শেয়ারবাজার ও দেশের অর্থনীতি
jugantor
শেয়ারবাজার ও দেশের অর্থনীতি

  আবু আহমেদ  

২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যবিত্তকে সম্পদ ধারণে সাহায্য করার জন্য স্টক মার্কেট হচ্ছে উত্তম জায়গা; অথচ এ জায়গাটাকে আমরা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা স্টক মার্কেটে একটু নজর দিলেই সেটি সম্ভব ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজকে আমাদের দেশের ধনী লোকেরা দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে টাকা পাচার করছে। আমি অহরহ শুনি এবং মিডিয়াতেও টাকা পাচার নিয়ে লেখালেখি হয়। এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথাবার্তাও হয়; কিন্তু ওই পর্যন্তই।এ প্রশ্নটি কি আমরা কাউকে কখনো করেছি, বিদেশে পাচার না করে দেশে বিনিয়োগের যোগ্য জায়গাটি আমরা কেন সৃষ্টি করতে পারছি না অথবা বাংলাদেশের ধনী লোকগুলোকে এসেট হোল্ডিংয়ের জন্য সুযোগ করে দিচ্ছি না কেন? না, আমাদের এসব নিয়ে ভাবার সে অবকাশ নেই।

‘দ্য স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস-২০২১’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বহুজাতিক কোম্পানি ও অতি সম্পদশালী ব্যক্তিদের কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক হাজার ২৩৭ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসাবে)। এ অর্থ বার্ষিক কর রাজস্বের প্রায় এক শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বছরে যে প্রায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে, তার মধ্যে ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের জন্য দায়ী বহুজাতিক করপোরেশন এবং ২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের জন্য দায়ী ধনী ব্যক্তিরা।

বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭০ কোটি ডলার, যা বিদেশে থাকা মোট বৈশ্বিক সম্পদের দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এ অর্থ মোট জিডিপির দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে রাখা এ সম্পদ থেকে বাংলাদেশ বছরে ২ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের কর রাজস্ব হারাচ্ছে। এটি জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এগুলো দেখেও যেন না দেখার ভান করছি আমরা। তাহলে আমাদের অর্থনীতি এগোবে কীভাবে? আমাদের অর্থনীতিকে একটি ভালো অবস্থানে নিতে হলে এ বিষয়গুলো সামনে আনতে হবে।

গত বছরের আগের বছর গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন ফার্মাসিউটিক্যাল্স কোম্পানি আমাদের এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল; অথচ আমরা বিদেশে গিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি-ভাই সাহেব, আপনারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আসুন, এখানে মুনাফা আছে। লন্ডনে গিয়ে এ ধরনের রোড শো করা হচ্ছে; অথচ সেখানে ওদেরই তো কোম্পানি গ্ল্যাক্সো স্মিথ। আমরা দেশে তাদের রাখতে পারিনি; অথচ তাদের দেশেই আমরা আবার রোড শো করছি। বিষয়টি হাস্যকরই বটে।

এ বছর আমাদের দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল ফ্রান্সের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি সানোফি অ্যাভেন্টিস। এখানে তারা সুবিধা করতে পারেনি। কারণ, এখানে ব্যবসা করতে গিয়ে তাদের অনেক অনৈতিক কাজকর্মের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব অনৈতিক কাজকর্ম তারা পছন্দ করেনি; তাই তারা মনে করেছে, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটানোই ভালো এবং তাই হয়েছে। অথচ আমাদের অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, মানুষ বাড়ছে, আয়-রোজগারও বাড়ছে। তাদের পণ্যের চাহিদাও তো বাড়ার কথা ছিল। তাহলে কেন তারা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাবে?

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কারণ ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে টপটেন কোম্পানির মধ্যে হিন্দুস্তান লিভার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেটি আমাদের দেশে ইউনিলিভার নামে পরিচিত। অথচ বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে ইউনিলিভার তো লিস্টেই নেই। এ কোম্পানি আমাদের দেশের টপটেনের মধ্যে থাকা উচিত ছিল। শেয়ারবাজারে শুধু জাংক শেয়ার অন্তর্ভুক্ত করে তো কোনো লাভ নেই। এতে করে শেয়ারবাজারে গতি ফেরানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এটি গবেষণা করে দেখা উচিত, গত তিন বছরে এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যারা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রিমিয়ামে টাকা নিয়েছে। অর্থাৎ ১০ টাকার শেয়ার ৩০-৪০ টাকা করে নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে অনেক কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশই দেয়নি। লভ্যাংশ দিলেও কেউ নামমাত্র ১০ শতাংশ দিয়েছে। অথচ ব্যাংক থেকে এ টাকা নিলে তাদের ৩০ পার্সেন্ট সুুদ দিতে হতো। অর্থাৎ তিনগুণ সুদ গুনতে হতো। বাংলাদেশে এখন তো মানুষকে ঠকানো সহজ হয়ে গেছে।

লোভে পড়ে অনেক সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার মার্কেটে আসে অল্প পুঁজি নিয়ে। তারা আবার বিভিন্ন কারণে তাদের পুঁজিটা হারায়। এমন অনেক উদাহরণ আছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে অনেকে নিঃস্ব-সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে গেছে। কেননা, জমিজমা বিক্রি করে এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে লাভের আশায়। শেয়ারবাজারে গ্যাম্বলিং, হিউমার ইত্যাদি কারণে এক শ্রেণির লোক সুবিধা নিয়ে সটকে পড়ে; অপরদিকে ক্ষতির মুখে পড়ে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। এবার যে ডাউন অবস্থা শুরু হয়েছে, সেটি চিন্তার বিষয়। একটা পর্যায়ে ২৭শ কোটি টার্নওভার ছিল, সেটি খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। আর এখন ১১শ থেকে ১ হাজারে নেমেছে। কেন হয়েছে? জবাবে বলতে হয়, আমাদের এখানে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করার মতো তেমন কোনো সুযোগ নেই। ওই জুয়া খেলার সময় শেয়ারের দাম বেশ বেড়েছে, মানি সাপ্লাই বেড়েছে, আইসিবিও নেট ক্রেতা ছিল, ব্যাংকগুলো কিনেছে, তারপর অন্যরাও দেখাদেখি টাকা এনে শেয়ার ক্রয় করেছে। গ্যাম্বলাররা শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নিজেদের ফায়দা লুটে যখন সরে যাচ্ছে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অফ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে শেয়ারবাজারে মূল্যসূচক নিচের দিকে নেমে আসছে।

এসব পরিস্থিতি থেকে শেয়ারবাজারকে রক্ষা করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সবার বসা উচিত। বসে কী কী করতে হবে বা কী কী করণীয়, সেটা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বলে দিতে পারবে। যেসব বড় কোম্পানি আমাদের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি, তাদের সঙ্গে বৈঠক করা যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অবশ্য চেষ্টা করা হয়েছিল বসার জন্য; কিন্তু তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আসেনি। কোনো দেশই পাবলিক ইন্টারেস্টে পিছিয়ে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের পলিসি মেকাররা যদি তৎপর না থাকে কিংবা তারা যদি বোকা বোকা ভাব দেখায়, তাহলে তো ভালো কোনো বিদেশি কোম্পানি লিস্টিংয়ে আসবে না। কারণ, কোনো কোম্পানি লিস্টিংয়ে এলে তাকে এক্সপোজড হতে হয়। সে কী কী আর্ন করছে, সরকারকে কত পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছে এবং তিন মাস অন্তর অন্তর তার ইনকামগুলো প্রকাশ করতে হয়। এগুলো অনেক কোম্পানিই করতে চায় না। এসব কোম্পানি এদের ব্যবসাকে ঢেকে রাখতে চায়। কারণ তাদের ব্যবসাকে তারা যত বেশি ঢেকে রাখতে পারবে, তাদের তত বেশি লাভ। এভাবে ঢেকে রাখলে সরকার ট্যাক্স কম পাবে এবং কোম্পানিতে মানুষের অংশগ্রহণও থাকবে না। ফলে দেশের সাধারণ মানুষ কোম্পানির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন টপ কোম্পানিগুলোর পণ্যের শুধু ভোক্তাই নয়, তারা ওইসব কোম্পানির মালিকও। আইবিএম, অ্যাপেল, অ্যামাজন ডটকম, মাইক্রোসফট, গুগলের মতো বড় বড় কোম্পানির মালিক সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ এ ধরনের বড় বড় কোম্পানির শেয়ারের মালিক। অথচ গুগল, নেসলে আমাদের দেশে ব্যবসা করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে লন্ডনে। কিন্তু এখানে আমাদের কোনো মালিকানাই নেই। এত বড় বোকামি বাংলাদেশের লোকজন করছে, যেটি খুবই আশ্চর্যজনক। যারা আমাদের দেশে ব্যবসা করে বড় অঙ্কের মুনাফা করছে, তাদের শেয়ারবাজারে না এনে ওই দুর্বল কোম্পানিকে এনে তো শেয়ারবাজারের গতি ফেরানো সম্ভব নয়। এসব কোম্পানি ঋণখেলাপি হয়েছে, সেই ঋণখেলাপি থেকে কোনো রকমে মুক্ত হয়ে শেয়ারবাজারে হাজির হয়েছে। এদের থেকে ভালো কী-ই বা আশা করা যেতে পারে। অথচ এগুলোকেই আমরা লিস্টিংয়ে আনছি। এসব বিষয় নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে একটা উদ্যোগ থাকা দরকার।

প্রতি বছর বাজেট আসছে, বাজেট যাচ্ছে-সেখানে কিছু সাজেশন দিচ্ছে ঢাকা স্টক সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন; কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। লিস্টেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত, সেটিও তেমন আসে না। সরকার এবার যে করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স আড়াই পার্সেন্ট কমিয়েছে, সেটি লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও কমিয়েছে, আবার নন লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও কমিয়েছে। তাহলে লাভটা কী হলো? পারিবারিক ব্যবসা দিয়ে পৃথিবীতে কোনো দেশ অর্থনীতিতে বড় হয়নি। পৃথিবীর অর্থনীতি বা জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে মালিকানা বণ্টনের মাধ্যমে। ক্রাইসলার, বোয়িং কোম্পানি, এয়ার বাস কোম্পানি-এরা তো আমেরিকার লাখ লাখ মানুষকে মালিকানা দিয়েছে। আমরা তাদের পণ্যের ভোক্তা অথচ মালিক নই। কোম্পানিটি আমাদের দেশে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে, আমরা এর কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারছি না। এসব বিষয় রাজনীতিকদের মাথায় আসে না।

আমাদের দেশের ধনী লোকদের (সুপার রিচ যারা) টাকা-পয়সা যদি দেশে বিনিয়োগ করাতে চাই, তাহলে কমোডিটি মার্কেট, গোল্ড মার্কেট খোলা উচিত। কারণ, এগুলো হচ্ছে বিকল্প সম্পদ; বিদেশে যেটি আছে। আমাদের এখানে ভালো কোনো কমোডিটি মার্কেটেও নেই, গোল্ড মার্কেটেও নেই, স্টক মার্কেটের অবস্থাও ভালো নয়। তাহলে যাদের হাতে এক হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আছে, তারা বিনিয়োগ করবে কোথায়? দেশে বিনিয়োগের জায়গা দেখাতে সরকারের তরফ থেকে শিল্প স্থাপন করার পরামর্শ আসে। কিন্তু সবাই তো শিল্প স্থাপন করতে আগ্রহী নয়। অনেকে করতেও চায় না। যার ফলে টাকাগুলো বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ বৃত্ত বলয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে আলোচ্য বিষয়গুলো সামনে এনে সরকারের উচ্চ মহলে চিন্তা-ভাবনা দরকার।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

শেয়ারবাজার ও দেশের অর্থনীতি

 আবু আহমেদ 
২৯ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যবিত্তকে সম্পদ ধারণে সাহায্য করার জন্য স্টক মার্কেট হচ্ছে উত্তম জায়গা; অথচ এ জায়গাটাকে আমরা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা স্টক মার্কেটে একটু নজর দিলেই সেটি সম্ভব ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজকে আমাদের দেশের ধনী লোকেরা দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে টাকা পাচার করছে। আমি অহরহ শুনি এবং মিডিয়াতেও টাকা পাচার নিয়ে লেখালেখি হয়। এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথাবার্তাও হয়; কিন্তু ওই পর্যন্তই।এ প্রশ্নটি কি আমরা কাউকে কখনো করেছি, বিদেশে পাচার না করে দেশে বিনিয়োগের যোগ্য জায়গাটি আমরা কেন সৃষ্টি করতে পারছি না অথবা বাংলাদেশের ধনী লোকগুলোকে এসেট হোল্ডিংয়ের জন্য সুযোগ করে দিচ্ছি না কেন? না, আমাদের এসব নিয়ে ভাবার সে অবকাশ নেই।

‘দ্য স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস-২০২১’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বহুজাতিক কোম্পানি ও অতি সম্পদশালী ব্যক্তিদের কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক হাজার ২৩৭ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসাবে)। এ অর্থ বার্ষিক কর রাজস্বের প্রায় এক শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বছরে যে প্রায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে, তার মধ্যে ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের জন্য দায়ী বহুজাতিক করপোরেশন এবং ২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের জন্য দায়ী ধনী ব্যক্তিরা।

বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭০ কোটি ডলার, যা বিদেশে থাকা মোট বৈশ্বিক সম্পদের দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এ অর্থ মোট জিডিপির দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে রাখা এ সম্পদ থেকে বাংলাদেশ বছরে ২ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের কর রাজস্ব হারাচ্ছে। এটি জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এগুলো দেখেও যেন না দেখার ভান করছি আমরা। তাহলে আমাদের অর্থনীতি এগোবে কীভাবে? আমাদের অর্থনীতিকে একটি ভালো অবস্থানে নিতে হলে এ বিষয়গুলো সামনে আনতে হবে।

গত বছরের আগের বছর গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন ফার্মাসিউটিক্যাল্স কোম্পানি আমাদের এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল; অথচ আমরা বিদেশে গিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি-ভাই সাহেব, আপনারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আসুন, এখানে মুনাফা আছে। লন্ডনে গিয়ে এ ধরনের রোড শো করা হচ্ছে; অথচ সেখানে ওদেরই তো কোম্পানি গ্ল্যাক্সো স্মিথ। আমরা দেশে তাদের রাখতে পারিনি; অথচ তাদের দেশেই আমরা আবার রোড শো করছি। বিষয়টি হাস্যকরই বটে।

এ বছর আমাদের দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল ফ্রান্সের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি সানোফি অ্যাভেন্টিস। এখানে তারা সুবিধা করতে পারেনি। কারণ, এখানে ব্যবসা করতে গিয়ে তাদের অনেক অনৈতিক কাজকর্মের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব অনৈতিক কাজকর্ম তারা পছন্দ করেনি; তাই তারা মনে করেছে, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটানোই ভালো এবং তাই হয়েছে। অথচ আমাদের অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, মানুষ বাড়ছে, আয়-রোজগারও বাড়ছে। তাদের পণ্যের চাহিদাও তো বাড়ার কথা ছিল। তাহলে কেন তারা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাবে?

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কারণ ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে টপটেন কোম্পানির মধ্যে হিন্দুস্তান লিভার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেটি আমাদের দেশে ইউনিলিভার নামে পরিচিত। অথচ বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে ইউনিলিভার তো লিস্টেই নেই। এ কোম্পানি আমাদের দেশের টপটেনের মধ্যে থাকা উচিত ছিল। শেয়ারবাজারে শুধু জাংক শেয়ার অন্তর্ভুক্ত করে তো কোনো লাভ নেই। এতে করে শেয়ারবাজারে গতি ফেরানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এটি গবেষণা করে দেখা উচিত, গত তিন বছরে এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যারা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রিমিয়ামে টাকা নিয়েছে। অর্থাৎ ১০ টাকার শেয়ার ৩০-৪০ টাকা করে নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে অনেক কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশই দেয়নি। লভ্যাংশ দিলেও কেউ নামমাত্র ১০ শতাংশ দিয়েছে। অথচ ব্যাংক থেকে এ টাকা নিলে তাদের ৩০ পার্সেন্ট সুুদ দিতে হতো। অর্থাৎ তিনগুণ সুদ গুনতে হতো। বাংলাদেশে এখন তো মানুষকে ঠকানো সহজ হয়ে গেছে।

লোভে পড়ে অনেক সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার মার্কেটে আসে অল্প পুঁজি নিয়ে। তারা আবার বিভিন্ন কারণে তাদের পুঁজিটা হারায়। এমন অনেক উদাহরণ আছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে অনেকে নিঃস্ব-সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে গেছে। কেননা, জমিজমা বিক্রি করে এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে লাভের আশায়। শেয়ারবাজারে গ্যাম্বলিং, হিউমার ইত্যাদি কারণে এক শ্রেণির লোক সুবিধা নিয়ে সটকে পড়ে; অপরদিকে ক্ষতির মুখে পড়ে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। এবার যে ডাউন অবস্থা শুরু হয়েছে, সেটি চিন্তার বিষয়। একটা পর্যায়ে ২৭শ কোটি টার্নওভার ছিল, সেটি খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। আর এখন ১১শ থেকে ১ হাজারে নেমেছে। কেন হয়েছে? জবাবে বলতে হয়, আমাদের এখানে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করার মতো তেমন কোনো সুযোগ নেই। ওই জুয়া খেলার সময় শেয়ারের দাম বেশ বেড়েছে, মানি সাপ্লাই বেড়েছে, আইসিবিও নেট ক্রেতা ছিল, ব্যাংকগুলো কিনেছে, তারপর অন্যরাও দেখাদেখি টাকা এনে শেয়ার ক্রয় করেছে। গ্যাম্বলাররা শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নিজেদের ফায়দা লুটে যখন সরে যাচ্ছে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অফ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে শেয়ারবাজারে মূল্যসূচক নিচের দিকে নেমে আসছে।

এসব পরিস্থিতি থেকে শেয়ারবাজারকে রক্ষা করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সবার বসা উচিত। বসে কী কী করতে হবে বা কী কী করণীয়, সেটা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বলে দিতে পারবে। যেসব বড় কোম্পানি আমাদের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি, তাদের সঙ্গে বৈঠক করা যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অবশ্য চেষ্টা করা হয়েছিল বসার জন্য; কিন্তু তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আসেনি। কোনো দেশই পাবলিক ইন্টারেস্টে পিছিয়ে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের পলিসি মেকাররা যদি তৎপর না থাকে কিংবা তারা যদি বোকা বোকা ভাব দেখায়, তাহলে তো ভালো কোনো বিদেশি কোম্পানি লিস্টিংয়ে আসবে না। কারণ, কোনো কোম্পানি লিস্টিংয়ে এলে তাকে এক্সপোজড হতে হয়। সে কী কী আর্ন করছে, সরকারকে কত পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছে এবং তিন মাস অন্তর অন্তর তার ইনকামগুলো প্রকাশ করতে হয়। এগুলো অনেক কোম্পানিই করতে চায় না। এসব কোম্পানি এদের ব্যবসাকে ঢেকে রাখতে চায়। কারণ তাদের ব্যবসাকে তারা যত বেশি ঢেকে রাখতে পারবে, তাদের তত বেশি লাভ। এভাবে ঢেকে রাখলে সরকার ট্যাক্স কম পাবে এবং কোম্পানিতে মানুষের অংশগ্রহণও থাকবে না। ফলে দেশের সাধারণ মানুষ কোম্পানির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন টপ কোম্পানিগুলোর পণ্যের শুধু ভোক্তাই নয়, তারা ওইসব কোম্পানির মালিকও। আইবিএম, অ্যাপেল, অ্যামাজন ডটকম, মাইক্রোসফট, গুগলের মতো বড় বড় কোম্পানির মালিক সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ এ ধরনের বড় বড় কোম্পানির শেয়ারের মালিক। অথচ গুগল, নেসলে আমাদের দেশে ব্যবসা করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে লন্ডনে। কিন্তু এখানে আমাদের কোনো মালিকানাই নেই। এত বড় বোকামি বাংলাদেশের লোকজন করছে, যেটি খুবই আশ্চর্যজনক। যারা আমাদের দেশে ব্যবসা করে বড় অঙ্কের মুনাফা করছে, তাদের শেয়ারবাজারে না এনে ওই দুর্বল কোম্পানিকে এনে তো শেয়ারবাজারের গতি ফেরানো সম্ভব নয়। এসব কোম্পানি ঋণখেলাপি হয়েছে, সেই ঋণখেলাপি থেকে কোনো রকমে মুক্ত হয়ে শেয়ারবাজারে হাজির হয়েছে। এদের থেকে ভালো কী-ই বা আশা করা যেতে পারে। অথচ এগুলোকেই আমরা লিস্টিংয়ে আনছি। এসব বিষয় নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে একটা উদ্যোগ থাকা দরকার।

প্রতি বছর বাজেট আসছে, বাজেট যাচ্ছে-সেখানে কিছু সাজেশন দিচ্ছে ঢাকা স্টক সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন; কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। লিস্টেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত, সেটিও তেমন আসে না। সরকার এবার যে করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স আড়াই পার্সেন্ট কমিয়েছে, সেটি লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও কমিয়েছে, আবার নন লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও কমিয়েছে। তাহলে লাভটা কী হলো? পারিবারিক ব্যবসা দিয়ে পৃথিবীতে কোনো দেশ অর্থনীতিতে বড় হয়নি। পৃথিবীর অর্থনীতি বা জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে মালিকানা বণ্টনের মাধ্যমে। ক্রাইসলার, বোয়িং কোম্পানি, এয়ার বাস কোম্পানি-এরা তো আমেরিকার লাখ লাখ মানুষকে মালিকানা দিয়েছে। আমরা তাদের পণ্যের ভোক্তা অথচ মালিক নই। কোম্পানিটি আমাদের দেশে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে, আমরা এর কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারছি না। এসব বিষয় রাজনীতিকদের মাথায় আসে না।

আমাদের দেশের ধনী লোকদের (সুপার রিচ যারা) টাকা-পয়সা যদি দেশে বিনিয়োগ করাতে চাই, তাহলে কমোডিটি মার্কেট, গোল্ড মার্কেট খোলা উচিত। কারণ, এগুলো হচ্ছে বিকল্প সম্পদ; বিদেশে যেটি আছে। আমাদের এখানে ভালো কোনো কমোডিটি মার্কেটেও নেই, গোল্ড মার্কেটেও নেই, স্টক মার্কেটের অবস্থাও ভালো নয়। তাহলে যাদের হাতে এক হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আছে, তারা বিনিয়োগ করবে কোথায়? দেশে বিনিয়োগের জায়গা দেখাতে সরকারের তরফ থেকে শিল্প স্থাপন করার পরামর্শ আসে। কিন্তু সবাই তো শিল্প স্থাপন করতে আগ্রহী নয়। অনেকে করতেও চায় না। যার ফলে টাকাগুলো বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ বৃত্ত বলয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে আলোচ্য বিষয়গুলো সামনে এনে সরকারের উচ্চ মহলে চিন্তা-ভাবনা দরকার।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন