আয়কর আইন হোক সর্বজনপ্রিয়, নিবর্তনমূলক নয়
jugantor
আয়কর আইন হোক সর্বজনপ্রিয়, নিবর্তনমূলক নয়

  ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ  

৩০ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, তেমনি আইনের প্রয়োগ আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আইনের ভাষা ও মেজাজ এবং প্রক্ষেপণ ও দর্শন এর উদ্দেশ্য-বিধেয় বিধৃত হয়ে থাকে। আইনপ্রণেতার মনোভাব, দূরদৃষ্টি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, স্বভাব-চরিত্র এবং আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে আইনের ভাষায়। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে, যাদের জন্য আইনটি তৈরি করা হয়, অর্থাৎ যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে-তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে।

এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, তাদের সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। আইন পরিষদ যে আইন তৈরি করে তার প্রয়োগ হয় যারা আইন তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে তাদের ওপর। আর এ আইন প্রয়োগের দায়িত্বও আইনপ্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের।

এখন পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি এমন হয় বা আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর বর্তাবে না, এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, প্রয়োগের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও তারা যেন হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষ আইনপ্রণেতা ও প্রয়োগকারী। এ পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক। এ প্রেক্ষাপটে আইন অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়; কিংবা মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়-এই স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপারটি বিশ্লেষণে গেলে এটা স্পষ্ট হয়ে প্রতিভাত হয় যে, মানুষের কল্যাণেই আইনের প্রয়োজন। তবে মানুষ আগে, আইন পরে। আইন মানুষকে মুক্তির জন্য, তাকে বন্দি করার জন্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার আইনের আওতায় স্বীকৃত, নিশ্চিত, নির্ধারিত, নিবন্ধিত হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তার, বিশ্বাসের, শরীরের, চলাচলের, সম্মানের ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও নিরাপত্তা দাবি করতে পারে আইনের কাছে। তাই যে কোনো আইনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সার্বজনীনতা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এর একটি অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। নিবর্তনমূলক কিংবা প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত আইন কল্যাণপ্রদ আইন হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। যে আইন যত সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য, সর্বজনবোধ্য, সর্বজন অনুসৃত-সে আইন তত কল্যাণকর ও কার্যকর।

আইনকে সর্বজনগ্রাহ্য, মান্য, বোধ্য, অনুসরণযোগ্য হতে হলে সে আইনের ভাষা বা দৃষ্টিভঙ্গিতে সার্বজনীনতার, ন্যায়নীতি-নির্ভরতার ও নিরপেক্ষতার প্রতিফলন থাকা চাই। যাদের জন্য আইন প্রণয়ন কিংবা যারা এর প্রয়োগ করবেন, তাদের থেকে আসা উচিত আইন প্রণয়নের তাগিদ, মালমসলা, যুক্তিতর্কানুমোদিত সুপারিশ বা পরামর্শ। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশনা নিচে যে আছে তার পক্ষে পরিপালন করা যথাসিদ্ধ হয় না। কেন আইনের প্রয়োজন, কতটুকু প্রয়োজন, কার কার জন্য প্রয়োজন, কিভাবে তা প্রয়োগ হবে-এসব বিষয়ে মাঠপর্যায় থেকেই আসবে উপাত্ত। আইনের উৎস হবে তারাই, যাদের জন্য এটি প্রণীত হচ্ছে। আইন যে সমাজে বা সময়ে প্রয়োগযোগ্য হবে, সে সমাজ বা সময়ে এটি ডাইজেস্টেবল কিনা সেটা দেখাও আবশ্যক হয়ে যায়।

বিদ্যমান বা চলমান আইনের সংস্কারের প্রশ্নটি সে নিরিখেই এসে যায়। অনেক ভালো বা মন্দ আইন সময় ও সমাজের পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে সংস্কারের প্রয়োজন হয়। আইন যুগধর্ম বিস্মৃত হয়ে অনড় হতে পারে না, একে যুগোপযোগীকরণে, সরলীকরণে সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজনের জন্য ফ্লেকজিবল হতে হয়। যে আইন যত সংস্কারযোগ্য, সে আইন তত সচল, সজীব ও দীর্ঘজীবী।

উপরের তাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণার আলোকে আমরা বাংলাদেশের আয়কর আইনের একটি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরিতে মনোনিবেশ করতে পারি। দেশে বিদ্যমান আয়কর আইনটি জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে নিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক। এ দেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান, বিভিন্ন সেবার বিনিময়, কিংবা উৎপাদন বা সম্পদ ব্যবহার বাবদ নানা নামে, নানা উপায়ে রাজস্ব বা টোল আদায়ের প্রথা সেই আদি যুগ থেকে চলে এলেও আধুনিক আয়কর বলতে যে বিশেষ কর রাজস্বের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এদেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তার প্রবর্তন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, সাত সাগর তের নদীর পার থেকে আসা বিদেশি বেনিয়ার দ্বারা। তাদের তৎকালীন সমাজে শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজির প্রসার ঘটে এবং সেখানে সম্পদের ওপর, সম্পদ সৃষ্টি ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ওই অতিরিক্ত আয়ের ওপর একটা হিস্যা দাবি করে বসে, যুক্তি এই-তুমি রাষ্ট্রের তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে আয় উপার্জন করছো, রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা ভোগ করে লাভবান হচ্ছো; সুতরাং এসব অবকাঠামো নির্মাণ, এসব সুযোগ-সুবিধার সমাহার বাবদ রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তোমার অংশগ্রহণ চাই।

এর ফলে করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধি-বিধানের ভাষায় এক ধরনের কুটিল মনোভাবের প্রকাশ পেয়ে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও কূটার্থবোধক হয়ে ওঠে। এদেশে প্রবর্তিত আয়কর সংক্রান্ত সার্কুলারগুলোর জটিলতা যুগলবন্দি হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদারের পাইক পেয়াদাসুলভ যুদ্ধংদেহি মনোভাব প্রকাশ পায়। উদ্দেশ্য থেকে যায়, তোমার আয় হোক আর না হোক, অর্থাৎ বাঁচো-মরো রাজস্ব আমার চাই।

এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অন্তরালে ব্রিটিশ প্রশাসনে বহুল কথিত একটা সাধারণ নির্দেশনা ছিল অনেকটা এরকম-‘চোর তো চুরি করিবেই, কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবেই।’ করদাতাদের এমন বিরূপ ধারণায় বিবেচনা এবং তাদের ধরার ইন্ধন কর আইনের ভাষ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ততার এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টিতে সেই সময়কার আয়কর আইনের ভাষার যেন ছিল পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে যা বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়। এ রকমই পরিবেশে করদাতাদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কর ফাঁকি কার্যক্রমে করদাতা আর আদায়কারীর মধ্যবর্তী সাহায্যকারীও যেন সহায়ক ভূমিকায় চলে আসে। এ জটিল, অনভিপ্রেত ব্যবস্থাদি আয়কর সার্কুলারের ভাষায় প্রতিফলিত হতে থাকে। তদানীন্তন ব্রিটেনে বিদ্যমান আয়কর আইন ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রক্রিয়া থেকে সে সময় এদেশে প্রণীত ও প্রবর্তিত আইন ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিচ্যুতি ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাই-ই ‘ভারতীয় আয়কর আইন’ আকারে ১৯২২ সালে সংকলিত ও প্রবর্তিত হয়।

১৯২২ সালের ভারতীয় আয়কর আইন ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর যেখানে ‘ভারত’ লেখা, সেখানে ‘পাকিস্তান’ প্রতিস্থাপন করে সমগ্র পাকিস্তানে তা প্রবর্তিত হয়। শাসকের ও শাসিতের মধ্যকার হরাইজেন্টাল ও ভার্টিক্যাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়কর সংক্রান্ত ধ্যানধারণা, মতিগতি, স্বভাব-চরিত্র-সবই সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আদলে থেকে যায়। আয়কর ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোয় সংগতকারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রে সেই একই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা বা অনুসরণ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। স্মর্তব্য, আজকের বাংলাদেশ তখন তদানীন্তন পাকিস্তানের অধীনে উপনিবেশসম একটি প্রদেশ হিসাবে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল। আর আয়কর রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। প্রসংগত, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনকে নিজস্ব সমাজ ও সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পুনর্গঠন করে নতুন আয়কর আইন প্রবর্তন করে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও একযুগেরও বেশি সময় সেই ১৯২২ সালের আয়কর আইন ভারতের স্থলে পাকিস্তান, পাকিস্তানের স্থলে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপিত ও নামাঙ্কিত হওয়া ছাড়া একইভাবে বলবৎ ও প্রযোজ্য থাকে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬নং অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও গণগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসাবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বারবার দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে আয়কর আইন প্রণয়নের। আইনসভার অনুমোদনে প্রণীত না হওয়ায় লক্ষ করা যায় অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাগুলো তথা বিধানাবলি মূলত ১৯২২ সালের মূল আইনেরই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রণীত প্রেসক্রিপশন মাত্র এবং এটি সেই হিসাবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে গেলে প্রতীয়মান হয়, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগযোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে, তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব-ভাষায় দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার হয়নি। বরং প্রতিবছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃতির সুবিধা সংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত। পক্ষান্তরে, যুগধর্মের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্র্ধারণ ও আদায় সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ, সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণের পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সমকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগসংবলিত সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়াস বারবার যেন উপেক্ষিতই থেকে গেছে।

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনামনস্ক হতে চাইলেও সেদেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের, সংশয়-সন্দেহের, জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আইন প্রয়োগে অভ্যস্ত আয়কর বিভাগ এবং সেই আইনের আওতায় করদাতাকে সহায়তাদানকারী সমাজও সময়ের দাবির প্রেক্ষাপটে আন্তরিক হয়েও যথাযথ সংস্কারে গলদঘর্ম হয়।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার অর্থে ভাড়া করা দেশি-বিদেশি আয়কর বিশেষজ্ঞ দ্বারা বাংলাদেশে বিদ্যমান গোটা আয়কর আইনকে পুনর্লিখিত করে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রয়োগ আইন পাশের পর দেশের সব আইন বাংলা ভাষায় প্রণয়নের বিধান থাকলেও আয়কর আইনটিতে ইংরেজি ভাষায় দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধক প্রাকরণিক ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সমাহার ঘটানো হয়েছে-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আবহ ও সংস্কৃতিতে যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এদেশের আয়কর আইন হবে এদেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলক, তবেই বাড়বে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, এ আয়কর আইনের ভাষা হতে হবে সহজবোধ্য, জটিলতামুক্ত এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে, সার্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। করদাতা যেন নিজেই নিজের আয়কর ফরম পূরণ, কর নির্ধারণ এবং সরাসরি তা দাখিলে সক্ষম হন। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত আয়করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিক মাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর-রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এমন পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার মতো স্পর্শকাতর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্যকর ও কল্যাণপ্রদ পরির্বতন আনয়নের ওপর। আর সে প্রত্যাশা পূরণে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ ও করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।

ড মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব; এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান; উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

আয়কর আইন হোক সর্বজনপ্রিয়, নিবর্তনমূলক নয়

 ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ 
৩০ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, তেমনি আইনের প্রয়োগ আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আইনের ভাষা ও মেজাজ এবং প্রক্ষেপণ ও দর্শন এর উদ্দেশ্য-বিধেয় বিধৃত হয়ে থাকে। আইনপ্রণেতার মনোভাব, দূরদৃষ্টি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, স্বভাব-চরিত্র এবং আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে আইনের ভাষায়। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে, যাদের জন্য আইনটি তৈরি করা হয়, অর্থাৎ যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে-তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে।

এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, তাদের সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। আইন পরিষদ যে আইন তৈরি করে তার প্রয়োগ হয় যারা আইন তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে তাদের ওপর। আর এ আইন প্রয়োগের দায়িত্বও আইনপ্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের।

এখন পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি এমন হয় বা আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর বর্তাবে না, এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, প্রয়োগের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও তারা যেন হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষ আইনপ্রণেতা ও প্রয়োগকারী। এ পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক। এ প্রেক্ষাপটে আইন অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়; কিংবা মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়-এই স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপারটি বিশ্লেষণে গেলে এটা স্পষ্ট হয়ে প্রতিভাত হয় যে, মানুষের কল্যাণেই আইনের প্রয়োজন। তবে মানুষ আগে, আইন পরে। আইন মানুষকে মুক্তির জন্য, তাকে বন্দি করার জন্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার আইনের আওতায় স্বীকৃত, নিশ্চিত, নির্ধারিত, নিবন্ধিত হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তার, বিশ্বাসের, শরীরের, চলাচলের, সম্মানের ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও নিরাপত্তা দাবি করতে পারে আইনের কাছে। তাই যে কোনো আইনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সার্বজনীনতা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এর একটি অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। নিবর্তনমূলক কিংবা প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত আইন কল্যাণপ্রদ আইন হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। যে আইন যত সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য, সর্বজনবোধ্য, সর্বজন অনুসৃত-সে আইন তত কল্যাণকর ও কার্যকর।

আইনকে সর্বজনগ্রাহ্য, মান্য, বোধ্য, অনুসরণযোগ্য হতে হলে সে আইনের ভাষা বা দৃষ্টিভঙ্গিতে সার্বজনীনতার, ন্যায়নীতি-নির্ভরতার ও নিরপেক্ষতার প্রতিফলন থাকা চাই। যাদের জন্য আইন প্রণয়ন কিংবা যারা এর প্রয়োগ করবেন, তাদের থেকে আসা উচিত আইন প্রণয়নের তাগিদ, মালমসলা, যুক্তিতর্কানুমোদিত সুপারিশ বা পরামর্শ। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশনা নিচে যে আছে তার পক্ষে পরিপালন করা যথাসিদ্ধ হয় না। কেন আইনের প্রয়োজন, কতটুকু প্রয়োজন, কার কার জন্য প্রয়োজন, কিভাবে তা প্রয়োগ হবে-এসব বিষয়ে মাঠপর্যায় থেকেই আসবে উপাত্ত। আইনের উৎস হবে তারাই, যাদের জন্য এটি প্রণীত হচ্ছে। আইন যে সমাজে বা সময়ে প্রয়োগযোগ্য হবে, সে সমাজ বা সময়ে এটি ডাইজেস্টেবল কিনা সেটা দেখাও আবশ্যক হয়ে যায়।

বিদ্যমান বা চলমান আইনের সংস্কারের প্রশ্নটি সে নিরিখেই এসে যায়। অনেক ভালো বা মন্দ আইন সময় ও সমাজের পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে সংস্কারের প্রয়োজন হয়। আইন যুগধর্ম বিস্মৃত হয়ে অনড় হতে পারে না, একে যুগোপযোগীকরণে, সরলীকরণে সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজনের জন্য ফ্লেকজিবল হতে হয়। যে আইন যত সংস্কারযোগ্য, সে আইন তত সচল, সজীব ও দীর্ঘজীবী।

উপরের তাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণার আলোকে আমরা বাংলাদেশের আয়কর আইনের একটি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরিতে মনোনিবেশ করতে পারি। দেশে বিদ্যমান আয়কর আইনটি জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে নিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক। এ দেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান, বিভিন্ন সেবার বিনিময়, কিংবা উৎপাদন বা সম্পদ ব্যবহার বাবদ নানা নামে, নানা উপায়ে রাজস্ব বা টোল আদায়ের প্রথা সেই আদি যুগ থেকে চলে এলেও আধুনিক আয়কর বলতে যে বিশেষ কর রাজস্বের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এদেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তার প্রবর্তন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, সাত সাগর তের নদীর পার থেকে আসা বিদেশি বেনিয়ার দ্বারা। তাদের তৎকালীন সমাজে শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজির প্রসার ঘটে এবং সেখানে সম্পদের ওপর, সম্পদ সৃষ্টি ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ওই অতিরিক্ত আয়ের ওপর একটা হিস্যা দাবি করে বসে, যুক্তি এই-তুমি রাষ্ট্রের তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে আয় উপার্জন করছো, রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা ভোগ করে লাভবান হচ্ছো; সুতরাং এসব অবকাঠামো নির্মাণ, এসব সুযোগ-সুবিধার সমাহার বাবদ রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তোমার অংশগ্রহণ চাই।

এর ফলে করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধি-বিধানের ভাষায় এক ধরনের কুটিল মনোভাবের প্রকাশ পেয়ে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও কূটার্থবোধক হয়ে ওঠে। এদেশে প্রবর্তিত আয়কর সংক্রান্ত সার্কুলারগুলোর জটিলতা যুগলবন্দি হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদারের পাইক পেয়াদাসুলভ যুদ্ধংদেহি মনোভাব প্রকাশ পায়। উদ্দেশ্য থেকে যায়, তোমার আয় হোক আর না হোক, অর্থাৎ বাঁচো-মরো রাজস্ব আমার চাই।

এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অন্তরালে ব্রিটিশ প্রশাসনে বহুল কথিত একটা সাধারণ নির্দেশনা ছিল অনেকটা এরকম-‘চোর তো চুরি করিবেই, কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবেই।’ করদাতাদের এমন বিরূপ ধারণায় বিবেচনা এবং তাদের ধরার ইন্ধন কর আইনের ভাষ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ততার এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টিতে সেই সময়কার আয়কর আইনের ভাষার যেন ছিল পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে যা বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়। এ রকমই পরিবেশে করদাতাদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কর ফাঁকি কার্যক্রমে করদাতা আর আদায়কারীর মধ্যবর্তী সাহায্যকারীও যেন সহায়ক ভূমিকায় চলে আসে। এ জটিল, অনভিপ্রেত ব্যবস্থাদি আয়কর সার্কুলারের ভাষায় প্রতিফলিত হতে থাকে। তদানীন্তন ব্রিটেনে বিদ্যমান আয়কর আইন ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রক্রিয়া থেকে সে সময় এদেশে প্রণীত ও প্রবর্তিত আইন ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিচ্যুতি ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাই-ই ‘ভারতীয় আয়কর আইন’ আকারে ১৯২২ সালে সংকলিত ও প্রবর্তিত হয়।

১৯২২ সালের ভারতীয় আয়কর আইন ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর যেখানে ‘ভারত’ লেখা, সেখানে ‘পাকিস্তান’ প্রতিস্থাপন করে সমগ্র পাকিস্তানে তা প্রবর্তিত হয়। শাসকের ও শাসিতের মধ্যকার হরাইজেন্টাল ও ভার্টিক্যাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়কর সংক্রান্ত ধ্যানধারণা, মতিগতি, স্বভাব-চরিত্র-সবই সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আদলে থেকে যায়। আয়কর ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোয় সংগতকারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রে সেই একই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা বা অনুসরণ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। স্মর্তব্য, আজকের বাংলাদেশ তখন তদানীন্তন পাকিস্তানের অধীনে উপনিবেশসম একটি প্রদেশ হিসাবে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল। আর আয়কর রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। প্রসংগত, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনকে নিজস্ব সমাজ ও সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পুনর্গঠন করে নতুন আয়কর আইন প্রবর্তন করে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও একযুগেরও বেশি সময় সেই ১৯২২ সালের আয়কর আইন ভারতের স্থলে পাকিস্তান, পাকিস্তানের স্থলে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপিত ও নামাঙ্কিত হওয়া ছাড়া একইভাবে বলবৎ ও প্রযোজ্য থাকে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬নং অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও গণগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসাবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বারবার দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে আয়কর আইন প্রণয়নের। আইনসভার অনুমোদনে প্রণীত না হওয়ায় লক্ষ করা যায় অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাগুলো তথা বিধানাবলি মূলত ১৯২২ সালের মূল আইনেরই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রণীত প্রেসক্রিপশন মাত্র এবং এটি সেই হিসাবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে গেলে প্রতীয়মান হয়, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগযোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে, তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব-ভাষায় দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার হয়নি। বরং প্রতিবছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃতির সুবিধা সংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত। পক্ষান্তরে, যুগধর্মের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্র্ধারণ ও আদায় সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ, সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণের পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সমকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগসংবলিত সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়াস বারবার যেন উপেক্ষিতই থেকে গেছে।

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনামনস্ক হতে চাইলেও সেদেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের, সংশয়-সন্দেহের, জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আইন প্রয়োগে অভ্যস্ত আয়কর বিভাগ এবং সেই আইনের আওতায় করদাতাকে সহায়তাদানকারী সমাজও সময়ের দাবির প্রেক্ষাপটে আন্তরিক হয়েও যথাযথ সংস্কারে গলদঘর্ম হয়।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার অর্থে ভাড়া করা দেশি-বিদেশি আয়কর বিশেষজ্ঞ দ্বারা বাংলাদেশে বিদ্যমান গোটা আয়কর আইনকে পুনর্লিখিত করে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রয়োগ আইন পাশের পর দেশের সব আইন বাংলা ভাষায় প্রণয়নের বিধান থাকলেও আয়কর আইনটিতে ইংরেজি ভাষায় দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধক প্রাকরণিক ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সমাহার ঘটানো হয়েছে-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আবহ ও সংস্কৃতিতে যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এদেশের আয়কর আইন হবে এদেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলক, তবেই বাড়বে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, এ আয়কর আইনের ভাষা হতে হবে সহজবোধ্য, জটিলতামুক্ত এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে, সার্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। করদাতা যেন নিজেই নিজের আয়কর ফরম পূরণ, কর নির্ধারণ এবং সরাসরি তা দাখিলে সক্ষম হন। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত আয়করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিক মাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর-রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এমন পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার মতো স্পর্শকাতর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্যকর ও কল্যাণপ্রদ পরির্বতন আনয়নের ওপর। আর সে প্রত্যাশা পূরণে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ ও করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।

ড মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব; এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান; উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন