শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক
jugantor
শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক

  ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী  

০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকের চেয়ে সামান্য বেশি। এর কারণ, আমি বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা সিটি কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আছি। এখানে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী। অন্যদিকে আমি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে লেখাপড়া করায় সেটাকেও নিজের প্রতিষ্ঠান বলেই দাবি করি।

এসব কারণে রাজধানীতে গণপরিবহণে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্রছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে আমার এক ধরনের মানসিক যোগাযোগ আছে। এর সঙ্গে কিছু আবেগও যুক্ত হয়েছে। আমি ষাটের দশকে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থেকে ছাত্র আন্দোলন করেছি। আমি জানি, ছাত্ররা যৌক্তিক কারণেই কোনো আন্দোলন করে থাকে। যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখনো বাসভাড়া অর্ধেক ছিল। তাই শিক্ষার্থীদের এই দাবি যৌক্তিক বলে মনে করি। আরেকটি বিষয়, সাধারণ মানুষ যখন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তখন প্রয়োজনে তারাও মাঠে নামে।

তবে এ মুহূর্তে আমার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন লেখাপড়াকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। রাস্তায় না থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়। কারণ এ আন্দোলনের ফলে সরকার ইতোমধ্যে বিআরটিসির বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণ করেছে। এছাড়া বেসরকারি বাস মালিকরা শর্তসাপেক্ষে হাফ ভাড়া চালুর ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও তা প্রত্যাখ্যান করেছে শিক্ষার্থীরা।

এর আগে পরিবহণ মালিকদের পক্ষ থেকে একটি হাস্যকর বক্তব্য এসেছিল যে, বাস মালিকরা গরিব। তবে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজ হচ্ছে বাস, ট্রাক পরিবহণ মালিক সংগঠনগুলো। তারা যাত্রীদের এক ধরনের জিম্মি বা চাঁদাবাজি করে চলে। কিন্তু তারা কখনো বড়লোক হয় না! অবশ্য আজকাল এটি করে বিদেশেও ঘরবাড়ি করা যায় বলে শুনেছি। তাই শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, চাঁদাবাজদের সঙ্গে রাস্তায় আন্দোলন করলে হবে না। আগে জনগণ ও গণমাধ্যমকে বোঝাতে হবে। ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরাই সফল হয়েছে।

আরেকটি বিষয় নতুন প্রজন্মের অনেকের জানা নেই এবং বয়স্কদের অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন যে, পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হয়, আর রেলের সংখ্যা কমানো হয়। অনেক জায়গায় রেলপথ বন্ধ করে বাসের লাইন করা হয়। এই বাস মালিকদের শতকরা ৭০ ভাগই ছিল বিএনপি আমলের। তখন থেকেই এদেশের মানুষ অনৈতিকভাবে অর্থ-সম্পদ আয় করা শুরু করে।

তারা বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে দেখেছে গণপরিবহণ ব্যবসা খুব লোভনীয়। ফলে কৌশলে রেলপথ কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পরিবহণ সমস্যার মূল কোথায় বুঝতে পেরেছেন। দেশের ভেতর ছাড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বাড়ানো শুরু করেছেন। ঢাকায় যানবাহনের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মেট্রোরেল চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

বর্তমানে বাস-ট্রাক মালিক সমিতির বড় পদগুলোতে কিছু হাইব্রিড আওয়ামী লীগার রয়েছে, যারা বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকাকালে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তারা এখন মালিক, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এসব হাইব্রিড আওয়ামী লীগের ভেতরে যেমন ঢুকেছে, ঠিক তেমনিভাবে পরিবহণ মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন জায়গায় ঢুকেছে। এরা সুযোগসন্ধানী। তারা ভাবছে, সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, সেহেতু প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে। তাই তারা ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমতাবস্থায় ছাত্রছাত্রীরা যদি লেখাপড়ার ক্ষতি করে রাস্তায় নামে, নিজেদের মধ্যে গণ্ডগোল করে, তাতে মানসিক ও বিবেকের দিক থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

আমার মনে হয়, যদি বাস মালিকরা যুক্তিপূর্ণভাবে সরকারের সঙ্গে আলাপ করেন, তাহলে কিছুটা ভর্তুকি পেতে পারেন। তেলের দাম বাড়ায় কিছুটা ছাড় তারা পেতে পারেন। তবে সেটা যুক্তিপূর্ণ হতে হবে। নয়তো ঢালাওভাবে বাস-ট্রাক মালিকদের সাহায্য করা হলে সেটা কর্মচারী পর্যন্ত পৌঁছায় না। কর্মচারীরা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে। সুতরাং উচিত হবে আইন করে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার ব্যপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। এটি বাস্তবায়নে নজরদারি জোরদার করা।

আমি আবারও বলছি, শিক্ষার্থীদের দাবি যুক্তিপূর্ণ, এটা নিয়ে আর কোনো আলাপ-আলোচনার দরকার নেই। শিক্ষার্থীরা সফল হয়েছে। এখন তাদের উচিত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়া। তা না হলে বিনা কারণে রাস্তায় থেকে নিজেদের ক্ষতি সাধন করলে সেটি আন্দোলনের কুফল হিসাবে বিবেচিত হবে।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী : চক্ষু বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান

শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক

 ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী 
০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকের চেয়ে সামান্য বেশি। এর কারণ, আমি বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা সিটি কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আছি। এখানে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী। অন্যদিকে আমি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে লেখাপড়া করায় সেটাকেও নিজের প্রতিষ্ঠান বলেই দাবি করি।

এসব কারণে রাজধানীতে গণপরিবহণে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্রছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে আমার এক ধরনের মানসিক যোগাযোগ আছে। এর সঙ্গে কিছু আবেগও যুক্ত হয়েছে। আমি ষাটের দশকে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থেকে ছাত্র আন্দোলন করেছি। আমি জানি, ছাত্ররা যৌক্তিক কারণেই কোনো আন্দোলন করে থাকে। যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখনো বাসভাড়া অর্ধেক ছিল। তাই শিক্ষার্থীদের এই দাবি যৌক্তিক বলে মনে করি। আরেকটি বিষয়, সাধারণ মানুষ যখন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তখন প্রয়োজনে তারাও মাঠে নামে।

তবে এ মুহূর্তে আমার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন লেখাপড়াকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। রাস্তায় না থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়। কারণ এ আন্দোলনের ফলে সরকার ইতোমধ্যে বিআরটিসির বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণ করেছে। এছাড়া বেসরকারি বাস মালিকরা শর্তসাপেক্ষে হাফ ভাড়া চালুর ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও তা প্রত্যাখ্যান করেছে শিক্ষার্থীরা।

এর আগে পরিবহণ মালিকদের পক্ষ থেকে একটি হাস্যকর বক্তব্য এসেছিল যে, বাস মালিকরা গরিব। তবে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজ হচ্ছে বাস, ট্রাক পরিবহণ মালিক সংগঠনগুলো। তারা যাত্রীদের এক ধরনের জিম্মি বা চাঁদাবাজি করে চলে। কিন্তু তারা কখনো বড়লোক হয় না! অবশ্য আজকাল এটি করে বিদেশেও ঘরবাড়ি করা যায় বলে শুনেছি। তাই শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, চাঁদাবাজদের সঙ্গে রাস্তায় আন্দোলন করলে হবে না। আগে জনগণ ও গণমাধ্যমকে বোঝাতে হবে। ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরাই সফল হয়েছে।

আরেকটি বিষয় নতুন প্রজন্মের অনেকের জানা নেই এবং বয়স্কদের অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন যে, পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হয়, আর রেলের সংখ্যা কমানো হয়। অনেক জায়গায় রেলপথ বন্ধ করে বাসের লাইন করা হয়। এই বাস মালিকদের শতকরা ৭০ ভাগই ছিল বিএনপি আমলের। তখন থেকেই এদেশের মানুষ অনৈতিকভাবে অর্থ-সম্পদ আয় করা শুরু করে।

তারা বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে দেখেছে গণপরিবহণ ব্যবসা খুব লোভনীয়। ফলে কৌশলে রেলপথ কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পরিবহণ সমস্যার মূল কোথায় বুঝতে পেরেছেন। দেশের ভেতর ছাড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বাড়ানো শুরু করেছেন। ঢাকায় যানবাহনের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মেট্রোরেল চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

বর্তমানে বাস-ট্রাক মালিক সমিতির বড় পদগুলোতে কিছু হাইব্রিড আওয়ামী লীগার রয়েছে, যারা বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকাকালে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তারা এখন মালিক, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এসব হাইব্রিড আওয়ামী লীগের ভেতরে যেমন ঢুকেছে, ঠিক তেমনিভাবে পরিবহণ মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন জায়গায় ঢুকেছে। এরা সুযোগসন্ধানী। তারা ভাবছে, সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, সেহেতু প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে। তাই তারা ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমতাবস্থায় ছাত্রছাত্রীরা যদি লেখাপড়ার ক্ষতি করে রাস্তায় নামে, নিজেদের মধ্যে গণ্ডগোল করে, তাতে মানসিক ও বিবেকের দিক থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

আমার মনে হয়, যদি বাস মালিকরা যুক্তিপূর্ণভাবে সরকারের সঙ্গে আলাপ করেন, তাহলে কিছুটা ভর্তুকি পেতে পারেন। তেলের দাম বাড়ায় কিছুটা ছাড় তারা পেতে পারেন। তবে সেটা যুক্তিপূর্ণ হতে হবে। নয়তো ঢালাওভাবে বাস-ট্রাক মালিকদের সাহায্য করা হলে সেটা কর্মচারী পর্যন্ত পৌঁছায় না। কর্মচারীরা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে। সুতরাং উচিত হবে আইন করে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার ব্যপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। এটি বাস্তবায়নে নজরদারি জোরদার করা।

আমি আবারও বলছি, শিক্ষার্থীদের দাবি যুক্তিপূর্ণ, এটা নিয়ে আর কোনো আলাপ-আলোচনার দরকার নেই। শিক্ষার্থীরা সফল হয়েছে। এখন তাদের উচিত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়া। তা না হলে বিনা কারণে রাস্তায় থেকে নিজেদের ক্ষতি সাধন করলে সেটি আন্দোলনের কুফল হিসাবে বিবেচিত হবে।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী : চক্ষু বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন