মেয়র জাহাঙ্গীর এতদিন শাস্তিমুক্ত ছিলেন কেন?
jugantor
মেয়র জাহাঙ্গীর এতদিন শাস্তিমুক্ত ছিলেন কেন?

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এ মুহূর্তে দেশে ইস্যুর ঘনঘটা। বেগম জিয়ার অসুস্থতা এবং সেটার ভিত্তিতে তার বিদেশে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে ক্ষমতাসীন দল এবং বিএনপির মধ্যে, যে বিতর্কে দূরে নেই অন্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকরাও। তুমুল আলোচনায় আছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, খুনোখুনি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের ধরাকে সরা জ্ঞান করা অকল্পনীয় সব মন্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ভীষণ।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ডিজেলের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহণের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে অনেক। এর জেরে পরিবহণ সেক্টরে বিশৃঙ্খলা নেমে এসেছে। এ ভাড়া বৃদ্ধির মধ্যেই শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়ার দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। ছাত্রদের এই আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক ছাত্রের প্রাণ হারানো। এই লেখা যখন লিখছি, তখন ছাত্ররা ২০১৮ সালের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আরেকবার রাস্তায় নেমে এসেছে।

এ সবকিছুর মধ্যেও আলোচনায় ছিলেন গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর। তার দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কথা বলেছি। তবে তার মেয়র-এর পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টা ততটা আলোচিত হয়নি, কারণ ‘বাজারে’ এখন আরও অনেক বড় ইস্যু আছে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি জনাব জাহাঙ্গীরকে নিয়ে যা যা ঘটল সেটি এ রাষ্ট্রের অনেকগুলো দিক উন্মোচন করেছে। তাই এ আলোচনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের কৃপাদৃষ্টি একজন মানুষকে কী অকল্পনীয় রকম ক্ষমতাশালী করে তুলতে পারে তার এক জাজ্বল্যমান উদাহরণ এ মেয়র জাহাঙ্গীর। অতীত জীবনের প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় থাকা একটা মানুষ তথাকথিত রাজনীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেকে কতটা ক্ষমতাশালী করে তুলতে পেরেছিলেন, সেটা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদেরকে যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে।

বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এ প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটিই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা-লংঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু, পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি।

ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না’। হ্যাঁ, দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকাকে এভাবেই অকপট ব্যাখ্যা দেন জাহাঙ্গীর।

এরপর আমাদের সামনে আসে তার অতি আলোচিত অডিও রেকর্ডটি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তো বটেই, সেখানে ভয়ংকর আপত্তিকর মন্তব্য আছে তারই দলের প্রধান মানুষ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। এমন মন্তব্য যদি এ দেশের আর কেউ করত তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারত বুঝতে পারছি নিশ্চয়ই আমরা। কিন্তু না, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কোনো মামলা করেনি। এরপর ক্ষমতাসীন দল তাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং সেই নোটিশের জবাব দেন জাহাঙ্গীর। শেষ পর্যন্ত দলের সভানেত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় জাহাঙ্গীরকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তের কয়েকদিন পর তার বিরুদ্ধে সেই অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য মামলা করা হয়। কিন্তু এখনো তিনি গ্রেফতার হননি। আমাদের মতো কেউ হলে সে কি এখনো থাকতে পারত জেলের বাইরে? দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা প্রজ্ঞাপনে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া দরপত্র, নির্দিষ্ট কোম্পানিকে দর দেওয়ার অনুরোধসংক্রান্ত (আরএফকিউ) দরপত্রে অনিয়ম, বিভিন্ন পদে অযৌক্তিক লোকবল নিয়োগ, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ও একই কাজ বিভিন্ন প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতি বছর হাটবাজার ইজারার টাকা যথাযথভাবে নির্ধারিত খাতে জমা না রাখাসহ নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া ভূমি দখল ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া রাস্তা প্রশস্তকরণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মতামত জানতে চাওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো মতামত দেওয়া হয়নি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উল্লিখিত অভিযোগগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিনিষেধের পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অপশাসনের শামিল, যা সিটি করপোরেশন আইনানুযায়ী অপসারণযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন অপসারণের কার্যক্রমও শুরু করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন এসেছে, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগ নিশ্চয়ই গত কয়েক দিনে তৈরি হয়নি, হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। তার ভয়ংকর দুর্নীতি-অনিয়মের কথা স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরাট একটা অংশ দীর্ঘদিন থেকে বলছে। এমনকি তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজীপুর আওয়ামী লীগের সভাপতির গ্রুপ বিরাট আনন্দ মিছিল করেছে, মিষ্টি বিতরণ করেছে। তাই কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, কেন তাহলে বছরের পর বছর জাহাঙ্গীরের দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার? তবে আমার মনে এ ধরনের প্রশ্ন কখনো আসে না, কারণ আমি জানি ক্ষমতাসীন দলে থাকা প্রত্যেকের দুর্নীতির একটা ইমিউনিটি থাকে। কিন্তু আমি কথা বলতে চাই যে প্রক্রিয়ায় জনাব জাহাঙ্গীরকে মেয়র পদ থেকে পদচ্যুত করা হয়েছে সেটা নিয়ে।

সিটি করপোরেশন আইনের ১২ ধারায় কোনো সিটি মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার জন্য বলা হয়েছে ‘যে ক্ষেত্রে কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়র অথবা কাউন্সিলরের অপসারণের জন্য ধারা ১৩-এর অধীন কার্যক্রম আরম্ভ করা হইয়াছে অথবা তাহার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালত কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে...’ এমন কারণে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা যাবে। যেহেতু জনাব জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো চার্জশিট গৃহীত হয়নি, তাই ধারা ১৩ অনুযায়ী কিছু হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। ১৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘মেয়র অথবা কাউন্সিলর মেয়র অথবা কাউন্সিলর তাহার স্বীয় পদ হইতে অপসারণযোগ্য হইবেন, যদি তিনি-’এখানে মোট ৬টি কারণের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে জনাব জাহাঙ্গীরের জন্য প্রযোজ্য হবে এটি-(ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।

এ ধারারই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেটির জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সঙ্গে মিল আছে। তাই এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু করাই যায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ মানে কি দোষী সাব্যস্ত হওয়া? বিচারের প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে কি দোষী বলা যায়? তাহলে তো এখন এমন পরিস্থিতি হতেই পারে সরকার তার অপছন্দের যে কোনো মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে স্রেফ কিছু অভিযোগের কথা তুলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে দিতে পারে।

জাহাঙ্গীর সম্পর্কে দেশের মূলধারার পত্রিকায় যেসব রিপোর্ট এসেছে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ সত্যি হলেও তিনি একজন দুর্বৃত্তের বেশিকিছু নন। এ দেশের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবেন তিনি। কিন্তু যখন আমরা একটা রাষ্ট্রের কথা বলি, যখন আমরা একটা রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা করার কথা বলি, তখন আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই চুক্তিতে পৌঁছি-ভয়ংকরতম দুর্বৃত্তেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ওপর অনেকের ক্ষোভ আছে, যৌক্তিকভাবেই আছে। তাই নিজেদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দলের জেরে জাহাঙ্গীরের এ পরিস্থিতি হওয়া অনেককে নিশ্চয়ই আনন্দ দিচ্ছে। কিন্তু এ দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমার চাওয়া তার মতো মানুষের বিচার হয়ে শাস্তি হোক। কিন্তু সবকিছুই হোক সঠিক বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তিনিও যেন কোনো অবিচারের শিকার না হন।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

মেয়র জাহাঙ্গীর এতদিন শাস্তিমুক্ত ছিলেন কেন?

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
২৯ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এ মুহূর্তে দেশে ইস্যুর ঘনঘটা। বেগম জিয়ার অসুস্থতা এবং সেটার ভিত্তিতে তার বিদেশে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে ক্ষমতাসীন দল এবং বিএনপির মধ্যে, যে বিতর্কে দূরে নেই অন্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকরাও। তুমুল আলোচনায় আছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, খুনোখুনি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের ধরাকে সরা জ্ঞান করা অকল্পনীয় সব মন্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ভীষণ।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ডিজেলের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহণের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে অনেক। এর জেরে পরিবহণ সেক্টরে বিশৃঙ্খলা নেমে এসেছে। এ ভাড়া বৃদ্ধির মধ্যেই শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়ার দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। ছাত্রদের এই আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক ছাত্রের প্রাণ হারানো। এই লেখা যখন লিখছি, তখন ছাত্ররা ২০১৮ সালের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আরেকবার রাস্তায় নেমে এসেছে।

এ সবকিছুর মধ্যেও আলোচনায় ছিলেন গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর। তার দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কথা বলেছি। তবে তার মেয়র-এর পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টা ততটা আলোচিত হয়নি, কারণ ‘বাজারে’ এখন আরও অনেক বড় ইস্যু আছে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি জনাব জাহাঙ্গীরকে নিয়ে যা যা ঘটল সেটি এ রাষ্ট্রের অনেকগুলো দিক উন্মোচন করেছে। তাই এ আলোচনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের কৃপাদৃষ্টি একজন মানুষকে কী অকল্পনীয় রকম ক্ষমতাশালী করে তুলতে পারে তার এক জাজ্বল্যমান উদাহরণ এ মেয়র জাহাঙ্গীর। অতীত জীবনের প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় থাকা একটা মানুষ তথাকথিত রাজনীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেকে কতটা ক্ষমতাশালী করে তুলতে পেরেছিলেন, সেটা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদেরকে যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে।

বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এ প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটিই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা-লংঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু, পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি।

ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না’। হ্যাঁ, দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকাকে এভাবেই অকপট ব্যাখ্যা দেন জাহাঙ্গীর।

এরপর আমাদের সামনে আসে তার অতি আলোচিত অডিও রেকর্ডটি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তো বটেই, সেখানে ভয়ংকর আপত্তিকর মন্তব্য আছে তারই দলের প্রধান মানুষ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। এমন মন্তব্য যদি এ দেশের আর কেউ করত তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারত বুঝতে পারছি নিশ্চয়ই আমরা। কিন্তু না, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কোনো মামলা করেনি। এরপর ক্ষমতাসীন দল তাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং সেই নোটিশের জবাব দেন জাহাঙ্গীর। শেষ পর্যন্ত দলের সভানেত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় জাহাঙ্গীরকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তের কয়েকদিন পর তার বিরুদ্ধে সেই অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য মামলা করা হয়। কিন্তু এখনো তিনি গ্রেফতার হননি। আমাদের মতো কেউ হলে সে কি এখনো থাকতে পারত জেলের বাইরে? দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা প্রজ্ঞাপনে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া দরপত্র, নির্দিষ্ট কোম্পানিকে দর দেওয়ার অনুরোধসংক্রান্ত (আরএফকিউ) দরপত্রে অনিয়ম, বিভিন্ন পদে অযৌক্তিক লোকবল নিয়োগ, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ও একই কাজ বিভিন্ন প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতি বছর হাটবাজার ইজারার টাকা যথাযথভাবে নির্ধারিত খাতে জমা না রাখাসহ নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া ভূমি দখল ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া রাস্তা প্রশস্তকরণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মতামত জানতে চাওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো মতামত দেওয়া হয়নি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উল্লিখিত অভিযোগগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিনিষেধের পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অপশাসনের শামিল, যা সিটি করপোরেশন আইনানুযায়ী অপসারণযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন অপসারণের কার্যক্রমও শুরু করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন এসেছে, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগ নিশ্চয়ই গত কয়েক দিনে তৈরি হয়নি, হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। তার ভয়ংকর দুর্নীতি-অনিয়মের কথা স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরাট একটা অংশ দীর্ঘদিন থেকে বলছে। এমনকি তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজীপুর আওয়ামী লীগের সভাপতির গ্রুপ বিরাট আনন্দ মিছিল করেছে, মিষ্টি বিতরণ করেছে। তাই কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, কেন তাহলে বছরের পর বছর জাহাঙ্গীরের দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার? তবে আমার মনে এ ধরনের প্রশ্ন কখনো আসে না, কারণ আমি জানি ক্ষমতাসীন দলে থাকা প্রত্যেকের দুর্নীতির একটা ইমিউনিটি থাকে। কিন্তু আমি কথা বলতে চাই যে প্রক্রিয়ায় জনাব জাহাঙ্গীরকে মেয়র পদ থেকে পদচ্যুত করা হয়েছে সেটা নিয়ে।

সিটি করপোরেশন আইনের ১২ ধারায় কোনো সিটি মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার জন্য বলা হয়েছে ‘যে ক্ষেত্রে কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়র অথবা কাউন্সিলরের অপসারণের জন্য ধারা ১৩-এর অধীন কার্যক্রম আরম্ভ করা হইয়াছে অথবা তাহার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালত কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে...’ এমন কারণে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা যাবে। যেহেতু জনাব জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো চার্জশিট গৃহীত হয়নি, তাই ধারা ১৩ অনুযায়ী কিছু হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। ১৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘মেয়র অথবা কাউন্সিলর মেয়র অথবা কাউন্সিলর তাহার স্বীয় পদ হইতে অপসারণযোগ্য হইবেন, যদি তিনি-’এখানে মোট ৬টি কারণের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে জনাব জাহাঙ্গীরের জন্য প্রযোজ্য হবে এটি-(ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।

এ ধারারই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেটির জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সঙ্গে মিল আছে। তাই এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু করাই যায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ মানে কি দোষী সাব্যস্ত হওয়া? বিচারের প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে কি দোষী বলা যায়? তাহলে তো এখন এমন পরিস্থিতি হতেই পারে সরকার তার অপছন্দের যে কোনো মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে স্রেফ কিছু অভিযোগের কথা তুলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে দিতে পারে।

জাহাঙ্গীর সম্পর্কে দেশের মূলধারার পত্রিকায় যেসব রিপোর্ট এসেছে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ সত্যি হলেও তিনি একজন দুর্বৃত্তের বেশিকিছু নন। এ দেশের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবেন তিনি। কিন্তু যখন আমরা একটা রাষ্ট্রের কথা বলি, যখন আমরা একটা রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা করার কথা বলি, তখন আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই চুক্তিতে পৌঁছি-ভয়ংকরতম দুর্বৃত্তেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ওপর অনেকের ক্ষোভ আছে, যৌক্তিকভাবেই আছে। তাই নিজেদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দলের জেরে জাহাঙ্গীরের এ পরিস্থিতি হওয়া অনেককে নিশ্চয়ই আনন্দ দিচ্ছে। কিন্তু এ দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমার চাওয়া তার মতো মানুষের বিচার হয়ে শাস্তি হোক। কিন্তু সবকিছুই হোক সঠিক বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তিনিও যেন কোনো অবিচারের শিকার না হন।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন