছবিটি তার হাতে ছিল প্রতিবাদ হিসাবে। ইন্টারনেটে ছবিটি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। কার আঁকা তা-ও জানতেন না। কলকাতার সায়নীও জানতেন না, তার আঁকা ছবিটা এভাবে বাংলাদেশের সম্প্রীতির মুখ হয়ে উঠবে। সায়নীর কথায়-‘স্বপ্নেও ভাবিনি, পুরোটাই চমক ছিল। আমার আঁকা ছবি যে এভাবে বাংলাদেশে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠবে, সেটা ভেবেই অসম্ভব ভালো লাগছে।’

কলকাতার বাকুড়ার বাসিন্দা ২০ বছরের সায়নী দত্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ভালোবাসেন ছবি আঁকতে। ছবিটি এঁকেছিলেন দুবছর আগে। ইন্টারনেটে আপলোডও করেছিলেন। অত্যাচারিত সব মেয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দুর্গা, সে জেগে উঠবেই-এই ভেবে ছবিটি এঁকেছিলেন সায়নী। আর সে ছবিই হয়ে উঠল প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদের ভাষা। ক্ষোভে-বিক্ষোভে দু’বাংলার এভাবে মিলনের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে এভাবেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নিগ্রহের ঘটনায় বিক্ষোভের স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘হোক কলরব’। পরবর্তীকালে তা প্রতিবাদের ভাষা হয় বাংলাদেশের গায়ক অর্ণবের-হোক কলরব...; কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের যে বদনাম হলো, তা কি কোনোদিন পূরণ হবে? শুধু কি কিছু হিন্দুর বাড়ি আর মন্দির ভাঙা হলো; নাকি চুরমার করা হলো বাংলাদেশের সম্প্রীতির ভাবমূর্তিটা? এ ধর্মউন্মাদরা জানে না, দেশভাগ আর দেশত্যাগের ফলে পূর্ববঙ্গ এবং বাংলাদেশকে আসলে যা হারাতে হয়েছে, সেটা মানবসম্পদ।

১৯৪৭ পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতে নানা ক্ষেত্রে যে বিরাট অগ্রগতি ঘটেছিল, তাতে অপরিমেয় অবদান রেখেছিলেন পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসা একঝাঁক প্রতিভাবান মানুষ। পূর্ববঙ্গে সম্প্রীতির অভাব না ঘটলে এ প্রতিভাবান মানুষগুলো এ দেশেরই নানা ধরনের উন্নয়নের সঙ্গী হতে পারতেন। মনে রাখতে হবে, ২১ কোটি ৩০ লাখ মুসলমানদের বাড়ি ভারতে; সেখানে তাদের পূর্বপুরুষরাও থাকতেন। ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে এখনো দেড় কোটি হিন্দু আছে। তাদের পূর্বপুরুষরাও এখানকার বাসিন্দা ছিলেন। দেশের প্রতি তাদের ততটাই অধিকার আছে, যতটা অধিকার অন্য নাগরিকের আছে।

প্রগতিশীল প্রতিবাদীদের যুক্তি ভোঁতা করে দিচ্ছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের পরিস্থিতি। এ তিন দেশের কোথাও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান নেই। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও তার অন্য হাতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়েছে। আফগানিস্তানে চেপে বসেছে তালেবান শাসন। ভারতে চেপে বসেছে মৌলবাদী মোদি সরকার। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রচলন করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। পরবর্তীকালে সংবিধান বদল করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল করা হয়, যা আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করে নিয়েছে এবং এখনো চলছে।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষার একটাই উপায়-সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা, বহুত্ববাদীকে শ্রদ্ধায় গ্রহণ করা, যা এ সময়ে বাংলাদেশের জন্য কঠিন নয়। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত এ বলয়ে ধর্মান্ধ রাজনীতির উঠতি লগ্নে বাংলাদেশ দিয়েই ধর্মান্ধ রাজনীতি অবসানের কাজটি শুরু হোক।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

[email protected]

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন